লুসিয়াস অ্যাপুলিয়াস “আফ্রিকানাস”
অনুবাদক: উইলিয়াম অ্যাডলিংটন
বাংলা অনুবাদ: অপু চৌধুরী
প্রথম খণ্ড
প্রথম অধ্যায়
থেসালির পথে অ্যাপুলিয়াসের সাথে দুই পথিকের সাক্ষাৎ এবং জাদুকরদের অলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে কথোপকথন।
ব্যবসায়িক প্রয়োজনে আমি যখন থেসালির পথে পাড়ি দিলাম (কারণ সেখানেই আমার মাতৃবংশের পূর্বপুরুষদের বাস; সেই মহাত্মা প্লুটার্ক এবং দার্শনিক সেক্সটাসের ভাগ্নের বংশধর হওয়া আমাদের জন্য পরম গৌরবের বিষয়), তখন আমাকে পাড়ি দিতে হয়েছিল এক দীর্ঘ পথ। দুর্গম পর্বতমালা আর পিচ্ছিল উপত্যকা অতিক্রম করে, কর্দমাক্ত পতিত জমির বুক চিরে আমার সেই যাত্রা ছিল বেশ কষ্টসাধ্য।
পথ চলতে চলতে আমার অশ্বটি যখন ক্লান্ত হয়ে ধীরলয়ে চলতে শুরু করল, তখন আমি ঘোড়া থেকে নেমে পড়লাম। উদ্দেশ্য, কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া এবং নিজেকে পুনরায় চনমনে করে তোলা। পরম যত্মে ঘোড়াটির শরীর থেকে ঘাম মুছে দিলাম এবং লাগাম খুলে হাতে নিয়ে আলতো পায়ে হাঁটতে শুরু করলাম, যাতে সে স্বাচ্ছন্দ্যে মলমূত্র ত্যাগ করতে পারে এবং পথের ক্লান্তি দূর করতে পারে।
ঘোড়াটি যখন সতেজ হয়ে মাঠে ঘাস চিবুচ্ছিল (মাঝে মাঝে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ঘাড় হেলিয়ে দিচ্ছিল), তখন আমার দৃষ্টিগোচর হলো দুই অশ্বারোহী, যারা আমার সম্মুখেই পথ চলেছিল। আমি দ্রুতপায়ে তাদের অতিক্রম করে তৃতীয় সঙ্গী হিসেবে তাদের দলে ভিড়ে গেলাম।
তাদের কথোপকথন শোনার জন্য আমি কান পেতে রইলাম। লক্ষ্য করলাম, তাদের একজন অপরজনকে লক্ষ্য করে উচ্চস্বরে হাসছে এবং উপহাসের সুরে বলছে, “আমি তোমাকে মিনতি করছি, থামো! আর বোকো না। তোমার এমন অযৌক্তিক এবং অবিশ্বাস্য গাঁজাখুরি গল্প শোনার মতো ধৈর্য আমার নেই।”
এ কথা শুনে আমার আগ্রহ বেড়ে গেল। আমি বললাম, “মশাইরা, আমাকে যদি অনুমতি দেন, তবে আপনাদের এই আলোচনার অংশীদার হতে চাই। আমি আপনাদের সব কথা জানতে আগ্রহী, তবে অহেতুক নাক গলাতে আসিনি। খোশগল্প আর আনন্দদায়ক আলোচনার মধ্য দিয়ে পথ চললে আমাদের যাত্রাপথ সংক্ষিপ্ত মনে হবে এবং সম্মুখের ওই খাড়া পাহাড়টি আমরা সহজেই অতিক্রম করতে পারব।”
কিন্তু যে ব্যক্তিটি তার সঙ্গীকে নিয়ে হাসাহাসি করছিল, সে পুনরায় বলে উঠল, “সত্যি বলতে কি, ওর এই গল্পটি ততটাই সত্য, যতটা একজন মানুষ যদি দাবি করে যে—জাদু ও মন্ত্রের বলে নদীর স্রোতকে উজানে বইয়ে দেওয়া সম্ভব, সমুদ্রকে স্তব্ধ করে দেওয়া যায়, অথবা বাতাসকে শূন্যে মিলিয়ে দেওয়া সম্ভব! কিংবা ধরুন, সূর্যকে তার প্রাকৃতিক গতিপথ থেকে থামিয়ে দেওয়া, জাদুকরী ভেষজের রস দিয়ে চাঁদকে কলঙ্কহীন করা, আকাশ থেকে নক্ষত্রদের টেনে নামানো, দিনকে অন্ধকার করা এবং রজনীকে চিরস্থায়ী করা সম্ভব!”
তার কথা শুনে আমি বক্তার প্রতি আরও আগ্রহী হয়ে উঠলাম এবং বললাম, “আমি আপনাকে অনুরোধ করছি, যিনি গল্পটি শুরু করেছিলেন—প্লিজ, থামবেন না। বাকিটুকু বলুন।”
অতঃপর যে ব্যক্তিটি উপহাস করছিল, তার দিকে ফিরে বললাম, “আর আপনি, মশাই, সম্ভবত স্থূলবুদ্ধি এবং একগুঁয়ে স্বভাবের কারণে লোকমুখে প্রচলিত সত্য ঘটনাকেও অবজ্ঞা ও উপহাস করছেন। আপনি কি জানেন না যে, মানুষের ভ্রান্ত ধারণার কারণেই অনেক সত্যকে মিথ্যা বলে গণ্য করা হয়? যা সচরাচর দেখা যায় না বা কদাচিৎ শোনা যায়, অথবা যা সাধারণ যুক্তির বাইরে—তাকে যদি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়, তবে দেখবেন তা কেবল স্পষ্ট ও সরলই নয়, বরং তা সম্পাদন করাও অত্যন্ত সহজসাধ্য।”
দ্বিতীয় অধ্যায়
এথেন্সে জাদুকরের ভেলকি দেখার অভিজ্ঞতা এবং অপরিচিত সঙ্গীর নিজের পরিচয় প্রদান।
“সেবার এক নৈশভোজে একদল ক্ষুধার্ত মানুষের সাথে খেতে বসেছিলাম। পনির এবং যবের আটা দিয়ে ভাজা এক টুকরো মাংস আমি যখন খুব আগ্রহ নিয়ে মুখে পুরলাম, তখন সেটি আমার গলার কাছে এমন শক্তভাবে আটকে গেল যে, শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। মনে হলো, এই বুঝি আমার প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবে।
অথচ এথেন্সে, ‘পিল’ নামক সেই বারান্দার সামনে আমি নিজের চোখে এক জাদুকরকে দেখেছিলাম, যে কিনা একটি ধারালো দুই-হাত তলোয়ার অবলীলায় গিলে ফেলল। এবং তার কিছুক্ষণ পর, দর্শকদের দেওয়া সামান্য কিছু মুদ্রার বিনিময়ে সে একটি শিকারি বর্শাও গিলে ফেলল, যার ফলাটি ছিল নিচের দিকে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর দৃশ্যটি দেখা গেল তারপরেই। সেই বর্শাটি তার শরীরের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে পেছন দিক দিয়ে বের করে আনার পর, তার ওপর আবির্ভূত হলো এক সুন্দর কিশোর। ছেলেটি এতই চটপটে এবং নমনীয় যে, সে নিজেকে সাপের মতো পেঁচিয়ে এবং মোচড় দিয়ে এমন ভঙ্গি করছিল, যেন তার শরীরে কোনো হাড় বা তরুণাস্থি নেই। মনে হচ্ছিল, সে যেন ঔষধের দেবতার হাতে থাকা সেই গিঁটযুক্ত লাঠির ওপর দিয়ে পিছলে চলা এক জ্যান্ত সর্প!”
গল্পটি শেষ করে আমি সেই প্রথম বক্তার দিকে ফিরলাম, যিনি গল্পটি শুরু করেছিলেন। বললাম, “আমি আপনাকে অনুরোধ করছি, আপনি আপনার কাহিনী চালিয়ে যান। আমি একাই আপনার কথা বিশ্বাস করব এবং আপনার এই শ্রমের প্রতিদান হিসেবে পরবর্তী সরাইখানায় আপনার আহার ও পানীয়ের খরচ আমিই বহন করব।”
উত্তরে তিনি বললেন, “নিশ্চয়ই স্যার, আপনার এই উদার প্রস্তাবের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার অনুরোধে আমি আমার কাহিনী অবশ্যই চালিয়ে যাব। কিন্তু তার আগে এই প্রখর সূর্যের দিব্যি দিয়ে বলছি—যা এখন আমাদের মাথার ওপর জ্বলজ্বল করছে—আমার এই কাহিনী ধ্রুব সত্য। পাছে পরবর্তী শহর থেসালিতে পৌঁছানোর পর আপনি এমন কোনো বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন, যা সেখানকার প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে ফেরে।”
“প্রথমে আমি আমার পরিচয় দিই—আমি কে, কী করি এবং কোথায় যাচ্ছি। জেনে রাখুন, আমি ইগিন থেকে এসেছি। মধু, পনির এবং অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী পাইকারি দরে কিনে তা খুচরা বিক্রির জন্য আমি থেসালি, ইটোয়িয়া এবং বোয়িটিয়া অঞ্চলে ভ্রমণ করছি।
আমি খবর পেলাম যে, থেসালির প্রধান শহর হিপ্পাটাতে অত্যন্ত সুস্বাদু এবং জিহ্বায় জল আনা নতুন পনির বিক্রি হচ্ছে। তাই আমি একদিন সদাই করার উদ্দেশ্যে সেখানে গেলাম। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, আমি পৌঁছালাম এক অসময়ে। লুপাস নামের এক পাইকারি ব্যবসায়ী আগের দিনই বাজারের সমস্ত পনির কিনে মজুদ করে ফেলেছিল। ফলে আমি প্রতারিত হলাম এবং খালি হাতে ফিরতে হলো।”
“সেদিন রাতের দিকে ক্লান্ত শরীরটাকে একটু সতেজ করার জন্য আমি স্নানাগারে গেলাম। এবং সেখানেই, মেঝের ওপর বসে থাকতে দেখলাম আমার পুরনো বন্ধু সক্রেটিসকে। তার গায়ে জড়ানো ছিল একটি ছেঁড়া এবং মোটা চাদর। সে এতটাই জীর্ণ, ফ্যাকাশে এবং শোচনীয় অবস্থায় ছিল যে, আমি তাকে প্রথমে চিনতেই পারিনি। ভাগ্য তাকে এমন এক দুর্দশায় ফেলেছিল যে, তাকে সত্যি সত্যিই রাস্তার ধারের কোনো ভিখারির মতো দেখাচ্ছিল, যে পথচারীদের করুণা ভিক্ষা করে।
যদিও সে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরিচিত ছিল, তবুও তার এই অবস্থা দেখে আমি প্রায় হতাশ হয়ে পড়লাম। কাছে গিয়ে বললাম, ‘হায় আমার সক্রেটিস! এ কী দশা তোমার? তোমার কী হয়েছে? তুমি কি কোনো অপরাধ করেছ?
সত্যি বলতে, তোমার বাড়িতে তোমার জন্য শোকের মাতম চলছে। তোমার সন্তানদের আদালতের নির্দেশে জিম্মায় রাখা হয়েছে। তোমার স্ত্রী—যে শোক পালন করতে করতে প্রায় অন্ধ হয়ে গেছে—তার বাবা-মায়ের চাপে পড়ে এখন তোমার মৃত্যুশোক ভুলে নতুন স্বামী গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে। আর তুমি কিনা এখানে প্রেতাত্মা বা শূকরের মতো জীবন কাটাচ্ছ! এ যে আমাদের জন্য চরম লজ্জা ও অপমানের বিষয়!’
আমার কথা শুনে সে উত্তর দিল, ‘ওহ আমার বন্ধু অ্যারিস্টোমেনাস, এখন আমি বুঝতে পারছি যে, তুমি ভাগ্যের এই নিষ্ঠুর খেলা, তার অস্থির পরিবর্তন এবং পিচ্ছিল খামখেয়ালিপনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।’
এই বলে সে লজ্জায় তার মুখটি সেই রুক্ষ চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলল। চাদরটি এতই ছোট ছিল যে, নাভি থেকে নিচের দিকে তার শরীর সম্পূর্ণ অনাবৃত হয়ে পড়ল।
আমি তাকে আর বেশিক্ষণ এমন করুণ ও বিপর্যস্ত অবস্থায় দেখতে পারলাম না। তার হাত ধরে তাকে মাটি থেকে টেনে তুললাম। সে তখনও মুখ ঢেকে রেখেছিল এবং বিড়বিড় করে বলল, ‘ভাগ্যই জয়ী হোক, তার প্রভাব বিস্তার করুক, এবং যা সে শুরু করেছে তা শেষ করুক।’
আমি তৎক্ষণাৎ আমার নিজের একটি পোশাক খুলে তাকে ঢেকে দিলাম এবং তাকে স্নানাগারে নিয়ে গেলাম। তাকে ভালো করে তেল মর্দন করিয়ে, শরীরের সমস্ত নোংরা ও ময়লা ঘষে পরিষ্কার করিয়ে স্নান করালাম।
যদিও আমি নিজেও খুব ক্লান্ত ছিলাম, তবুও সেই হতভাগ্য বন্ধুকে ধরে আমি আমার সরাইখানায় নিয়ে গেলাম। সেখানে একটি বিছানায় তাকে শুইয়ে দিলাম এবং তার জন্য খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা করলাম। এরপর আমরা খোশগল্পে মেতে উঠলাম, মন খুলে হাসাহাসি করলাম—যেমনটি পুরনো দিনে করতাম।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সে তার হৃদয়ের গভীর থেকে এক করুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর নিজের কপালে আঘাত করে দুঃখভরা কণ্ঠে তার কাহিনী বলতে শুরু করল…”
তৃতীয় অধ্যায়
ম্যাসেডোনিয়া থেকে লারিসায় ফেরার পথে সক্রেটিসের লুণ্ঠিত হওয়া এবং মায়াবিনী মেরোইর কুহকজালে আাবদ্ধ হওয়ার ইতিবৃত্ত।
“হায়! কী দুর্ভাগ্য আমার! কেবল গ্ল্যাডিয়েটরদের অস্ত্রের কসরত দেখার কৌতূহলে আমি এমন চরম দুর্দশা ও ভাগ্যের ফাঁদে পা দিয়েছি। ম্যাসেডোনিয়াতে দীর্ঘ দশ মাস আমি বণিক হিসেবে কাজ করে যা উপার্জন করেছিলাম, তা নিয়ে লারিসায় ফেরার পথেই ঘটে বিপত্তি। মূল পথ ছেড়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি দেখার জন্য আমি যেই না এক নির্জন পথে পা বাড়ালাম, অমনি এক গভীর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন উপত্যকায় একদল দস্যু আমাকে ঘিরে ফেলল। আমার সর্বস্ব তারা লুটে নিল, এমনকি আমাকে সহজে নিস্তারও দিতে চাইছিল না।
অশেষ কষ্টে সেই চরম বিপদ থেকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আমি শেষমেশ আশ্রয় নিলাম এক বৃদ্ধার সরাইখানায়। তার নাম মেরোই। বয়সে বৃদ্ধা হলেও সে মদ্যপানে আসক্ত ছিল এবং তার জিহ্বা ছিল চাটুবাক্যে অত্যন্ত পটু। আমি সরল বিশ্বাসে তাকে আমার দীর্ঘ ভ্রমণ, সতর্কতার কারণ এবং সদ্য ঘটে যাওয়া দুর্ভাগ্যের কথা খুলে বললাম।
আমার করুণ কাহিনী শুনে সে আমাকে অত্যন্ত সমাদরে আপ্যায়ন করল এবং উপাদেয় ভোজন করাল। কিন্তু হায়! আহারের পরেই সে আমাকে কামনার ফাঁদে ফেলল এবং নিজের শয্যাসঙ্গী করল। সেই কালরাত্রিতেই আমি হতভাগ্য তার বাহডোরে এই জঘন্য ও বীভৎস রূপ লাভ করলাম। আর সেই ডাইনীর সাথে থাকার বিনিময়ে দস্যুরা দয়া করে আমাকে যে সামান্য বস্ত্রটুকু দিয়ে গিয়েছিল, তা-ও আমাকে বিসর্জন দিতে হলো।”
সক্রেটিসের এই শোচনীয় অবস্থার প্রকৃত কারণ অনুধাবন করে আমি ভর্ৎসনার সুরে বললাম, “সত্যি বলতে কি, তুমি যে চরম দুর্দশা ও বিপর্যয় ভোগ করছ, তা তোমারই প্রাপ্য। কারণ তুমি নিজের শরীরকে কলুষিত করেছ, ধর্মতমা স্ত্রীকে বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে ত্যাগ করেছ এবং তোমার সন্তান, পিতা-মাতা ও বন্ধুদের অপমান করেছ—কেবল এক জঘন্য বারবনিতা ও বৃদ্ধা ডাইনীর প্রণয়াসক্ত হয়ে।”
মেরোইর বিরুদ্ধে আমার এমন কটূক্তি শুনে সক্রেটিস আতঙ্কিত হয়ে উঠল। সে তর্জনী উঁচিয়ে আমাকে থামতে ইঙ্গিত করল এবং ভয়ে জুবুথুবু হয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল কেউ আড়ি পেতে শুনছে কিনা।
ফিসফিস করে সে বলল, “শান্ত হও! আমি তোমাকে মিনতি করছি, এমন এক ক্ষমতাধর ও ভয়ংকর নারীর বিরুদ্ধে কী বলছ, সেদিকে খেয়াল রাখো। পাছে তোমার অসংযত জিহ্বার কারণে তোমার কোনো বড় ক্ষতি হয়ে না যায়।”
আমি বিস্ময়ের সাথে বললাম, “কী বললে? সে কি এতটাই ক্ষমতাবান যেমনটি তুমি বর্ণনা করছ? আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, আমাকে সব খুলে বলো।”
উত্তরে সে বলল, “সত্যিই সে এক অসামান্যা জাদুকরী। তার ক্ষমতা অসীম—সে চাইলে আকাশকে মর্ত্যে নামিয়ে আনতে পারে, পৃথিবীকে শূন্যে ভাসাতে পারে, জলকে পাথরে এবং পাথরকে প্রবহমান জলধারায় পরিণত করতে পারে। এমনকি তার মন্ত্রবলে সে নরকের অতল গহ্বরকে আলোকিত করতে পারে এবং দেবতাদের স্বর্গ থেকে টেনে নামাতে পারে।”
আমি সক্রেটিসকে বাধা দিয়ে বললাম, “এইসব উচ্চমার্গের এবং হেঁয়ালিপূর্ণ কথাবার্তা রাখো। আমাকে সহজ ও সরল ভাষায় বলো, সে আসলে কী করেছে।”
সে তখন বলল, “তুমি কি তার এক-দুটি বা আরও বেশি কীরোলাপ শুনতে চাও? সে কেবল এই অঞ্চলের মানুষদেরই নয়, বরং সুদূর ভারত ও ইথিওপিয়ার অধিবাসীদেরও তার প্রেমে উন্মত্ত করতে বাধ্য করে। এগুলো তার কাছে নিতান্তই ছেলেখেলা। তবে আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, মন দিয়ে শোনো—আমি তার এমন সব জঘন্য কীর্তির কথা বলব যা সে জনসমক্ষে ঘটিয়েছে।”
চতুর্থ অধ্যায়
ডাইনী মেরোইর জাদুকরী প্রতিহিংসা এবং বিভিন্ন ব্যক্তিকে পশুবৎ রূপান্তরের বিবরণ।
“সত্যি বলছি অ্যারিস্টোমেনাস, এই মায়াবিনীর এক প্রেমিক ছিল। সেই যুবকটি অন্য এক নারীকে ভালোবাসত বলে ঈর্ষান্বিত হয়ে মেরোই কেবল একটি মন্ত্র উচ্চারণ করে তাকে একটি উদবিড়ালে পরিণত করে দিল।
তাকে এমন অদ্ভুত পশুকে রূপান্তরিত করার একটি বিশেষ কারণ ছিল। প্রচলিত আছে যে, এই পশু যখন শিকারি ও তাদের কুকুরের তাড়া খায়, তখন প্রাণ বাঁচাতে সে নিজের গোপনাঙ্গ কামড়ে ছিঁড়ে ফেলে এবং শিকারিদের পথে ফেলে দিয়ে পালায়—যাতে শিকারিরা তা পেয়ে শান্ত হয়। মেরোই চেয়েছিল তার সেই অবিশ্বস্ত প্রেমিকের পরিণতিও যেন ঠিক এমনই হয়।”
“একইভাবে তার প্রতিবেশী এক বৃদ্ধ শুঁড়িখানার মালিককে সে ঈর্ষাবশত একটি ব্যাঙে পরিণত করেছিল। সেই হতভাগ্য এখন নিজেরই মদের পিপার তলানিতে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে এবং কর্কশ কণ্ঠে তার পুরনো খদ্দেরদের ডাকছে।”
“আদালতের এক আইনজীবী, যে কিনা একটি ন্যায্য মামলায় মেরোইর বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করেছিল, তাকে সে শিংওয়ালা এক ভেড়ায় পরিণত করেছে। সেই বেচারা এখন ভেড়ার রূপেই নিজের নিয়তি বহন করছে।”
“আরও এক ভয়ংকর ঘটনা শোনো। তার এক প্রেমিকের স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিল। মেরোই এমন এক মন্ত্র প্রয়োগ করল যে, সেই মহিলার প্রসব বন্ধ হয়ে গেল। লোকলজ্জা ও গণনার হিসেবে আট বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু তার প্রসব আর হয় না। তার পেট ফুলে এখন এতটাই বিশাল হয়েছে যে মনে হয় সে কোনো এক অতিকায় হস্তী প্রসব করবে।
যখন এই ঘটনা জানাজানি হলো এবং শহরের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ল, তখন তারা সিদ্ধান্ত নিল যে পরদিন সেই ডাইনীকে পাথর ছুড়ে হত্যা করা হবে। কিন্তু মেরোই তার জাদুকরী শক্তির বলে সেই আক্রমণ প্রতিহত করল। পুরাণের মেদিয়া যেমন রাজা ক্রেওনের হাত থেকে বাঁচার জন্য একদিন সময় নিয়ে পুরো রাজপ্রাসাদ ভস্মীভূত করেছিল, ঠিক তেমনি মেরোই তার ঘরের এক গোপন গর্তে মন্ত্রপাঠ করে প্রেতাত্মাদের আহ্বান জানাল।
পরদিন সকালে দেখা গেল, শহরের প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ ঘরে এমন এক অদৃশ্য শক্তিবলে আটকা পড়েছে যে, টানা দুদিন তারা কেউ বের হতে পারল না। দরজার খিল ভাঙা তো দূরের কথা, দেয়াল ফুটো করার ক্ষমতাও কারও ছিল না। অবশেষে নিরুপায় হয়ে তারা সমস্বরে তাকে ডাকল এবং কঠোর শপথ করল যে, তারা আর কখনও তাকে বিরক্ত করবে না, বরং কেউ তাকে আঘাত করতে এলে তারাই তাকে রক্ষা করবে।
এই প্রতিশ্রুতি পেয়ে এবং কিছুটা দয়াপরবশ হয়ে সে পুরো শহরকে মুক্তি দিল। কিন্তু এই বিদ্রোহের যে মূল হোতা ছিল, মধ্যরাতে তার ঘরবাড়ি, দেয়াল ও ভিত্তিসহ তাকে সে শূন্যে ভাসিয়ে নিয়ে গেল এবং একশত মাইল দূরে এক জলশূন্য পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত অন্য এক শহরে নিক্ষেপ করল। যেহেতু সেখানে বাড়িঘর খুব ঘনসন্নিবিষ্ট ছিল, তাই তার ঘরটি ফেলার জায়গা না পেয়ে সেটিকে শহরের তোরণের সামনেই ফেলে রাখা হলো।”
সক্রেটিসের মুখে এসব শুনে আমি শিউরে উঠলাম। বললাম, “ও আমার বন্ধু সক্রেটিস, তুমি আমাকে এমন সব বিস্ময়কর ও অদ্ভুত ঘটনার কথা শোনালে যে আমি কেবল মানসিক কষ্টই পাচ্ছি না, বরং আমার অন্তরাত্মা ভয়ে কেঁপে উঠছে। পাছে সেই বৃদ্ধা ডাইনী তার পিশাচসিদ্ধ ক্ষমতার বলে আমাদের এই গোপন কথোপকথন শুনে ফেলে!
অতএব, এসো আমরা এখন ঘুমাই। এবং কিছুটা বিশ্রামের পর, ভোরের আলো ফোটার আগেই যত দ্রুত সম্ভব এই অভিশপ্ত স্থান ত্যাগ করি।”
পঞ্চম অধ্যায়
সক্রেটিস ও অ্যারিস্টোমেনাসের একশয্যায় রজনীযাপন এবং ডাইনীদের পৈশাচিক আচরণের বিবরণ।
গল্প বলতে বলতে এবং পরদিন ভোরের প্রস্থানের কথা ভাবতে ভাবতে আমরা ঘুমের আয়োজন করলাম। আমার মনে এক অজানা আতঙ্ক—পাছে মায়াবিনী মেরোই আমাদের ওপরও সেই একই জাদুকরী হিংস্রতা প্রয়োগ করে, যা সে অন্যদের ওপর করেছিল। কিন্তু দীর্ঘ ভ্রমণ, প্রচুর আহার এবং মদিরা পানের ক্লান্তিতে সক্রেটিস অচিরেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
আমি সতর্কতাবশত ঘরের দরজায় ভালো করে খিল এঁটে দিলাম এবং অতিরিক্ত সুরক্ষার জন্য নিজের খাটটি দরজার ঠিক আড়াআড়িভাবে পেতে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু হৃদয়ের গভীর আতঙ্কে কিছুতেই আমার দুচোখের পাতা এক করতে পারলাম না। মধ্যরাত অতিক্রান্ত হওয়ার পর যখন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি, ঠিক তখনই—হায়!
হঠাৎ এক প্রচণ্ড শব্দে ঘরের দরজাটি ভেঙে পড়ল। তালা, খিল এবং কবজাগুলো এমনভাবে ছিটকে পড়ল যেন মনে হলো একদল দস্যু লুঠতরাজ করতে হানা দিয়েছে। আমার ছোট খাটটি, যার একটি পায়া আগে থেকেই ভাঙা ও জরাজীর্ণ ছিল, দরজার ধাক্কায় উল্টে গেল এবং আমিও তার নিচে চাপা পড়লাম।
তখন আমি উপলব্ধি করলাম যে, মানুষের মনের অনুভূতি অনেক সময় প্রকৃতির বিপরীতে কাজ করে। যেমন অতিরিক্ত আনন্দে চোখে জল চলে আসে, তেমনি সেই চরম ভয়ের মুহূর্তেও আমি হাসি সংবরণ করতে পারছিলাম না—এটা ভেবে যে, কিছুক্ষণ আগেও আমি ছিলাম অ্যারিস্টোমেনাস, আর এখন আমি খাটের নিচে কচ্ছপের খোলসে লুকানো শামুকের মতো গুটিসুটি মেরে আছি।
খাটের আড়াল থেকে আমি উঁকি দিলাম। দেখলাম, দুজন বৃদ্ধা নারী ঘরে প্রবেশ করেছে। একজনের হাতে জ্বলন্ত মশাল, অন্যজনের হাতে একটি স্পঞ্জ এবং উন্মুক্ত তলোয়ার। তারা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সক্রেটিসের শিয়রে গিয়ে দাঁড়াল। তলোয়ারধারী নারী অন্যজনকে বলল, “দেখ বোন প্যানথিয়া, এই হলো আমার সেই প্রিয়তম এবং নিষ্ঠুর প্রেমিক, যে দিনরাত আমার যৌবনকে উপভোগ করেছে। অথচ এখন সে আমার ভালোবাসার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে আমাকে অপমান করছে এবং পালিয়ে যাওয়ার ফন্দি আঁটছে। ইউলিসিসের হাতে ক্যালিপসো যেমন পরিত্যক্ত হয়েছিল, আমারও দশা হয়েছে তাই।”
অতঃপর সে খাটের নিচে আমার দিকে ইঙ্গিত করে প্যানথিয়াকে দেখাল, “আর ওই যে, ও হলো এর পরামর্শদাতা। ও-ই তাকে বুদ্ধি দিচ্ছে আমাকে ত্যাগ করার। এখন মৃত্যুর ভয়ে খাটের তলায় মড়ার মতো পড়ে আছে এবং ভাবছে আমাদের চোখ এড়িয়ে অক্ষত অবস্থায় পালাবে। কিন্তু আমি এমন ব্যবস্থা করব যে, সে তার অতীত স্পর্ধা এবং বর্তমান কৌতূহলের জন্য এখনই অনুশোচনা করবে।”
এ কথা শুনে আতঙ্কে আমার শরীর হিম হয়ে গেল, ভয়ে আমি এমনভাবে কাঁপতে লাগলাম যে আমার ওপরের খাটটিও থরথর করে কেঁপে উঠল। তখন প্যানথিয়া মেরোইকে বলল, “বোন, তবে কি একে এখনই টুকরো টুকরো করে ফেলব, নাকি জীবন্ত অবস্থায় অঙ্গচ্ছেদ করব?”
