রতিবিলাস উপাখ্যান (The Carnal Prayer Mat) হলো ১৭ শতকের প্রখ্যাত চীনা লেখক লি ইউ-এর লেখা একটি বিতর্কিত ও ব্যঙ্গাত্মক ইরোটিক উপন্যাস। ১৬৫৭ সালে রচিত এই উপন্যাসটি কিং রাজবংশের আমলে চীনা সমাজ ও কনফুসীয় puritanism (কঠোর নীতিবাদ)-কে আক্রমণ করে লেখা হয়েছিল।
অনুবাদ: অপু চৌধুরী
প্রথম খণ্ড: জাগরণের পর ধ্যান – বসন্ত
প্রথম অধ্যায়: কামপ্রবৃত্তি নিবারণ, কামলীলার মাধ্যমে ধর্মের ব্যাখ্যা এবং যৌনতার উন্মোচন
শ্লোক:
শ্লোক: কালো চুলের মায়া ধরে রাখা দায়, সুন্দর মুখও দ্রুত পাল্টে যায়; মানুষের জীবন তো আর চিরসবুজ পাইন গাছ নয়। যশ আর লাভের মোহ বসন্তের বাতাসের মতো, ঝরা ফুলের সঙ্গে মিলিয়ে যায়। হায়! যৌবনের জোয়ারে যদি আনন্দের তরী না ভাসাও, তবে বুড়ো বয়সে কেবল দীর্ঘশ্বাসই হবে সার।
হে রাজপুত্ররা, শোনো সেই সুবর্ণ গান, দেরি কোরো না, প্রেমে পড়ো সেই সুগন্ধি মহৌষধের। পৃথিবীর বুকে আসল স্বর্গের সুখ কোথায় জানতে চাও? হিসেব কষে দেখো, তা লুকিয়ে আছে ওই শোবার ঘরের নিভৃত বিছানায়। এটা সেই ঐশ্বর্যের রাজ্য নয়, যেখানে আনন্দের শুরু হয় আর শেষ হয় বিষাদে।
বরং প্রতিদিন উপভোগ করো সেই অমৃত, যেখানে পাখিরা ঘুমিয়ে থাকে, ভোরের ঘণ্টার শব্দে ভয় পায়। চোখ মেলে দেখো, এই মহাবিশ্বের পর্দায় আঁকা— এক বিশাল, অনন্ত বসন্তের ছবি।
এই শ্লোকটির নাম ‘মানটিং ফাং’। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের জীবনের প্রতিদিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি আর দুশ্চিন্তার কথা, যেখানে সত্যিকারের আনন্দের বড়ই অভাব। সৃষ্টির শুরুতে ঋষিরা নারী-পুরুষের মিলনের যে অনুভূতি তৈরি করেছিলেন, তা আসলে মানুষের ক্লান্তি আর উদ্বেগ দূর করার জন্যই—যাতে সংসারের চাপে মানুষ একেবারে ভেঙে না পড়ে।
রক্ষণশীল পণ্ডিতরা নারীর কোমরের নিচের অংশকে ‘জন্মের দরজা’ আর ‘মৃত্যুর দরজা’ বলে ডাকেন। তাঁদের যুক্তি হলো, এই পথেই পুরুষের জীবনীশক্তি ফুরিয়ে যায়। কিন্তু জ্ঞানীরা বলেন উল্টো কথা। তাঁদের মতে, মানুষের জীবনে যদি এই পরম উপভোগের জিনিসটি না থাকত, তবে মাথার চুল হয়তো আরও কয়েক বছর আগেই পেকে যেত আর আয়ুও দ্রুত ফুরিয়ে আসত।
যাঁরা এটা বিশ্বাস করেন না, তাঁরা একবার সন্ন্যাসীদের দিকে তাকিয়ে দেখুন। কতজন সন্ন্যাসীকে দেখেছেন, যাঁদের চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর বয়সেও চুল পাকেনি? কতজন সত্তর বা আশি বছর বয়সেও শরীর ভেঙে বিছানায় পড়েননি?
এখন তর্ক হতে পারে যে, সন্ন্যাসীরা সংসার ত্যাগ করলেও তাঁদেরও তো গোপন পথ আছে। হয়তো কেউ গোপনে নারীদের সঙ্গে মেশেন, অথবা শিষ্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন। ফলে সাধারণ মানুষের মতোই তাঁরাও মূল শক্তি ধরে রাখতে পারেন না বলেই দীর্ঘজীবী হন না।
যদি তাই হয়, তবে একবার রাজধানীর অন্দরমহলের নপুংসক রক্ষী বা খোজাদের দিকে তাকান। তাঁরা শুধু যে নারীদের সঙ্গে গোপনে মেশেন না বা শিষ্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন না তাই নয়, বরং সেই কাজ করার যন্ত্রটিই তাঁদের নেই। যুক্তির খাতিরে ধরলে, তাঁদের তো তবে চিরকাল তরুণ থাকা উচিত এবং শতবর্ষের বেশি বাঁচা উচিত।
তাহলে কেন তাঁদের মুখে অন্যদের চেয়ে বেশি ভাঁজ পড়ে? কেন মাথায় অকালে টাক পড়ে বা চুল পেকে যায়? কেন তাঁরা নামে পুরুষ হলেও দেখতে জরাগ্রস্ত বৃদ্ধার মতো হয়ে যান? রাজধানীর রাস্তায় সাধারণ মানুষের দীর্ঘায়ু লাভের স্মৃতিফলক চোখে পড়ে, কিন্তু কোনো শতবর্ষী নপুংসকের স্মৃতিস্তম্ভ কখনো দেখা যায় না।
এ থেকেই বোঝা যায়, নারী-পুরুষের রতিসংগম বা যৌনতা আসলে মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। যদিও ‘বেনকাও গাংমু’ (ভেষজ বিশ্বকোষ)-এ এই উপাদানটির উল্লেখ নেই এবং এর কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। কেউ বলেন এটি পুষ্টিকর, আবার কেউ বলেন এটি ক্ষতিকর।
তুলনা করলে বলা যায়, রতিসংগম শুধু পুষ্টিকরই নয়, এর ঔষধি গুণাগুণ জিনসেং এবং ফুজির (এক প্রকার বলকারক ভেষজ) মতোই শক্তিশালী। এগুলি একে অপরের পরিপূরক। তবে মনে রাখতে হবে, জিনসেং এবং ফুজি অত্যন্ত শক্তিশালী ওষুধ হলেও তা দীর্ঘকাল ধরে অল্প মাত্রায় খাওয়া উচিত, খুব বেশি পরিমাণে নয়। এটাকে ওষুধ হিসেবেই নেওয়া উচিত, খাবার হিসেবে নয়।