মেরোই (যে পেশায় ছিল শুঁড়িখানার মালকিন এবং মদের ভক্ত) উত্তর দিল, “না, তার চেয়ে বরং একে বাঁচিয়ে রাখা যাক। অন্তত এই হতভাগা সক্রেটিসের মৃতদেহ কবর দেওয়ার জন্য কাউকে তো প্রয়োজন হবে।”
এই বলে সে সক্রেটিসের মাথাটি অন্যদিকে কাত করে ধরল এবং তার গলার বাম দিকে তলোয়ারটি আমূল বসিয়ে দিল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসতেই সে একটি পাত্রে তা ধরে রাখল, যেন এক ফোঁটাও মাটিতে না পড়ে। আমি নিজের চোখে দেখলাম—সে তার হাত সক্রেটিসের ক্ষতবিক্ষত গলার ভেতর ঢুকিয়ে দিল এবং অন্ত্রের ভেতর হাতড়ে তার হৃৎপিণ্ডটি টেনে বের করে আনল। আমার হতভাগ্য বন্ধু একটি করুণ আর্তনাদ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।
তখন প্যানথিয়া স্পঞ্জ দিয়ে গলার সেই বিশাল ক্ষতটি বন্ধ করে দিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ করল, “ওহে সমুদ্রজাত স্পঞ্জ, সতর্ক থেকো—কখনও যেন বহমান নদী পার না হও।”
এরপর তারা আমার ওপরের খাটটি সরিয়ে দিল এবং আমার মুখের ওপর দাঁড়িয়ে তাদের নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত মূত্র ত্যাগ করে আমাকে আদ্যপান্ত ভিজিয়ে দিল। তাদের কাজ শেষ হলে তারা চলে গেল। অলৌকিকভাবে দরজাটি আবার আগের মতো বন্ধ হয়ে গেল, ছিটকে পড়া খিল ও কবজাগুলো যথাস্থানে ফিরে এল।
আমি সেই মেঝের ওপর পড়ে রইলাম—আত্মাহীন, নগ্ন, শীতে কম্পমান এবং মূত্রে সিক্ত। নিজেকে তখন ফাঁসির আসামির মতো মনে হচ্ছিল। ভাবলাম, সকালে যখন এই ঘরে আমার সঙ্গীর খুন হওয়া লাশ পাওয়া যাবে, তখন আমার কী হবে? কে বিশ্বাস করবে আমার এই অদ্ভুত সত্য কাহিনী? সবাই বলবে, যদি আমি প্রতিরোধ করতে অক্ষমও ছিলাম, তবু কেন আমি সাহায্যের জন্য চিৎকার করিনি? কেন তারা আমাকে জীবিত রেখে গেল?
সারা রাত এই দুশ্চিন্তায় কাটিয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, ভোরের আলো ফোটার আগেই গোপনে পালিয়ে যাব।
ভোরের বিভ্রম ও পলায়ন
আমি আমার ঝুলি কাঁধে তুলে নিলাম এবং দরজার খিল খোলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু যে দরজা রাতে জাদুর প্রভাবে নিজে থেকেই খুলে গিয়েছিল, এখন চাবি দিয়েও তা খুলতে চাইছিল না। অবশেষে দরজা খুলে আমি আস্তাবলের রক্ষককে ডেকে বললাম, “ওহে, দরজা খোলো, আমি এখনই রওনা হতে চাই।”
রক্ষক তখন আধোঘুমে আস্তাবলের দরজার পেছনে শুয়ে ছিল। সে বিরক্ত হয়ে বলল, “তুমি কি জানো না পথঘাট কতটা বিপজ্জনক? এত রাতে রওনা হয়ে কি তুমি মরতে চাও? আর যদি তুমি কোনো অপরাধ করে পালিয়ে যেতে চাও, তবে জেনো—তোমার পাপের ভাগীদার হতে আমরা রাজি নই।”
আমি বললাম, “প্রায় ভোর হয়ে এসেছে। আর আমার মতো রিক্তহস্ত পথিকের কাছ থেকে দস্যুরা কী-ই বা নেবে?”
সে পাশ ফিরে শুতে শুতে বলল, “কে জানে বাপু! হয়তো কাল রাতে যে সঙ্গীকে নিয়ে এসেছিলে, তাকে খুন করেই এখন পালানোর চেষ্টা করছ।”
ওহ ঈশ্বর! তার কথা শুনে মনে হলো পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। আমার মনে হলো নরকের দ্বাররক্ষী কুকুর সারবেরাস যেন আমাকে গিলে খেতে আসছে। আমি নিশ্চিত হলাম যে মেরোই দয়া করে আমাকে বাঁচিয়ে রাখেনি, বরং আমাকে ফাঁসির কাষ্ঠে চড়ানোর জন্যই রেখে গেছে।
আমি ঘরে ফিরে এলাম এবং আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু আমার কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। তখন আমি খাটের জীর্ণ দড়িটি খুলে জানলার বিমে বাঁধলাম এবং গলায় ফাঁস লাগিয়ে খাট থেকে লাফ দিলাম। কিন্তু দড়িটি পুরনো ও পচা হওয়ায় মাঝপথে ছিঁড়ে গেল এবং আমি ধপাস করে নিচে শুয়ে থাকা সক্রেটিসের শরীরের ওপর পড়লাম।
ঠিক সেই মুহূর্তে আস্তাবলের রক্ষক চিৎকার করে ঘরে ঢুকল, “কোথায় গেল সেই লোকগুলো যারা মাঝরাতে এত হুলুস্থুল করছিল?”
তার চিৎকারে অথবা আমার পতনের ধাক্কায়—জানি না ঠিক কী কারণে—হঠাৎ সক্রেটিস ঘুম থেকে ধড়মড় করে উঠে বসল এবং বিরক্তি প্রকাশ করে বলল, “অকারণে নয় যে লোকে সরাইখানার মালিকদের গালি দেয়! এই চোরটা মাঝরাতে চিৎকার করে আমার কাঁচা ঘুমটা ভাঙিয়ে দিল।”
আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠে দাঁড়ালাম এবং রক্ষককে বললাম, “দেখো হে, এই আমার বন্ধু, আমার ভাই—যাকে তুমি মৃত বলে সন্দেহ করছিলে!”
আমি সক্রেটিসকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করতে গেলাম, কিন্তু সে আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। “ছিঃ! তোমার গা থেকে প্রস্রাবের কী জঘন্য দুর্গন্ধ আসছে! আগে নিজেকে পরিষ্কার করো।”
আমি কোনোক্রমে একটি মিথ্যা অজুহাত দিয়ে তাকে শান্ত করলাম এবং বললাম, “চলো, আর দেরি না করে এই সুন্দর সকালে বেরিয়ে পড়ি।”
সক্রেটিসের মৃত্যু ও আখ্যানের সমাপ্তি
আমরা শহর থেকে খুব বেশি দূরে যাইনি। ভোরের আলো পুরোপুরি ফুটে উঠেছে। আমি বারবার সক্রেটিসের গলার দিকে তাকালাম—কোথায় সেই ক্ষত? কোথায় সেই স্পঞ্জ? কিন্তু তার গলা ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত। আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম, তবে কি গত রাতের সেই মদিরা আমাকে পাগল করেছিল? আমি কি কোনো ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখেছি?
সক্রেটিসকে আমার মনের কথা জানাতেই সে হেসে বলল, “না, তুমি রক্তে ভেজোনি বটে, তবে প্রস্রাবে ভিজেছ ঠিকই। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমিও স্বপ্নে দেখছিলাম যে আমার গলা কেটে ফেলা হয়েছে এবং আমার হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে নেওয়া হচ্ছে। সেই ব্যথার স্মৃতিতে এখনও আমার হাঁটু কাঁপছে। আমাকে কিছু খেতে দাও, শরীরটা বড্ড দুর্বল লাগছে।”
আমরা একটি বিশাল চিনার গাছের নিচে বসলাম। আমি ঝুলি থেকে রুটি ও পনির বের করে দিলাম। সে যখন গোগ্রাসে খাচ্ছিল, আমি লক্ষ্য করলাম তার চেহারা ক্রমশ ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। আমার মনে সেই ‘ফিউরি’ বা প্রতিহিংসার দেবীদের কথা ভেসে উঠল। ভয়ে আমার গলার নিচ দিয়ে খাবার নামছিল না।
প্রচুর পনির খাওয়ার ফলে সক্রেটিসের প্রচণ্ড তৃষ্ণা পেল। কাছেই একটি স্বচ্ছ জলের ধারা বয়ে যাচ্ছিল। আমি বললাম, “সক্রেটিস, ওই জলে গিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করো।”
সে নদীর তীরে হাঁটু গেড়ে বসল। কিন্তু হায়! যেইমাত্র তার ঠোঁট জল স্পর্শ করল, অমনি তার গলার সেই অদৃশ্য ক্ষতটি বিশাল হয়ে হাঁ করে খুলে গেল। সেই জাদুকরী স্পঞ্জটি ছিটকে জলে পড়ে গেল এবং তার সঙ্গে বেরিয়ে এল শেষ রক্তবিন্দু। আমার হতভাগ্য বন্ধুটি প্রাণহীন হয়ে নদীতে পড়ে যাচ্ছিল, আমি কোনোক্রমে তার পা ধরে টেনে তুললাম।
নদীর ধারের বালুকাময় তীরে আমি আমার বন্ধুকে সমাধিস্থ করলাম। তারপর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে, নিজেকে তার মৃত্যুর জন্য দায়ী মনে করে—আমি আমার দেশ, স্ত্রী ও সন্তানদের ত্যাগ করে এই নির্বাসিত জীবন বেছে নিলাম।
অ্যারিস্টোমেনাসের গল্প শেষ হলো। তার যে সঙ্গীটি প্রথমে তাকে অবিশ্বাস করছিল, সে এবার বলল, “সত্যিই, এমন আজগুবি গল্প আমি জীবনে শুনিনি।” তারপর সে আমার (অ্যাপুলিয়াসের) দিকে ফিরে বলল, “মশাই, আপনাকে তো বেশ বিদ্বান ও ভদ্রলোক মনে হচ্ছে। আপনি কি এই গালগল্প বিশ্বাস করেন?”
আমি উত্তর দিলাম, “অবশ্যই। কেন করব না? মানুষের ভাগ্যে যা লেখা থাকে, তা খণ্ডানোর সাধ্য কার? আমাদের জীবনে এমন অনেক কিছুই ঘটে যা সাধারণ মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। আমি তার গল্প বিশ্বাস করি এবং তাকে ধন্যবাদ জানাই। তার এই চমৎকার বর্ণনায় আমাদের যাত্রাপথ অনেক সংক্ষিপ্ত ও আনন্দদায়ক হয়েছে। এমনকি আমার ঘোড়াটিও বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে।”
এভাবেই আমাদের কথোপকথন ও যাত্রার সমাপ্তি ঘটল। তারা দুজন বাঁ-দিকের গ্রামের পথ ধরল, আর আমি প্রবেশ করলাম শহরে।
ষষ্ঠ অধ্যায়
অ্যাপুলিয়াসের হিপেট নগরে আগমন, মিলোর গৃহে আশ্রয় গ্রহণ এবং করিন্থের ডেমিয়াসের পত্র অর্পণ।
সেই দুই সঙ্গী বিদায় নেওয়ার পর আমি শহরে প্রবেশ করলাম। পথিমধ্যে এক বৃদ্ধার সাথে সাক্ষাৎ হলো। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “এই শহরের নাম কি হিপেট?” তিনি সম্মতি জানিয়ে বললেন, “হ্যাঁ।”
অতঃপর আমি জানতে চাইলাম, তিনি মিলো নামক শহরের এক অল্ডারম্যান বা নগরপিতার খোঁজ জানেন কিনা। এ কথা শুনে তিনি হেসে উঠলেন এবং বললেন, “সত্যিই, মিলোকে অল্ডারম্যান বলা বা শহরের দেয়ালের বাইরে বসবাসকারীদের মধ্যে প্রধান হিসেবে গণ্য করাটা অযৌক্তিক নয়।”
আমি তখন বললাম, “দয়া করে হে ভদ্র মহিলা, পরিহাস করবেন না। আমাকে বলুন তিনি কেমন মানুষ এবং কোথায় বাস করেন।”
তিনি উত্তর দিলেন, “দেখছেন ওই ঝুলবারান্দাগুলো, যা একদিকে শহরের তোরণের সাথে এবং অন্যদিকে পাশের গলির সাথে যুক্ত? ওখানেই মিলোর বাস। তিনি অর্থ ও সম্পদে অত্যন্ত বিত্তবান, কিন্তু তার সীমাহীন লোভ এবং ঘৃণ্য লালসার জন্য তিনি কুখ্যাত। তিনি সুদের কারবার করে জীবনযাপন করেন এবং বন্ধক রেখে টাকা ধার দেন।
এত বিত্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি একটি ছোট জরাজীর্ণ বাড়িতে বাস করেন এবং দিনরাত কেবল টাকা গুনতে থাকেন। তার স্ত্রীও তার এই চরম কৃপণতার যোগ্য সহচরী। তাদের সংসারে একজন দাসী ছাড়া আর কেউ নেই, যে কিনা ভিখারির মতো পোশাক পরে থাকে।”
তার কথা শুনে আমি মনে মনে হাসলাম এবং ভাবলাম, আমার বন্ধু ডেমিয়াস আমার প্রতি বেশ ভালোই সুবিচার করেছে! একজন অপরিচিতকে এমন এক ব্যক্তির কাছে পাঠিয়েছে, যার বাড়িতে আমাকে অন্তত রান্নার ধোঁয়া বা মাংসের গন্ধ—কোনোটিরই ভয় পেতে হবে না।
আমি মিলোর দরজার দিকে ঘোড়া চালিয়ে গেলাম। দরজাটি ছিল শক্তভাবে বন্ধ। আমি জোরে কড়া নাড়লাম। ভেতর থেকে এক দাসী বেরিয়ে এসে বিরক্তির সুরে বলল, “ওহে মশাই, এত জোরে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছেন কেন? আপনি কী ধরনের টাকা ধার নিতে চান? জানেন না, আমরা সোনা-রুপা বা গহনা ছাড়া কোনো বন্ধক রাখি না?”
আমি তাকে শান্ত কণ্ঠে বললাম, “দয়া করে বাছা, একটু নম্রভাবে কথা বলো। তোমার মনিব কি ভেতরে আছেন?”
সে বলল, “হ্যাঁ, আছেন। কিন্তু কেন জিজ্ঞাসা করছেন?”
আমি বললাম, “আমি করিন্থ থেকে এসেছি এবং তার বন্ধু ডেমিয়াসের কাছ থেকে তার জন্য চিঠি নিয়ে এসেছি।”
দাসী তখন বলল, “দয়া করে এখানে অপেক্ষা করুন, আমি তাকে খবর দিই।” এই বলে সে দরজাটি আবার শক্ত করে বন্ধ করে ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, “আমার মনিব আপনাকে ঘোড়া থেকে নেমে ভেতরে আসার অনুরোধ করেছেন।”
আমি ভেতরে প্রবেশ করে দেখলাম, মিলো একটি ছোট বিছানায় বসে সান্ধ্যভোজন করছেন এবং তার স্ত্রী তার পায়ের কাছে বসে আছেন। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, টেবিলে কোনো খাবার ছিল না। দাসীর নির্দেশমতো আমি তার কাছে গেলাম, তাকে অভিবাদন জানিয়ে ডেমিয়াসের চিঠিটি তার হাতে দিলাম।
চিঠিটি পড়ে তিনি বললেন, “সত্যিই, আমি আমার বন্ধু ডেমিয়াসকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই। তিনি আপনার মতো একজন যোগ্য অতিথি পাঠিয়েছেন।”
এরপর তিনি স্ত্রীকে সরে যেতে এবং আমাকে তার জায়গায় বসতে নির্দেশ দিলেন। আমি সৌজন্যবশত আপত্তি জানালে তিনি আমার পোশাক ধরে টেনে বসালেন এবং বললেন, “বসুন, বসুন। আমাদের এখানে বসার জন্য অন্য কোনো টুল বা চেয়ার নেই। চুরির ভয়ে আমরা বাড়তি কোনো আসবাব রাখি না।”
তার আদেশমতো আমি বসলাম। তিনি আমার সাথে আলাপচারিতায় মেতে উঠলেন এবং বললেন, “সত্যিই, আপনার দেহের গঠন এবং মুখের ওই সম্ভ্রান্ত লাবণ্য দেখে আমি অনুমান করছি যে আপনি এক অভিজাত বংশের সন্তান। আমার বন্ধু ডেমিয়াসও তার চিঠিতে তা উল্লেখ করেছেন।
অতএব, আমি আপনাকে অনুরোধ করছি, আমাদের এই দীনহীন কুটিরকে সদয়ভাবে গ্রহণ করুন। ওই যে কক্ষটি দেখছেন, ওটি এখন আপনার। এটিকে নিজের ঘর মনে করে ব্যবহার করবেন। এতে যদি আপনি সন্তুষ্ট হন, তবে আপনি আপনার মহান পূর্বপুরুষ থেসিয়াসের গুণাবলীরই অনুসরণ করবেন, যিনি একদা হেকাদেসের সামান্য কুটিরকে অবজ্ঞা করেননি।”
অতঃপর তিনি তার দাসী ফোটসকে ডেকে বললেন, “এই ভদ্রলোকের জিনিসপত্র তার কক্ষে নিয়ে যাও এবং নিরাপদে রেখে দাও। আর তার হাত-মুখ ধোয়ার জন্য জল, তোয়ালে এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দ্রুত নিয়ে এসো। তারপর তাকে কাছের স্নানাগারে নিয়ে যাও, কারণ দীর্ঘ ভ্রমণে তিনি নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত।”
তার কথা শুনে আমি মিলোর চরিত্রের কিছুটা আঁচ করতে পারলাম। তার অনুগ্রহ আরও পাওয়ার আশায় আমি বললাম, “মহাশয়, এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। পথে সব জায়গায় আমি যথেষ্ট বিশ্রাম ও সেবা পেয়েছি। তবে আমি স্নানাগারে যাব। কিন্তু আমার প্রধান চিন্তা হলো আমার ঘোড়াটি। সে আমাকে দ্রুত এখানে নিয়ে এসেছে, তাই তার ভালো যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। ফোটস, এই টাকাটি নাও এবং তার জন্য কিছু খড় ও যব কিনে এনো।”
সপ্তম অধ্যায়
মাছ কিনতে গিয়ে অ্যাপুলিয়াসের সাথে তার বন্ধু পিথিয়াসের সাক্ষাৎ এবং এক অদ্ভুত বিড়ম্বনা।
সব ব্যবস্থা করার পর আমি স্নানাগারের দিকে রওনা হলাম। কিন্তু তার আগে রাতের খাবারের জন্য কিছু কেনাকাটা করতে বাজারে গেলাম। দেখলাম, সেখানে প্রচুর মাছ বিক্রি হচ্ছে। আমি দরদাম করে একশ পেন্সের মাছ শেষমেশ বিশ পেন্স দিয়ে কিনলাম।
মাছ কিনে যখন ফিরছিলাম, তখন আমার এক পুরনো পরিচিত এবং এথেন্সের সহপাঠী পিথিয়াসের সাথে দেখা হলো। কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকার পর সে আমাকে চিনতে পারল এবং কাছে এসে আলতো করে আলিঙ্গন করে বলল, “ও আমার প্রিয় বন্ধু লুসিয়াস! কতদিন পর দেখা! আমাদের শিক্ষক ভেস্টিয়াসের কাছ থেকে চলে আসার পর তোমার কোনো খবরই পাইনি। দয়া করে বলো, এখানে তোমার আগমনের কারণ কী?”
আমি উত্তর দিলাম, “আগামীকাল তোমাকে সব বিস্তারিত বলব। কিন্তু আগে বলো, এই যে দলবল নিয়ে তুমি চলেছ, তাদের হাতে এই লাঠিসোঁটা, আর তোমার গায়ে এই ম্যাজিস্ট্রেটের পোশাক—এর অর্থ কী? মনে হচ্ছে তুমি তোমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করেছ। আমি সত্যিই খুব আনন্দিত।”
পিথিয়াস গর্বিত ভঙ্গিতে বলল, “আমি এখন এই বাজারের খাদ্য পরিদর্শক বা ক্লার্কের পদে অধিষ্ঠিত। যদি তোমার রাতের খাবারের জন্য কিছু প্রয়োজন হয় তবে বলো, আমি ব্যবস্থা করে দেব।”
আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম যে আমি ইতিমধ্যেই যথেষ্ট মাছ কিনেছি। কিন্তু পিথিয়াস যখন আমার ঝুড়ির দিকে তাকাল এবং মাছগুলো নেড়েচেড়ে দেখল, সে জিজ্ঞাসা করল, “এই সামান্য মাছের জন্য তুমি কত দাম দিয়েছ?”
আমি বললাম, “অনেক দরাদরি করেও বিশ পেন্সের নিচে নামাতে পারিনি।”
এ কথা শুনে সে আমাকে আবার বাজারে টেনে নিয়ে গেল এবং জিজ্ঞাসা করল, “কার কাছ থেকে এগুলো কিনেছ?”
আমি এক কোণায় বসে থাকা এক বৃদ্ধকে দেখিয়ে দিলাম। পিথিয়াস তৎক্ষণাৎ তার ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বৃদ্ধকে ভর্ৎসনা শুরু করল, “এভাবেই কি তোমরা অপরিচিতদের, বিশেষ করে আমাদের বন্ধুদের সাথে আচরণ করো? এই সামান্য মাছের জন্য এত দাম চাইছ, যা আধা পেন্সেরও যোগ্য নয়?
এখন আমি বুঝতে পারছি, কেন মানুষ থেসালির এই প্রধান শহরটি ত্যাগ করছে। তোমাদের এই অত্যধিক মূল্যের কারণেই এই শহর জনমানবহীন মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু জেনো রেখো, তোমরা শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না। আমার ক্ষমতা কতটুকু এবং অপরাধীদের আমি কীভাবে শায়েস্তা করি, তা এবার হাড়ে হাড়ে টের পাবে।”
এই বলে সে আমার হাত থেকে ঝুড়িটি নিয়ে মাছগুলো মাটিতে ফেলে দিল এবং তার একজন রক্ষীকে আদেশ দিল সেগুলোকে পা দিয়ে পিষে ফেলতে। এই ‘মহৎ’ কর্ম সম্পাদন করে সে আমাকে বলল যে, এই বৃদ্ধ শয়তানের জন্য কেবল এই অপমান আর তিরস্কারই যথেষ্ট শাস্তি।
আমি হতভম্ব ও বিস্মিত হয়ে স্নানাগারের দিকে পা বাড়ালাম। একদিকে আমার বন্ধু পিথিয়াসের এই অদ্ভুত ‘অনুগ্রহ’ এবং অন্যদিকে আমার অর্থ ও খাবার—উভয়ই হারিয়ে আমি রিক্তহস্তে ফিরলাম। স্নান সেরে শরীর সতেজ করে যখন মিলোর বাড়িতে ফিরলাম, তখন আমার হাতে না ছিল টাকা, না ছিল খাবার।
কক্ষে প্রবেশ করতেই ফোটস এসে জানাল যে তার মনিব আমাকে রাতের খাবারে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু মিলোর কৃপণতার কথা আমার অজানা ছিল না, তাই আমি অজুহাত দেখালাম যে খাবারের চেয়ে এখন আমার বিশ্রাম ও ঘুম বেশি প্রয়োজন।
ফোটস যখন এ কথা মিলোকে জানাল, তখন সে নিজেই এসে আমার হাত ধরল এবং বলল, “আমি এখান থেকে নড়ব না, যতক্ষণ না আপনি আমার সাথে আসছেন।” সে এমনভাবে দিব্যি দিয়ে আমাকে বাধ্য করল যে, অগত্যা আমাকে তার সাথে যেতেই হলো।
সে আমাকে তার কক্ষে নিয়ে গিয়ে বিছানায় বসল এবং তার বন্ধু ডেমিয়াস, তার স্ত্রী, সন্তান এবং পরিবারের সবার খুঁটিনাটি খবর নিতে শুরু করল। আমি ধৈর্য ধরে সব প্রশ্নের উত্তর দিলাম। এরপর সে আমার ভ্রমণের কারণ এবং আমাদের দেশের পরিস্থিতি, প্রধান ম্যাজিস্ট্রেট এবং ভাইসরয় সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করতে লাগল।
ততক্ষণে আমি কেবল পথশ্রমে নয়, কথার শ্রমেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। গল্পের মাঝখানের আমি প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়ছিলাম এবং অসংলগ্ন উত্তর দিচ্ছিলাম। অবশেষে যখন সে বুঝতে পারল যে আমি কথা বলার মতো অবস্থায় নেই, তখন সে আমাকে অব্যাহতি দিল।
অবশেষে এই বৃদ্ধের বকবক এবং সেই ‘ক্ষুধার্ত’ সান্ধ্যভোজ (যেখানে কেবল কথার ফুলঝুরি ছিল, খাবারের লেশমাত্র ছিল না) থেকে রেহাই পেয়ে আমি আমার কক্ষে ফিরে এলাম। খাবারের পরিবর্তে কেবল গল্প দিয়ে পেট ভরিয়ে আমি আমার বহু কাঙ্ক্ষিত বিশ্রামের কোলে ঢলে পড়লাম।
দ্বিতীয় খণ্ড
অষ্টম অধ্যায়
বিররেনার সাথে অ্যাপুলিয়াসের সাক্ষাৎ এবং প্রাসাদের বিস্ময়কর বর্ণনা।
রজনী অতিক্রান্ত হওয়ার পর যখন ভোরের আলো ফুটল, তখন আমি শয্যা ত্যাগ করলাম। আমার মন তখন এক অদ্ভুত বিস্ময় আর অদম্য কৌতূহলে পরিপূর্ণ। আমি স্মরণ করলাম যে, আমি এখন থেসালির বুকে অবস্থান করছি—সেই ভূমি, যা জগতজুড়ে জাদুকরী মন্ত্র আর মায়াবিদ্যার পীঠস্থান হিসেবে খ্যাত। আমার সঙ্গী অ্যারিস্টোমেনাসের বলা সেই শহরের অদ্ভুত সব গল্প বারবার আমার স্মৃতিপটে ভেসে উঠতে লাগল।
অজানাকে জানার প্রবল আকাঙ্ক্ষায় আমি শহরের পথে বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু আমার চোখের সামনে যা কিছু দৃশ্যমান হচ্ছিল, তার কোনোটিকেই আমি সাধারণ বা স্বাভাবিক বলে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। জাদুকরী মায়ার প্রভাবে আমার মনে হতে লাগল, সবকিছুই যেন রূপান্তরিত এবং ভিন্ন কোনো সত্তা ধারণ করে আছে।
আমার ভ্রম হতে লাগল যে, পথের ধারের পাথরগুলো একসময় মানুষ ছিল, যা এখন শক্ত প্রস্তরে পরিণত হয়েছে। যে পাখিদের কলকাকলি শুনছি, নগরের প্রাচীরের বাইরের বৃক্ষরাজি, এমনকি প্রবহমান জলধারা—সবই যেন এককালে মানবসত্তা ছিল, এখন জাদুর প্রভাবে রূপান্তর লাভ করেছে। মনে হলো, এখনই হয়তো জড় মূর্তিরা হেঁটে বেড়াবে, দেয়াল কথা বলবে, আর বন্য পশুরা মানুষের ভাষায় অদ্ভুত সব সংবাদ শোনাব। আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম আকাশ থেকে কোনো দৈববাণী শোনার বা সূর্যের কিরণ থেকে কোনো ভবিষ্যৎবাণী দেখার আশায়।
এভাবেই বিস্ময়, কিছুটা হতাশা আর বিরক্তি মিশ্রিত এক অদ্ভুত ঘোর নিয়ে আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে এক রাস্তা থেকে অন্য রাস্তায় ঘুরতে লাগলাম। অবশেষে কৌতূহলবশত চারপাশ দেখতে দেখতে আমি অজান্তেই বাজারের চত্বরে এসে পৌঁছালাম।
সেখানে এক সম্ভ্রান্ত মহিলাকে দেখলাম, যাকে ঘিরে ছিল বহু দাস-দাসী। তাঁর পরিধানে ছিল স্বর্ণখচিত এবং মণিমুক্তাখচিত মহামূল্যবান বস্ত্র, যা তাঁর অভিজাত বংশপরিচয় বহন করছিল। তাঁর পেছনে থাকা এক বৃদ্ধ ভৃত্য আমাকে দেখামাত্রই চিনে ফেলল এবং বিড়বিড় করে বলল, “এ যে সত্যিই লুসিয়াস!”
সে এগিয়ে এসে আমাকে পরম স্নেহে আলিঙ্গন করল এবং তৎক্ষণাৎ তার মালকিনের কানে ফিসফিস করে কিছু বলল। তারপর পুনরায় আমার কাছে এসে বলল, “লুসিয়াস, আপনি আপনার প্রিয় মাসি এবং পরম সুহৃদকে কেন অভিবাদন জানাচ্ছ না?”