যদি মাত্রা বা সময়ের তোয়াক্কা না করে পেট ভরার মতো করে এই সম্ভোগ করা হয়, তবে তা অবশ্যই মানুষের ক্ষতি করবে। নারী-পুরুষের মিলনের উপকারিতা ও অপকারিতাও ঠিক তেমনই। দীর্ঘকাল ধরে নিয়ম মেনে চললে ‘ইয়াং’ (পুরুষ সত্তা) ও ‘ইয়ান’ (নারী সত্তা)-এর ভারসাম্য বজায় থাকে; কিন্তু বাড়াবাড়ি করলে জল আর আগুনের বিরোধে শরীর ক্ষয় হয়ে যায়। ওষুধ হিসেবে নিলে এটি মন শান্ত করে আর দুশ্চিন্তা দূর করার আনন্দ দেয়; কিন্তু খাবার হিসেবে নিলে পেশী আর রক্তের ক্ষয় অনিবার্য।
পৃথিবীর মানুষ যদি রতিসংগমকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করতে শেখে, তবে তা খুব বিরল হওয়াও ঠিক নয়, আবার খুব ঘনঘন হওয়াও ঠিক নয়। বিছানায় যাওয়ার আগে মনে ভাবা উচিত: “এটা একটা ওষুধ, বিষ নয়; তবে কেন ভয় পাব?” আর মিলন শেষ হওয়ার পর ভাবা উচিত: “এটা ওষুধ ছিল, খাবার নয়; তবে কেন এতেই ডুবে থাকব?”
এমন ভাবনা বজায় রাখলে পুরুষের তেজ অকারণে নষ্ট হবে না এবং নারীর সত্তাও বিষণ্ণ হবে না। তাহলে কেন এটা মানুষের উপকারে আসবে না?
তবে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, এই ‘ওষুধের’ গুণাগুণ জিনসেং এবং ফুজির সঙ্গে প্রায় সব বিষয়েই এক, শুধু উৎপত্তিস্থল আর ব্যবহারের পদ্ধতিটা একটু উল্টো—যা ওষুধ সেবনকারীদের জানা দরকার। ভেষজের ক্ষেত্রে স্থানীয় জিনিসের চেয়ে বাইরে থেকে আনা জিনিস বেশি গুণী হয়। কিন্তু নারী-পুরুষের কামকলায়, ‘স্থানীয়’ জিনিসই ভালো। অন্য জায়গা থেকে আনা জিনিস শুধু যে কাজ করে না তা নয়, উল্টো ক্ষতিও করতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, “স্থানীয়” বলতে কী বোঝায়? আর “অন্য জায়গা থেকে আনা” বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?
নিজের স্ত্রী বা উপপত্নী, যাঁদের জন্য দূরে কোথাও খুঁজতে যেতে হয় না, টাকা দিয়ে কিনতে হয় না, হাতের কাছেই পাওয়া যায়—তাঁরাই হলেন “স্থানীয় ওষুধ”। আমি যখন খুশি কাছে পেতে পারি, কোনো বাধা নেই; দরজায় কেউ টোকা দিল কি না, সেই ভয়ে তটস্থ থাকতে হয় না। এতে মূল শক্তির কোনো ক্ষতি তো হয়ই না, বরং বংশরক্ষার পথ সহজ হয়। একবার মিলনের পর শরীর ও মন সতেজ হয়ে ওঠে। একে কি মানুষকে পুষ্ট করা বলা যায় না?
অন্যদিকে, সুন্দরী মেয়েদের সাধারণত ধনী পরিবার থেকে আসতে দেখা যায়, তাদের সাজসজ্জা অবশ্যই সুন্দর কারুকাজ করা ঘরেই মানায়। এটা ঠিক যে, পোষা মুরগির স্বাদ বুনো হাঁসের মতো অতটা চটকদার বা তাজা নয়; পুরনো স্ত্রীর রূপ হয়তো নতুন কুমারী মেয়ের মতো উজ্জ্বল নয়—একে বলা হয় “অন্য জায়গা থেকে আনা” বা নিষিদ্ধ আকর্ষণ।
মানুষ যখন এই ধরনের পরকীয়া বা বাইরের নারীদের কামনায় পাগল হয়, তখন দিনরাত কেবল তাদের স্বপ্নই দেখে, তাদের পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রথমে আবেগ দিয়ে ভুলিয়ে, তারপর উপহার দিয়ে, অথবা দেয়াল টপকে দেখা করতে যায়, কিংবা গর্ত খুঁড়ে গোপনে কথা বলে।
তাদের সাহস যতই আকাশচুম্বী হোক না কেন, দিনশেষে তাদের আত্মা ইঁদুরের মতোই ভয়ে কুঁকড়ে থাকে। যদিও কেউ দেখছে না, তবু প্রতিমুহূর্তে মনে হয়, এই বুঝি কেউ এসে পড়ল! এমন অবৈধ প্রেমে কামলীলার ঘামের চেয়ে ভয়ের ঠান্ডা ঘামই বেশি বের হয়। প্রেমিক-প্রেমিকার আবেগ হয়তো অনেকক্ষণ থাকে, কিন্তু তাদের বীরত্বের সাহস কর্পূরের মতো উবে যায়।
অপ্রত্যাশিত বিপদের মুখে ঝাঁপ দিয়ে তারা এক ভয়ংকর বিপর্যয় ডেকে আনে। গোপনে নৈতিকতা নষ্ট হয়, প্রকাশ্যে আইন ভাঙা হয়, আর শরীর অকালে শেষ হয়ে যায়। যদি কোনো প্রতিশোধ নেওয়ার লোক নাও থাকে, তবুও নিজের স্ত্রী তো ঘরে আছে। এছাড়াও সতীত্ব হারানো নারীর যে নানারকম ক্ষতি হয়, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।
সবশেষে এটাই বোঝা যায় যে, রতিসাধনার ক্ষেত্রে মানুষের কখনোই হাতের কাছের জিনিস ছেড়ে দূরের জিনিসের পেছনে ছোটা উচিত নয়, কিংবা পুরনোকে অবজ্ঞা করে নতুনের মোহে অন্ধ হওয়া উচিত নয়।
এই উপন্যাসের লেখকের মনে আসলে এক মহৎ উদ্দেশ্য নিহিত ছিল। তিনি চেয়েছিলেন মানুষের ধর্মজ্ঞান জাগাতে, কামনার লেলিহান শিখা প্রশমিত করতে—উসকে দিতে নয়। তাঁর লক্ষ্য লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা গোপন লাম্পট্য প্রচার করা নয়, বরং কামনার প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করে মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেওয়া।
পাঠকদের উচিত লেখকের এই সাধু অভিপ্রায়কে ভুল না বোঝা। প্রশ্ন উঠতেই পারে, তিনি যদি মানুষকে কামপ্রবৃত্তি থেকে দূরেই রাখতে চাইলেন, তবে সরাসরি নীতিবচনের বই না লিখে এমন রতিশাস্ত্র কেন রচনা করলেন? কেন তিনি নৈতিকতার বুলি না আউড়ে প্রেমকাহিনীর আশ্রয় নিলেন?