আমি বিনীতভাবে উত্তর দিলাম, “মহাশয়, এক অপরিচিতা সম্ভ্রান্ত রমণীর সাথে আগ বাড়িয়ে পরিচিত হওয়ার ধৃষ্টতা আমার নেই।”
লজ্জা ও সংকোচ নিয়ে আমি যখন তাঁর দিকে এগিয়ে গেলাম, তখন তিনি আমার দিকে ফিরলেন এবং বললেন, “দেখো, ওর অবয়ব অবিকল ওর মা সালভিয়ার মতো। সেই একই লাবণ্য, সেই সুঠাম উচ্চতা। ওর ছিপছিপে গড়ন, গায়ের রক্তিম আভা, সোনালি কেশরাশি আর ঈগলের মতো তীক্ষ্ণ ধূসর চক্ষু—সবই সালভিয়ার প্রতিচ্ছবি। ওর মার্জিত চলনবলনই প্রমাণ করে যে ও সালভিয়ারই প্রকৃত সন্তান।”
তিনি আরও বললেন, “ওরে লুসিয়াস, আমি তোকে নিজের হাতে মানুষ করেছি। আমি তোর মায়ের রক্তের সম্পর্কের বোন না হলেও আমরা একই মায়ের দুধ পান করেছি, একই গর্ভে লালিত হয়েছি এবং একই বাড়িতে বড় হয়েছি। কারণ আমরা দুজনেই মহাত্মা প্লুটার্কের বংশধর। আমাদের মধ্যে পার্থক্য কেবল এইটুকু যে, সে আমার চেয়ে অধিকতর সম্মান ও বিত্তের ঘরে বিবাহিত হয়েছে। আমিই সেই বিররেনা, যার নাম তুই নিশ্চয়ই তোর বাড়িতে বহুবার শুনেছিস। অতএব আমি অনুরোধ করছি, আমার প্রাসাদে চল এবং একে নিজের গৃহ মনে কর।”
তাঁর আন্তরিকতায় আমি কিছুটা লজ্জিত হলাম এবং বললাম, “ঈশ্বর না করুন মাসিমণি! আমি আমার বর্তমান গৃহকর্তা মিলোকে কোনো কারণ ছাড়া ত্যাগ করতে পারি না। তবে আমি কথা দিচ্ছি, যখনই এ পথ দিয়ে যাওয়ার সুযোগ হবে, আমি আসব এবং আপনার খোঁজ নেব।”
কথা বলতে বলতে আমরা তাঁর প্রাসাদে এসে পৌঁছালাম। কী অপূর্ব সেই অট্টালিকা! প্রবেশদ্বারের স্তম্ভগুলো সুনিপুণভাবে চতুর্ভুজাকারে সাজানো, যার ওপর খোদাই করা বিবিধ মূর্তি ও চিত্র। তবে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ছিল বিজয়ের দেবী বা ‘ভিক্টোরি’-র মূর্তিটি। সেটি এতই জীবন্ত যে মনে হচ্ছিল, দেবী এখনই ডানা মেলে এদিক-সেদিক উড়ে বেড়াবেন।
আঙিনার ঠিক মাঝখানে শ্বেতপাথরে খোদাই করা দেবী ডায়ানার এক অপরূপ মূর্তি। এটি ছিল এক বিস্ময়কর শিল্পকর্ম। বাতাসের বিপরীতে দাঁড়ালে যেমন হয়, তাঁর পোশাকগুলো যেন ঠিক সেভাবেই উড়ছে এবং তিনি আগন্তুকদের সম্ভাষণ জানাচ্ছেন। দেবীর দুপাশে পাথরের তৈরি শিকারি কুকুর—তাদের চোখ জ্বলজ্বল করছে, কান খাড়া, নাসরন্ধ্র স্ফীত এবং দাঁত বের করা হিংস্র ভঙ্গি। মনে হচ্ছিল, এখনই তারা বিকট শব্দে ঘেউ ঘেউ করে উঠবে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ভাস্কর এই কুকুরগুলোকে এমনভাবে তৈরি করেছেন যেন তারা সামনের পা উঁচিয়ে এবং পেছনের পা মাটিতে গেঁথে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।
দেবীর পেছনের দিকে পাথরের গায়ে একটি কৃত্রিম গুহা খোদাই করা ছিল। সেখানে শ্যাওলা, লতা-পাতা, পল্লব ও সবুজ ডালপালার নিখুঁত কারুকাজ। পাথরের ভেতরেও যেন এক অদ্ভুত দ্যুতি খেলা করছিল। গুহার কিনারায় খোদাই করা ছিল আপেল আর আঙুর, যেখানে শিল্পীরা প্রকৃতির প্রতি স্পর্ধা দেখিয়ে নিজেদের মুনশিয়ানা ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ফলগুলো এতই জীবন্ত যে মনে হচ্ছিল, গ্রীষ্মকাল এলে হাত বাড়ালেই পেড়ে খাওয়া যাবে।
দেবীর পদতলে ঝর্ণার মতো যে জলধারা প্রবাহিত হচ্ছিল, তার ওপর ঝুলন্ত আঙুরগুচ্ছগুলো জলের স্রোতে সত্যিই দুলছে বলে ভ্রম হচ্ছিল। আর সেই পাথরের ডালপালার আড়ালে উঁকি দিচ্ছিল অভিশপ্ত অ্যাক্টিওনের মূর্তি। দেবী ডায়ানাকে স্নানরতা অবস্থায় দেখে ফেলায় তিনি কীভাবে হরিণে রূপান্তরিত হচ্ছেন এবং নিজেরই শিকারি কুকুরের দ্বারা ছিন্নভিন্ন হচ্ছেন—সেই করুণ দৃশ্য সেখানে মূর্ত হয়ে ছিল।
আমি যখন এই অপূর্ব শিল্পকর্ম দর্শনে মগ্ন, তখন বিররেনা আমাকে বললেন, “বৎস, এখানে যা কিছু দেখছ, সবই তোমার সেবায় নিবেদিত।”
অতঃপর তিনি ইশারায় অন্যদের সরে যেতে বললেন। আমরা যখন একান্তে, তখন তিনি বললেন, “আমার প্রিয় লুসিয়াস, আমি দেবী ডায়ানার নামে শপথ করে বলছি, আমি তোমার নিরাপত্তার জন্য গভীরভাবে শঙ্কিত। আমি তোমাকে নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করি। তাই বলছি—খুব সাবধান!
প্যামফিলেসের সেই জঘন্য মায়াজাল থেকে নিজেকে রক্ষা কোরো। ওই প্যামফিলেস হলো মিলোর স্ত্রী, যাকে তুমি তোমার আশ্রয়দাতা বলছ। সে এই অঞ্চলের প্রধান মায়াবিনী ও ডাকিনী। সামান্য ডালপালা আর নুড়িপাথর দিয়ে মন্ত্র পড়ে সে স্বর্গের নক্ষত্রদের নরকের অতলে নিক্ষেপ করতে পারে এবং এই সুশৃঙ্খল পৃথিবীকে আদিম বিশৃঙ্খলায় ফিরিয়ে নিতে পারে।
কোনো সুদর্শন যুবককে দেখলেই সে কামাতুর হয়ে ওঠে এবং তৎক্ষণাৎ তার ওপর তার কুদৃষ্টি ও স্নেহ বর্ষণ করে। সে চাটুকারিতার ফাঁদ পাতে, যুবকের মন জয় করে এবং তাকে অদম্য প্রেমের অবিরাম শিকলে আবদ্ধ করে।
আর যদি কেউ তার সেই ঘৃণ্য লালসায় সাড়া না দেয়, অথবা যদি কাউকে তার অপছন্দ হয়, তবে এক মুহূর্তের মধ্যে সে তাকে পাথর, ভেড়া বা অন্য কোনো পশুতে পরিণত করে দেয়। এমনকি অনেককে সে প্রাণে মেরেও ফেলে। তোমার বয়স অল্প এবং তুমি সুপুরুষ—তাই তুমি তার কামাগ্নির ইন্ধন হওয়ার যোগ্য। তাই আমি তোমাকে করজোড়ে মিনতি করছি, তার থেকে দূরে থেকো।”
বিররেনা আমাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই উপদেশ দিলেন। কিন্তু আমি, যে কিনা সর্বদা জাদুবিদ্যা ও ডাইনিবিদ্যার অভিজ্ঞতা লাভের জন্য উদগ্রীব ছিলাম, প্যামফিলেসের ভয়ে ভীত হওয়ার পরিবর্তে বরং কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। আমার মনের গোপন ইচ্ছা ছিল—আমি নিজেই সেই বিদ্যা আয়ত্ত করব এবং জাদুকর হব।
তাই আমি এক অদ্ভুত উত্তেজনা অনুভব করলাম। বিররেনার সঙ্গ থেকে নিজেকে মুক্ত করে—যেন কোনো শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছি—আমি তাঁকে বিদায় জানালাম।
মিলোর বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে আমি মনে মনে নিজেকে বললাম, “ওরে লুসিয়াস, এবার চোখ-কান খোলা রাখো এবং সতর্ক হও। তোমার দীর্ঘদিনের সুপ্ত বাসনা পূরণ করার এই তো সুবর্ণ সুযোগ! এবার ছেলেমানুষি ঝেড়ে ফেলো এবং নিজেকে পুরুষ প্রমাণ করো।
তবে সাবধান! আশ্রয়দাত্রীর প্রেমের ফাঁদে পা দিও না। মিলোর শয্যা কলঙ্কিত করা চলবে না। তার চেয়ে বরং ওই চঞ্চলা ও সুচতুরা পরিচারিকা ফোটসকে বশ করার চেষ্টা করো। সে সুন্দরী, রসিক এবং কথা বলতে পটু। আজ রাতে যখন সে তোমাকে শয়নকক্ষে নিয়ে যাবে, বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আলতো করে ঢেকে দেবে, এবং বিদায়বেলায় মায়াভরা চোখে বারবার পেছনে ফিরে তাকাবে—তখনই হবে ফোটসের মন জয় করার উপযুক্ত সময়।”
এভাবেই মনে মনে ফন্দি আঁটতে আঁটতে আমি মিলোর দরজায় এসে পৌঁছালাম। আমার সংকল্প তখন স্থির, কিন্তু ঘরে ঢুকে দেখলাম মিলো বা তার স্ত্রী—কেউই বাড়িতে নেই।
একাদশ অধ্যায়
বিররেনার প্রাসাদে অ্যাপুলিয়াসের নৈশভোজ এবং টেবিলে বেলেরোফনের বলা এক অদ্ভুত কাহিনী।
একদিন মাসি বিররেনা আমাকে তার সাথে নৈশভোজে যোগ দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করলেন। তাঁর অনুরোধ এতই আন্তরিক ছিল যে, তা প্রত্যাখ্যান করার কোনো উপায় ছিল না। অগত্যা আমি ফোটসের কাছে গেলাম তার অনুমতি বা ‘ঐশ্বরিক পরামর্শ’ নিতে। যদিও সে আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে চাইছিল না, তবুও শেষমেশ সে আমাকে কিছুক্ষণের জন্য যাওয়ার অনুমতি দিল।
যাওয়ার আগে সে আমাকে সতর্ক করে বলল, “দেখো, ফিরতে যেন খুব বেশি রাত না হয়। কারণ রাতের শহরে একদল দাঙ্গাবাজ ও দুর্বৃত্ত ঘুরে বেড়ায়। তারা নিরীহ পথচারীদের ওপর চড়াও হয় এবং সুযোগ পেলে হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। কোনো আইন বা বিচারব্যবস্থাই এদের দমাতে পারছে না। তোমার মতো সুদর্শন এবং সাহসী যুবক, যে কিনা রাতের অন্ধকারে একাকী হাঁটতে ভয় পায় না, তাদের সহজ শিকারে পরিণত হতে পারে।”
আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম, “ফোটস, আমার জন্য ভেবো না। তোমার সান্নিধ্যে আমি যে আনন্দ পাই, তা বাইরের যেকোনো সুস্বাদু ভোজের চেয়েও আমার কাছে মূল্যবান। তাই আমি দ্রুত ফিরে আসব। তবে আমি একেবারে অরক্ষিত হয়ে যাচ্ছি না; আমার কটিদেশে তলোয়ার বাঁধা আছে। আশা করি, আত্মরক্ষার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।”
নৈশভোজের জাঁকজমক
আমি বিররেনার প্রাসাদে উপস্থিত হলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম শহরের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং অনেক অপরিচিত অতিথির সমাগম হয়েছে। ভোজসভার সজ্জা ছিল চোখ ধাঁধানো। সিট্রন কাঠ ও হাতির দাঁতের তৈরি শয্যাগুলো স্বর্ণখচিত বস্ত্রে আবৃত ছিল।
টেবিলে সাজানো ছিল মহামূল্যবান সব পানপাত্র। কোনোটি সুদৃশ্য কাঁচের তৈরি, কোনোটি স্বচ্ছ স্ফটিকের, কোনোটি উজ্জ্বল রৌপ্যপাত্র, আবার কোনোটি খাঁটি সোনার। এছাড়াও ছিল অ্যাম্বার বা ধূসর মণিতে খোদাই করা কারুকাজমণ্ডিত পাত্র। বিলাসিতার কোনো উপকরণেরই অভাব ছিল না সেখানে।
সুদৃশ্য পোশাকে সজ্জিত দাসেরা সুশৃঙ্খলভাবে খাবার পরিবেশন করছিল। রেশমি বস্ত্র পরিহিত কিশোর ভৃত্যরা বড় বড় রত্নখচিত পাত্র থেকে অতিথিদের পেয়ালায় উৎকৃষ্ট মদিরা ঢেলে দিচ্ছিল।
ভোজ শুরু হলে আমরা হাসি-তামাশা ও খোশগল্পে মেতে উঠলাম। বিররেনা আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “বলি ও বাছা, আমাদের এই দেশ তোমার কেমন লাগছে? আমার বিশ্বাস, আমাদের এখানকার মন্দির, স্নানাগার এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধার সমকক্ষ অন্য কোনো শহর নেই। আমাদের ঐশ্বর্য যেমন আছে, তেমনি আছে স্বাচ্ছন্দ্য। রোমান বণিক থেকে শুরু করে এই প্রদেশের সাধারণ নাগরিক—সবাই বিশ্রামের জন্য এই শহরকেই বেছে নেয়।”
আমি উত্তর দিলাম, “সত্যিই মাসি, আপনি যথার্থই বলেছেন। আমার ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় এমন মনোরম স্থান আমি আর কোথাও দেখিনি। কিন্তু সত্যি বলতে কি, আমি এখানকার জাদুকরী মায়ার অদৃশ্য ফাঁদগুলোকে বড্ড ভয় পাই।
শোনা যায়, এখানকার ডাইনিরা কবর খুঁড়ে মৃতদেহ বের করে আনে, চিতা থেকে পোড়া হাড় চুরি করে এবং নিহতদের হাত-পায়ের আঙুল কেটে নিয়ে যায়। এমনকি জীবিতদেরও তারা রেহাই দেয় না। কোনো মৃত্যুর সংবাদ পেলেই এই বৃদ্ধা ডাইনিরা ছুটে যায় এবং তাদের জঘন্য জাদুকরী ক্রিয়ার জন্য মৃতদেহ বিকৃত করে।”
আমার কথা শেষ হতে না হতেই টেবিলে বসা অন্য একজন অতিথি বলে উঠলেন, “আপনি একদম ঠিক বলেছেন। এরা জীবিত বা মৃত—কাউকেই রেহাই দেয় না। আমি এমন একজনকে চিনি, যাকে এই ডাইনিরা নির্মমভাবে নির্যাতন করেছিল। কেবল তার নাক কেটেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, তার কানও কেটে নিয়েছিল।”
এ কথা শুনে উপস্থিত সবাই উচ্চস্বরে হেসে উঠল এবং টেবিলের এক প্রান্তে বসা এক ব্যক্তির দিকে তাকাল। সেই ব্যক্তি লজ্জায় এবং অপমানে এতটাই বিচলিত হয়ে পড়লেন যে, তিনি টেবিল ছেড়ে উঠে যাওয়ার উপক্রম করলেন।
বিররেনা তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “বন্ধু বেলেরোফন, আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, শান্ত হয়ে বসো। তোমার স্বভাবসুলভ সৌজন্য বজায় রেখে আমার ভাইপো লুসিয়াসকে তোমার সেই নাক ও কান হারানোর গল্পটি শোনাও। ও গল্পটির রসাস্বাদন করুক।”
বেলেরোফন কিছুটা ক্ষোভের সাথে উত্তর দিল, “ম্যাডাম, আপনার উদারতা সর্বদা জয়ী হয়, কিন্তু কিছু মানুষের ঔদ্ধত্য সহ্য করা কঠিন।” বিররেনার পীড়াপীড়িতে এবং কেউ তার ক্ষতি করবে না—এই আশ্বাসে অবশেষে সে গল্পটি বলতে রাজি হলো।
বেলেরোফনের কাহিনী: মৃতদেহের প্রহরী
সে টেবিলের ওপর বিছানো কার্পেটের এক প্রান্ত গুটিয়ে তার ওপর কনুই রেখে হেলান দিল। তারপর একজন দক্ষ বক্তার মতো ডান হাত প্রসারিত করে বলতে শুরু করল:
“তখন আমি তরুণ ছিলাম। মাইলেট শহরে অলিম্পিয়া উৎসব ও খেলাধুলা দেখতে গিয়েছিলাম। এরপর এই বিখ্যাত প্রদেশটি দেখার আকাঙ্ক্ষায় ঘুরতে ঘুরতে আমি এসে পৌঁছালাম লারিসা শহরে। ততদিনে আমার পকেটের অবস্থা শোচনীয়। কপর্দকহীন অবস্থায় আমি যখন ত্রাণের আশায় রাস্তায় ঘুরছি, তখন দেখলাম বাজারের মাঝখানে একটি উঁচুর পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ চিৎকার করে ঘোষণা করছে—’আজ রাতে কেউ যদি একটি মৃতদেহ পাহারা দিতে রাজি থাকে, তবে তাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হবে।’
আমি পাশ দিয়ে যাওয়া একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ব্যাপার কী? এই দেশে কি মরা মানুষ পালিয়ে যায়?’
সে বলল, ‘চুপ করো! তুমি নিতান্তই শিশু এবং বহিরাগত। তাই জানো না যে তুমি এখন থেসালিতে আছো। এখানকার ডাইনিরা জাদুর প্রয়োজনে মরা মানুষের মুখ ও মাংস খুবলে খায়।’
আমি বললাম, ‘দয়া করে আমাকে এই পাহারার নিয়মাবলী বুঝিয়ে বলো।’
সে উত্তর দিল, ‘শোনো তবে। তোমাকে সারারাত জেগে থাকতে হবে এবং চোখের পলক না ফেলে মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। কারণ এই ডাইনিরা রূপ পরিবর্তনে সিদ্ধহস্ত। তারা কখনও পাখি, কখনও কুকুর, কখনও ইঁদুর, আবার কখনও মাছি সেজে তোমার চোখে ধুলো দেবে। তারা রক্ষীদের জাদুর ঘুমে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আর এই বিপজ্জনক কাজের পারিশ্রমিক চার থেকে ছয় শিলিং-এর বেশি নয়।
তবে সাবধান! (বলতে ভুলে গিয়েছিলাম) যদি পরদিন সকালে মৃতদেহটি অক্ষত অবস্থায় ফেরত দিতে না পারো, তবে রক্ষকেরও একই পরিণতি হবে। অর্থাৎ, মৃতদেহের নাক, কান বা অন্য কোনো অঙ্গ যদি খোয়া যায়, তবে রক্ষকের শরীর থেকেও সেই একই অঙ্গ কেটে নেওয়া হবে।’
সব শুনে আমি সাহস সঞ্চয় করলাম এবং সেই ঘোষকের কাছে গিয়ে বললাম, ‘থামো, আমি এই কাজ নেব। কিন্তু পারিশ্রমিক কত?’
সে বলল, ‘এক হাজার পেন্স। কিন্তু যুবক, সাবধান! মৃত ব্যক্তি শহরের এক প্রধান নাগরিকের পুত্র। তাকে ডাইনিদের হাত থেকে রক্ষা করা চাই।’
আমি দম্ভের সাথে বললাম, ‘তুমি কী বলছ, তা তুমি নিজেই জানো না। আমি লোহার তৈরি মানুষ। ঘুমের কোনো বালাই আমার নেই। আমার দৃষ্টি আরগাস বা লিনক্সের চেয়েও তীক্ষ্ণ।’
নিশুতি রাতের বিভীষিকা
ঘোষক আমাকে একটি প্রাসাদে নিয়ে গেল। অন্ধকারাচ্ছন্ন এক কক্ষে শোকের পোশাকে আবৃত এক রমণীকে দেখলাম, যিনি করুণ সুরে কাঁদছিলেন। ঘোষক বলল, ‘এই যে সেই যুবক, যে আজ রাতে আপনার স্বামীর দেহ পাহারা দেবে।’
রমণী তার অশ্রুসিক্ত মুখ তুলে বললেন, ‘দয়া করে খুব সতর্ক থেকো বাছা।’
আমি বললাম, ‘কোনো চিন্তা করবেন না। শুধু আমার পাওনাটা যেন ঠিকঠাক পাই।’
তিনি আমাকে পাশের ঘরে নিয়ে গেলেন, যেখানে সাদা চাদরে ঢাকা মৃতদেহটি রাখা ছিল। সাতজন সাক্ষীর সামনে তিনি দেহটি অনাবৃত করলেন এবং সবাইকে ভালো করে দেখে নিতে বললেন যে নাক, কান, চোখ, ঠোঁট এবং চিবুক সব অক্ষত আছে। সমস্ত বিবরণ লিখিতভাবে নথিবদ্ধ করা হলো।
আমি বললাম, ‘ম্যাডাম, আমার কিছু উপকরণের প্রয়োজন। তেলসহ একটি বড় বাতি, মদের পাত্র এবং কিছু খাবার।’
তিনি মাথা নেড়ে বললেন, ‘দূর হ বোকা! যেখানে দিনের পর দিন চুলায় আগুন জ্বলেনি, সেখানে তুই ভোজের আশা করছিস? আমরা এখানে শোক করছি আর তুই এসেছিস পেটপূজো করতে?’ এই বলে তিনি আমাকে কেবল একটি বাতি ও তেল দিয়ে দাসীকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন এবং দরজা বন্ধ করে দিলেন।
একা ঘরে আমি নিজেকে প্রস্তুত করলাম। ঘুম তাড়াতে গান গাইতে শুরু করলাম। মধ্যরাত পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। হঠাৎ—দেখলাম একটি ছোট বেজি (Weasel) হামাগুড়ি দিয়ে ঘরে ঢুকল। এতটুকু একটা প্রাণীর এত সাহস দেখে আমি অবাক হলাম।
আমি ধমক দিয়ে বললাম, ‘যা ভাগ এখান থেকে! তোদের ডাইনি ডেরায় ফিরে যা, নইলে মজা টের পাবি!’
আশ্চর্যজনকভাবে বেজিটি তৎক্ষণাৎ পালিয়ে গেল। কিন্তু ও চলে যাওয়ার সাথে সাথেই এক গভীর তন্দ্রা আমাকে গ্রাস করল। আমি এমন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম যে, স্বয়ং অ্যাপোলো এলেও বুঝতে পারতেন না যে আমাদের দু’জনের মধ্যে কে আসল মৃতদেহ।
মোরগের ডাকে আমার ঘুম ভাঙল। ভয়ে আঁতকে উঠে আমি বাতি নিয়ে মৃতদেহের কাছে ছুটলাম। ভালো করে উল্টেপাল্টে দেখলাম—সব অঙ্গ ঠিকঠাক আছে!
সকালে সেই রমণী ও সাক্ষীরা এলেন। তিনি স্বামীর দেহে চুম্বন করে সবকিছু পরীক্ষা করলেন এবং সব ঠিক পেয়ে আমাকে পারিশ্রমিক মিটিয়ে দিলেন।
টাকা পেয়ে আমি খুশিতে গদগদ হয়ে বললাম, ‘ম্যাডাম, আমাকে আপনার পরিবারের একজন হিসেবেই গণ্য করবেন। ভবিষ্যতে যখনই আপনার কোনো সেবার (অর্থাৎ মৃত্যুর) প্রয়োজন হবে, আমাকে ডাকবেন।’
হায়! আমার এই অলক্ষুনে কথা শেষ হতে না হতেই বাড়ির দাস-দাসীরা আমাকে মারার জন্য তেড়ে এল। কেউ মুখে ঘুষি মারল, কেউ লাথি দিল, কেউ বা আমার পোশাক ছিঁড়ে ফেলল। অহংকারী অ্যাডোনিস যেমন বন্য শূকরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল, আমিও তেমনি মার খেয়ে বাড়ি থেকে বিতাড়িত হলাম।
মৃতের জবানবন্দি ও চরম সত্য
রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমি আমার বোকামির জন্য অনুশোচনা করছিলাম। এমন সময় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য মৃতদেহটি নিয়ে শোভাযাত্রা বের হলো। হঠাৎ এক বৃদ্ধ কাঁদতে কাঁদতে কফিনের ওপর আছড়ে পড়লেন এবং চিৎকার করে বললেন:
‘হে নাগরিকবৃন্দ! আমি আপনাদের দোহাই দিয়ে বলছি, এই মৃতদেহের প্রতি সুবিচার করুন। এই হতভাগ্যকে তার নিজের স্ত্রী বিষ খাইয়ে হত্যা করেছে। কেবল তার পরকীয়া প্রেমিকের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য এবং সম্পত্তির লোভে সে আমার বোনের ছেলেকে খুন করেছে!’
জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। সবাই ‘পুড়িয়ে মারো ডাইনিটাকে’ বলে চিৎকার করতে লাগল। কিন্তু স্ত্রী তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে কাঁদতে লাগল।
তখন বৃদ্ধ বললেন, ‘ঈশ্বর সত্য উদঘাটনের জন্য মিশরীয় মহাপুরোহিত জ্যাচলাসকে পাঠিয়েছেন। তিনি এই মৃতকে ক্ষণিকের জন্য জীবিত করে সত্য প্রকাশ করবেন।’
একজন লিনেন বস্ত্র পরিহিত, মুণ্ডিতমস্তক পুরোহিত এগিয়ে এলেন। তিনি মৃতের বুকে ও মুখে ভেষজ স্পর্শ করিয়ে সূর্যদেব ও নীল নদের শপথ নিয়ে মন্ত্রপাঠ করলেন।
অলৌকিকভাবে মৃতদেহের বুকে স্পন্দন ফিরে এল। সে মাথা তুলে বলল, ‘কেন আমাকে আবার এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে ফিরিয়ে আনলে? আমি তো স্টিক্স নদীর ওপারে শান্তিতে ছিলাম। আমাকে বিশ্রাম নিতে দাও।’
পুরোহিত বললেন, ‘বলো, তোমার মৃত্যুর কারণ কী? সত্য না বললে আমি মন্ত্রবলে তোমাকে নরকযন্ত্রণা দেব।’
মৃত ব্যক্তি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘সত্যিই, আমার স্ত্রী আমাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছে। কিন্তু আমার মৃত্যুর চেয়েও এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।’
সে আঙুল দিয়ে আমাকে দেখিয়ে বলল, ‘এই যে আমার পাহারাদার, সে আমাকে খুব সতর্কতার সাথেই পাহারা দিচ্ছিল। কিন্তু ডাইনিরা যখন পশু সেজে ঘরে ঢুকল এবং তাকে বোকা বানাতে পারল না, তখন তারা তাকে জাদুর ঘুমে আচ্ছন্ন করে ফেলল।
তারপর তারা আমার নাম ধরে ডাকতে লাগল। আমার দেহে সাড়া জাগার আগেই, এই পাহারাদার—যার নামও কাকতালীয়ভাবে আমারই নামে—ঘুমের ঘোরে উঠে দাঁড়াল। ডাইনিরা তাকেই আমি মনে করে জানালার ছিদ্র দিয়ে তার নাক ও কান কেটে নিয়ে গেল।
ডাইনিরা তাদের চাতুর্য ঢাকার জন্য তাকে মোমের তৈরি নকল নাক ও কান পরিয়ে দিয়েছে। এই হতভাগ্য সামান্য কিছু টাকার লোভে নিজের অঙ্গ হারিয়েছে, যা আসলে আমার হারানো কথা ছিল।’
এই কথা শুনে আমি ভয়ে ও বিস্ময়ে নিজের নাকে হাত দিলাম। হায়! আমার নাকটি খসে হাতে চলে এল। কানে হাত দিতেই কানদুটোও পড়ে গেল।
উপস্থিত জনতা আমাকে দেখে হাসিতে ফেটে পড়ল। আমি লজ্জায় ও অপমানে মাটির সাথে মিশে গেলাম এবং ভিড়ের পায়ের ফাঁক দিয়ে পালিয়ে এলাম।”
উপসংহার
বেলেরোফনের গল্প শেষ হতেই টেবিলের সবাই মদ্যপানের ফাঁকে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। বিররেনা আমাকে বললেন, “আগামীকাল আমাদের শহরে ‘রিসাস’ বা হাস্যের দেবতার উৎসব। আমি চাই তুমি সেখানে উপস্থিত থেকো এবং মজার কিছু করে দেখাও।”
আমি বিদায় নিয়ে রাস্তায় নামলাম। ততক্ষণে আমার হাতের মশাল নিভে গেছে। অন্ধকারের মধ্যে হোঁচট খেতে খেতে আমি মিলোর বাড়ির দরজায় পৌঁছালাম।
সেখানে দেখলাম, বিশাল আকৃতির তিনজন লোক মিলোর বাড়ির দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। আমাকে দেখে তারা ভয় তো পেলই না, বরং আরও আগ্রাসী হয়ে উঠল। আমি বুঝলাম এরা নিশ্চিত ডাকাত।
কাপড়ের নিচ থেকে তলোয়ার বের করে আমি তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর তিনজনকেই ধরাশায়ী করলাম। তারা আমার পায়ের কাছে মৃতবৎ লুটিয়ে পড়ল।
রক্তাক্ত ও ক্লান্ত অবস্থায় আমি দরজায় ধাক্কা দিলাম। ফোটস এসে দরজা খুলে দিল। রাক্ষস গেরিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ী হারকিউলিসের মতো ক্লান্ত শরীরে আমি আমার কক্ষে গিয়ে গভীর ঘুমে ঢলে পড়লাম।
চমৎকার। তোমার নির্দেশিত ভিক্টোরিয়ান সাহিত্যের গাম্ভীর্য, ধ্রুপদী মেজাজ এবং মার্জিত চলিত ভাষা বজায় রেখে ‘দ্য গোল্ডেন অ্যাস’-এর তৃতীয় খণ্ডের পরবর্তী অংশটি নতুন করে বিন্যাস ও অনুবাদ করা হলো। পড়ার সুবিধার্থে দীর্ঘ অনুচ্ছেদগুলোকে ভেঙে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা হয়েছে।
তৃতীয় খণ্ড
দ্বাদশ অধ্যায়
অ্যাপুলিয়াসকে হত্যার দায়ে গ্রেফতার ও কারাবরণের ইতিবৃত্ত।
ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে আমার ঘুম ভাঙল। জাগ্রত হওয়ার পরমুহূর্তেই গত রাতের সেই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি আমার হৃদয়ে আগুনের মতো জ্বলে উঠল। আমি শয্যা ত্যাগ করে মেঝের ওপর পা মুড়ে বসে পড়লাম এবং দুই হাত কচলাতে কচলাতে অঝোরে কাঁদতে লাগলাম।
কল্পনার চোখে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম—আমাকে বিচারকের সামনে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে, তিনি আমার বিরুদ্ধে চরম দণ্ড ঘোষণা করেছেন এবং জল্লাদ আমাকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। আমি মনে মনে বিলাপ করে বললাম, “হায়! এমন কোন দয়ালু বা সুবিবেচক বিচারক আছেন, যিনি বিশ্বাস করবেন যে আমি তিন-তিনটি খুনের ঘটনায় নির্দোষ?” অথচ সেই অ্যাসিরিয়ান গণক ডায়োফানেস আমাকে কতই না আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, আমার এই যাত্রা শুভ হবে!