এর কারণ হয়তো অনেকেরই অজানা। সমাজের রীতিনীতি বা অভ্যাস বদলাতে হলে পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়, তবেই উপদেশ মানুষের কানে সহজে প্রবেশ করে। আজকালকার দিনে মানুষ ধর্মগ্রন্থ বা সাধু-সন্তের জীবনী দেখলেই ভয় পায়, কিন্তু ঐতিহাসিক উপন্যাস বা লোককথা পেলে গোগ্রাসে গেলে। এমনকি সেই গল্পের মধ্যেও সততা, রাজভক্তি বা ত্যাগের কাহিনীর চেয়ে অশ্লীল আর চটকদার কেচ্ছাই তাদের বেশি টানে।
বর্তমান যুগকে ঘোর কলিকাল বলাই শ্রেয়। এখন যদি নিছক নীতিবাক্য দিয়ে মানুষকে ভালো কাজ করতে উৎসাহিত করা হয়, তবে কেউ কড়ি খরচ করে সেই বই কিনবে না। এমনকি ধনী ব্যক্তিরা যদি পুণ্যলাভের আশায় ধর্মগ্রন্থ ছাপিয়ে বিনামূল্যেও বিলি করেন, তবুও মানুষ হয়তো তা পড়ার বদলে বয়ামের মুখ ঢাকতে বা নেশার তামাক মুড়তে ব্যবহার করবে; একবার খুলেও দেখবে না।
তার চেয়ে বরং কামনার ফাঁদ পেতেই তাদের আকৃষ্ট করা যাক। যতক্ষণ তারা সেই আদিম রসে মজে থাকবে, ঠিক তখনই আচমকা কিছু কঠোর সত্য কথা বা উপদেশ শুনিয়ে দেওয়া হবে। তাতে চমকে উঠে তারা হয়তো দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাববে:
“নারী-পুরুষের মিলন যদি এতই সুখের হয়, তবে কেন শরীর বাঁচিয়ে চলব? কেন আজীবন উপভোগ করব না? কেন খ্যাতির মায়া ত্যাগ করে প্রমোদ কাননে ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যাব না?”
আবার যখন তারা উপন্যাসের চরিত্রদের কর্মফল বা ভয়ংকর পরিণতি দেখবে, তখন আলতো করে দু-একটি জ্ঞানগর্ভ কথা তাদের কানে পৌঁছে দেওয়া হবে। তখন তাদের মনে হবে:
“পরকীয়ার পরিণাম যখন এতই নিশ্চিত, তখন কেন নিজের বিবাহিত স্ত্রী বা উপপত্নীকে নিয়েই সুখী থাকব না? কেন অন্যের পেছনে ছুটে নিজের সর্বনাশ করব এবং ধার করে ঋণ শোধ করার মতো বোকামি করব?”
এমন সুবুদ্ধি মাথায় এলে মানুষ আর স্বাভাবিকভাবেই বিপথে পা বাড়াবে না। আর বিপথে না গেলে স্বামী স্ত্রীকে ভালোবাসবে, স্ত্রী স্বামীকে ভক্তি করবে—এভাবেই সংসারে শান্তি ফিরে আসবে এবং প্রাচীন ‘চৌনান’ ও ‘ঝাওনান’-এর কবিতার মতো পবিত্র সম্পর্ক গড়ে উঠবে। একেই বলে ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’ বা মানুষের প্রবৃত্তি দিয়েই মানুষকে শাসন করা।
এই কৌশল যে কেবল ঐতিহাসিক উপন্যাসেই খাটে তা নয়, প্রাচীন ঋষিরাও ধর্মপ্রচারের ক্ষেত্রে এই পথ বেছে নিয়েছিলেন। বিশ্বাস না হলে দেখুন, যুদ্ধরত রাজ্যগুলোর যুগে কুই রাজ্যের রাজা জুয়ানের সঙ্গে যখন মেনসিয়াসের কথোপকথন হয়েছিল। রাজা জুয়ান ছিলেন ভোগবিলাসী; রাজধর্ম পালনে তাঁর মন ছিল না। তিনি মেনসিয়াসকে বললেন, “আমার একটা রোগ আছে, আমি ধনসম্পদ ভালোবাসি।”
মেনসিয়াস বললেন, “রাজা যদি সম্পদ ভালোবাসেন, তবে তা দোষের কিছু নয়, কিন্তু তা কীভাবে ব্যবহার করছেন সেটাই আসল।”
রাজা জুয়ান আবার লাজুক হেসে বললেন, “আমার আরও একটা রোগ আছে, আমি নারীসঙ্গ বড় ভালোবাসি।” এ কথা বলার সময় তিনি নিজেকে অত্যাচারী রাজা জে এবং ঝোউ-এর কাতারে নামিয়ে আনলেন, যেন তিনি রাজধর্ম পালন না করার অজুহাত খুঁজছিলেন।
মেনসিয়াস যদি সাধারণ কোনো নীতিবাগীশ হতেন, তবে তিনি কঠোরভাবে রাজাকে ভর্ৎসনা করতেন। তিনি হয়তো বলতেন, “সাধারণ মানুষ নারীলোভী হলে তাদের জীবন নষ্ট হয়; রাজপুরুষরা নারীলোভী হলে পদ হারান; আর রাজা নারীলোভী হলে রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়।” এমন রূঢ় কথা শুনলে রাজা মুখে কিছু না বললেও মনে মনে ভাবতেন, “তবে আমার রোগ সারবার নয়, আপনার উপদেশেরও দরকার নেই।”