আমি যখন এভাবেই ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বিলাপ করছিলাম, ঠিক তখনই দরজায় প্রচণ্ড হট্টগোল শুরু হলো। বিচারক এবং রাজকর্মচারীরা হুড়মুড় করে ঘরে প্রবেশ করলেন। তারা দুজন রক্ষীকে নির্দেশ দিলেন আমাকে বেঁধে কারাগারে নিয়ে যেতে। আমি কোনো বাধা দিলাম না, বরং স্বেচ্ছায় তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।
আমাকে যখন রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন মনে হলো পুরো শহর আমাকে দেখার জন্য ভেঙে পড়েছে। লজ্জায় আমি মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটছিলাম। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন মাথা তুলছিলাম, তখন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাচ্ছিলাম—এই হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে এমন একজনও নেই যে আমাকে দেখে উচ্চস্বরে হাসছে না!
দেবতাদের ক্রোধ প্রশমিত করার জন্য যেভাবে বলির পশুকে শোভাযাত্রা করে নিয়ে যাওয়া হয়, ঠিক সেভাবেই তারা আমাকে শহরের অলিগলি ঘুরিয়ে বিচারকক্ষে নিয়ে এল। সেখানে আমাকে বিচারকদের আসনের সামনে দাঁড় করানো হলো। কিন্তু উপস্থিত জনতার ভিড় এতই বেড়ে গেল যে, বিচারকক্ষে শ্বাসরোধ হওয়ার উপক্রম হলো। তখন সমবেত জনতা দাবি জানাল যেন বিচারকাজটি বিশাল থিয়েটার হলে স্থানান্তর করা হয়।
সেখানেও ভিড় বাড়তে থাকল। কেউ বাড়ির ছাদে, কেউ কড়িকাঠের ওপর, কেউ বা মূর্তির ওপর চড়ে বসল। অনেকে নিজেদের নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে জানালা দিয়ে মাথা বের করে দিল—উদ্দেশ্য একটাই, আমাকে একনজর দেখা।
কর্মকর্তারা আমাকে থিয়েটার হলের ঠিক মাঝখানে সবার সামনে উপস্থিত করলেন। ঘোষক সবাইকে নীরব থাকার নির্দেশ দিলেন। এরপর আমার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের সামনে আসতে বলা হলো। তখন এক বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন। তার হাতে ছিল একটি জলঘড়ির পাত্র (Clepsydra), যা থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় জল ঝরে বক্তার সময় নির্ধারণ করছিল। তিনি অনুরোধ করলেন যেন পাত্রের জল নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কথা বলার অনুমতি দেওয়া হয়। অনুমতি পাওয়ার পর তিনি তার জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুরু করলেন।
ত্রয়োদশ অধ্যায়
বৃদ্ধ বাদি কর্তৃক অ্যাপুলিয়াসের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ এবং তার আত্মপক্ষ সমর্থন।
“ওহে পরম শ্রদ্ধেয় ও ন্যায়পরায়ণ বিচারকমণ্ডলী, আজ আমি আপনাদের সামনে যে অভিযোগ নিয়ে উপস্থিত হয়েছি, তা কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়। এটি এই শহরের শৃঙ্খলা ও শান্তির সাথে জড়িত। এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ভবিষ্যতে অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে।
অতএব, হে পূজনীয় পিতাগণ, জনকল্যাণের মর্যাদা ও নিরাপত্তা বিধানের গুরুদায়িত্ব যাদের স্কন্ধে ন্যস্ত, আপনারা এই পাপিষ্ঠ নরঘাতককে—যে কিনা বহু নাগরিকের রক্তে রঞ্জিত—বিনা শাস্তিতে রেহাই দেবেন না। আপনারা ভাববেন না যে, আমি ব্যক্তিগত ঈর্ষা বা বিদ্বেষ থেকে এই অভিযোগ করছি। বরং নগররক্ষা বাহিনীর প্রধান হিসেবে এটি আমার কর্তব্য। কোনো জীবিত মানুষ আমাকে কর্তব্যে অবহেলার দায়ে অভিযুক্ত করতে পারবে না। গত রাতে যা ঘটেছিল, আমি তা অবিকল বর্ণনা করছি।
গত রাতে, নির্ধারিত সময়ে আমি যখন শহরের প্রতিটি কোণ সতর্কতার সাথে টহল দিচ্ছিলাম, তখন দেখতে পেলাম এই নিষ্ঠুর যুবকটি তলোয়ার উঁচিয়ে তিনজন সম্মানিত নাগরিকের ওপর চড়াও হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ ধস্তাধস্তির পর সে নির্মমভাবে একে একে তিনজনকেই হত্যা করে।
এই জঘন্য কর্ম সম্পাদনের পর বিবেকের দংশনে এবং ভয়ে সে পালিয়ে যায়। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সে একটি বাড়িতে আশ্রয় নেয় এবং সারা রাত সেখানেই আত্মগোপন করে থাকে। কিন্তু দেবতাদের বিধান, যা কোনো জঘন্য অপরাধকে বিনা শাস্তিতে যেতে দেয় না, তার ফলেই আজ সকালে পলায়নের পূর্বেই আমরা তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি।
সুতরাং, আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক জঘন্য অপরাধী, একজন নির্মম হত্যাকারী এবং এক বহিরাগত আগন্তুক। যখন আপনারা একজন পরিচিত নাগরিকের সামান্য অপরাধকেও কঠোর শাস্তি দেন, তখন এই বিদেশীর বিরুদ্ধে আপনারা দ্বিগুণ কঠোর রায় প্রদান করুন।”
এই বলে সেই নিষ্ঠুর বাদি তার ভয়ংকর অভিযোগ শেষ করল। তখন ঘোষক আমাকে আদেশ করল, আমার আত্মপক্ষ সমর্থনে যদি কিছু বলার থাকে তবে তা বলতে। কিন্তু কান্নার আবেগে আমার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছিল। তাছাড়া তার কঠোর অভিযোগের চেয়ে আমার নিজের বিবেকের দংশনই আমাকে বেশি পীড়া দিচ্ছিল।
তবুও, এক ঐশ্বরিক সাহসে অনুপ্রাণিত হয়ে অবশেষে আমি বলতে শুরু করলাম:
“সত্যিই আমি জানি, তিনজন মানুষকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা কতটা কঠিন—তা সে যতই সত্য কথা বলুক না কেন। কিন্তু মান্যবর বিচারকগণ যদি আমাকে শোনার ধৈর্য প্রদর্শন করেন, তবে আমি প্রমাণ করে দেব যে, যদি আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তবে তা আমার প্রাপ্য নয়। আমি ভাগ্যচক্রে এবং আত্মরক্ষার তাগিদে সেই কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলাম।
গত রাতে আমি এক ভোজসভা থেকে ফিরছিলাম। স্বীকার করছি, আমি মদিরাপানে কিছুটা বেসামাল ছিলাম। যখন আমি আমার বর্তমান বাসস্থান অর্থাৎ এই শহরের বিশিষ্ট নাগরিক মিলোর বাড়ির কাছে পৌঁছালাম, তখন দেখলাম বিশালদেহী তিন দস্যু বাড়ির দেয়াল ও তোরণ ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে। তারা ইতিমধ্যেই দরজার কবজা খুলে ফেলেছে এবং নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করছে যে, বাড়ির ভেতরের মানুষদের সাথে কী আচরণ করবে।
তাদের মধ্যে একজন, যে ছিল দলনেতা এবং আকৃতিতে অন্যদের চেয়েও বিশাল, সে সঙ্গীদের উস্কে দিয়ে বলল, ‘আরে, তোমরা তো সব শিশুর মতো আচরণ করছ! পুরুষের মতো সাহস দেখাও। চলো বাড়ির ভেতরে ঢুকে ঘুমন্ত যাকে পাব, তাকেই হত্যা করব। তাহলেই আমরা নির্বিঘ্নে পালাতে পারব।’
মান্যবর বিচারকগণ, আমি স্বীকার করছি যে আমি সেই তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে তলোয়ার কোষমুক্ত করেছিলাম। কিন্তু আমি মনে করেছিলাম, জনকল্যাণকামী ও সাহসী নাগরিক হিসেবে চোরদের প্রতিহত করা আমার কর্তব্য। বিশেষত তারা আমাকে ভীষণ ভয় দেখিয়েছিল এবং আমার বন্ধু মিলোর বাড়ি লুণ্ঠন করার চেষ্টা করছিল।
যখন সেই নিষ্ঠুর দুর্বৃত্তরা আমার খোলা তলোয়ার দেখেও পালাল না, বরং উল্টো আমাকে আক্রমণ করল, তখন আমি তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম এবং বীরত্বের সাথে লড়াই করলাম। তাদের দলনেতা আমাকে প্রচণ্ডভাবে আক্রমণ করল, দুই হাতে আমার চুল ধরে টানল এবং বিশাল এক পাথর দিয়ে আমাকে আঘাত করার চেষ্টা করল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমিই জয়ী হলাম এবং তাকে ধরাশায়ী করলাম।
দ্বিতীয়জন আমার পা জড়িয়ে ধরে কামড়াতে শুরু করেছিল, তাকেও আমি বধ করলাম। আর তৃতীয়জন, যে আমার দিকে হিংস্রভাবে ছুটে আসছিল, তার পেটে আঘাত করার পর সেও লুটিয়ে পড়ল।
এভাবে আমি নিজেকে, আমার আশ্রয়দাতার বাড়ি এবং তার পরিবারকে নিশ্চিত বিপদের হাত থেকে রক্ষা করলাম। আমি ভেবেছিলাম, এই কাজের জন্য আমি কেবল শাস্তি থেকেই মুক্তি পাব না, বরং শহরবাসীর কাছ থেকে কোনো বড় পুরস্কারও লাভ করব।
তাছাড়া, আমি সর্বদা অপরাধমুক্ত জীবন যাপন করেছি এবং বিশ্বের সমস্ত সম্পদের চেয়ে নিজের সততাকেই বড় মনে করেছি। আমি বুঝতে পারছি না, কেন আমার বিরুদ্ধে এই মৃত্যুদণ্ডের অভিযোগ আনা হলো। প্রথমত, আমি ন্যায়সংগত কারণেই চোরদের আক্রমণ করেছিলাম। দ্বিতীয়ত, তাদের সাথে আমার কোনো পূর্বশত্রুতা ছিল না। তৃতীয়ত, তারা ছিল আমার সম্পূর্ণ অপরিচিত। এবং সবশেষে, কোনো অর্থলোভ বা লাভের আশায় আমি এই কাজ করিনি।”
বক্তব্য শেষ করার পর আমি পুনরায় কান্নায় ভেঙে পড়লাম। হাত জোড় করে সমবেত জনতার কাছে তাদের সন্তান-সন্ততির দোহাই দিয়ে প্রাণভিক্ষা চাইলাম। আমার করুণ কান্না দেখে তাদের হৃদয় কিছুটা বিগলিত হয়েছে বলে মনে হলো। আমি দেবতাদের সাক্ষী রেখে বললাম যে আমি নির্দোষ।
কিন্তু যখন আমি মাথা তুলে তাকালাম, তখন এক বিস্ময়কর দৃশ্য আমার চোখে পড়ল। দেখলাম, উপস্থিত জনতা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, আমার পরম সুহৃদ ও আশ্রয়দাতা মিলো—যার জন্য আমি এত বড় ঝুঁকি নিলাম—সেও হাসছে!
আমি মনে মনে বললাম, “হায়! পৃথিবীতে বিশ্বাস কোথায়? কৃতজ্ঞতা কোথায়? আমি আমার বন্ধু মিলো ও তার পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়ে আজ খুনি সাব্যস্ত হয়েছি, অথচ সে আমাকে সান্ত্বনা বা সাহায্য করার পরিবর্তে উল্টো উপহাস করছে!”
চতুর্দশ অধ্যায়
দুজন নারীর করুণ অভিযোগ এবং নিহত দেহগুলো ফোলানো মূত্রাশয় হিসেবে উন্মোচনের অবিশ্বাস্য বৃত্তান্ত।
আমার আর্তনাদ শেষ হতে না হতেই থিয়েটারের মাঝখানে এক শোকাকুল দৃশ্য উন্মোচিত হলো। কালো শোকবস্ত্র পরিহিতা এক নারী, যার কোলে একটি শিশু, অশ্রুসিক্ত নয়নে বেরিয়ে এলেন। তার পেছনে ছিলেন আরেক বৃদ্ধা, যার পরনে ছিল জীর্ণ পোশাক। তাঁরা উভয়েই উচ্চস্বরে বিলাপ করছিলেন এবং হাতে জলপাইয়ের ডাল বহন করছিলেন।
তাঁরা কফিনে ঢাকা তিনটি মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে বিচারকদের উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বললেন:
“ওহে পরম করুণাময় ও ন্যায়পরায়ণ বিচারকমণ্ডলী! আপনাদের হৃদয়ে যদি বিন্দুমাত্র ন্যায়বিচার ও মানবিকতা অবশিষ্ট থাকে, তবে এই নিহত আত্মাদের প্রতি সদয় হোন। আমাদের এই অকাল বৈধব্য এবং প্রিয়জন হারানোর শোকে আমাদের পাশে দাঁড়ান। বিশেষ করে এই অসহায় এতিম শিশুটির দিকে তাকান, যে আজ সব সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত। আমরা প্রার্থনা করি, এই নির্মম হত্যাকারীর—যে আমাদের সব দুঃখের মূল কারণ—রক্তের বিনিময়ে আপনারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করুন।”
তাঁদের এই করুণ আর্তনাদ শুনে বিচারকদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন:
“এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের কথা আসামী নিজেও অস্বীকার করতে পারবে না। এটি চরম শাস্তির যোগ্য। কিন্তু আমাদের এখন খুঁজে বের করতে হবে, এই অপরাধে তার কোনো সহযোগী ছিল কিনা। কারণ, একজন মানুষের পক্ষে একাই তিনজন বিশাল ও শক্তিশালী ব্যক্তিকে হত্যা করা অসম্ভব।
অতএব, সত্য উদঘাটনের জন্য তাকে কঠোর নির্যাতন করতে হবে। গ্রিসের প্রথা অনুযায়ী তার মুখ থেকে সত্য বের করে আনতে হবে এবং এই দুষ্ট হত্যাকারীদের শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে।”
তৎক্ষণাৎ গ্রিক প্রথা মেনে নির্যাতনের ভয়ংকর সব সরঞ্জাম—আগুন, চাকা এবং অন্যান্য যন্ত্র—আনা হলো। আমার দুঃখ তখন দ্বিগুণ হয়ে গেল। মনে হলো, অক্ষত শরীরে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া আমার ভাগ্যে নেই।
ঠিক সেই মুহূর্তে, সেই বৃদ্ধা—যার চিৎকারে আদালত প্রাঙ্গণ প্রকম্পিত হচ্ছিল—বিচারকদের কাছে একটি অদ্ভুত অনুরোধ জানালেন। তিনি বললেন, “মান্যবর, এই আসামীকে নির্যাতন করার আগে তাকে আদেশ দেওয়া হোক যেন সে নিজ হাতে নিহতদের দেহাবরণ উন্মোচন করে। সবাই দেখুক, সে কী নিষ্ঠুরভাবে এই সুন্দর ও তরুণ প্রাণগুলোকে হত্যা করেছে। তার অপরাধের ভয়াবহতা অনুযায়ী যেন তাকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয়।”
তাঁর এই অনুরোধে যেন এক গোপন আনন্দের আভাস ছিল। বিচারক আমাকে আদেশ দিলেন কফিনের ঢাকনা খুলে দেহগুলো উন্মুক্ত করতে। আমি প্রথমে অস্বীকৃতি জানালাম, কারণ নিজের হাতে করা সেই নৃশংস দৃশ্য আমি আর দেখতে চাইছিলাম না। কিন্তু রক্ষীরা আমাকে জোর করে ঠেলে দিল এবং দেহগুলো উন্মোচন করতে বাধ্য করল।
অবশেষে বাধ্য হয়ে, অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমি কফিনের ওপর থেকে চাদর সরিয়ে দিলাম।
কিন্তু ওহ দয়াময় প্রভু! এ আমি কী দেখছি? এ এক কী অদ্ভুত বিভ্রম! আমার সমস্ত দুঃখ মুহূর্তের মধ্যে এক বিস্ময়কর কৌতুকে পরিণত হলো। মনে হলো, আমি যেন নরকের দেবী প্রোসার্পিনার রাজ্যে দাঁড়িয়ে আছি। বিস্ময়ে আমি এতটাই হতবাক হয়ে গেলাম যে আমার বাকশক্তি হারিয়ে গেল।
কারণ, সেই তিনটি নিহত দেহ কোনো মানুষের মরদেহ ছিল না! সেগুলো ছিল তিনটি বিশাল ফোলানো মূত্রাশয় (Bladders)! অদ্ভুত ব্যাপার হলো, গত রাতে আমি চোরদের শরীরের যেসব জায়গায় আঘাত করেছিলাম, ঠিক সেসব জায়গাতেই এই মূত্রাশয়গুলো ফুটো হয়ে বাতাস বেরিয়ে গেছে।
এই দৃশ্য দেখা মাত্রই উপস্থিত জনতা হাসিতে ফেটে পড়ল। কেউ কেউ হাসতে হাসতে পেটে হাত দিয়ে বসে পড়ল, কেউ বা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল। পুরো থিয়েটার যেন এক বিশাল হাসির উৎসবে পরিণত হলো। সবাই এই কৌতুক উপভোগ করতে করতে থিয়েটার ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু আমি? আমি তখনো বরফের মতো জমে গিয়েছিলাম। কোনো জড় মূর্তির মতো আমি সেখানে দাঁড়িয়ে রইলাম, যেন আমার কোনো প্রাণ নেই। আমার সংবিৎ ফিরল যখন আমার আশ্রয়দাতা মিলো এসে আমার হাত ধরলেন। আমি তখনও কাঁদছি এবং বিলাপ করছি। তিনি আমাকে সান্ত্বনা দিতে দিতে প্রায় জোর করেই সেখান থেকে নিয়ে গেলেন।
লোকের দৃষ্টি এড়ানোর জন্য তিনি আমাকে অলিগলি পথ দিয়ে ঘুরিয়ে তার বাড়িতে নিয়ে এলেন। তিনি আমাকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু আমার মনের ক্ষত তখনো দগদগে। যে অপমান ও মানসিক আঘাত আমি পেয়েছিলাম, তা কোনো সান্ত্বনাতেই প্রশমিত হচ্ছিল না।
এমন সময় শহরের ম্যাজিস্ট্রেট এবং বিচারকরা রাজকীয় প্রতীক নিয়ে মিলোর বাড়িতে প্রবেশ করলেন। তাঁরা আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন:
“ওহে লুসিয়াস, আমরা তোমার বংশমর্যাদা সম্পর্কে অবহিত। তোমার পূর্বপুরুষদের খ্যাতি এই প্রদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। তুমি আজ যা দেখলে, তার জন্য লজ্জিত বা দুঃখিত হয়ো না। এটি তোমার প্রতি কোনো বিদ্বেষ বা অপমান নয়।
আজকের এই দিনটি আমরা প্রতি বছর ‘রিসাস’ বা হাসির দেবতার সম্মানে উদযাপন করি। এই উৎসবের বিশেষত্বই হলো কোনো না কোনো নতুন ঘটনার অবতারণা করা, যা সবাইকে আনন্দ দেবে। দেবতা রিসাস সর্বদা তার ভক্তদের পাশে থাকেন এবং তাদের দুঃখ ভুলিয়ে মুখে হাসি ফোটান।
সত্যি বলতে, তোমার এই অসাধারণ অভিনয়ে পুরো শহর মুগ্ধ। নগরবাসী তোমাকে সম্মান জানাতে চায় এবং তোমাকে শহরের একজন পৃষ্ঠপোষক (Patron) হিসেবে বরণ করতে চায়। এমনকি তোমার স্মৃতিরক্ষার্থে একটি মূর্তিও স্থাপন করার প্রস্তাব রয়েছে।”
আমি বিনীতভাবে উত্তর দিলাম, “থেসালির এই মহান শহরের কাছ থেকে আমি যে সম্মান ও সুবিধা পেয়েছি, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু মূর্তি স্থাপনের মতো সম্মান আমার পূর্বপুরুষ এবং আমার চেয়ে যোগ্যতর ব্যক্তিদের জন্যই সংরক্ষিত থাকুক।”
আমার গাম্ভীর্যপূর্ণ উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে এবং আমাকে কিছুটা প্রফুল্ল দেখে বিচারকরা বিদায় নিলেন। আমি তাঁদের শ্রদ্ধার সাথে বিদায় জানালাম।
তাঁরা চলে যেতেই একজন ভৃত্য হন্তদন্ত হয়ে আমার কাছে এসে বলল, “মহাশয়, আপনার মাসি বিররেনা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, গতকালের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আপনি যেন তাঁর বাড়িতে নৈশভোজে যোগ দেন। খাবার প্রস্তুত।”
কিন্তু রাতের সেই বিভীষিকার পর তাঁর বাড়িতে যাওয়ার সাহস আমার ছিল না। আমি বার্তাবাহককে বললাম, “বন্ধু, আমার মাসিকে গিয়ে বলো যে আমি সানন্দে তাঁর আদেশ পালন করতাম। কিন্তু আমার বন্ধু মিলো আমাকে আজ তাঁর সঙ্গ না ছাড়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করিয়েছেন। আজকের উৎসবের কারণে আমি তাঁর কাছে আটকা পড়েছি। দয়া করে আমাকে ক্ষমা করো, আমার এই প্রতিশ্রুতি অন্য কোনো সময়ের জন্য তোলা থাক।”
কথা শেষ হতেই মিলো আমার হাত ধরে আমাকে কাছের স্নানাগারে নিয়ে গেলেন। রাস্তায় আমি লজ্জায় সংকুচিত হয়ে হাঁটছিলাম, পাছে কেউ আমাকে চিনে ফেলে। কারণ আমি নিজেই আজ পুরো শহরের হাসির খোরাক হয়েছিলাম।
স্নান সেরে যখন বাড়িতে ফিরলাম, তখনো আমার ঘোর কাটেনি। প্রতিটি মানুষের ইশারা আর হাসি আমাকে বিঁধছিল। মিলোর সাথে নৈশভোজে বসলাম বটে, কিন্তু ঈশ্বর জানেন, আমার গলা দিয়ে এক লোকমা খাবারও নামছিল না।
সারা দিনের কান্নাকাটি ও মানসিক ধকলে আমার সত্যিই মাথা ধরেছিল। তাই অসুস্থতার ভান করে আমি মিলোর কাছে অনুমতি চাইলাম এবং দ্রুত আমার কক্ষে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
পঞ্চদশ অধ্যায়
ফটিসের স্বীকারোক্তি এবং অ্যাপুলিয়াসকে তার মালকিনের জাদুকরী ক্রিয়া দেখানোর প্রতিশ্রুতি।
বিছানায় শুয়ে আমি সারা দিনের সেই মর্মান্তিক ঘটনা আর অপমানের কথা ভাবছিলাম। এমন সময় আমার প্রেমিকা ফটিস তার মালকিনকে ঘুম পাড়িয়ে আমার কক্ষে প্রবেশ করল। কিন্তু আজ তার চোখেমুখে সেই চিরচেনা দীপ্তি ছিল না। তার প্রফুল্লতা যেন কোথায় মিলিয়ে গেছে। বিমর্ষ বদনে ও ভ্রু কুঁচকে সে আমার দিকে তাকাল।
বিষাদগ্রস্ত কণ্ঠে সে বলতে শুরু করল, “সত্যিই আমি স্বীকার করছি, আজকের সমস্ত দুর্ভোগের মূল কারণ আমিই।” এই বলে সে তার অ্যাপ্রনের নিচ থেকে একটি চাবুক বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, “এই নাও, এই দুষ্ট দাসীকে শাস্তি দাও। আমার ওপর তোমার সব ক্ষোভ মেটাও, অথবা আমাকে মেরেই ফেলো।
তবে ঈশ্বর জানেন, আমি স্বেচ্ছায় তোমার ওপর এই যন্ত্রণা ও দুঃখ ডেকে আনিনি। নিজের শরীরের ক্ষতি হতে দেব, তবু তোমার সামান্যতম ক্ষতি হতে দেব না—এটাই আমার প্রতিজ্ঞা ছিল। কিন্তু আমি যা করেছি তা ছিল অন্যের আদেশে। আমি ভেবেছিলাম আমি অন্যের উপকার করছি, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই কাজটিই তোমার জীবনে এমন বিপর্যয় ডেকে এনেছে।”
আমি তার কথা শুনে কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। তার হাত থেকে চাবুকটি নিয়ে বললাম, “থামো ফটিস! তুমি যে চাবুক এনেছ, তা শত টুকরো হয়ে যাবে, তবু তা তোমার ওই কোমল ত্বক স্পর্শ করবে না। আমি তোমাকে মিনতি করছি, আমাকে খুলে বলো—কীভাবে তুমি আমার এই কষ্টের কারণ হলে?
তোমার প্রতি আমার যে ভালোবাসা, তার দিব্যি দিয়ে বলছি, তুমি নিজে চাইলেও আমি বিশ্বাস করব না যে তুমি কখনো আমার ক্ষতি করতে চেয়েছ। হয়তো মনের ভুলে কখনো কোনো অমঙ্গল চিন্তা করেছ, যা পরক্ষণেই মন থেকে মুছে ফেলেছ। তাকে তো আর অপরাধ বলা যায় না।”
আমার কথা শুনে ফটিসের অশ্রুসিক্ত চোখ কিছুটা উজ্জ্বল হলো। সে বুঝতে পারল যে আমি তাকে এখনও ভালোবাসি। কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে সে আমাকে মিষ্টি করে আলিঙ্গন ও চুম্বন করল। তারপর সে বলল, “আগে দরজাটা বন্ধ করে দিই। পাছে আমার অসংযত জিহ্বার কারণে কোনো গোপন কথা বাইরে চলে যায় এবং নতুন কোনো বিপত্তি ঘটে।”
দরজা বন্ধ করে সে ফিরে এল এবং আমার গলা জড়িয়ে ধরে ভালোবাসামাখা স্বরে ফিসফিস করে বলল, “আমার মালকিনের এই গোপন রহস্য ফাঁস করতে আমি বড্ড ভয় পাচ্ছি। কিন্তু তোমার প্রজ্ঞা ও আভিজাত্যের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। তুমি মহৎ বংশের সন্তান এবং ঐশ্বরিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ। আমি জানি তুমি এই গোপনীয়তা রক্ষা করবে এবং আমি যা বলব তা তোমার হৃদয়ের গভীরেই লুকিয়ে রাখবে।
তোমার প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা আমাকে এই সত্য প্রকাশ করতে বাধ্য করছে। আজ তুমি আমাদের বাড়ির ভেতরের অবস্থা এবং আমার মালকিনের সেই ভয়ঙ্কর গুপ্তবিদ্যা সম্পর্কে জানবে, যার কাছে নরকের শক্তিও নতি স্বীকার করে, নক্ষত্ররা বিচলিত হয়, দেবতারা দুর্বল হয়ে পড়েন এবং প্রকৃতির উপাদানগুলো বশীভূত হয়।
বিশেষ করে যখন কোনো সুদর্শন যুবক তার নজরে পড়ে, তখন তার জাদুকরী শক্তির তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়। বর্তমানে সে একজন বোয়েতিয়ান যুবকের প্রেমে মগ্ন। ছেলেটি দেখতে খুবই সুদর্শন। গতকাল রাতে আমি নিজের কানে তাকে বলতে শুনেছি যে, সূর্য যদি অস্ত না যেত এবং রাত তার জাদুকরী ক্রিয়ার জন্য উপযুক্ত সময় না দিত, তবে সে নিজেই সারা বিশ্বে চিরস্থায়ী অন্ধকার নামিয়ে আনত।”
ফটিস থামল, তারপর আবার বলতে শুরু করল, “গতকাল বিকেলে সে ওই বোয়েতিয়ান যুবককে নাপিতের দোকানে চুল কাটতে দেখেছিল। স্নানাগার থেকে ফেরার সময় সে আমাকে গোপনে নির্দেশ দিয়েছিল, নাপিতের দোকানে পড়ে থাকা ওই যুবকের কিছু চুল সংগ্রহ করে আনতে।
আমি যখন সেই চুল কুড়াতে গেলাম, তখন নাপিত আমাকে দেখে ফেলল। যেহেতু শহরে সবাই জানে যে আমরা ডাইনি এবং জাদুকরী, তাই সে চিৎকার করে উঠল, ‘তোমরা কি কখনো যুবকদের চুল চুরি করা বন্ধ করবে না? আমি নিশ্চিত করছি, যদি তোমরা তোমাদের এই পিশাচিনীপনা বন্ধ না করো, তবে আমি বিচারকদের কাছে নালিশ করব।’
এই বলে সে রাগান্বিত হয়ে আমার অ্যাপ্রন থেকে সংগ্রহ করা চুলগুলো কেড়ে নিল। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম, কারণ আমি জানি মালকিন খালি হাতে ফিরলে আমাকে কী নির্মমভাবে মারধর করবে।
ভয়ে আমি পালিয়ে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলাম। কিন্তু তোমার স্মৃতি আমাকে আটকে রাখল। আমি খুব মনমরা হয়ে বাড়ির দিকে ফিরছিলাম। এমন সময় আমার নজরে পড়ল—এক লোক ছাগলের ফোলানো চামড়া (Goat skin) থেকে লোম ছাড়াচ্ছে। সেই লোমগুলো ছিল সোনালি রঙের এবং দেখতে হুবহু ওই বোয়েতিয়ান যুবকের চুলের মতো।
আমি সেখান থেকে একমুঠো লোম তুলে নিলাম এবং কিছুটা রং করে মালকিনের কাছে নিয়ে গেলাম, যাতে সে বুঝতে না পারে।
রাত নামলে, তুমি ভোজসভা থেকে ফেরার আগেই মালকিন তার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বাড়ির পূর্ব দিকের সেই খোলা বারান্দায় গেল। সে ধূপের জন্য সমস্ত উপকরণ সাজাল—অদ্ভুত সব অক্ষর খোদাই করা ধাতব পাত, সমুদ্রের ঝড়ে ডুবে মরা মানুষের হাড়, কবর থেকে তোলা নাক ও আঙুল, ফাঁসিকাঠে ঝোলানো মানুষের মাংসের টুকরো এবং সংরক্ষিত রক্ত।
তারপর সে সেই ছাগলের লোমের ওপর মন্ত্রপাঠ করল এবং বিভিন্ন তরল পদার্থে—যেমন কুয়োর জল, গরুর দুধ ও পাহাড়ি মধুতে—ডুবিয়ে রাখল। সবশেষে সেগুলোকে সুগন্ধি ও অন্যান্য দ্রব্যের সাথে মিশিয়ে জ্বলন্ত আগুনে ফেলে দিল।
জাদুবিদ্যার অমোঘ প্রভাবে এবং ওই মিশ্রণের তীব্রতায়, আগুনের তাপে ওই লোমগুলো মানুষের রূপ ধারণ করল। তারা যেন জীবন পেল—অনুভব করতে ও শুনতে শিখল। তারপর নিজেদের চুলের গন্ধ অনুসরণ করে বোয়েতিয়াসের বদলে তারা আমাদের দরজায় এসে আঘাত করতে শুরু করল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তুমি মদ্যপ অবস্থায় ফিরলে। অন্ধকারের বিভ্রমে তুমি ভাবলে দস্যুরা হানা দিয়েছে। তুমি উন্মত্ত এজাক্সের মতো তলোয়ার বের করলে। এজাক্স যেমন পশুর পালকে শত্রু ভেবে হত্যা করেছিল, তুমিও তেমনি তিনটি ফোলানো ছাগলের চামড়াকে মানুষ ভেবে হত্যা করলে।
আর তাই, এতগুলো ‘শত্রু’ বধ করার পর, কোনো রক্তপাত ছাড়াই আমি আজ একজন নরঘাতককে নয়, বরং একজন ‘চামড়া-ঘাতককে’ (Skin-slayer) আলিঙ্গন করছি!”
ফটিসের এই সরস বিদ্রূপে আমি হেসে ফেললাম। বললাম, “সত্যিই, এখন আমি নিজেকে হারকিউলিসের মতো বীর ভাবতে পারি! তিনি যেমন তিন-মাথাওয়ালা কুকুর সারবেরাস বা তিন-দেহধারী জেরিওনকে বধ করেছিলেন, আমিও তেমনি তিনটি ফোলানো ছাগলের চামড়া বধ করেছি!
যাই হোক, তোমার অপরাধ আমি ক্ষমা করলাম। কিন্তু তার বিনিময়ে আমার একটি একান্ত ইচ্ছা তোমাকে পূরণ করতে হবে। আমি স্বচক্ষে দেখতে চাই, তোমার মালকিন কীভাবে জাদু বা মন্ত্র প্রয়োগ করেন এবং দেবতাদের আহ্বান করেন। আমি এই গুপ্তবিদ্যা শিখতে খুব আগ্রহী। আমার ধারণা, তোমার নিজেরও এতে বেশ অভিজ্ঞতা আছে।
কারণ আমি নিশ্চিত অনুভব করছি—যে আমি সর্বদা নারীদের আলিঙ্গন এড়িয়ে চলতাম, আজ তোমার ওই উজ্জ্বল চোখ, রক্তিম গাল, রেশমি চুল আর মিষ্টি চুম্বনে আমি এতটাই বশীভূত যে, আমার আর বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না। তোমার সাথে কাটানো এই আনন্দময় মুহূর্তগুলো আমার কাছে পৃথিবীর যেকোনো ঐশ্বর্যের চেয়েও মূল্যবান।”
ফটিস উত্তর দিল, “ও আমার লুসিয়াস! আমি তোমার ইচ্ছা পূরণ করতে কতটা আগ্রহী, তা তুমি জানো না। কিন্তু আমার মালকিন তার এই জঘন্য কাজের জন্য সর্বদা নির্জনতা খোঁজে। মন্ত্রপাঠের সময় সে কাউকেই আশেপাশে থাকতে দেয় না।
তবুও তোমার অনুরোধ রক্ষা করাকে আমি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিই। যখনই সুযোগ আসবে, আমি তোমাকে খবর দেব এবং গোপনে তোমাকে তার জাদুকরী ক্রিয়া দেখাব। কিন্তু শর্ত একটাই—তুমি যা দেখবে, তা আজীবন গোপন রাখবে।”
এভাবে আমাদের কথোপকথন চলল। তারপর প্রেমের দেবী ভেনাসের প্রভাবে আমাদের মন ও শরীর কামনায় উদ্বেলিত হলো। ফটিস নিজেকে অনাবৃত করে আমার শয্যায় এল। সারা রাত আমরা আনন্দ ও কৌতুকের মধ্য দিয়ে কাটালাম, যতক্ষণ না ভোরের আলো ফোটার আগে ক্লান্ত শরীরে আমরা গভীর ঘুমে ঢলে পড়লাম।
ষোড়শ অধ্যায়
পাখিতে রূপান্তরের ব্যর্থ চেষ্টা ও ফটিসের অসতর্কতায় অ্যাপুলিয়াসের গাধায় রূপান্তর।
একদিন ফটিস চরম উৎকণ্ঠিত হয়ে আমার কাছে ছুটে এল। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সে জানাল, তার মালকিন—যাদের প্রতি প্রণয়াসক্ত—তাদের বশ করার উদ্দেশ্যে আজ রাতে নিজেকে পাখির রূপ ধারণ করে যেখানে খুশি উড়ে যেতে চায়। এই বিরল দৃশ্য দেখার জন্য সে আমাকে গোপনে প্রস্তুত হতে বলল।
মধ্যরাতে সে আমাকে পা টিপে টিপে এক উঁচু কক্ষে নিয়ে গেল এবং দরজার ফাঁক দিয়ে দেখার নির্দেশ দিল। দেখলাম, মালকিন প্রথমে তার সমস্ত পোশাক ত্যাগ করল। একটি বড় সিন্দুক থেকে বিভিন্ন আকারের বাক্স বের করল। তার মধ্য থেকে একটি বাক্স খুলে সে আঙুল দিয়ে মলমটি ভালো করে মেশাল। তারপর পায়ের পাতা থেকে মাথার তালু পর্যন্ত সারা শরীরে সেই মলম মর্দন করতে লাগল।
হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে সে বিড়বিড় করে মন্ত্র আওড়াতে লাগল এবং শরীর নাড়াতে লাগল। হায়! এ আমি কী দেখছি! তার শরীর থেকে ধীরে ধীরে পালক গজাচ্ছে! তার নাক বাঁকা হয়ে শক্ত চঞ্চুতে পরিণত হলো, নখগুলো হিংস্র নখরে রূপান্তরিত হলো—দেখতে না দেখতেই সে একটি পূর্ণাঙ্গ পেঁচায় পরিণত হলো। তারপর পেঁচার মতো কর্কশ চিৎকার করে এবং ডানা ঝাপটে নিজের শক্তি পরীক্ষা করে সে জানলা দিয়ে উড়ে অজানায় পাড়ি দিল।
তার এই জাদুকরী ক্ষমতা দেখে আমি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলাম। যদিও কোনো মন্ত্র আমাকে স্পর্শ করেনি, তবু আমার মনে হলো আমি যেন আর লুসিয়াস নেই। উন্মাদনায় আমার ইন্দ্রিয়গুলো অবশ হয়ে এল। আমি কি জেগে আছি, না স্বপ্ন দেখছি—তা যাচাই করার জন্য নিজের চোখ রগড়ালাম।
কিছুক্ষণ পর যখন আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম, ফটিসের হাত ধরে নিজের মুখের কাছে নিয়ে মিনতি করে বললাম, “প্রিয়তমা, এই সুযোগ! আমার বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করো। তোমার ওই অমৃতসম স্তনের দিব্যি—দয়া করে আমাকে সেই মলম একটু দাও। আমাকেও একটি পাখি বানিয়ে দাও, যাতে আমি ঈগলের মতো আকাশে ডানা মেলতে পারি। আমি চিরকাল তোমার ক্রীতদাস হয়ে থাকব।”
ফটিস অভিমানী সুরে বলল, “তুমি কি আমাকে ঠকিয়ে পালাতে চাইছ? তুমি কি আমাকেই আমার দুঃখের কারণ বানাতে চাও? তুমি যদি পাখি হয়ে উড়ে যাও, তবে এই বিশাল থেসালিতে আমি তোমাকে কোথায় খুঁজব? কখন তোমাকে দেখব?”
আমি বললাম, “ঈশ্বর না করুন! আমি যদি জুপিটারের বার্তাবাহকও হই, তবু দিনশেষে তোমার কাছেই ফিরে আসব। তোমার ওই সুন্দর চুলের দিব্যি, তোমাকে ভালোবাসার পর আমি আর কাউকে চাইনি। তাছাড়া পেঁচা হয়ে আমি মানুষের ধারের কাছেও যাব না। কারণ পেঁচাকে অশুভ মনে করে মানুষ তাকে ধরে পেরেক দিয়ে গেঁথে রাখে।
তবে একটা কথা—আমি পাখি হওয়ার পর পুনরায় লুসিয়াস হয়ে ফিরব কীভাবে?”
ফটিস আশ্বস্ত করে বলল, “ভয় নেই। আমার মালকিন আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে আবার মানুষে রূপান্তর করতে হয়। সামান্য কিছু ডিল আর লরেল পাতা কুয়োর জলে মিশিয়ে স্নান করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”
এই বলে সে সিন্দুক থেকে একটি বাক্স এনে আমার হাতে দিল। আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে সেই বাক্সটি বুকে জড়িয়ে ধরলাম এবং চুম্বন করলাম। তারপর দ্রুত পোশাক খুলে লোভীর মতো হাত ডুবিয়ে সেই মলম সারা শরীরে মাখতে লাগলাম।
সপ্তদশ অধ্যায়
অ্যাপুলিয়াসের গাধায় রূপান্তর এবং দস্যুদের হাতে লাঞ্ছনার করুণ আখ্যান।
শরীরের প্রতিটি অঙ্গে মলম মাখানোর পর আমি দুহাত প্রসারিত করে ওড়ার চেষ্টা করলাম। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম—কখন প্যামফিলের মতো আমার শরীরে পালক গজাবে।
কিন্তু হায়! পালকের বদলে আমার শরীরের লোমগুলো কর্কশ ও রুক্ষ হয়ে উঠল। আমার কোমল ত্বক শক্ত ও পুরু চামড়ায় পরিণত হলো। হাতের ও পায়ের আঙুলগুলো এক হয়ে শক্ত খুরে রূপান্তরিত হলো। মেরুদণ্ডের শেষপ্রান্ত থেকে বেরিয়ে এল এক বিশাল লেজ!
আমার মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে গেল, নাসরন্ধ্র প্রশস্ত হলো, ঠোঁট ঝুলে পড়ল এবং কান দুটো লম্বা হয়ে লোমে ঢেকে গেল। আমি নিজের দিকে তাকিয়ে কোনো সান্ত্বনা খুঁজে পেলাম না। আমার পৌরুষও বৃদ্ধি পেয়ে এক কিম্ভূতকিমাকার রূপ ধারণ করল। অবশেষে আমি বুঝতে পারলাম—আমি কোনো পাখি হইনি, হয়েছি এক আস্ত গাধা!
আমি ফটিসকে ভর্ৎসনা করতে চাইলাম, কিন্তু মানুষের ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। কেবল ঝুলে পড়া ঠোঁট আর অশ্রুসিক্ত চোখ দিয়ে তার দিকে তাকালাম। আমার এই করুণ দশা দেখে ফটিস আর্তনাদ করে উঠল, “হায়! আমি শেষ হয়ে গেলাম! তাড়াহুড়ো আর ভয়ের চোটে আমি ভুল বাক্স এনেছি। তবে ভেবো না, এর প্রতিকার সহজ। যদি তুমি একটি গোলাপ ফুল খেতে পারো, তবেই তুমি আবার মানুষ হতে পারবে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে আমি গতকাল সন্ধ্যায় কিছু গোলাপের মালা গেঁথেছিলাম। সকালেই তুমি মুক্তি পাবে।”
আমি তখন পূর্ণাঙ্গ গাধা হলেও মানুষের বুদ্ধি ও চেতনা আমার মধ্যে অটুট ছিল। মনে মনে ভাবলাম, এই পাপিষ্ঠ দাসীকে লাথি মেরে মেরে ফেলি। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলাম, ফটিস মারা গেলে আমি আর কোনোদিনই মানুষ হতে পারব না। তাই রাগ সংবরণ করে মাথা নিচু করে আস্তাবলে গেলাম।
সেখানে আমার নিজের ঘোড়া এবং মিলোর আরেকটি গাধা ছিল। আমি ভেবেছিলাম, আমার নিজের ঘোড়াটি অন্তত আমাকে চিনবে এবং দয়া দেখাবে। কিন্তু হায়! পশুদের মধ্যে কোনো বিবেক থাকে না। তারা দুজনেই আমাকে তাদের খাবারের অংশীদার ভেবে জোটবদ্ধ হয়ে পেছনের পা দিয়ে লাথি মেরে আমাকে তাড়িয়ে দিল। অথচ গত রাতেই আমি নিজ হাতে তাদের খাবার দিয়েছিলাম!
আস্তাবলের এক কোণে দাঁড়িয়ে আমি আমার ভাগ্যকে ধিক্কার দিচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল, আস্তাবলের ছাদ ধরে রাখা একটি থামের মাঝখানে দেবী হিপোনার মূর্তিতে টাটকা গোলাপের মালা জড়ানো। আমি মুক্তির আশায় পেছনের পায়ে ভর দিয়ে উঁচুতে লাফিয়ে সেই গোলাপ খাওয়ার চেষ্টা করলাম।
কিন্তু আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না। যে বালকটি ঘোড়া দেখাশোনা করত, সে আমাকে ওই অবস্থায় দেখে ফেলল। সে চিৎকার করে উঠল, “আর কতদিন এই বন্য গাধার অত্যাচার সহ্য করব? একে তো অন্যদের খাবার খায়, এখন দেবতাদের মূর্তিও নষ্ট করতে চায়!”
সে একটি মোটা ও শক্ত লাঠি নিয়ে আমাকে নির্মমভাবে পেটাতে শুরু করল। মনে হচ্ছিল সে আমাকে মেরেই ফেলবে। ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে প্রচণ্ড হট্টগোল শুরু হলো। দস্যুদের একটি দল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মিলোর বাড়িতে হানা দিয়েছে। বাড়ির দরজা ভেঙে তারা ভেতরে ঢুকে পড়ল।
প্রতিবেশীরা সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলেও দস্যুদের তলোয়ার ও ঢালের ঝলকানি দেখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হলো। দস্যুরা মিলোর সিন্দুক ভেঙে সমস্ত ধনরত্ন লুট করল। লুটের মাল এত বেশি ছিল যে, তারা তা বহন করার জন্য আস্তাবল থেকে আমাদের—অর্থাৎ আমার ঘোড়া, মিলোর গাধা এবং আমাকে—নিয়ে গেল।
আমাদের পিঠে ক্ষমতার চেয়েও বেশি বোঝা চাপিয়ে তারা লাঠি দিয়ে পেটাতে পেটাতে পাহাড়ি পথে নিয়ে চলল। দীর্ঘ পথ আর ভারী বোঝায় আমি প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিলাম। আমি মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়ার জন্য সম্রাটের নাম ধরে ডাকার চেষ্টা করলাম—”ও সিজার!” কিন্তু আমার গলা দিয়ে কেবল গাধার কর্কশ চিৎকার বের হলো।
দস্যুরা আমার চিৎকারে বিরক্ত হয়ে আমাকে আরও জোরে পেটাতে লাগল। আমার চামড়া থেঁতলে এমন অবস্থা হলো যে তা আর কোনো কাজেই লাগবে না।
অবশেষে জুপিটার আমাকে অপ্রত্যাশিত এক সুযোগ দিলেন। আমরা যখন একটি বাগানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন সেখানে অনেক সুন্দর ফুলের সাথে ফুটে থাকা তাজা গোলাপ দেখলাম। আনন্দে ও লোভে আমি সেদিকে এগিয়ে গেলাম।
কিন্তু তখনই এক শুভ্র বুদ্ধি আমার মাথায় এল। যদি আমি এখন গোলাপ খেয়ে মানুষ হয়ে যাই, তবে এই দস্যুরা আমাকে গুপ্তচর বা জাদুকর ভেবে তৎক্ষণাৎ হত্যা করবে। তাই আমি গোলাপ খাওয়ার লোভ সংবরণ করলাম এবং জীবন বাঁচানোর স্বার্থে মুখ বুজে অন্য গাধাদের মতো ঘাস চিবোতে লাগলাম।
চতুর্থ খণ্ড
অষ্টাদশ অধ্যায়
গোলাপ ভেবে বিষাক্ত ফুল খাওয়ার প্রচেষ্টা, মালীর হাতে প্রহার এবং কুকুরের ধাওয়ার লোমহর্ষক বিবরণ।
সূর্য যখন মধ্যগগনে তার প্রখর উত্তাপ ছড়াচ্ছিল, তখন আমরা দস্যুদের পরিচিত এক গ্রামে এসে পৌঁছালাম। তাদের পারস্পরিক আলিঙ্গন ও সম্ভাষণ দেখে আমি, এই হতভাগ্য গাধা, সহজেই অনুধাবন করলাম যে এরা একই দলের লোক। দস্যুরা আমার পিঠ থেকে বোঝা নামিয়ে নিল এবং লুণ্ঠিত ধন-সম্পদের কিছু অংশ গ্রামবাসীদের ভাগ করে দিল। তাদের ফিসফিসানি শুনে স্পষ্ট বোঝা গেল যে, এগুলো সবই চুরির মাল।
বোঝামুক্ত করার পর তারা আমাদের একটি মাঠে চরে খাওয়ার জন্য ছেড়ে দিল। কিন্তু হায়! আমার নিজের ঘোড়া এবং মিলোর সেই গাধাটি আমাকে তাদের সাথে খাবার ভাগ করে নিতে দিল না। তারা আমাকে একঘরে করে দিল, তাই বাধ্য হয়ে আমাকে অন্য কোথাও খাবারের সন্ধান করতে হলো।
ক্ষুধায় আমার প্রাণান্তকর অবস্থা। আমি আস্তাবলের পেছনের এক বাগানে লাফিয়ে পড়লাম। যদিও সেখানে কাঁচা ও সবুজ শাকসবজি ছাড়া আর কিছুই ছিল না, তবুও তা দিয়েই আমি কোনোক্রমে আমার ক্ষুধার্ত উদরপূর্তি করলাম।
খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আমি দেবতাদের কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছিলাম—যদি আশেপাশের কোনো বাগানে রক্তলাল গোলাপের সন্ধান পাই! আমার একাকীত্ব আমাকে এই আশার আলো দেখাচ্ছিল যে, যদি আমি সেই কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার খুঁজে পাই, তবে সবার চোখের আড়ালে আমি এই গাধার খোলস ছেড়ে পুনরায় লুসিয়াসে রূপান্তরিত হতে পারব।
চারপাশে তাকাতেই নজরে এল দূরের এক ছায়াময় উপত্যকা। বনের কাছাকাছি সেই স্থানটিতে বিভিন্ন ভেষজ লতাগুল্ম ও সবুজের সমারোহের মাঝে আমি উজ্জ্বল ডামাস্ক রঙের গোলাপের মতো কিছু একটা দেখতে পেলাম। আনন্দে আমার পশুসুলভ মন বলে উঠল, “নিশ্চয়ই এটি দেবী ভেনাস ও গ্রেসদের বিচরণভূমি, যেখানে রাজকীয় আভাযুক্ত এই সুস্বাদু ফুলগুলো গোপনে শোভা পাচ্ছে।”
সৌভাগ্যের আশায় বুক বেঁধে আমি বনের দিকে দ্রুত ছুটলাম। তখন নিজেকে আর গাধা নয়, বরং এক দ্রুতগামী অশ্ব মনে হচ্ছিল।
কিন্তু আমার এই ক্ষিপ্রতা ভাগ্যের নিষ্ঠুরতাকে রোধ করতে পারল না। সেই স্থানে পৌঁছানোর পর আমি মর্মান্তিক সত্যটি আবিষ্কার করলাম। সেগুলো মোটেও গোলাপ ছিল না; স্বর্গীয় শিশিরে সিক্ত কোনো কোমল বা মনোরম ফুলও ছিল না। সেগুলো ছিল লরেল গাছের মতো লম্বা ডালপালাযুক্ত, ঝোপঝাড় ও কাঁটার মাঝে জন্মানো একপ্রকার গন্ধহীন ফুল—যাকে লোকমুখে ‘লরেল গোলাপ’ (Oleander) বলা হয়। আর এই ফুল গবাদিপশুদের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত।
আমি নিজেকে এক ভয়ানক বিপদে জড়িয়ে ফেললাম। নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে আমি সেই বিষাক্ত ফুলগুলোই খেতে উদ্যত হলাম, যদিও জানতাম এগুলো সাক্ষাৎ মৃত্যু।
ঠিক সেই মুহূর্তে এক যুবক মালীকে আমার দিকে আসতে দেখলাম। বাগানের সব শাকসবজি আমি সাবাড় করে ফেলেছি দেখে সে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। হাতে একটি বিশাল লাঠি নিয়ে অভিশাপ দিতে দিতে সে আমার ওপর চড়াও হলো এবং আমাকে এমনভাবে প্রহার করতে শুরু করল যে আমার মরণদশা উপস্থিত হলো।
কিন্তু আত্মরক্ষার জন্য আমি নিজেই একটি উপায় বের করলাম। আমি আমার পেছনের পা তুলে তাকে সজোরে এক লাথি মারলাম, যার ফলে সে পাহাড়ের পাদদেশে আছড়ে পড়ে প্রায় আধমরা হয়ে গেল। আমি সেই সুযোগে পালানোর চেষ্টা করলাম।
তৎক্ষণাৎ তার স্ত্রী বেরিয়ে এল। স্বামীকে অমন মুমূর্ষু অবস্থায় দেখে সে করুণ আর্তনাদ শুরু করল। তার চিৎকারের উদ্দেশ্য ছিল আমার ওপর অবিলম্বে ধ্বংস ডেকে আনা। তার হট্টগোলে শহরের সমস্ত লোক উত্তেজিত হয়ে বেরিয়ে এল এবং আমাকে ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য কুকুর লেলিয়ে দেওয়ার হুকুম দিল।
একদল বিশাল আকৃতির মাস্টিফ কুকুর ধেয়ে এল, যারা গাধা নয় বরং সিংহ বা ভাল্লুক শিকারের জন্য অধিক উপযুক্ত। তাদের দেখে আমি নিশ্চিত হলাম যে আমার মৃত্যু আসন্ন। কালবিলম্ব না করে আমি উল্টো ঘুরে যে আস্তাবল থেকে এসেছিলাম, সেদিকেই প্রাণপণ দৌড় দিলাম।
কিন্তু গ্রামবাসী তাদের কুকুরদের ডেকে নিল এবং আমাকে ধরে একটি খুঁটির সাথে শক্ত করে বাঁধল। তারপর বিশাল গিঁটযুক্ত চাবুক দিয়ে আমাকে এমনভাবে প্রহার করতে লাগল যে, আমি মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে গেলাম। নিঃসন্দেহে তারা আমাকে মেরেই ফেলত, যদি না এক কদর্য ঘটনা আমাকে রক্ষা করত।
তাদের নির্মম প্রহারের যন্ত্রণা এবং পেটে থাকা কাঁচা শাকসবজির প্রভাবে আমার ভয়ানক উদরাময় শুরু হলো। আমি আমার পেছনের দিক দিয়ে তাদের মুখে তরল মল ছিটিয়ে দিলাম। সেই অসহ্য দুর্গন্ধ ও নোংরা পরিস্থিতির কারণে তারা আমাকে প্রহার করা বন্ধ করতে বাধ্য হলো।
ঊনবিংশ অধ্যায়
অ্যাপুলিয়াসের ব্যর্থ অভিপ্রায় এবং দস্যুদের গুহায় প্রত্যাবর্তনের করুণ আখ্যান।
কিছুক্ষণ পর চোরেরা আবার আমাদের পিঠে বোঝা চাপিয়ে দিল। বিশেষ করে আমার পিঠে তারা অমানুষিক ভার তুলে দিল এবং আস্তাবল থেকে আমাদের বের করে নিয়ে এল। দীর্ঘ ও দুর্গম পথ, আমার পিঠের বিশাল বোঝা, লাঠির আঘাত এবং জীর্ণ খুর—সব মিলিয়ে আমি এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলতে আমার প্রাণান্তকর অবস্থা হচ্ছিল।
এমন সময় সামনে একটি সুন্দর নদী দেখে আমার মাথায় এক বুদ্ধি এল। আমি মনে মনে বললাম, “এই তো সুযোগ! আমি নদীর কাছে গেলেই পড়ে যাব এবং কিছুতেই আর উঠব না। চাবুক বা লাঠির ভয় দেখিয়েও আমাকে আর তোলা যাবে না। এই যন্ত্রণা ভোগ করার চেয়ে এখানেই মরে যাওয়া ঢের ভালো।”
আমার এই সিদ্ধান্তের পেছনে একটি যুক্তিও ছিল। আমি ভেবেছিলাম, চোরেরা যখন দেখবে আমি আর হাঁটতে পারছি না, তখন তারা সময় বাঁচানোর জন্য আমার পিঠের বোঝা নামিয়ে অন্য পশুদের ওপর চাপিয়ে দেবে এবং শাস্তিস্বরূপ আমাকে নেকড়ে বা হিংস্র পশুর খাবার হিসেবে এখানেই ফেলে রেখে যাবে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমার এই ‘চমৎকার’ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলো না। কারণ আমার সঙ্গী গাধাটি আমার আগেই একই ফন্দি এঁটেছিল। সে হঠাৎ ক্লান্তির ভান করে সমস্ত বোঝা নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, যেন সে মরেই গেছে। দস্যুরা তাকে লাঠি দিয়ে পেটাল, খোঁচাল, এমনকি লেজ ও কান ধরে টানল—তবুও সে উঠল না।
অবশেষে চোরেরা হাল ছেড়ে দিয়ে একে অপরকে বলল, “আমরা এখানে এই মরা গাধার জন্য কেন সময় নষ্ট করছি? চলো, এর বোঝা নামিয়ে নিই।”
তারা তার বোঝা ভাগ করে আমার এবং ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে দিল। তারপর তারা তলোয়ার বের করে নির্দয়ভাবে তার পা কেটে ফেলল এবং জ্যান্ত অবস্থাতেই তাকে পাহাড়ের চূড়া থেকে গভীর উপত্যকায় ফেলে দিল।
আমার দরিদ্র সঙ্গীর এই মর্মান্তিক পরিণতি দেখে আমি শিউরে উঠলাম। আমি আমার সমস্ত শঠতা ও প্রতারণা ভুলে গিয়ে প্রভুদের মন জয় করার জন্য ‘ভালো গাধা’ হিসেবে কাজ করার সংকল্প করলাম। কারণ তাদের কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারলাম যে আমরা আমাদের যাত্রার প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি।
একটি ছোট পাহাড় অতিক্রম করার পর আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছালাম। বোঝা নামানোর পর তারা সব জিনিস ভেতরে নিয়ে গেল। আমি ক্লান্ত শরীরটাকে একটু আরাম দেওয়ার জন্য জলের পরিবর্তে ধুলোয় গড়াগড়ি দিলাম।
দস্যুদের গুহার বর্ণনা
সময় এবং পরিস্থিতি আমাকে এই স্থানটির বর্ণনা দিতে বাধ্য করছে। বিশেষ করে চোরেরা যে গুহায় বাস করত, তার বিবরণ দিলেই আপনারা বুঝতে পারবেন যে আমি গাধা হলেও আমার বিচারবুদ্ধি কতটা তীক্ষ্ণ ছিল।
প্রথমে একটি বিশাল ও সুউচ্চ পাহাড়, যা বড় বড় গাছ দিয়ে ঘেরা। এর পাদদেশ ছিল তীক্ষ্ণ পাথরে পূর্ণ, যা স্থানটিকে দুর্গম করে তুলেছিল। সেখানে অনেক আঁকাবাঁকা ও ফাঁপা উপত্যকা ছিল, যা কাঁটাঝোপ দিয়ে প্রাকৃতিকভাবেই সুরক্ষিত।
পাহাড়ের চূড়া থেকে রুপার মতো স্বচ্ছ একটি জলধারা নিচে নেমে এসে উপত্যকাকে প্লাবিত করত, যা দেখে মনে হতো যেন এক স্থির বন্যা বা আবদ্ধ সমুদ্র। গুহার সামনে যেখানে পাহাড় ছিল না, সেখানে একটি উঁচু টাওয়ার দাঁড়িয়ে ছিল। তার নিচে মাটির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ভেড়ার খোঁয়াড়।
বাড়ির গেটের সামনে কোনো পাকা রাস্তা ছিল না, বরং এমন এক পথ ছিল যা দেখে সহজেই বোঝা যেত এটি চোরদের আস্তানা। সেখানে খড় দিয়ে ঢাকা একটি ছোট কুঁড়েঘর ছিল, যেখানে চোরেরা রাতে পালা করে পাহারা দিত।
গুহার ভেতরের দৃশ্য ও দস্যুদের ভোজ
দস্যুরা সবাই ভেতরে ঢুকল এবং আমাদের দরজার সাথে শক্ত করে বেঁধে রাখল। তারপর তারা এক বৃদ্ধার সাথে ঝগড়া শুরু করল। বয়সের ভারে নুব্জ সেই বৃদ্ধাই ছিল পুরো বাড়ির হর্তাকর্তা।
চোরেরা ধমক দিয়ে বলল, “কীরে বুড়ি ডাইনি! তুই তো সারাদিন অলস হয়ে বসে থাকিস। আমাদের এই হাড়ভাঙা খাটুনির পর আমাদের জন্য রাতের খাবার তৈরি করিসনি কেন? নাকি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নিজেই গিলছিস আর পিচ্ছিস?”