কিন্তু মেনসিয়াস তা করলেন না। তিনি প্রাচীন রাজা তাইওয়ং-এর উদাহরণ দিয়ে এক চমত্কার গল্প শোনালেন। রাজা তাইওয়ং যখন বিপদের মুখে ঘোড়ায় চড়ে পালাচ্ছিলেন, তখনও তিনি তাঁর প্রিয়তমা জিয়াং নিউকে সঙ্গে নিতে ভোলেননি। এর মানে, তিনিও জীবনে এক মুহূর্ত নারীসঙ্গ ছাড়া থাকতে পারতেন না। কিন্তু তাঁর সেই লাম্পট্য বা ভালোবাসার মধ্যে এমন এক মহত্ত্ব ছিল যে, তিনি রাজ্যের সমস্ত পুরুষকেও তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে সুখে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। রাজা যখন রানীর সঙ্গে আনন্দ করতেন, তখন প্রজারাও তাদের সঙ্গিনীদের নিয়ে আনন্দ করত। এটিই ছিল বসন্তের আগমন এবং পৃথিবীর ভারসাম্য। এমন রাজাকে কে প্রশংসা করবে না? কার সাধ্য তাঁর ভুল ধরে?
এই কথা শুনে রাজা জুয়ান স্বাভাবিকভাবেই শান্ত ও সন্তুষ্ট হলেন এবং রাজধর্ম পালনে রাজি হলেন। তিনি আর “আমার রোগ আছে” বলে অজুহাত দেখালেন না।
এই উপন্যাসের রচয়িতার লেখনীর শক্তিও এখানেই নিহিত। আশা করি পৃথিবীর সমস্ত পাঠক একে নিছক গল্প না ভেবে ইতিহাসের দলিল হিসেবেই দেখবেন। যখনই এই বইয়ের পাতায় ‘পাঠক’ সম্বোধন দেখবেন, বুঝবেন সেখানেই কোনো উপদেশ বা গূঢ় সত্য লুকিয়ে আছে—যা মনোযোগ দিয়ে অনুধাবন করা উচিত।
এই গ্রন্থে যৌন মিলন বা শয্যাকক্ষের আদিম উল্লাসের বর্ণনা অশ্লীলতার কাছাকাছি মনে হতে পারে, কিন্তু এর মূল উদ্দেশ্য হলো পাঠককে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া, যাতে তারা পাপের ফলাফল নিজের চোখে দেখে সতর্ক হতে পারে। অন্যথায়, এই বই হতো কেবল তেতো জলপাইয়ের মতো—যার আসল মিষ্টি স্বাদ অনেকক্ষণ চিবোনোর পর পাওয়া যায়। কিন্তু শুরুতেই যদি স্বাদ টক বা কষা হয়, তবে কে তা কষ্ট করে চিবোতে চাইবে?
তাই আমার এই বর্ণনার উদ্দেশ্য হলো, সেই তেতো জলপাইকে মিষ্টি খেজুরের শাস দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া, যাতে পাঠক সেই স্বাদের লোভে পুরোটা খেয়ে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত বিরক্ত না হয়ে আসল সত্যটি আস্বাদন করতে পারে।
বাজারের গুজব অনেক হলো, আসল কাহিনী না হয় পরের অধ্যায়েই দেখা যাক।
দ্বিতীয় অধ্যায়: জীর্ণ চর্মথলিতে বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর ভ্রমণ এবং মাংসল আসনে তরুণ শিষ্যের উপবেশন
গল্পটি মঙ্গোল রাজবংশের ঝিহুয়াং আমলের। কুয়াচ্যাং পর্বতে ঝেংই নামে এক সন্ন্যাসী বাস করতেন, যার ধর্মনাম ছিল ‘গুফেং’। তিনি মূলত চুঝৌ প্রদেশের এক খ্যাতনামা পণ্ডিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বিধাতা তাঁকে এতটাই প্রখর মেধার অধিকারী করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন যে, শৈশবেই তাঁর মুখে অনবরত বুলি ফুটত—যেন কোনো অভিজ্ঞ ছাত্র সশব্দে পুঁথি পাঠ করছে। তাঁর পিতা-মাতা সন্তানের এই অদ্ভুত আচরণের কোনো কুলকিনারা খুঁজে পেতেন না।
একদিন এক পরিব্রাজক ভিক্ষু তাঁদের দ্বারে উপস্থিত হলেন। তিনি শিশুটিকে কোলে নিয়ে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, শিশুটি কাঁদছেও না, হাসছেও না; বরং বিড়বিড় করে ‘ল্যাংগিয়ান দাজিয়াং জেনজিং’ (বৌদ্ধ সুরঙ্গম সূত্র) আবৃত্তি করছে। ভিক্ষু বললেন, “এ শিশু সাধারণ কেউ নয়, কোনো উচ্চমার্গীয় সন্ন্যাসীর পুনর্জন্ম।” তিনি শিশুটিকে শিষ্য হিসেবে ভিক্ষা চাইলেন। কিন্তু পিতা-মাতা একে নিছক আজগুবি গল্প ভেবে সে কথায় কর্ণপাত করলেন না।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে বিদ্যাচর্চায় নিয়োগ করা হলো। তাঁর মেধা ছিল অসাধারণ, একবার দেখলেই যে কোনো কঠিন পাঠ মুখস্থ করে ফেলতেন। কিন্তু পার্থিব যশ বা খ্যাতির প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। তিনি বারবার পাণ্ডিত্য ও সংসার ত্যাগ করে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করতেন, কিন্তু প্রতিবারই তাঁর পিতা-মাতা কঠোর শাসনে তাঁকে নিরস্ত করতেন।