বৃদ্ধা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “ও আমার শক্তিশালী প্রভুরা! আপনারা এখনই যথেষ্ট মাংস আর স্যুপ পাবেন। প্রচুর রুটি আর ধোয়া পাত্রে মদ প্রস্তুত আছে। আপনাদের স্নানের জন্য গরম জলও তৈরি।”
এ কথা শুনে তারা পোশাক ছেড়ে আগুনের পাশে বসল। স্নান ও তেল মর্দন শেষে তারা সুস্বাদু খাবারে সাজানো টেবিলে বসল। ঠিক তখনই একদল যুবক এসে যোগ দিল। তাদের সংখ্যা ছিল আগের দলের চেয়েও বেশি। তাদের সাথে ছিল প্রচুর সোনা-রুপা, গহনা এবং দামি পোশাকের লুট। স্নান শেষে তারাও অন্যদের সাথে ভোজনে যোগ দিল।
তারা প্রচুর পরিমাণে পানাহার করল। তাদের হাসি, চিৎকার আর হট্টগোল শুনে মনে হচ্ছিল আমি যেন অত্যাচারী ল্যাপিত, থিবান এবং সেন্টরদের (Centaurs) ভোজসভায় আটকা পড়েছি।
অবশেষে তাদের মধ্যে একজন, যে সবচেয়ে সাহসী বলে মনে হচ্ছিল, উঠে দাঁড়িয়ে বলল:
“আমরা বীরত্বের সাথে হিপাটার মিলোর বাড়ি জয় করেছি। প্রচুর ধন-সম্পদ লুট করে এনেছি এবং এই ঘোড়া ও গাধাটি আমাদের সম্পদ আরও বাড়িয়েছে। আমরা সবাই নিরাপদে ফিরেছি।
কিন্তু তোমরা যারা বোয়েটিয়া দেশে অভিযানে গিয়েছিলে, তোমরা তোমাদের মহান দলনেতা ল্যামাথুসকে হারিয়েছ। তার জীবন আমার কাছে এই সমস্ত সম্পদের চেয়েও মূল্যবান ছিল। তার স্মৃতি চিরকাল সাহসী অধিনায়কদের তালিকায় অমলিন থাকবে। আর তোমরা? তোমরা হাঁসের মতো ভীতু হয়ে সামান্য জিনিসের জন্য গর্তে গর্তে ঘুরে বেড়াচ্ছ।”
দ্বিতীয় দলের একজন উত্তর দিল:
“তোমরা কি জানো না যে সংখ্যা যত বেশি হয়, লুটপাট তত সহজ হয়? আর যখন চোরের সংখ্যা কম থাকে, তখন তারা কেবল নিজেদের জীবন বাঁচাতেই ব্যস্ত থাকে, সম্পদের দিকে আর নজর দিতে পারে না।
শোনো, আমরা থিবসের কাছাকাছি কোথাও যাইনি। আমরা খবর পেলাম ক্রাইসেরোস নামে এক কৃপণ ধনী ব্যক্তি একাকী একটি ছোট কুঁড়েঘরে বাস করে। সরকারি কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য সে তার বিপুল সম্পদ লুকিয়ে রাখে এবং নিজে ছেঁড়া পোশাকে থাকে। আমরা ঠিক করলাম তার বাড়িতে হানা দেব।
রাতে তার দরজায় গিয়ে দেখলাম তা শক্তভাবে বন্ধ। শব্দ না করে আমাদের দলনেতা ল্যামাথুস দরজার একটি ছিদ্র দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দিল ছিটকিনি খোলার জন্য। কিন্তু সেই ধূর্ত কৃপণ জেগে ছিল। সে নিঃশব্দে দরজার কাছে এসে ল্যামাথুসের হাত চেপে ধরল এবং একটি বিশাল পেরেক দিয়ে দরজার চৌকাঠের সাথে তার হাত গেঁথে দিল!
তারপর সে ছাদে উঠে প্রতিবেশীদের সাহায্য চেয়ে চিৎকার শুরু করল, ‘আগুন! আগুন!’
প্রতিবেশীরা ছুটে এল। আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম। ল্যামাথুসকে বাঁচাব নাকি নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে পালাব? শেষে ল্যামাথুসের সম্মতিতে আমরা এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিলাম। আমরা তার কনুই থেকে হাতটি কেটে ফেললাম এবং কাটা হাতটি সেখানেই ঝুলিয়ে রেখে তাকে নিয়ে পালালাম।
কিন্তু রক্তক্ষরণে ল্যামাথুস এত দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে সে আমাদের সাথে তাল মেলাতে পারছিল না। সে বুঝতে পারল যে সে আমাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে আমাদের অনুরোধ করল, ‘তোমরা আমাকে হত্যা করো। একজন সাহসী অধিনায়কের পক্ষে হাত ছাড়া বেঁচে থাকা অপমানের।’
আমরা যখন তাকে মারতে অস্বীকার করলাম, তখন সে তার অন্য হাত দিয়ে তলোয়ার বের করল। তলোয়ারে বারবার চুম্বন করে সে নিজের বুকে আমূল বসিয়ে দিল। আমরা তার সেই বীরোচিত আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়ে তার দেহ সমুদ্রে সমাহিত করলাম।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। অ্যালসিনাস নামের আরেক সাহসী সঙ্গীও নিজেকে বাঁচাতে পারেনি। এক বৃদ্ধার বাড়িতে চুরি করতে ঢুকে সে যখন ওপর থেকে মালপত্র নিচে ফেলছিল, তখন সে বৃদ্ধার বিছানার চাদরটাও নিতে চাইল।
বৃদ্ধা জেগে উঠে বলল, ‘বাছা, এই ছেঁড়া চাদরটা আমার প্রতিবেশীর আঙিনায় ফেলো না। ওরা ধনী মানুষ, ওদের এসব লাগবে না।’
অ্যালসিনাস বোকার মতো বিশ্বাস করে জানালা দিয়ে নিচে উঁকি দিল—আসলেই সে মালপত্র কোথায় ফেলছে তা দেখার জন্য। ঠিক সেই মুহূর্তে বৃদ্ধা তার পা ধরে এমন জোরে ধাক্কা দিল যে সে মাথা নিচু করে নিচে পড়ে গেল। একটি বড় পাথরের ওপর পড়ে তার পাঁজর ভেঙে চুরমার হয়ে গেল এবং রক্তবমি করে সে মারা গেল। তাকেও আমরা ল্যামাথুসের মতো নদীতে ভাসিয়ে দিলাম।”
প্লেটিয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ও ভাল্লুক শিকারের ছক
“দুই সঙ্গীকে হারিয়ে আমরা থিবস ছেড়ে প্লেটিয়ার দিকে রওনা হলাম। সেখানে ডেমোচারিস নামে এক ধনী ব্যক্তি বিশাল এক খেলার আয়োজন করেছিল। সে ছিল অত্যন্ত শৌখিন। শিকার ও মল্লযুদ্ধের জন্য সে বিশাল সব টাওয়ার ও মঞ্চ তৈরি করেছিল।
সে প্রচুর বন্য পশু ও গ্ল্যাডিয়েটর জোগাড় করেছিল। তবে তার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল বিশাল সব ভাল্লুক, যা সে অনেক টাকা খরচ করে কিনেছিল বা নিজে শিকার করেছিল।
কিন্তু হিংসার কারণেই হোক বা অবহেলার কারণে—সেই ভাল্লুকগুলো অসুস্থ হয়ে একে একে মারা যেতে লাগল। রাস্তায় মৃত ভাল্লুক পড়ে থাকতে দেখা যেত। অভাবী মানুষজন সেই মরা ভাল্লুকের মাংস খেয়েই পেট ভরাত।
তখন আমি আর বাবুলুস এক ফন্দি আঁটলাম। আমরা সবচেয়ে বড় একটি মরা ভাল্লুককে আমাদের ডেরায় নিয়ে এলাম। আমরা তার চামড়া এমনভাবে ছাড়ালাম যেন নখগুলো অক্ষত থাকে। মাথাটি আমরা চামড়ার সাথেই ঝুলিয়ে রাখলাম। তারপর মাংস ফেলে দিয়ে চামড়াটি রোদে শুকোতে দিলাম।”
বিংশ অধ্যায়
থ্রাসিলিয়নের ভাল্লুক ছদ্মবেশ ধারণ এবং তার মর্মান্তিক পরিণতির আখ্যান।
ভাল্লুকের চামড়াটি যখন শুকিয়ে এল, তখন আমরা তার মাংস দিয়ে ভোজের আনন্দ উপভোগ করলাম। এরপর আমরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করলাম যে, আমাদের মধ্যে যে দৈহিক শক্তি ও সাহসে সবার সেরা, সে এই চামড়াটি পরিধান করবে। পরিকল্পনাটি ছিল—সে নিজেকে জীবন্ত ভাল্লুক হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাতে ডেমোচারিসের প্রাসাদে প্রবেশ করবে এবং আমাদের জন্য ভেতরে ঢোকার পথ সুগম করবে।
অনেকেই এই ছদ্মবেশ ধারণ করতে আগ্রহী ছিল, কিন্তু বিশেষ করে থ্রাসিলিয়ন—যিনি অসীম সাহসী ও দুঃসাহসিক মনের অধিকারী—স্বেচ্ছায় এই গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন। আমরা তাকে পরম যত্নে ভাল্লুকের চামড়াটি পরিয়ে দিলাম। চামড়াটি তার শরীরে এত নিখুঁতভাবে মানিয়ে গেল যে, দেখে বোঝার উপায় ছিল না। পেটের নিচে চামড়াটি শক্ত করে বেঁধে সেলাইয়ের জায়গাগুলো আমরা নিপুণভাবে লোম দিয়ে ঢেকে দিলাম।
এরপর ভাল্লুকের মুখের জায়গায়—নাসারন্ধ্র ও চোখের কাছে—আমরা ছোট ছোট ছিদ্র করলাম, যাতে থ্রাসিলিয়ন বাইরে দেখতে পায় এবং শ্বাস নিতে পারে। সব মিলিয়ে তাকে দেখে একটি জীবন্ত ও হিংস্র পশু বলেই ভ্রম হচ্ছিল।
প্রস্তুতি শেষে আমরা ভাড়াকৃত একটি গুহায় গেলাম। থ্রাসিলিয়ন অসামান্য দক্ষতায় ভাল্লুকের মতো হামাগুড়ি দিয়ে গুহার ভেতর প্রবেশ করল। এরপর আমরা আমাদের চাতুরীর দ্বিতীয় ধাপ শুরু করলাম। আমরা কিছু জাল চিঠি তৈরি করলাম, যেন সেগুলো থ্রেস দেশের নিকানর নামক এক ব্যক্তির কাছ থেকে এসেছে। নিকানর ছিলেন ডেমোচারিসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। চিঠিতে লেখা হলো যে, নিকানর তার শিকারের প্রথম এবং সেরা উপহার হিসেবে এই ভাল্লুকটি তার বন্ধুকে পাঠাচ্ছেন।
রাত নামতেই, যা ছিল আমাদের অভিযানের উপযুক্ত সময়, আমরা থ্রাসিলিয়ন এবং সেই জাল চিঠি নিয়ে ডেমোচারিসের দরবারে উপস্থিত হলাম। ডেমোচারিস সেই বিশালকায় ভাল্লুক এবং বন্ধু নিকানরের উদারতা দেখে মুগ্ধ হলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ তার ভাণ্ডার থেকে আমাদের দশটি স্বর্ণমুদ্রা বকশিশ দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।
নতুন এবং অদ্ভুত কিছু দেখার কৌতূহল মানুষের চিরন্তন স্বভাব। তাই খবর ছড়িয়ে পড়তেই দলে দলে লোক এই অতিকায় ভাল্লুকটি দেখতে ভিড় জমাল। পাছে কেউ কাছে এসে খুব খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে সত্যটি ধরে ফেলে, তাই থ্রাসিলিয়ন মাঝে মাঝে হিংস্রভাবে তাদের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার ভান করতে লাগল, যাতে তারা ভয় পেয়ে দূরে থাকে।
লোকেরা বলতে লাগল, “সত্যিই ডেমোচারিস বড় ভাগ্যবান! এতগুলো পশুর মৃত্যুর পর ভাগ্যের চাকা ঘুরে তিনি এমন চমৎকার একটি ভাল্লুক উপহার পেলেন।”
ডেমোচারিস তখন নির্দেশ দিলেন ভাল্লুকটিকে যেন খুব যন্ত্বের সাথে তার ব্যক্তিগত উদ্যানে অন্যান্য পশুদের সাথে রাখা হয়। কিন্তু আমি তৎক্ষণাৎ বাধা দিয়ে বললাম:
“মহাশয়, আমি আপনাকে বিনীত অনুরোধ করছি, সূর্যের তাপে এবং দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত এমন একটি রাজকীয় পশুকে অন্যান্য অসুস্থ পশুর সাথে রাখবেন না। শুনেছি আপনার অনেক পশু রোগে মারা গেছে। তার চেয়ে বরং একে আপনার প্রাসাদের কোনো খোলামেলা জায়গায়, জলের কাছাকাছি রাখুন। সেখানে সে মুক্ত বাতাস পাবে এবং স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। আপনি কি জানেন না যে, এই জাতীয় পশুরা গাছের ছায়া, পাহাড়ের ঢাল এবং শীতল ঝর্ণার পাশে শুয়ে থাকতে ভালোবাসে?”
আমার কথায় ডেমোচারিস সতর্ক হলেন। অতীতের ক্ষতির কথা স্মরণ করে তিনি আমাদের প্রস্তাবে রাজি হলেন এবং ভাল্লুকটিকে আমাদের পছন্দমতো জায়গায় রাখার অনুমতি দিলেন। অধিকন্তু, আমরা প্রস্তাব দিলাম যে, ভাল্লুকটি যেহেতু ক্লান্ত, তাই আমরাই সারা রাত তার পাশে থেকে তার সেবাযত্ন করব এবং সময়মতো খাবার দেব।
তিনি উত্তর দিলেন, “আপনাদের এত কষ্ট করার প্রয়োজন নেই। আমার ভৃত্যরা এ কাজে যথেষ্ট দক্ষ।”
অগত্যা আমরা বিদায় নিয়ে চলে এলাম। শহরের তোরণ পেরিয়ে আমরা এক নির্জন স্থানে অবস্থিত একটি বিশাল সমাধিসৌধের (Tomb) কাছে গেলাম। সেখানে মানুষের পচা হাড়গোড় ও দীর্ঘদিনের ধুলোবালি ছড়িয়ে ছিল। আমরা সেই সমাধির ঢাকনা খুলে ফেললাম এবং আমাদের লুটের মাল রাখার নিরাপদ আস্তানা হিসেবে সেটি ব্যবহারের জন্য ভেতরে প্রবেশ করলাম।
রাতের অভিযান ও থ্রাসিলিয়নের আত্মত্যাগ
রাতের গভীর অন্ধকার যখন চারদিক গ্রাস করল এবং আমরা অনুমান করলাম যে নগরবাসী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন আমরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ডেমোচারিসের প্রাসাদ ঘেরাও করলাম। থ্রাসিলিয়ন আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। সে গুহা থেকে বেরিয়ে এল এবং প্রহরীদের হত্যা করার জন্য উদ্যত হলো। কিন্তু দারোয়ান তাকে দেখে ভয়ে গেট খুলে দিল এবং আমাদের ভেতরে ঢোকার সুযোগ করে দিল।
সে আমাদের একটি বিশাল সিন্দুক দেখিয়ে দিল, যেখানে আগের রাতে আমরা প্রচুর ধনরত্ন দেখেছিলাম। সিন্দুকটি ভেঙে ফেলার পর আমি সঙ্গীদের বললাম, “তোমরা যে যতটা পারো সোনা-রুপা নিয়ে নাও এবং দ্রুত ওই সমাধিসৌধে রেখে এসো।” আমি গেটে দাঁড়িয়ে প্রহরারত রইলাম এবং সঙ্গীদের ফেরার প্রতীক্ষা করতে লাগলাম।
ইতিমধ্যে ভাল্লুকবেশী থ্রাসিলিয়ন বাড়ির আঙিনায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল, যাতে কেউ জেগে উঠলে ভয়েই যেন ঘরের ভেতরে থাকে। কারণ এমন কোন বীর আছে যে রাতের আঁধারে এমন বিশাল দানব দেখে ভয় পাবে না?
আমাদের পরিকল্পনা প্রায় সফল হতে চলেছিল, ঠিক তখনই ঘটল এক করুণ বিপত্তি। আমি যখন সঙ্গীদের ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম, তখন বাড়ির এক চাকর জানালা দিয়ে উঁকি মেরে উঠোনে ভাল্লুকটিকে দৌড়াতে দেখে ফেলল। সে তৎক্ষণাৎ বাড়ির সবাইকে জাগিয়ে দিল।
মুহূর্তের মধ্যে মশাল, লণ্ঠন এবং প্রদীপের আলোয় পুরো আঙিনা দিনের মতো আলোকিত হয়ে গেল। ভৃত্যরা লাঠি, বর্শা, খোলা তলোয়ার এবং হিংস্র শিকারি কুকুর নিয়ে সেই ‘নিরীহ’ পশুটিকে মারার জন্য বেরিয়ে এল।
এই হট্টগোলে আমি পালাতে পারতাম, কিন্তু থ্রাসিলিয়নের পরিণতি দেখার জন্য গেটের আড়ালে লুকিয়ে রইলাম। দেখলাম, সে প্রায় মৃত্যুশয্যায়, তবুও আমাদের প্রতি তার বিশ্বস্ততা বিস্মৃত হয়নি। সে সাহসের সাথে সেই নরকের কুকুরগুলোর মোকাবিলা করতে লাগল। নিজের স্বেচ্ছায় নেওয়া ছদ্মবেশ সে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বজায় রাখল এবং প্রাণপণ চেষ্টা করে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল।
কিন্তু বাইরে এসেও তার রেহাই মিলল না। রাস্তার নেড়ি কুকুরগুলো প্রাসাদের শিকারি কুকুরদের সাথে যোগ দিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
আহ্! কী মর্মান্তিক দৃশ্য! আমাদের প্রিয় থ্রাসিলিয়নকে অগণিত কুকুর ঘিরে ধরেছে এবং নির্মমভাবে ছিঁড়ে খাচ্ছে। এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে আমি নিজেকে সামলাতে পারলাম না। ভিড়ের মধ্যে ঢুকে চিৎকার করে বললাম, “হায়! কী দুর্ভাগ্য আমাদের! আমরা কী এক অমূল্য ও চমৎকার পশু হারালাম!”
কিন্তু আমার কথায় কোনো কাজ হলো না। এক দীর্ঘদেহী ব্যক্তি বর্শা হাতে এগিয়ে এল এবং থ্রাসিলিয়নের বুকে বিঁধিয়ে দিল। এরপর বাকিরাও তলোয়ার দিয়ে তাকে আঘাত করতে শুরু করল। এভাবেই তারা তাকে হত্যা করল।
আমাদের মহান দলনেতা, আমাদের গর্ব থ্রাসিলিয়ন এমন ধৈর্যের সাথে মৃত্যুকে বরণ করে নিলেন যে, কোনো চিৎকার বা আর্তনাদ করে তিনি আমাদের গোপন কথা ফাঁস করলেন না। কুকুর ও অস্ত্রের আঘাতে জর্জরিত হয়ে তিনি কেবল পশুর মতোই গোঙাতে লাগলেন। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি মানুষের মতো আচরণ না করে নিখুঁতভাবে ভাল্লুকের ভূমিকা পালন করে গেলেন।
তার মৃত্যুতে উপস্থিত জনতা এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল যে, ভোর না হওয়া পর্যন্ত কেউ তার মৃতদেহ স্পর্শ করার সাহস পেল না। অবশেষে একজন সাহসী কসাই এসে পশুটির পেট চিরে ভেতর থেকে এক বীর চোরকে বের করে আনল।
এভাবেই আমরা আমাদের দলনেতা থ্রাসিলিয়নকে হারালাম, কিন্তু তার সম্মান ও খ্যাতি অমলিন হয়ে রইল।
সব শেষ হওয়ার পর আমরা সমাধিসৌধ থেকে আমাদের লুণ্ঠিত ধনরত্ন সংগ্রহ করলাম এবং দ্রুত প্লেটিয়ার সীমানা ত্যাগ করলাম। পথে যেতে যেতে আমরা ভাবলাম, জীবিতদের চেয়ে মৃতদের বিশ্বাস করাই শ্রেয়, কারণ আমাদের লুটের মাল ওই সমাধিতেই সবচেয়ে নিরাপদে ছিল।
ভারী বোঝা, দীর্ঘ ভ্রমণ এবং তিনজন বীর সঙ্গীকে হারানোর শোকে ভারাক্রান্ত হয়ে আমরা অবশেষে আমাদের ডেরায় ফিরে এলাম।
উপসংহার
মৃত সঙ্গীদের স্মরণে এই করুণ কাহিনী বর্ণনা করার পর দস্যুরা সোনার পেয়ালা হাতে তুলে নিল এবং যুদ্ধের দেবতা মঙ্গলের (Mars) স্তবগান গেয়ে ঘুমাতে গেল।
বৃদ্ধা আমাদের জন্য প্রচুর পরিমাণে যব খেতে দিল। আমার ঘোড়াটি এত বেশি খাবার পেয়ে ভাবল যেন সে কোনো রাজকীয় ভোজসভায় এসেছে। কিন্তু আমি, যে কিনা ভুসি আর আটা খেয়েই অভ্যস্ত ছিলাম, কাঁচা যব আমার কাছে বিস্বাদ ঠেকল। তাই বাড়ির এক কোণে যেখানে রুটির স্তূপ রাখা ছিল, আমি চুপিচুপি সেখানে গিয়ে পেট ভরে রুটি খেয়ে নিলাম।
পঞ্চম খণ্ড
একবিংশ অধ্যায়
চোরদের হাতে এক সম্ভ্রান্ত তরুণীর অপহরণ এবং দস্যু-গুহায় বন্দিত্বের করুণ কাহিনী।
রাতের অন্ধকার গভীর হতেই চোরেরা জেগে উঠল। তারা দ্রুত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে, মুখে মুখোশ পরে গুহা ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
ওদিকে আমি, এত দীর্ঘ সময় ঘুমানো সত্ত্বেও খাওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। যখন মানুষ ছিলাম, তখন সামান্য এক-দুটি রুটিতেই আমার পেট ভরে যেত। কিন্তু এখন আমার গাধার পেট এতটাই রাক্ষুসে হয়ে উঠেছে যে, তিন ঝুড়ি রুটিও যেন যথেষ্ট মনে হয় না। খেতে খেতে এবং এসব ভাবতে ভাবতে ভোর হয়ে গেল। আমাকে নদীর ঘাটে নিয়ে যাওয়া হলো। গাধার রূপে থাকার লজ্জাবোধ সত্ত্বেও আমি পেট ভরে জল পান করলাম।
হঠাৎ করেই চোরেরা ফিরে এল। তাদের চোখেমুখে হতাশা ও বিষণ্নতার ছাপ স্পষ্ট। তাদের সাথে কোনো লুটের মাল বা জিনিসপত্র ছিল না। কেবল একটি কুমারী মেয়ে তাদের সাথে ছিল। মেয়েটির পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে সে কোনো অভিজাত বংশের সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা। সে এতই অসামান্য সুন্দরী ছিল যে, আমি একটি মূর্খ গাধা হওয়া সত্ত্বেও তার রূপে মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না।
মেয়েটি তার দুর্ভাগ্যের জন্য বিলাপ করছিল। শোকে সে নিজের মাথার চুল ছিঁড়ছিল এবং পরনের কাপড় ছিন্নভিন্ন করছিল। চোরেরা তাকে গুহার ভেতরে নিয়ে এল এবং কিছুটা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল।
তারা বলল, “সুন্দরী, কেঁদো না। আমরা তোমাকে কথা দিচ্ছি, তোমার কোনো ক্ষতি বা অমর্যাদা আমরা করব না। আমাদের অভাব আর চরম দারিদ্র্যই আমাদের এই কাজ করতে বাধ্য করেছে। তুমি শুধু কিছুদিন ধৈর্য ধরো। আমরা জানি তোমার বাবা-মা সম্পদ আঁকড়ে ধরে থাকলেও তোমাকে আমাদের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিতে প্রচুর মুক্তিপণ দিতে রাজি হবেন।”
এভাবে নানা মিষ্টি কথায় তারা মেয়েটিকে শান্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু সে কোনো সান্ত্বনাই মানল না। বরং হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে আরও করুণ স্বরে কাঁদতে লাগল। চোরেরা তখন সেই বৃদ্ধাকে ডেকে নির্দেশ দিল মেয়েটির পাশে বসতে এবং তাকে যতটা সম্ভব শান্ত করতে। এরপর তারা তাদের স্বভাবসুলভ কাজে অর্থাৎ ডাকাতি করতে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু বৃদ্ধার কোনো অনুরোধেই মেয়েটির কান্না থামল না। সে এমনভাবে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল যে, তা দেখে আমি—এই বোবা পশুটিও—চোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না।
সে বিলাপ করে বলল, “হায়! আমি কি আর বাঁচতে পারব? এত সম্ভ্রান্ত বংশের মেয়ে হয়েও আজ আমি মা-বাবা, বন্ধু-বান্ধব ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। আজ আমি দস্যুদের হাতে লুণ্ঠিত, এই পাথরের কারাগারে ক্রীতদাসীর মতো বন্দী। আমার সব আনন্দ আজ ধূলিসাৎ। যে আমি কত আদরে বড় হয়েছি, আজ সেই আমিই এই ভয়ংকর ডাকাতদের হাতে ছিন্নভিন্ন হওয়ার অপেক্ষায়! আমি কি কান্না থামিয়ে আর বাঁচতে পারি?”
চিৎকার ও বিলাপে ক্লান্ত হয়ে এবং চোখের জলে মুখ ভাসিয়ে অবশেষে সে তার অশ্রুসিক্ত চোখ দুটি বন্ধ করল এবং ঘুমে ঢলে পড়ল।
কিন্তু ঘুম ভাঙার পর তার অবস্থা হলো আরও করুণ। সে পাগলের মতো উঠে দাঁড়াল এবং আগের চেয়েও দ্বিগুণ জোরে নিজের বুক ও মুখে আঘাত করতে শুরু করল।
বৃদ্ধা অবাক হয়ে তার এই আকস্মিক বিলাপে কারণ জানতে চাইল। মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হায়! আমি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছি। আমার সব আশা শেষ। ওহ, আমাকে একটি ছুরি দাও, আমি নিজেকে শেষ করে ফেলি! অথবা একটা দড়ি দাও, আমি ফাঁসিতে ঝুলি।”
এ কথা শুনে বৃদ্ধা ক্ষেপে গেল। সে ধমক দিয়ে বলল, “কী বলছিস তুই? তুই কি আমাদের ছেলেদের তাদের প্রাপ্য মুক্তিপণ থেকে বঞ্চিত করতে চাস? খবরদার! কান্না থামা। চোরেরা তোর এই কান্নাকাটির তোয়াক্কা করে না। আর যদি তুই চুপ না করিস, তবে আমি তোকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারব।”
ভয়ে মেয়েটি চুপসে গেল। সে বৃদ্ধার হাতে চুমু খেয়ে বলল, “ওহ মা, আমার এই পোড়া কপালের ওপর একটু দয়া করো। আমাকে একটু কথা বলার সুযোগ দাও। আমার মনে হচ্ছে আমি আর বেশিদিন বাঁচব না। তোমার ওই পাকা চুলে যেন একটু করুণার উদয় হয়। আমার দুঃখের কাহিনীটা শোনো।”
তরুণীর আত্মকথন: স্বপ্নভঙ্গ ও অপহরণ
“আমাদের শহরে এক সুদর্শন যুবক ছিল, যে তার উদারতা ও গুণের জন্য সবার প্রিয়পাত্র। সে আমার আপন ফুফাতো ভাই এবং আমার চেয়ে মাত্র তিন বছরের বড়। আমরা একই বাড়িতে, একই ছাদের নিচে বড় হয়েছি। শৈশব থেকেই আমাদের গভীর সখ্য ছিল। অবশেষে পরিবারের সম্মতিতে আমাদের বিয়ে ঠিক হলো।
বিয়ের দিন ঘনিয়ে এল। আমাদের বাড়ি লরেল পাতা দিয়ে সাজানো হলো। বিয়ের দেবতা হাইমেনিউসের সম্মানে চারদিকে মশাল জ্বলে উঠল। আমার হবু স্বামী তার আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের নিয়ে মন্দিরে পূজা দিচ্ছিল।
অন্যদিকে আমার মা আমাকে কোলে নিয়ে আদর করছিলেন, কনের সাজে সাজিয়ে দিচ্ছিলেন এবং মধুর চুম্বনে ভরিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন ভবিষ্যতের নাতি-নাতনিদের। ঠিক সেই সুখের মুহূর্তে—একদল সশস্ত্র দস্যু খোলা তলোয়ার হাতে ঝড়ের বেগে আমাদের ঘরে ঢুকে পড়ল। তারা কোনো জিনিসপত্র নিতে আসেনি। সোজা আমাদের ঘরে ঢুকে মায়ের কোল থেকে আমাকে জোর করে ছিনিয়ে নিল। ভয়ে কেউ তাদের বাধা দেওয়ার সাহস পেল না।
পৌরাণিক হিপ্পোডামিয়া ও পেরিথুসের বিয়ের মতো আমার বিয়েও ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
কিন্তু শোনো মা, আমার দুর্ভাগ্যের এখানেই শেষ নয়। একটু আগে আমি এক ভয়ংকর স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম, আমাকে আমার বাড়ি, আমার ঘর এবং আমার বিছানা থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করা হচ্ছে। আমি এক অজানা নির্জন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছি আর আমার স্বামীর নাম ধরে ডাকছি।
ওদিকে আমার স্বামী—যে কিনা তখনও সুগন্ধি মেখে, বরের মালা গলায় পরে বিয়ের অপেক্ষায় ছিল—সে যখন জানল আমাকে অপহরণ করা হয়েছে, তখন সে আমার পায়ের ছাপ ধরে পাগলের মতো খুঁজতে শুরু করল। সে মানুষের কাছে সাহায্য চেয়ে চিৎকার করছিল।
সে যখন আমাকে খুঁজছিল, তখন চোরদের একজন রেগে গিয়ে তার পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটি পাথর তুলে নিল এবং আমার স্বামীর দিকে সজোরে ছুঁড়ে মারল। সেই আঘাতেই সে মারা গেল!
এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখেই আমি আঁতকে উঠেছি। এই দুঃস্বপ্নই আমাকে বলে দিচ্ছে যে আমার সব শেষ।”
বৃদ্ধার আশ্বাস ও গল্পের সূচনা
বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বাছা আমার, সাহস রাখো। এই সব মিথ্যা আর অদ্ভুত স্বপ্নে ভয় পেও না। দিনের বেলার স্বপ্ন যেমন মিথ্যে হয়, তেমনি রাতের স্বপ্নও অনেক সময় উল্টো ফল দেয়।
স্বপ্নে কান্না, মারধর বা হত্যা দেখা আসলে সৌভাগ্য ও শুভ পরিবর্তনের লক্ষণ। উল্টোদিকে স্বপ্নে হাসি, আনন্দ বা ভোজ দেখা দুঃখ, অসুস্থতা বা ক্ষতির ইঙ্গিত দেয়।
সুতরাং শান্ত হও। তোমার মন ভালো করার জন্য আমি তোমাকে একটি চমৎকার গল্প বলব। গল্পটি তোমার সব দুঃখ ভুলিয়ে দেবে এবং তোমার প্রাণে নতুন আশার সঞ্চার করবে।”
এই বলে বৃদ্ধা তার গল্প শুরু করল।
কিউপিড ও সাইকের পরিণয়
দ্বাবিংশ অধ্যায়
কিউপিড এবং সাইকের বিবাহের পরম আনন্দদায়ক ও মনোহর উপাখ্যান।
একদা পশ্চিম দেশে এক রাজা রাজত্ব করতেন। তাঁর মহীয়সী রানীর গর্ভে তিন পরম সুন্দরী কন্যা জন্মগ্রহণ করেছিল। জ্যেষ্ঠা ও মধ্যমা কন্যা এতটাই রূপবতী ছিলেন যে, তাঁরা জীবিত সকল নারীকে অতিক্রম করেছিলেন এবং সর্বজনীন প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। কিন্তু কনিষ্ঠা কন্যার রূপলাবণ্য এবং কুমারীসুলভ গরিমা এতটাই অসাধারণ ছিল যে, পৃথিবীর কোনো মরণশীল প্রাণীর পক্ষে ভাষার মাধ্যমে তা প্রকাশ করা বা বর্ণনা করা ছিল অসম্ভব।
এই অপরূপ কুমারীর খ্যাতি নগরীর প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ল। স্বদেশী নাগরিক এবং আগন্তুক বিদেশীরা দলে দলে তাঁর সেই অলৌকিক রূপ দর্শনে পিতার প্রাসাদে ভিড় জমাতে লাগল। তাঁর অতুলনীয় সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে তারা প্রাচীন রীতিনীতি মেনে তাঁকে দেবী ভেনাসের মতোই পূজা ও শ্রদ্ধা করতে শুরু করল।
শীঘ্রই পার্শ্ববর্তী শহর ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এই জনশ্রুতি ছড়িয়ে পড়ল যে, সমুদ্রসম্ভবা এবং তরঙ্গ-লালিতা স্বয়ং দেবী ভেনাস এখন মর্ত্যলোকে বিচরণ করছেন। অথবা আকাশ ও গ্রহমন্ডলীর এক নতুন সংযোগে কুমারীত্বের পুষ্পে শোভিত এক নবীন ভেনাসের জন্ম হয়েছে।
ভেনাসের ঈর্ষা ও ক্রোধ
দিন দিন এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হতে লাগল। তাঁর খ্যাতি নিকটবর্তী দ্বীপপুঞ্জ ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। অসংখ্য মানুষ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, সমুদ্রের বিপদ তুচ্ছ করে এই মহিমান্বিত কুমারীকে একনজর দেখতে এল। এর ফলে দেবী ভেনাসের প্রতি মানুষের ভক্তি হ্রাস পেল।
প্যাফোস, গ্নিডোস বা সাইথেরা—কোথাও আর কেউ দেবীর পূজার জন্য যেত না। তাঁর মন্দিরগুলো পরিত্যক্ত হলো, বিগ্রহগুলো মুকুটহীন হয়ে পড়ল এবং বেদিগুলো পুরনো বলিদানের ছাইয়ে অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়ে রইল। ভেনাসের পরিবর্তে মানুষ এখন এই কুমারীকেই পূজা করতে লাগল। প্রত্যুষে তাঁর দর্শনের জন্য তারা পুষ্পমাল্য অর্পণ করত এবং তাঁকেই ভেনাস জ্ঞানে আরাধনা করত।
স্বর্গীয় সম্মানের এই আকস্মিক পরিবর্তন দেবী ভেনাসের ক্রোধাগ্নি প্রজ্জ্বলিত করল। তিনি ক্রোধ সংবরণ করতে না পেরে রাগে ফুঁসতে লাগলেন এবং মনে মনে বললেন:
“বিশ্বের আদি জননী হয়ে আজ আমাকে এক মরণশীল মানবীর সাথে সম্মান ভাগ করে নিতে হচ্ছে! প্যারিস আমাকে সৌন্দর্যের দেবী হিসেবে যে রায় দিয়েছিল, তা কি তবে বৃথা? যে-ই হোক এই স্পর্ধা দেখিয়েছে, তাকে অচিরেই তার এই অবৈধ অবস্থার জন্য অনুতপ্ত হতে হবে।”
তৎক্ষণাৎ তিনি তাঁর পক্ষীরাজ পুত্র কিউপিডকে তলব করলেন। এই যুবক স্বভাবতই দুর্মুখ ও দুঃসাহসী; যে নিজের খেয়ালে আইন ও বিচারকে তোয়াক্কা করে না। হাতে ধনুক ও অগ্নিশলাকা নিয়ে সে রাতের আঁধারে মানুষের ঘরে হানা দেয় এবং পবিত্র বিবাহবন্ধন কলুষিত করে।
ভেনাস তাকে সাইকের (সেই কুমারীর নাম) কাছে নিয়ে গেলেন এবং ক্রোধোন্মত্ত হয়ে বললেন, “বৎস, মাতৃস্নেহের দোহাই! তোমার তীরের আঘাতে এবং তোমার অগ্নির উত্তাপে এই মরণশীল কুমারীর গর্ব চূর্ণ করো। আমি চাই, সে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট, কুৎসিত এবং জঘন্যতম প্রাণীর প্রেমে পড়ে—যার দুর্দশার কোনো তুলনা নেই।”
এই বলে তিনি পুত্রকে চুম্বন করে সমুদ্রের দিকে যাত্রা করলেন।
সমুদ্রযাত্রা এবং সাইকের নিঃসঙ্গতা
সমুদ্রতীরে পৌঁছাতেই দেব-দেবীরা তাঁর সেবায় উপস্থিত হলেন। নেরিউসের কন্যারা সুমধুর কণ্ঠে গান গাইতে গাইতে এল। রুক্ষ দাড়িওয়ালা পোরটুনাস, মাছভর্তি বক্ষ নিয়ে স্লাসিয়া, ডলফিন চালক প্যালেমন এবং শঙ্খবাদক ট্রাইটন—সকলেই ভেনাসের অনুগামী হয়ে সমুদ্রের দিকে অগ্রসর হলো।
এদিকে সাইকি তার সমস্ত রূপলাবণ্য নিয়ে নিঃসঙ্গ দিন কাটাচ্ছিল। সবাই তার প্রশংসা করত, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত, কিন্তু কোনো রাজা বা রাজপুত্র তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিল না। সবাই তাকে দেখত যেন সে এক সুন্দর চিত্রিত প্রতিমা।
তার দুই দিদি, যাদের রূপ সাধারণ মানের, তারা রাজকীয় পরিবারে বিবাহিত হয়ে সুখে দিন কাটাচ্ছিল। কিন্তু কুমারী সাইকি পিতৃগৃহে একা বসে নিজের এই অমানবিক রূপকে ঘৃণা করতে লাগল, যা সারা বিশ্বকে আনন্দ দিলেও তাকে কেবল একাকীত্বই উপহার দিয়েছে।
কন্যার এই দুর্ভাগ্যে পিতা শঙ্কিত হলেন। তিনি ভাবলেন, নিশ্চয়ই দেবতারা তাঁর ওপর রুষ্ট হয়েছেন। তাই তিনি মিলেট শহরে অ্যাপোলোর মন্দিরে গেলেন এবং কন্যার জন্য বরের প্রার্থনা করলেন। অ্যাপোলো গ্রিক এবং আইওনিয়ার অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও ল্যাটিন শ্লোকে উত্তর দিলেন, যার মর্মার্থ ছিল নিম্নরূপ:—
সাইকেসের দেহ শোকের পোশাকে আবৃত হোক,
এবং সেই পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপন করা হোক:
তার স্বামী কোন মানব বীজ নয়,
কিন্তু ভয়ঙ্কর এবং হিংস্র সর্প যেমনটি ভাবা যেতে পারে।
যে ডানার সাহায্যে তারাময় আকাশে উড়ে বেড়ায়,
এবং অগ্নিময় উড়ানে সবকিছু বশ করে।
দেবতারাও, এবং যারা জ্ঞানী বলে মনে হয়,
মহাশক্তিমান জুপিটারের সাথে, তার শক্তির অধীন,
কালো নদী, এবং মৃত্যুর যন্ত্রণার বন্যা
এবং অন্ধকারও, তার দাসত্বে থাকে।
রাজা অ্যাপোলোর ভবিষ্যদ্বাণী শুনে বিষাদগ্রস্ত ও শোকার্ত হৃদয়ে প্রাসাদে ফিরলেন। তিনি রানীর কাছে কন্যার এই দুর্ভাগ্যজনক পরিণতির কথা জানালেন। এ কথা শুনে রানী বিলাপ করতে শুরু করলেন এবং তাঁরা অনেক দিন গভীর শোকে কাটালেন।
কিন্তু নিয়তির বিধান অলঙ্ঘনীয়। সাইকের বিবাহের লগ্ন ঘনিয়ে এল। চারদিকে প্রস্তুতি শুরু হলো। কিন্তু এই প্রস্তুতি ছিল যেন কোনো শোকযাত্রার আয়োজন। শুভ্র মশালের পরিবর্তে কালো মশাল জ্বালানো হলো। আনন্দময় বিবাহের গীত করুণ বিলাপের সুরে রূপান্তরিত হলো। হাইমেনিউসের বাদ্য বাজল শোকাবহ আর্তনাদের মতো। যে বধূ ঘোমটা দিয়ে মুখ ঢাকার কথা, সে অশ্রু মুছতে ব্যস্ত। পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে নগরবাসী—সকলেই কাঁদছিল।
তবুও দৈববাণী পালনের বাধ্যবাধকতায় সাইকেকে তার নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া হলো। অনুষ্ঠান শেষে এই দুঃখিনী বধূকে বিবাহের পালঙ্ক নয়, বরং তার অন্তিম শয্যা ও সমাধির উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হলো। যখন তার পিতা-মাতা শোকাতুর হৃদয়ে এগিয়ে আসছিলেন, তখন সাইকি তাঁদের সান্ত্বনা দিয়ে বলল:
“বাবা-মা, কেন আপনারা এই বার্ধক্যে অবিরাম দুঃখ দিয়ে নিজেদের জর্জরিত করছেন? কেন নিজেদের আত্মাকে কষ্ট দিচ্ছেন, যা আমার চেয়েও আপনাদের বেশি প্রয়োজন? কেন আপনারা অশ্রু দিয়ে আপনাদের পবিত্র মুখমণ্ডল মলিন করছেন, যা আমার কাছে পূজনীয়?
কেন আপনারা আপনাদের শুভ্র কেশ ছিড়ছেন? কেন আমার জন্য বুকে আঘাত করছেন? আজ আপনারা আমার সেই অসাধারণ রূপের নির্মম পুরস্কার দেখতে পাচ্ছেন। আজ আপনারা ঈর্ষার অভিশাপ বুঝতে পারছেন, কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
যখন মানুষ আমাকে সম্মান করত, আমাকে ‘নবীন ভেনাস’ বলে ডাকত, তখনই আপনাদের কাঁদা উচিত ছিল। তখনই শোক করা উচিত ছিল যে আমি মরে গেছি। কারণ আজ আমি বুঝতে পারছি, কেবল ভেনাস নামের কারণেই আমার এই দুর্দশা।
আমাকে নিয়ে চলুন। নিয়তি যেভাবে নির্ধারণ করেছে, আমাকে সেই পাহাড়ের চূড়ায় রেখে আসুন। আমি আমার এই অদ্ভুত বিবাহ সম্পন্ন করতে চাই। আমি আমার স্বামীকে দেখার জন্য উদগ্রীব। কেন আর দেরি করছি? যে সারা বিশ্বকে ধ্বংস করার জন্য নির্ধারিত, তাকে আমি কেন প্রত্যাখ্যান করব?”
এই বলে সে তার বক্তব্য শেষ করল এবং শোকাতুর জনতার ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল। তাকে পাহাড়ের চূড়ায় নির্দিষ্ট পাথরের ওপর রেখে আসা হলো। চোখের জলে মশাল নিভে গেল। সবাই ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঘরে ফিরল। শোকে মুহ্যমান পিতা-মাতা চিরকালের জন্য নিজেদের অন্ধকারের অন্তরালে সমর্পণ করলেন।
এভাবে হতভাগ্য সাইকি জনহীন পাহাড়ের চূড়ায় একা পড়ে রইল। ভয়ে ও শোকে সে কাঁপছিল। এমন সময় মৃদুমন্দ বাতাস এবং তীক্ষ্ণ জেফাইরাস (পশ্চিমের বাতাস) তাকে আলতো করে শূন্যে ভাসিয়ে নিল। তার পোশাক বাতাসের টানে ফুলে উঠল এবং বাতাস তাকে পরম যন্ত্নে এক গভীর উপত্যকায় নামিয়ে আনল। সেখানে সুগন্ধি ফুলের বিছানায় তাকে শুইয়ে দেওয়া হলো।
রহস্যময় প্রাসাদ ও অদৃশ্য সেবা
কোমল ঘাস ও সুগন্ধি ফুলের শয্যায় শুয়ে সাইকি তার মনের উদ্বেগ ও ক্লান্তি ভুলে গেল। এক প্রশান্তিময় ঘুমে সে আচ্ছন্ন হলো। ঘুম থেকে উঠে সে নিজেকে বেশ সতেজ অনুভব করল। তার মন তখন অনেক শান্ত।
উঠে দাঁড়িয়ে সে সামনে এক বিশাল অরণ্য দেখতে পেল, যা সুউচ্চ ও মহীরুহ গাছে ঘেরা। অদূরেই স্ফটিকস্বচ্ছ এক নদীর প্রবাহ। বনের ঠিক মাঝখানে, নদীর ঝর্ণার কাছে এক অপরূপ রাজপ্রাসাদ দাঁড়িয়ে ছিল। দেখেই বোঝা যায়, এটি কোনো মানুষের হাতের কাজ নয়, বরং স্বয়ং ঈশ্বরের অলৌকিক শক্তির সৃষ্টি। স্বর্গের দেবতাদের বাসযোগ্য এক উপযুক্ত আবাস।
প্রাসাদের ওপরের খিলানগুলো ছিল সাইট্রন কাঠ ও হাতির দাঁতের তৈরি, যা সোনার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। দেয়ালগুলো ছিল রূপার পাতে মোড়ানো এবং তাতে বিভিন্ন পশুর নিখুঁত খোদাই করা চিত্র। সেগুলো এতই জীবন্ত যে মনে হচ্ছিল, প্রবেশকারীদের দিকে তারা তাকিয়ে আছে। মেঝের কারুকাজ ছিল আরও বিস্ময়কর। মূল্যবান পাথর দিয়ে তৈরি মোজাইকের ওপর এমন সব ছবি আঁকা ছিল যে, যারাই এর ওপর দিয়ে হাঁটবে, তারাই ধন্য হবে।
প্রাসাদের প্রতিটি কোণ মূল্যবান রত্ন ও সম্পদের আভায় ঝলমল করছিল। কক্ষ, বারান্দা ও দরজাগুলো সূর্যের মতো উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে দিচ্ছিল। সত্যিই, এটি ছিল স্বয়ং জুপিটারের যোগ্য এক স্বর্গীয় প্রাসাদ।
সাইকি এই ঐশ্বর্য দেখে মুগ্ধ ও বিস্মিত হলো। সে সাহসে ভর করে প্রাসাদে প্রবেশ করল। দেখল, ভাণ্ডারগুলো অঢেল সম্পদে পূর্ণ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত সম্পদ রক্ষা করার জন্য কোনো পাহারাদার, তালা বা দরজার খিল ছিল না।
সে যখন এই ঐশ্বর্য দর্শনে মগ্ন, তখন এক অশরীরী কণ্ঠস্বর ভেসে এল: “ম্যাডাম, এত বিশাল সম্পদ দেখে কেন বিস্মিত হচ্ছেন? আপনি যা দেখছেন, সবই আপনার আজ্ঞাধীন। আপনি কক্ষে গিয়ে বিশ্রাম নিন, স্নান করুন। আমরা, যাদের কণ্ঠস্বর আপনি শুনছেন, সবাই আপনার অদৃশ্য দাস। আমরা আপনার সেবা করার জন্য প্রস্তুত। এর মধ্যেই আপনার জন্য রাজকীয় ভোজের আয়োজন করা হবে।”
সাইকি তখন বুঝতে পারল যে কোনো দৈবশক্তি তার সহায়। সে অদৃশ্য কণ্ঠস্বরের পরামর্শ মেনে প্রথমে বিশ্রাম নিল এবং স্নান করে শরীর সতেজ করল। এরপর সে দেখল, টেবিলভর্তি সুস্বাদু খাবার এবং বসার জন্য একটি আসন প্রস্তুত।
সে আসনে বসার পর অদৃশ্য হাতে তার সামনে স্বর্গীয় খাবার ও পানীয় পরিবেশন করা হলো। সে কোনো মানুষকে দেখতে পেল না, কেবল চারপাশ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। খাওয়ার সময় এক অদৃশ্য গায়ক গান শোনালেন, অন্যজন অদৃশ্য বীণায় সুর তুললেন। বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনায় তার মনে হলো, সে যেন এক বিশাল জনসমাবেশে বসে আছে।
অদৃশ্য স্বামী ও প্রথম মিলন
রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এলে সাইকি শয্যা গ্রহণ করল। একাকিত্ব এবং তার কৌমার্য হারানোর ভয়ে সে কিছুটা শঙ্কিত ছিল। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় সে অনুভব করল, তার অজ্ঞাত স্বামী তার পাশে এসে শুয়েছেন।
সেই রাতে তাদের বিবাহ পূর্ণতা পেল। কিন্তু ভোরের আলো ফোটার আগেই তার স্বামী অদৃশ্য হয়ে গেলেন। সকালে অদৃশ্য দাসীরা এসে তার সতীত্ব হারানোর পরিচর্যা করল এবং তাকে সান্ত্বনা দিল।
এভাবেই দিন কাটতে লাগল। নতুন এই জীবনের আনন্দ এবং অভ্যাসের বশবর্তী হয়ে সাইকি তার নিঃসঙ্গতা ভুলে গেল। বিশেষ করে অদৃশ্য বাদ্যযন্ত্রের সুর তাকে একাকিত্বের মাঝেও সঙ্গ দিত।
এদিকে তার পিতা-মাতা কন্যার শোকে কেবল কেঁদেই দিন কাটাচ্ছিলেন। তার বড় দুই বোন সাইকের এই করুণ পরিণতির কথা শুনে পিতা-মাতাকে সান্ত্বনা দিতে প্রাসাদে এল।
স্বামীর সতর্কবাণী ও বোনেদের আগমন
পরের রাতে, সাইকের স্বামী তাকে নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে (সাইকি তার উপস্থিতি স্পর্শ ও শ্রবণের মাধ্যমে অনুভব করতে পারত) বললেন:
“ও আমার মিষ্টি স্ত্রী, আমার প্রিয়তমা! নিয়তি তোমার জন্য এক আসন্ন বিপদ ডেকে আনছে। আমি তোমাকে সাবধান করছি—তোমার বোনেরা মনে করছে তুমি মারা গেছ। তারা শোকাহত হয়ে তোমার খোঁজে ওই পাহাড়ের দিকে আসছে। যদি তুমি তাদের কান্নার শব্দ শুনতে পাও, তবে সাবধান! কোনোভাবেই তাদের ডাকে সাড়া দিও না বা তাদের দিকে তাকাও না। যদি তা করো, তবে আমার জন্য গভীর দুঃখ এবং নিজের জন্য চরম সর্বনাশ ডেকে আনবে।”
স্বামীর কথা শুনে সাইকি প্রতিজ্ঞা করল যে সে এই আদেশ মেনে চলবে।
কিন্তু স্বামী চলে যাওয়ার পর সারা দিন সাইকি কেবল কাঁদল। সে ভাবল, এই ঐশ্বর্য আসলে এক কারাগার। সে মানুষের সঙ্গ থেকে বঞ্চিত, এমনকি তার দুঃখী বোনদের একবার দেখার বা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার অধিকারও তার নেই। সারা দিন সে অভুক্ত রইল, স্নান করল না এবং রাতেও উপবাসে কাটাল।
স্বামীর আগমনের পর সে যখন তাকে আলিঙ্গন করতে চাইল, স্বামী বললেন, “এই কি তোমার প্রতিশ্রুতির নমুনা? সারা দিন-রাত তুমি কেঁদে কাটাচ্ছ? এমনকি আমার বাহুডোরেও তোমার শান্তি নেই? বেশ, যাও! যা ইচ্ছা করো। নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে আনো। কিন্তু যখন বিপদ আসবে, তখন আমার কথা মনে কোরো। তখন অনুতাপ করলেও আর লাভ হবে না।”
সাইকি তখন স্বামীকে আঁকড়ে ধরে কাকুতি-মিনতি করতে লাগল। সে বলল, বোনদের সাথে একবার দেখা না করতে পারলে সে মরেই যাবে। অবশেষে তার স্বামী রাজি হলেন। তিনি তাকে বোনদের যত খুশি সোনাদানা দেওয়ার অনুমতিও দিলেন। কিন্তু একটি শর্ত জুড়ে দিলেন:
“সাবধান! তোমার বোনদের কুপরামর্শে প্ররোচিত হয়ে ভুলেও আমার চেহারা দেখার চেষ্টা করো না। তোমার এই কৌতূহল তোমাকে চিরকালের জন্য এই ঐশ্বর্য ও সুখ থেকে বঞ্চিত করবে।”
সাইকি আনন্দে আত্মহারা হয়ে স্বামীকে ধন্যবাদ জানাল এবং বলল, “প্রিয়তম, আপনার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেয়ে আমি মরে যাওয়া পছন্দ করব। আপনি যেই হোন না কেন, আমি আপনাকে আমার হৃদয়ে ধারণ করি—যেন আপনি আমার আত্মা বা স্বয়ং কিউপিড। কিন্তু দয়া করে আপনার দাস জেফাইরাসকে আদেশ দিন, সে যেন আমার বোনদের ওই পাহাড় থেকে এই উপত্যকায় নিয়ে আসে।”
এই বলে সে স্বামীকে মিষ্টি চুম্বনে ভরিয়ে দিল। তার আদরে স্বামী বিগলিত হলেন এবং তার অনুরোধ মঞ্জুর করলেন। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
বোনেদের মিলন
অনেক খোঁজাখুঁজির পর সাইকের বোনেরা সেই পাহাড়ে এসে পৌঁছাল, যেখানে তাকে ফেলে যাওয়া হয়েছিল। তারা সাইকের নাম ধরে এত জোরে চিৎকার করে ডাকল যে পাথরের গায়ে সেই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো।
তাদের করুণ আর্তনাদ সাইকের কানে পৌঁছাল। সে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এসে বলল, “দেখো, যার জন্য তোমরা কাঁদছ, সে এখানেই আছে। আর কেঁদো না। তোমাদের দুঃখের অবসান হয়েছে।”
তৎক্ষণাৎ সে জেফাইরাসকে আদেশ দিল বোনদের নিচে নামিয়ে আনতে। মৃদুমন্দ বাতাসে ভেসে তারা নিরাপদে উপত্যকায় নেমে এল। তিন বোনের সেই মিলনের দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। আলিঙ্গন আর আনন্দাশ্রুর বন্যায় সব দুঃখ ধুয়ে গেল।
সাইকি বলল, “এসো, আমার বাড়িতে এসো। তোমাদের বোনের সাথে এই সুখের মুহূর্তে শামিল হয়ে তোমাদের মনকে সতেজ করো।”
সাইকি তার বোনদের সম্পদের ভাণ্ডার দেখাল এবং তাদের সেই অদৃশ্য দাসদের কণ্ঠস্বর শোনাল, যারা তাকে সেবা করত। তাদের জন্য স্নান ও রাজকীয় ভোজের আয়োজন করা হলো। বোনদের হৃদয়ে তখন প্রবল ঈর্ষার আগুন জ্বলে উঠল। তাদের একজন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোমার স্বামী কে? তিনি দেখতে কেমন? এমন বিশাল ঐশ্বর্যের মালিক কে?”
সাইকি স্বামীর প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যায়নি। তাই সে মিথ্যা বলল যে, তার স্বামী এক সুদর্শন যুবক, যার মুখে সোনালি দাড়ি এবং তিনি পাহাড়ে শিকার করতে ভালোবাসেন। পাছে বেশি কথা বলতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়, তাই সে তাদের কোলে প্রচুর সোনাদানা ও গয়না ভরে দিয়ে জেফাইরাসকে আদেশ দিল তাদের পৌঁছে দিতে।
পাহাড়ে ফিরে বোনেরা নিজেদের বাড়ির পথ ধরল। পথে যেতে যেতে সাইকির প্রতি তাদের ঈর্ষা বিষের মতো উগড়ে দিতে লাগল।
একজন বলল, “ভাগ্য কী নিষ্ঠুর! আমরা একই মা-বাবার সন্তান, অথচ আমাদের কপাল কত ভিন্ন! আমরা বড় দুই বোন ভিনদেশি স্বামীদের ঘরে দাসীর মতো আছি। আর ছোট বোনটা, যার কোনো যোগ্যতা নেই, সে কিনা এক দেবতাকে বিয়ে করে সম্পদের পাহাড়ে বসে আছে! দেখেছিস বোন, ওর বাড়িতে কত মণি-মুক্তা, কত সোনা? ও যদি সত্যিই কোনো দেবতার ঘর করে, তবে এই পৃথিবীতে ওর চেয়ে সুখী আর কেউ নেই। হয়তো একদিন ওর স্বামী ওকে দেবীও বানিয়ে দেবে!”
দ্বিতীয় বোন বিলাপ করে বলল, “আর আমি হতভাগী! আমার স্বামী বাবার বয়সী, মাথায় টাক আর শিশুর মতো দুর্বল। সে আমাকে সারাদিন ঘরে তালা দিয়ে রাখে।”
প্রথম বোন যোগ করল, “আর আমার স্বামী? গেঁটে বাতে পঙ্গু, কুঁজো আর কৃপণ। স্বামীর সোহাগ তো দূরের কথা, তার ওই বাঁকা আঙুলগুলোতে তেল মালিশ আর পটিতে ওষুধ লাগাতে লাগাতেই আমার দিন যায়। আমি যেন স্ত্রী নই, এক সেবিকা!