পিতা-মাতার আদেশে বাধ্য হয়ে তিনি পরীক্ষায় বসলেন এবং অল্প বয়সেই পণ্ডিত হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেন। কিন্তু ভাগ্যের লিখন খণ্ডাবে কে? পিতা-মাতার মৃত্যুর পর, দু’বছর ধরে যথাবিহিত শোক পালন করলেন। এরপর নিজের সমস্ত পৈতৃক সম্পত্তি আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে, নিজ হাতে সেলাই করা এক বিশাল চামড়ার থলিতে বাদ্যযন্ত্র ‘কাঠের মাছ’, ধর্মগ্রন্থ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামান্য কিছু জিনিস ভরে, মাথার চুল কামিয়ে পাহাড়ে গিয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন।
যাঁরা তাঁকে চিনতেন, তাঁরা তাঁকে ‘গুফেং জ্যেষ্ঠ সন্ন্যাসী’ বলে সম্বোধন করতেন। আর যাঁরা চিনতেন না, তাঁরা তাঁর সেই অদ্ভুত থলি দেখে নাম দিয়েছিলেন ‘চামড়ার থলি সন্ন্যাসী’।
অন্যান্য সাধারণ সন্ন্যাসীদের সঙ্গে তাঁর মিল ছিল সামান্যই। তিনি কেবল মদ্য, মাংস এবং স্ত্রীসঙ্গ বর্জন করেই ক্ষান্ত হননি, বরং সন্ন্যাসীদের চিরাচরিত নিয়মের বাইরেও তিনি নিজের জন্য তিনটি কঠোর ব্রত পালন করতেন। সেই তিনটি নিয়ম হলো: ভিক্ষা না করা, ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যা না দেওয়া এবং কোনো বিখ্যাত পাহাড়ে বাস না করা।
লোকেরা কৌতুহলী হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করত, “আপনি ভিক্ষা করেন না কেন?”
তিনি উত্তর দিতেন, “বৌদ্ধধর্মের সাধনা শুরুই হয় কঠোর পরিশ্রম দিয়ে। শরীরকে খাটাতে হয়, ক্ষুধার্ত রাখতে হয়। যখন ক্ষুধা আর শীতের চিন্তা প্রতিদিন শরীরকে পীড়া দেয়, তখন মনে কামপ্রবৃত্তির উদ্রেক হয় না। আর কামভাব না জাগলে মন থেকে পঙ্কিলতা দূর হয়, পবিত্রতা আসে। দীর্ঘদিন এই চর্চা করলে স্বাভাবিকভাবেই বুদ্ধত্ব লাভ হয়।
কিন্তু কেউ যদি নিজে চাষ না করে খায়, নিজের কাপড় না বুনে পরে, আর সারাদিন কেবল দাতার দানে পেট ভরে—তবে তার কী দশা হবে? পেট ভরা থাকলে মনে হাঁটার শখ জাগে, শরীর গরম থাকলে ঘুমের নেশা পায়। হাঁটার সময় চোখে পড়ে নানা লোভনীয় বস্তু, আর ঘুমের ঘোরে আসে রঙিন স্বপ্ন। এতে বুদ্ধত্ব লাভ তো দূরের কথা, নরকে যাওয়ার পথটাই কেবল প্রশস্ত হয়। তাই আমি নিজের শ্রমে অন্ন সংস্থান করি, ভিক্ষা না করার ব্রত পালন করি।”
লোকেরা আবার প্রশ্ন করত, “আপনি ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যা করেন না কেন?”
তিনি বলতেন, “ধর্মগ্রন্থের বাণী বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্বদের শ্রীমুখনিঃসৃত। এর গূঢ় অর্থ কেবল তাঁরাই ব্যাখ্যা করতে পারেন। সাধারণ মানুষের মুখে ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যা দেওয়া আর বোকার মুখে স্বপ্নের বিবরণ শোনা—দুটোই সমান। অতীতে তাও ইউয়ানমিং বই পড়তেন ঠিকই, কিন্তু গভীরে যাওয়ার ভান করতেন না। চীনা মানুষ যখন নিজেদের ভাষায় লেখা বই-ই ঠিকমতো বোঝার সাহস পায় না, তখন বিদেশী ভাষায় লেখা ধর্মগ্রন্থের ভুলভাল অনুবাদ করার ধৃষ্টতা আমি দেখাই কী করে? আমি বোধিসত্ত্বের গুণকীর্তন করতে চাই না, কেবল বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বের কাছে পাপী হওয়া থেকে বাঁচতে চাই। তাই আমি মূর্খ ও সরল হয়েই থাকতে পছন্দ করি, ধর্মগ্রন্থ ব্যাখ্যা না করার নিয়ম মেনে চলি।”
লোকেদের তৃতীয় প্রশ্ন ছিল, “আপনি বিখ্যাত কোনো পাহাড়ে থাকেন না কেন?”