আমি কিছুতেই ওই ছোট বোনটার এমন বাড়বাড়ন্ত সহ্য করতে পারছি না। দেখেছিস, সে আমাদের সাথে কেমন অহংকারী আচরণ করল? যেন দয়া করে আমাদের কোলে কিছু সোনা ছুঁড়ে দিল আর বাতাস দিয়ে তাড়িয়ে দিল! আমি যদি নারী হই, তবে আমি ওর সব সুখ কেড়ে নেব। আমরা কাউকে বলব না যে তাকে দেখেছি। যার সম্পদ অজানা, তাকে কেউ সুখী মনে করে না। চলো, আমরা এর প্রতিশোধ নিই।”
দুই কুটিল বোন ষড়যন্ত্র এঁটে নিজের নিজের বাড়ি ফিরে গেল। মা-বাবার কাছে সাইকির সুখের কথা গোপন করে তারা মিথ্যা কান্নাকাটি শুরু করল, যাতে মা-বাবার দুঃখ আরও বেড়ে যায়।
কিউপিডের সতর্কবাণী ও আসন্ন বিপদ
এদিকে কিউপিড রাতে সাইকিকে আবারও সতর্ক করলেন, “ভাগ্য তোমার জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনছে। ওই বিশ্বাসঘাতক শয়তানরা তোমাকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো তোমাকে আমার মুখ দেখানো। আর আমি আগেও বলেছি, যদি একবার আমার মুখ দেখো, তবে আর কোনোদিন আমাকে পাবে না।
যদি ওই ডাইনিরা আবার আসে—এবং তারা আসবেই—তবে তাদের সাথে কোনো কথা বলো না। আর যদি কথা বলতেই হয়, তবে সাবধান! আমার সম্পর্কে একটি শব্দও উচ্চারণ করবে না। জেনো রেখো, আমাদের বংশবৃদ্ধির সময় এসেছে। তোমার গর্ভে এখন যে সন্তান বেড়ে উঠছে, যদি তুমি আমার কথা মেনে চলো তবে সে হবে এক অমর দেবতা। আর যদি অবাধ্য হও, তবে সে হবে সাধারণ মরণশীল মানুষ।”
সাইকি আনন্দে আত্মহারা হলো। সে এক ঐশ্বরিক সন্তানের মা হতে চলেছে—এই ভাবনায় সে গর্বিত বোধ করল।
কিন্তু সেই দুই বোন—যাদের নিঃশ্বাসে বিষ—তারা আবার সাইকির সর্বনাশের জন্য ফিরে এল। কিউপিড ব্যাকুল হয়ে বললেন, “সাইকি, চূড়ান্ত সময় উপস্থিত! তোমার নিজের বোনেরা তলোয়ার উঁচিয়ে তোমাকে হত্যা করতে আসছে। আমাদের সন্তানের দোহাই, ওদের কথা শুনো না। ওরা বোন নামের কলঙ্ক। সাইরেনদের মতো ওরা পাহাড়ে এসে মায়াবী কান্না কাঁদবে, কিন্তু তুমি তাতে ভুলো না।”
সাইকি কেঁদে বলল, “প্রিয়তম, এতদিনে কি আমার ভালোবাসার প্রমাণ পাওনি? আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমি তোমার আদেশ মানব। কিন্তু জেফাইরাসকে বলো, সে যেন একবার আমার বোনদের নিয়ে আসে। তোমার মুখ দেখার তৃষ্ণা আমি ওদের মুখ দেখেই মেটাব। তোমার এই সুন্দর চুল, তোমার কোমল গাল আর উষ্ণ আলিঙ্গনের দোহাই—আমাকে এইটুকু অনুমতি দাও। তুমিই আমার আলো, আমি অন্ধকারকে ভয় পাই না।”
সাইকির কান্না আর আদরে কিউপিড গলে গেলেন। তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনুমতি দিলেন এবং ভোরে চলে গেলেন।
বোনদের দ্বিতীয় আগমন ও ভয়ংকর মিথ্যা
বোনেরা পাহাড়ে এসে কান্নাকাটি শুরু করল। সাইকি তাদের কান্না সইতে না পেরে জেফাইরাসকে দিয়ে তাদের নামিয়ে আনল। বোনেরা এসেই সাইকিকে জড়িয়ে ধরল এবং মিষ্টি কথায় তাকে ভোলাতে লাগল।
“ওহ প্রিয় সাইকি! তুমি এখন আর ছোটটি নও, তুমি মা হতে চলেছ! আমাদের জন্য কী খুশির খবর! তোমার সন্তান নিশ্চয়ই কিউপিডের মতোই সুন্দর হবে।”
ক্লান্ত বোনেরা স্নান ও ভোজ সেরে আবার তাদের আসল রূপে ফিরল। তারা সুকৌশলে সাইকির স্বামীর পরিচয় জানতে চাইল। সরলমনা সাইকি আগের মিথ্যে কথা ভুলে গিয়ে বলল, তার স্বামী একজন মাঝবয়সী বণিক, যার চুলে পাক ধরেছে।
এই অসঙ্গতি শুনে বোনেরা বুঝে গেল যে সাইকি তার স্বামীকে কখনো দেখেইনি। ফেরার পথে তারা বলাবলি করতে লাগল, “প্রথমে বলল তরুণ, এখন বলছে বুড়ো! তার মানে ও নিশ্চিত কোনো দেবতাকে বিয়ে করেছে। যদি ওর পেটে দেবতার সন্তান থাকে, তবে আমি ঈর্ষায় গলায় দড়ি দেব! চলো, এমন কিছু করি যাতে ওর সব সুখ ছাই হয়ে যায়।”
তারা তৃতীয়বার ফিরে এসে ভয়ংকর এক মিথ্যে ফাঁদ পাতল। তারা সাইকিকে বলল, “হায় বোন! তুই তো জানিস না তুই কী মহাবিপদে আছিস! আমরা বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পেয়েছি যে, তোর স্বামী কোনো মানুষ নয়। সে এক বিশাল বিষধর সাপ! অ্যাপোলোর ভবিষ্যদ্বাণী মনে আছে? তোকে এক পশুর সাথে বিয়ে দেওয়া হবে।
গ্রামবাসীরা দেখেছে, প্রতি রাতে এক বিশাল সাপ নদী পার হয়ে তোর কাছে আসে। সে তোকে এখন সুস্বাদু খাবার খাওয়াচ্ছে বটে, কিন্তু সন্তান প্রসবের সময় হলেই সে তোকে আর তোর বাচ্চাকে গিলে খাবে। এখন তুই ঠিক কর—আমাদের কথা শুনে বাঁচবি, নাকি সাপের পেটে যাবি?”
সাইকির বিভ্রান্তি ও হত্যার ষড়যন্ত্র
সরল সাইকি ভয়ে দিশেহারা হয়ে গেল। স্বামীর সতর্কবাণী ভুলে সে বোনদের কাছে বাঁচার উপায় জানতে চাইল।
বোনেরা বলল, “শোন, একটা ধারালো ক্ষুর আর একটা প্রদীপ লুকিয়ে রাখ। রাতে যখন ওই ‘সাপ’ গভীর ঘুমে থাকবে, তখন প্রদীপ জ্বেলে ক্ষুর দিয়ে এক কোপে ওর মাথা কেটে ফেলবি। তারপর আমরা তোকে এখান থেকে নিয়ে গিয়ে ভালো কোনো মানুষের সাথে বিয়ে দেব।”
বিষাক্ত পরামর্শ দিয়ে বোনেরা পালিয়ে গেল। সাইকি একা পড়ে রইল, কিন্তু তার মনের ভেতর তখন হাজারও দ্বন্দ্ব। সে একবার স্বামীকে ভালোবাসে, পরক্ষণেই পশুকে ঘৃণা করে। সে একবার সাহসী হয়, পরক্ষণেই ভয়ে কুঁকড়ে যায়।
অবশেষে রাত নামল। কিউপিড এসে ঘুমিয়ে পড়লেন। সাইকি কাঁপা হাতে প্রদীপ আর ক্ষুর নিয়ে বিছানার কাছে গেল।
কিন্তু হায়! আলো পড়তেই সে দেখল কোনো সাপ নয়, বিছানায় শুয়ে আছেন স্বয়ং প্রেমের দেবতা কিউপিড! তাঁর সোনালি চুল, দুগ্ধশুভ্র ত্বক আর বেগুনি আভাযুক্ত গাল দেখে প্রদীপের আলোও যেন ম্লান হয়ে গেল। তাঁর কাঁধের ডানাগুলো ফুলের মতো কাঁপছিল।
সাইকি অনুতাপে দগ্ধ হলো। সে নিজের বুকে ক্ষুর বসিয়ে দিতে চাইল, কিন্তু হাত থেকে তা পড়ে গেল। সে কিউপিডের তীর থেকে একটি নিয়ে আঙুলে ছোঁয়াল। তীরের আঘাতে সে কিউপিডের প্রেমে নতুন করে উন্মাদ হলো। সে ঘুমন্ত স্বামীকে পাগলের মতো চুম্বন করতে লাগল।
কিন্তু বিধিবাম! উত্তেজনায় তার হাত কেঁপে প্রদীপের এক ফোঁটা গরম তেল কিউপিডের কাঁধে পড়ে গেল।
কিউপিডের বিদায় ও সাইকির বিলাপ
ব্যথায় কিউপিড জেগে উঠলেন। সাইকির হাতে ক্ষুর আর বিশ্বাসঘাতকতা দেখে তিনি কোনো কথা না বলে ডানা মেলে উড়ে গেলেন। সাইকি তাঁর পা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করল এবং শূন্যে ঝুলে রইল। কিন্তু ক্লান্ত হয়ে সে মাটিতে পড়ে গেল।
কিউপিড একটি সাইপ্রেস গাছের ডালে বসে বললেন, “ওরে অবলা সাইকি! আমি মায়ের আদেশ অমান্য করে তোকে ভালোবেসেছিলাম। আমি তোকে দেবীর সম্মান দিতে চেয়েছিলাম, আর তুই আমাকে পশু ভেবে হত্যা করতে চাস? তোকে আমি বারবার সাবধান করেছিলাম। তোর শাস্তির জন্য আমার বিচ্ছেদই যথেষ্ট।”
কিউপিড উড়ে গেলেন। সাইকি নদীর জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করল। কিন্তু নদী দেবতা কিউপিডের ভয়ে তাকে ডুবতে না দিয়ে তীরে ফুলশয্যায় ভাসিয়ে দিলেন।
সেখানে প্যান দেবতা সাইকিকে সান্ত্বনা দিলেন এবং কিউপিডের আরাধনা করার পরামর্শ দিলেন।
প্রতিশোধ ও প্রায়শ্চিত্ত
সাইকি ঘুরতে ঘুরতে তার এক বোনের শহরে পৌঁছাল। সে বোনকে বলল, “কিউপিড আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি বলেছেন, তিনি তোমাকেই বিয়ে করবেন।”
লোভী বোন কিউপিডের স্ত্রী হওয়ার আশায় পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিল। কিন্তু জেফাইরাস তাকে ধরল না। সে পাথরের ওপর আছড়ে পড়ে মারা গেল। একইভাবে সাইকি দ্বিতীয় বোনেরও বিনাশ ঘটাল।
এরপর সাইকি দেশ-বিদেশ ঘুরে তার স্বামীকে খুঁজতে লাগল।
এদিকে এক গাংচিল (Seagull) ভেনাসের কাছে খবর পৌঁছে দিল যে, কিউপিড পুড়ে গিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় আছেন এবং তিনি সাইকি নামের এক মানবীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন। ভেনাস রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। তিনি চিৎকার করে বললেন, “সাইকি? সেই মেয়েটি, যে আমার রূপের বড়াই করত? আমার ছেলেও তার ফাঁদে পড়ল?”
ভেনাস ছেলেকে প্রাসাদে বন্দী করলেন এবং সাইকিকে খুঁজে বের করার জন্য মার্কারিকে (দেবতাদের দূত) নির্দেশ দিলেন। মার্কারি সারা বিশ্বে ঘোষণা করে দিলেন—যে সাইকির খোঁজ দিতে পারবে, তাকে ভেনাস সাতটি চুমু পুরস্কার দেবেন।
সাইকি তখন বুঝতে পারল তার পালানোর পথ নেই। সে নিজেই ভেনাসের কাছে ধরা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
মার্কারির ঘোষণা সাইকির সমস্ত দ্বিধা দূর করে দিল। সে স্বেচ্ছায় ভেনাসের প্রাসাদে উপস্থিত হলো। তাকে দেখামাত্র ভেনাসের দাসী কাস্টম (অভ্যাস) চিৎকার করে বলল, “ওরে দুষ্টু মেয়ে! অবশেষে বুঝতে পেরেছিস তোর একজন মালকিন আছে? তুই জানিস না তোকে খুঁজতে আমরা কতটা কষ্ট করেছি? তুই এখন নরকের গহ্বরে এসেছিস এবং তোর স্পর্ধার উপযুক্ত শাস্তি পাবি।”
এই বলে সে সাইকিকে চুল ধরে টেনে ভেনাসের সামনে নিয়ে গেল।
সাইকিকে দেখে ভেনাস অট্টহাসি দিলেন। ক্রোধে মাথা নেড়ে এবং কান চুলকাতে চুলকাতে তিনি বললেন, “ওরে দেবী! অবশেষে তুই তোর স্বামীকে দেখতে এসেছিস? যার প্রাণ তোর জন্য ওষ্ঠাগত? চিন্তা করিস না, আমি তোর সাথে ঠিক তেমন আচরণই করব, যেমন একজন শাশুড়ি তার পুত্রবধূর সাথে করে।”
এরপর তিনি তাঁর দুই দাসী—’দুঃখ’ (Sorrow) ও ‘বিষাদ’ (Sadness)-কে ডাকলেন। তাদের আদেশ দিলেন সাইকিকে নির্মমভাবে প্রহার করতে। তারা সাইকিকে চাবুক দিয়ে মেরে রক্তাক্ত করে আবার ভেনাসের সামনে হাজির করল।
ভেনাস বিদ্রূপ করে বললেন, “ও! তুই ভেবেছিস তোর ওই বড় পেট দেখিয়ে আমার দয়া পাবি? আমাকে দাদি বানাবি? আমি কি এতই সৌভাগ্যবতী যে আমার যৌবনকালে আমাকে ‘দাদি’ বলা হবে? আর এক নিচু বেশ্যার ছেলেকে ভেনাসের নাতি বলা হবে?
তবে তাকে আমার ছেলে বলাই ভুল। কারণ এই বিয়ে ছিল অসম, সাক্ষীহীন এবং অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া। সুতরাং এই বিয়ে অবৈধ এবং তোর গর্ভের সন্তান জারজ।”
এই বলে ভেনাস সাইকির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তার পোশাক ছিঁড়ে, চুল ধরে টেনে তাকে মাটিতে আছড়ে ফেললেন।
তারপর তিনি গম, যব, পোস্ত দানা, মটর, মসুর এবং শিম মিশিয়ে এক বিশাল শস্যের স্তূপ তৈরি করলেন। সাইকিকে আদেশ দিলেন, “তুই তো তোর প্রেমিকের মন পেতে দাসীবৃত্তি ছাড়া আর কোনো উপায় জানিস না। তাই দেখি তোর যোগ্যতা কতটুকু। সূর্যাস্তের আগে এই স্তূপ থেকে প্রতিটি শস্য আলাদা করে সাজিয়ে রাখবি।”
সাইকি হতভম্ব হয়ে বসে রইল। এই অসম্ভব কাজ করার চেষ্টা করাও বৃথা। কিন্তু একটি ছোট পিঁপড়ে তার এই অসহায় অবস্থা দেখে দয়া পরবশ হলো। সে তার সঙ্গীদের ডেকে বলল, “ওহে মাটির সন্তানরা! এই দুর্ভাগা মেয়েটি কিউপিডের বাগদত্তা। এর জীবন বিপন্ন। এসো, আমরা একে সাহায্য করি।”
মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার পিঁপড়ে এসে শস্যগুলো আলাদা করে দিল এবং কাজ শেষ করে দ্রুত মিলিয়ে গেল।
রাতে ভোজসভা থেকে ফিরে ভেনাস দেখলেন কাজ শেষ। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, “এটা তোর কাজ নয়। এটা তার কাজ, যে তোকে ভালোবাসে।” তারপর তিনি সাইকিকে এক টুকরো শুকনো রুটি খেতে দিয়ে শুতে গেলেন।
এদিকে কিউপিডকেও প্রাসাদের একটি সুরক্ষিত কক্ষে বন্দী করে রাখা হয়েছিল, যাতে প্রেমিক যুগল একে অপরের সাথে দেখা করতে না পারে।
দ্বিতীয় পরীক্ষা: স্বর্ণমেষের পশম সংগ্রহ
পরদিন সকালে ভেনাস সাইকিকে ডেকে বললেন, “ওই যে নদী পার হয়ে দূরে জঙ্গল দেখছিস? ওখানে কিছু স্বর্ণমেষ (Golden Sheep) চরে বেড়ায়। তাদের কোনো রাখাল নেই। যা, গিয়ে তাদের কিছু পশম নিয়ে আয়।”
সাইকি রওনা হলো, কিন্তু পশম আনার জন্য নয়, নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার জন্য। সে যখন নদীর তীরে পৌঁছাল, তখন একটি সবুজ নলখাগড়া (Reed) বাতাসে দুলে তাকে সাবধান করল:
“ও সাইকি! আত্মহত্যা করে আমার জল দূষিত কোরো না। আর খবরদার! এখন ওই ভেড়াগুলোর কাছে যেও না। দুপুরের প্রখর রোদে ওরা খুব হিংস্র হয়ে থাকে। ওদের শিং ও পাথরের মতো শক্ত কপাল দিয়ে তোমাকে মেরে ফেলবে।
তুমি বরং এই বড় গাছটার নিচে লুকিয়ে থাকো। রোদ পড়লে যখন ওরা শান্ত হবে এবং বিশ্রাম নেবে, তখন তুমি ঝোপঝাড়ের কাঁটায় আটকে থাকা ওদের পশম সহজেই সংগ্রহ করতে পারবে।”
সাইকি নলখাগড়ার পরামর্শ মেনে পশম সংগ্রহ করে ভেনাসের কাছে নিয়ে গেল। কিন্তু ভেনাস খুশি হলেন না। তিনি বিদ্রূপ করে বললেন, “আমি জানি এটা তোর কাজ নয়। দেখি তোর সাহস আর বুদ্ধি কতটুকু।”
তৃতীয় পরীক্ষা: স্টিক্স নদীর জল
ভেনাস আবার আদেশ দিলেন, “ওই দেখ বিশাল পাহাড়ের চূড়া। ওখান থেকে কালো রঙের বিষাক্ত জল পড়ছে, যা নরকের স্টিক্স ও কোসাইটাস নদীকে পুষ্ট করে। ওই পাহাড়ের চূড়া থেকে এক ঘটি জল নিয়ে আয়।”
সাইকি ক্রিস্টালের বোতল হাতে পাহাড়ের দিকে গেল। কিন্তু সেখানে পৌঁছে সে দেখল কাজটি অসম্ভব। খাড়া পাহাড় বেয়ে জল পড়ছে, আর দুই পাশে দুটি বিশাল ড্রাগন পাহারা দিচ্ছে। এমনকি জলের ধারাও চিৎকার করে বলছে, “পালা! পালা! নইলে মারা পড়বি!”
সাইকি ভয়ে পাথরের মতো জমে গেল। কিন্তু জুপিটারের রাজকীয় পাখি ঈগল তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এল। কিউপিডের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ঈগল সাইকির হাত থেকে বোতলটি নিয়ে উঁচুতে উড়ে গেল। ড্রাগনদের চোখ এড়িয়ে সে জল ভরে এনে সাইকিকে দিল।
সাইকি সেই জল নিয়ে ভেনাসের কাছে গেল। কিন্তু ভেনাসের মন গলল না। তিনি বললেন, “তুই নিশ্চয়ই কোনো ডাইনি! নইলে এসব কাজ করছিস কী করে? তবে থাম, তোর শেষ পরীক্ষা বাকি আছে।”
চতুর্থ পরীক্ষা: পাতালপুরীর যাত্রা
ভেনাস সাইকির হাতে একটি বাক্স দিয়ে বললেন, “এটা নিয়ে নরকে প্রোসার্পিনার কাছে যা। তাকে বলবি, ভেনাস তার সৌন্দর্যের কিছুটা অংশ চেয়েছে। কারণ ছেলের অসুস্থতার চিন্তায় আমার সৌন্দর্য কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। দেরি করবি না, কারণ ওই প্রসাধন মেখে আমি দেবতাদের সভায় যাব।”
সাইকি বুঝল এবার তার মৃত্যু নিশ্চিত। নরকে যাওয়া মানেই তো মৃত্যু। তাই সে একটি উঁচু টাওয়ারে উঠল ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার জন্য। সে ভেবেছিল, এটাই নরকে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ।
কিন্তু টাওয়ারটি হঠাৎ কথা বলে উঠল: “বোকা মেয়ে! কেন আত্মহত্যা করছিস? এভাবে মরলে তুই নরকে যাবি ঠিকই, কিন্তু আর ফিরতে পারবি না। আমার কথা শোন।
কাছেই ল্যাসিডেমন শহরের পাশে টেনারাস পাহাড় আছে। সেখানে নরকে যাওয়ার গোপন পথ পাবি। কিন্তু সাবধান! খালি হাতে যাবি না। দুই হাতে যব আর মধু দিয়ে তৈরি দুটো পিঠা নিবি আর মুখে দুটো মুদ্রা রাখবি।
পথে অনেক বাধা পাবি। এক খোঁড়া লোক গাধার পিঠ থেকে পড়ে যাওয়া কাঠ তুলে দিতে বলবে—শুনবি না। নরকের নদী পার করার সময় মাঝি চ্যারন ভাড়া চাইবে—তাকে তোর মুখ থেকে একটি মুদ্রা নিতে দিবি। নদীতে মরা মানুষ হাত বাড়িয়ে সাহায্য চাইবে—তাকাবি না। তাঁতবোনা বুড়িরা সাহায্য চাইবে—এড়িয়ে যাবি।
মনে রাখবি, পিঠা দুটো তোর জীবনের চাবিকাঠি। ওগুলো হারিয়ে ফেললে আর ফিরতে পারবি না।
নরকের গেটে তিনমাথাওয়ালা কুকুর সারবেরাস পাহারা দেয়। তাকে একটি পিঠা খেতে দিবি, সে তোকে পথ ছেড়ে দেবে। প্রোসার্পিনার কাছে গিয়ে মাটিতে বসবি এবং শুধু শুকনো রুটি খাবি। সে বাক্সে যা দেবে তা নিয়ে ফেরার পথে কুকুরকে দ্বিতীয় পিঠা দিবি আর মাঝিকে দ্বিতীয় মুদ্রা দিবি।
সবচেয়ে জরুরি কথা—ফেরার পথে ভুলেও বাক্সটি খুলবি না। ভেতরের ঐশ্বরিক সৌন্দর্য দেখার লোভ সামলে রাখবি।”
টাওয়ারের নির্দেশ মেনে সাইকি সফলভাবে পাতালপুরী থেকে ফিরে এল। কিন্তু দিনের আলো দেখার পর তার মনে কৌতূহল জাগল। সে ভাবল, “আমি কি বোকা! স্বর্গের সৌন্দর্য হাতে নিয়ে যাচ্ছি, আর নিজের জন্য একটুও নেব না? কিউপিডকে খুশি করার জন্য একটু সৌন্দর্য তো আমারও দরকার।”
সে বাক্সটি খুলল। কিন্তু হায়! ভেতরে কোনো সৌন্দর্য ছিল না। ছিল কেবল নরকীয় ঘুম । বাক্স খোলার সাথে সাথেই সেই গাঢ় ঘুম তাকে গ্রাস করল। সে মৃতদেহের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
কিউপিডের মুক্তি ও সাইকির পুনর্জাগরণ
এদিকে কিউপিডের ক্ষত সেরে গিয়েছিল। তিনি আর সাইকির বিরহ সহ্য করতে পারছিলেন না। জানলার ফাঁক দিয়ে ডানা মেলে তিনি উড়ে এলেন এবং সাইকিকে খুঁজে পেলেন।
কিউপিড সাইকির শরীর থেকে সেই জাদুকরী ঘুম মুছে আবার বাক্সে ভরে দিলেন। তারপর নিজের তীরের ডগা দিয়ে আলতো খোঁচা দিয়ে তাকে জাগালেন।
তিনি বললেন, “হায়রে বোকা মেয়ে! কৌতূহল তোকে আবারও শেষ করে দিচ্ছিল। যা, এখন মায়ের কাছে গিয়ে এই বাক্সটা দিয়ে আয়। বাকিটা আমি দেখছি।”
কিউপিড আকাশে উড়ে গেলেন এবং সাইকি ভেনাসের কাছে তার শেষ কাজ সমর্পণ করতে গেল।
সাইকের প্রতি কিউপিডের প্রেম তখন আরও গভীর হয়েছে। কিন্তু মায়ের (ভেনাসের) রোষানলে পড়ার ভয়ে তিনি আর কালবিলম্ব না করে সোজা স্বর্গে প্রবেশ করলেন। তিনি তাঁর আরজি পেশ করার জন্য দেবরাজ জুপিটারের (বৃহস্পতি) সামনে উপস্থিত হলেন।
জুপিটার তাঁকে স্নেহভরে আলিঙ্গন করে বললেন:
“হে আমার প্রিয় পুত্র, যদিও তুমি আমাকে কখনোই উপযুক্ত শ্রদ্ধা বা সম্মান প্রদর্শন করোনি, বরং আমার এই বক্ষপঞ্জর—যা দ্বারা নক্ষত্রমণ্ডলী ও প্রকৃতির নিয়ম নিয়ন্ত্রিত হয়—তা তুমি বারবার পার্থিব কামনার আঘাতে জর্জরিত করেছ; আমাকে নীতি ও সমাজশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে গিয়ে কখনও সাপ, কখনও আগুন, কখনও বন্য পশু, পাখি বা ষাঁড়ের রূপ ধারণ করতে বাধ্য করেছ এবং আমার ঐশ্বরিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছ—তবুও আমার সংযম এবং নিজের হাতে তোমাকে লালন-পালন করার কথা স্মরণ করে আমি তোমার সব ইচ্ছা পূরণ করব। আমি তোমাকে ঈর্ষাপরায়ণ ও বিদ্বেষপূর্ণ শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করব। আর পৃথিবীতে যদি কোনো সুন্দরী কুমারী থাকে, তবে আমার প্রতি তোমার ভালোবাসার প্রতিদানস্বরূপ আমি তোমার উপকার করব।”
এই কথা বলে তিনি দেবদূত মার্কারিকে (বুধ) আদেশ দিলেন অবিলম্বে সমস্ত দেব-দেবীকে সভায় আহ্বান করতে। ঘোষণা করা হলো, যদি কোনো স্বর্গীয় শক্তি এই সভায় অনুপস্থিত থাকে, তবে তাকে দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা জরিমানা দিতে হবে। এই কঠোর আদেশের ভয়ে স্বর্গের নাট্যশালা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল।
তখন জুপিটার সিংহাসনে উপবিষ্ট হয়ে বলতে শুরু করলেন:
“ওহে অমর দেবগণ, মিউজদের গ্রন্থে যাদের নাম লিপিবদ্ধ আছে, আপনারা সকলেই এই যুবক কিউপিডকে চেনেন, যাকে আমি নিজ হাতে বড় করেছি। আমি মনে করি, তার প্রথম যৌবনের এই উদ্দাম আবেগকে এখনই সংযত ও নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। তার উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের জন্য সে সর্বত্র নিন্দিত হয়েছে, এটাই যথেষ্ট। অতএব, বিবাহের পবিত্র বন্ধনের মাধ্যমে তার এই চপলতা দূর করা হোক। সে এমন এক কুমারীকে বেছে নিয়েছে, যে তাকে ভালোবাসে এবং যার সতীত্ব সে হরণ করেছে। সুতরাং, সেই কুমারী তার কাছেই থাকুক এবং কিউপিড তাকে চিরকালের জন্য ভোগ করুক।”
এরপর তিনি ভেনাসের দিকে ফিরে বললেন, “আর তুমি মা, আমার কন্যা, তুমি কোনো চিন্তা কোরো না। তোমার বংশমর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে—এমন ভয় পেয়ো না। এই বিবাহকে কোনো সাধারণ মর্ত্য বিবাহ মনে করার কারণ নেই, কারণ আমি নিজেই বেসামরিক আইন অনুযায়ী একে ন্যায্য, বৈধ এবং আইনসম্মত বলে ঘোষণা করছি।”
সাইকের অমরত্ব লাভ ও স্বর্গীয় বিবাহ
জুপিটার তৎক্ষণাৎ মার্কারিকে আদেশ দিলেন কিউপিডের স্ত্রী সাইকেকে স্বর্গের প্রাসাদে নিয়ে আসার জন্য। সাইকে উপস্থিত হলে তিনি এক পাত্র অমৃত তার হাতে দিয়ে বললেন:
“সাইকে, এই অমৃত পান করো এবং অমরত্ব লাভ করো। আজ থেকে কিউপিড তোমার চিরস্থায়ী স্বামী হলো। মৃত্যু আর কখনোই তোমাদের বিচ্ছেদ ঘটাতে পারবে না।”
অবিলম্বে এক বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ বিবাহভোজের আয়োজন করা হলো। বরের আসনে কিউপিড তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে বাহুডোরে জড়িয়ে বসল। জুপিটার বসলেন তাঁর স্ত্রী জুনোকে নিয়ে এবং অন্যান্য দেবতারা ক্রমানুসারে আসন গ্রহণ করলেন।
স্বর্গের ভোজসভায় গ্যানিমিডিস জুপিটারের পাত্র পূর্ণ করতে লাগল এবং ব্যাকাস (মদের দেবতা) বাকিদের পরিবেশন করতে লাগল। তাদের পানীয় ছিল দেবতাদের প্রিয় সুধা বা অমৃত। আগুনের দেবতা ভালকান পরম যন্ত্নে ভোজের রান্না প্রস্তুত করলেন। ঋতুদেবীরা গোলাপ ও অন্যান্য সুগন্ধি ফুল দিয়ে সারা ঘর সাজিয়ে দিলেন। গ্রেসরা ছড়িয়ে দিলেন লাবণ্য ও সুবাস।
মিউজরা সুমধুর কণ্ঠে গান ধরলেন, অ্যাপোলো তাঁর বীণায় তুললেন আনন্দদায়ক সুর, আর ভেনাস সেই ছন্দে অপূর্ব ভঙ্গিমায় নৃত্য পরিবেশন করলেন। স্যাটিরাস এবং প্যানিস্কাস তাদের বাঁশি বাজিয়ে আসর মাতিয়ে রাখল।
এভাবেই কিউপিড ও সাইকের পবিত্র বিবাহ সম্পন্ন হলো। যথাসময়ে তাদের কোল আলো করে এক কন্যাসন্তান জন্ম নিল, যাকে আমরা ‘আনন্দ’ (Pleasure/Joy) নামে ডাকি।
গল্পের ইতি ও লেখকের আক্ষেপ
দস্যুদের গুহায় বন্দী সেই বৃদ্ধাটি অপহৃতা তরুণীকে এই চমৎকার গল্পটি শোনালেন।
আমি, সেই হতভাগ্য গাধা, অদূরে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলাম। কিন্তু হায়! আমার মনে তখন একটাই আক্ষেপ—ইশ! এই অমূল্য গল্পটি লিখে রাখার জন্য যদি আমার কাছে দোয়াত আর কলম থাকত!

Leave a Reply