উত্তরে তিনি বলতেন, “সন্ন্যাসীর উচিত নয় এমন কিছু দেখা যা মনে লোভের সঞ্চার করে। পৃথিবীতে লোভনীয় বস্তু কেবল ধনসম্পদ বা ইন্দ্রিয়সুখ নয়। মনোরম বাতাস, মায়াবী চাঁদ, পাখির সুমধুর কলতান, সুস্বাদু ফলমূল—সবই চিত্তবিক্ষেপকারী। কোনো মনোরম স্থানে বাস করলে পাহাড়ের আত্মা আর জলের দানবরা আমাকে কবিতা লিখতে প্রলুব্ধ করে, চাঁদের দেবী আর বাতাসের পরীরা ধ্যানে ব্যাঘাত ঘটায়।
এই কারণেই বিখ্যাত পাহাড়ের বিদ্যাপীঠে ছাত্রদের বিদ্যাশিক্ষা হয় না, আর বিখ্যাত তীর্থে সাধুদের যশের মোহ কাটে না। তাছাড়া এমন কোনো বিখ্যাত পাহাড় আছে কি, যেখানে ধূপ জ্বালানো সুন্দরী রমণী আর আমোদপ্রমোদকারী রাজপুরুষদের ভিড় নেই? চাঁদ আর সবুজ উইলোর ছায়ায় ঘটা কত কেলেঙ্কারির সাক্ষী তো ইতিহাস। তাই আমি লোকালয় ও বিখ্যাত মন্দির ছেড়ে এই নির্জন পাহাড়ে বাস করি, যাতে আমার চোখ ও কানের সামনে কোনো লোভনীয় বস্তুর অস্তিত্ব না থাকে।”
তাঁর এই গভীর তত্ত্বকথা শুনে প্রশ্নকারীরা মুগ্ধ হয়ে যেত। তাদের মনে হতো, এমন কথা তো প্রাচীনকালের বড় বড় ঋষিরাও বলে যাননি! খ্যাতি না চাইলেও, এই তিনটি ব্রতের কারণে তাঁর নাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁকে অনুসরণ করতে এল। কিন্তু তিনি সহজে কাউকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করতেন না। কঠোরভাবে পরীক্ষা করে দেখতেন, আগন্তুকের মধ্যে সদগুণ আছে কি না, পার্থিব মোহের লেশমাত্র আছে কি না। সামান্য সন্দেহ হলেই তিনি ফিরিয়ে দিতেন। তাই দীর্ঘকাল সন্ন্যাস জীবন যাপন করলেও তাঁর শিষ্যের সংখ্যা ছিল নগণ্য। তিনি একা পাহাড়ের ঝরনার পাশে কুঁড়েঘর বেঁধে থাকতেন, চাষাবাদ করে খেতেন আর ঝরনার জল পান করতেন।
একদিন শরৎকালের বাতাস বনের মর্মরধ্বনি তুলছে, গাছের পাতা ঝরছে, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। সন্ন্যাসী খুব ভোরে উঠে আঙিনার ঝরা পাতা পরিষ্কার করলেন, বুদ্ধমূর্তির সামনে স্বচ্ছ জল নিবেদন করলেন। তারপর ধূপ জ্বেলে আসন পেতে মধ্যকক্ষে গভীর ধ্যানে মগ্ন হলেন।
এমন সময় এক তরুণ পণ্ডিত দুজন ভৃত্যকে সঙ্গে নিয়ে দরজার ভেতরে প্রবেশ করলেন। সেই তরুণের চেহারা ছিল শরতের জলের মতো শান্ত আর বসন্তের মেঘের মতো কোমল। তাঁর চোখ দুটি ছিল আর পাঁচজনের চেয়ে আলাদা—অত্যন্ত উজ্জ্বল ও চঞ্চল। তিনি সোজাসুজি তাকাতে পছন্দ করতেন না, বরং আড়চোখে দেখাতেই তাঁর বেশি আনন্দ। অন্য কোনো কাজে এই চোখের উপযোগিতা না থাকলেও, নারীদের চুরি করে দেখার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। কাছে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ত না; কয়েকশ হাত দূর থেকেও একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই তিনি রমণীর খুঁটিনাটি বুঝে ফেলতেন।
কোনো সুন্দরী নারীকে দেখলেই তিনি চোখের ইশারায় বার্তা পাঠাতেন। যদি সেই নারী সতীসাধ্বী হতেন, তবে তিনি লজ্জায় মাথা নিচু করে চলে যেতেন, ইশারায় সাড়া দিতেন না। কিন্তু যদি সেই নারীও একই স্বভাবের হতেন, তবে এপার থেকে ইশারা যেত, ওপার থেকে জবাব আসত। চোখের কোণ দিয়ে চলত অদৃশ্য প্রেমপত্রের আদান-প্রদান, এবং মুহূর্তেই তাঁদের বিচ্ছেদ অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত।
পুরুষ বা নারী, যেই হোক না কেন—এমন চঞ্চল আঁখি নিয়ে জন্মানো কখনোই শুভ লক্ষণ নয়। এমন চোখের অধিকারীদের কপালে শেষ পর্যন্ত দুর্নাম আর সতীত্বহানিই জোটে। পাঠকদের মধ্যে যদি কারও এমন চোখ থাকে, তবে সাবধান হওয়াই শ্রেয়।
সেই তরুণ পণ্ডিত কক্ষে প্রবেশ করে প্রথমে বুদ্ধমূর্তিকে চারবার ভক্তিভরে প্রণাম করলেন, তারপর সন্ন্যাসীকেও চারবার প্রণাম করে একপাশে বিনম্রভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন।
সন্ন্যাসী ধ্যানে মগ্ন থাকায় তাৎক্ষণিক উত্তর দিতে পারলেন না। ধ্যানভঙ্গের পর তিনি আসন ছেড়ে উঠে আগন্তুককে পাল্টা চারবার গভীর প্রণাম জানালেন। এরপর আসন গ্রহণ করে তাঁর নাম জানতে চাইলেন।
পণ্ডিত উত্তর দিলেন, “আমি দূর দেশের পথিক, সুঝৌ ও ঝেজিয়াং অঞ্চলের মধ্যবর্তী স্থানে আমার বিচরণ। আমার উপাধি ‘ওয়েই ইয়াংশেং’। লোকমুখে শুনেছি আপনি এক মহান সন্ন্যাসী, ইহকাল ও পরকালের জীবন্ত বুদ্ধ। তাই আমি উপবাস করে আপনার অমৃতবচন শুনতে এসেছি।”
আপনারা কি জানেন, সন্ন্যাসী নাম জানতে চাওয়া সত্ত্বেও তিনি কেন নিজের নাম না বলে উপাধি বললেন? পাঠকদের জেনে রাখা ভালো, ইউয়ান যুগের পণ্ডিতদের মধ্যে এক অদ্ভুত রেওয়াজ ছিল। তাঁরা সচরাচর নিজেদের নাম মুখে আনতেন না, একে অপরকে উপাধি বা ছদ্মনামে ডাকতেন। তাই প্রত্যেক পণ্ডিতেরই একটি করে বাহারি উপাধি ছিল। কাউকে বলা হতো ‘অমুক শেং’, কাউকে ‘অমুক জি’, আবার কাউকে ‘অমুক দাওরেন’। সাধারণত তরুণদের ক্ষেত্রে ‘শেং’, মধ্যবয়সীদের ‘জি’ এবং বৃদ্ধদের ‘দাওরেন’ বলা হতো।
এই উপাধিগুলোর পেছনেও থাকত বিশেষ অর্থ। হয়তো কোনো শখের প্রতি আসক্তি, কিংবা স্বভাবের সঙ্গে মিল রেখে দুটি অক্ষর বেছে নিয়ে নাম রাখা হতো। সেই নামের অর্থ কেবল নিজের কাছে পরিষ্কার থাকলেই চলত, সবার কাছে ব্যাখ্যা করার দায় ছিল না।
এই তরুণ পণ্ডিত ছিলেন নারী-পুরুষের আদিম কামকলায় আসক্ত। তিনি দিনের চেয়ে রাতকেই বেশি পছন্দ করতেন। আবার পুরো রাত নয়, রাতের সেই বিশেষ প্রহরটিই ছিল তাঁর প্রিয়। ‘শিজিং’ (কবিতার বই)-এর একটি পংক্তি “রাত এখনও শেষ হয়নি” (ওয়েই ইয়াং)—এই কথাটি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে, তিনি এর অর্থকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়ে নিজের নাম দিয়েছিলেন ‘ওয়েই ইয়াংশেং’ বা ‘নিশিযাপনকারী’।
আগন্তুকের মুখে নিজের এমন অঢেল প্রশংসা শুনে বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বেশ লজ্জিত বোধ করলেন এবং বিনয়ের সঙ্গে দু-একটি কথা বলে প্রসঙ্গ পাল্টালেন।
ততক্ষণে মাটির পাত্রে সকালের আহার প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল, সন্ন্যাসী তাঁকে পরম যত্নে আপ্যায়ন করলেন। আহারের সময় দুজনে মুখোমুখি বসে ধ্যান ও তত্ত্বকথা নিয়ে আলোচনায় মগ্ন হলেন। আশ্চর্য বিষয়, তাঁদের চিন্তাভাবনার স্রোত যেন একই মোহনায় গিয়ে মিলল। আসলে ওয়েই ইয়াংশেং ছিলেন অসাধারণ ধীশক্তি সম্পন্ন পুরুষ। তিন ধর্ম ও নয়টি দর্শন—সবই ছিল তাঁর নখদর্পণে। ধ্যানের যে গূঢ় রহস্য বুঝতে গিয়ে অন্যের হাজার কথায়ও জট খোলে না, তিনি সন্ন্যাসীর মুখের প্রথম বাক্যটি শোনা মাত্রই তা জলের মতো বুঝে ফেললেন।
সন্ন্যাসী মনে মনে প্রমাদ গুনলেন, “কী শাণিত বুদ্ধি এই যুবকের! কিন্তু হায়, বিধাতা মনে হয় তার রূপ গড়তে গিয়ে বড় এক ভুল করে ফেলেছেন। এমন বৌদ্ধধর্ম ধারণ করার মতো পবিত্র মনের খোলস হিসেবে তিনি কেন এমন পাপী চেহারার শরীর বেছে নিলেন?”
“তাঁর চালচলন দেখেই স্পষ্ট বোঝা যায়, ইনি পুরোদস্তুর লম্পট। আজ যদি একে এই ‘চামড়ার থলি’ বা ধর্মের শাসনে বেঁধে না রাখা হয়, তবে ভবিষ্যতে এ অবশ্যই পরস্ত্রীর সতীত্ব হরণ করতে দেয়াল টপকাবে কিংবা সিঁদ কাটবে এবং গৃহস্থের সর্বনাশ ডেকে আনবে। পৃথিবীর কত রমণী যে এর ছোবলে নীল হবে, তার ইয়ত্তা নেই। আজ এই বিপথগামী যুবককে হাতের কাছে পেয়েও যদি আমি সাধারণ মানুষের স্বার্থে এই জঞ্জাল দূর না করি, তবে তা করুণার কাজ হবে না।”
তিনি যুবককে বললেন, “সন্ন্যাসী হওয়ার পর আমি বহু মানুষ দেখেছি। সেই সব মূর্খ নর-নারী যারা ভালো হওয়ার কোনো চেষ্টাই করে না, তাদের কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু যারা ধ্যান শিখতে আসে সেই সব পণ্ডিত, কিংবা ধর্মকথা শুনতে আসা রাজকর্মচারী—তারা সবাই আসলে বহিরাগত; ধ্যানের আসল রহস্য বোঝার ক্ষমতা খুব কম মানুষেরই আছে। কে জানত যে আপনার মতো এমন প্রখর ধীশক্তিধর কারো দেখা আমি পাব! এই মেধা দিয়ে ধ্যান শিখলে কয়েক বছরের মধ্যেই আপনি ‘সমাধি’ বা মোক্ষ লাভ করতে পারবেন।”
“মানুষের জন্ম পাওয়া সহজ, কিন্তু মানুষের মতো স্বভাব পাওয়া কঠিন। সময় পার করে দেওয়া সহজ, কিন্তু বিপদ এড়ানো কঠিন। আপনি যখন বুদ্ধ হওয়ার মতো স্বভাব নিয়েই পৃথিবীতে এসেছেন, তখন কেন ভূতের পথে পা বাড়াবেন? কেন এই তরুণ বয়সেই প্রেম আর কামনার মায়া ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করছেন না? আমি যদিও নগণ্য মানুষ, তবু আমি আপনাকে পথ দেখাতে পারি। যদি আপনি এই মহান প্রতিজ্ঞা করতে পারেন এবং কার্যকারণের এই সত্যকে গুরুত্ব দেন, তবে শত বছর পর আপনি উঁচুতে সিদ্ধপুরুষদের সঙ্গে সম্মানিত হবেন, আর নিচে রাক্ষস বা প্রেতাত্মাদের দাসত্ব করতে হবে না। আপনি কী মনে করেন?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “ধর্মের পথে ফেরার ইচ্ছা আমার বহুদিনের, ভবিষ্যতে আমাকে এই পথেই আসতে হবে। কিন্তু আমার হৃদয়ে দুটি বাসনা এখনও অপূর্ণ রয়ে গেছে, যা ত্যাগ করা আমার পক্ষে অসম্ভব। আমার বয়স এখন কম, তাই ফিরে গিয়ে সেই দুটি কাজ শেষ করে, জগতটা কয়েক বছর একটু চেখে দেখে, তারপর না হয় সন্ন্যাস নেব। তখন খুব একটা দেরি হবে না।”
সন্ন্যাসী জানতে চাইলেন, “অনুগ্রহ করে বলুন, কী আপনার সেই দুটি ইচ্ছা? আপনি কি স্বর্গে নাম লেখাতে চান, নাকি নিজের অগাধ পাণ্ডিত্যের প্রতিদান চান? নাকি বিদেশে বীরত্ব দেখিয়ে রাজার মন জয় করতে চান?”
ওয়েই ইয়াংশেং মাথা নেড়ে বললেন, “আমার ইচ্ছা এই দুটির কোনোটিই নয়।”
সন্ন্যাসী বললেন, “যদি এই দুটি না হয়, তবে আপনার ইচ্ছা ঠিক কী?”
ওয়েই ইয়াংশেং উত্তরে বললেন, “আমার ইচ্ছা এমন কিছু যা আমি নিজের যোগ্যতায় অর্জন করতে পারি, কোনো অলীক কল্পনা নয়। গুরুর কাছে বলতে দ্বিধা নেই—আমার স্মৃতিশক্তি, ধর্মতত্ত্ব বোঝার ক্ষমতা এবং লেখনী—সবই অন্যদের চেয়ে সেরা। আজকালকার নামকরা পণ্ডিতরা তো কেবল কষ্ট করে মুখস্থ করে, এদিক-ওদিক থেকে লেখা চুরি করে প্রবন্ধ সাজায়, আর কিছু কবিতা সংগ্রহ করে সাহিত্য জগতে নিজেদের ঝান্ডা ওড়ায়। আমার মতে ওসব মিথ্যে লোক দেখানো।”
“একজন প্রকৃত পণ্ডিত হতে হলে পৃথিবীর সমস্ত অদ্ভুত বই পড়তে হবে, পৃথিবীর সমস্ত অসাধারণ জ্ঞানীদের সঙ্গে মিশতে হবে, সমস্ত বিখ্যাত পাহাড়-পর্বত ঘুরে দেখতে হবে। তারপর নিভৃত কক্ষে ফিরে এসে এমন বই লিখে যেতে হবে যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পাথেয় হয়ে থাকে। যদি কপালগুণে পরীক্ষায় পাস করি, তবে রাজার জন্যও কিছু কাজ করব। আর যদি সেই ভাগ্য নাও থাকে, তবুও হাজার বছর ধরে মানুষ আমাকে মনে রাখবে। তাই আমার মনে দুটি গোপন কথা আছে: এক, আমি পৃথিবীর ‘প্রথম প্রতিভাবান পুরুষ’ হতে চাই…”
সন্ন্যাসী বাধা দিয়ে বললেন, “এটি তো প্রথম বাক্য। তাহলে দ্বিতীয় বাক্যটি কী?”
ওয়েই ইয়াংশেং মুখ খুলতে গিয়েও আবার চুপ করে গেলেন, যেন সংকোচে বলতে পারছেন না।
সন্ন্যাসী বললেন, “দ্বিতীয় বাক্যটি বলতে যখন আপনি ভয় পাচ্ছেন, তখন আমিই না হয় আপনার হয়ে বলে দিই।”
ওয়েই ইয়াংশেং অবাক হয়ে বললেন, “আমার মনের গোপন কথা গুরু কীভাবে জানবেন?”
সন্ন্যাসী বললেন, “যদি আমি ভুল বলি, তবে আমি যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেব। কিন্তু যদি সঠিক বলি, তবে আপনি কোনো মিথ্যে অজুহাত দেখাবেন না।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “যদি গুরু সঠিক বলতে পারেন, তবে আপনি কেবল বোধিসত্ত্ব নন, সাক্ষাৎ দেবতা। আমি তখন মিথ্যে বলব কোন সাহসে?”
সন্ন্যাসী তখন শান্ত ও ধীর গলায় বললেন, “আপনার দ্বিতীয় বাসনাটি হলো—’আপনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী রমণীকে বিবাহ করতে চান’।”
সন্ন্যাসীর মুখে নিজের মনের এমন নিগূঢ় কথা শুনে ওয়েই ইয়াংশেং হতবাক হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে তিনি বলে উঠলেন, “গুরুদেব, আপনি তো দেখছি সাক্ষাৎ অন্তর্যামী! এই দুটি গোপন বাসনার কথা আমি সারাদিন কেবল মনে মনেই নাড়াচাড়া করি, অথচ আপনি তা এমনভাবে বলে দিলেন যেন নিজের কানে শুনেছেন।”
সন্ন্যাসী বললেন, “আপনি কি শোনেননি যে মানুষের মনের গোপন কথা স্বর্গে বজ্রের মতো সশব্দে পৌঁছায়?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “যুক্তির খাতিরে ধরলে, এমন পার্থিব আবেগ আর কামনার কথা গুরুর কাছে প্রকাশ করা উচিত নয়। কিন্তু আপনি যখন আমার মনের কথাই ধরে ফেলেছেন, তখন আর লুকোছাপা কেন? সত্য বলতে, আমার ধর্মবিশ্বাস এখনও কাঁচা, কিন্তু বাসনা বড়ই পাকা। আদিকাল থেকেই ‘সুন্দরী রমণী আর প্রতিভাবান পুরুষ’—এই চারটি শব্দ একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যেখানেই গুণী পুরুষ, সেখানেই সুন্দরী রমণীর আগমন; আর যেখানেই রূপসী নারী, সেখানেই গুণী পুরুষের কদর।
আমার মেধার কথা না হয় বাদই দিলাম, আমার চেহারাও তো ফেলনা নয়। আমি প্রায়শই আয়নায় নিজের মুখ দেখি। প্রাচীন যুগের সুদর্শন পুরুষ প্যান আন বা ওয়েই জিয়েও যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে আমি নিজেকে তাঁদের চেয়ে কোনো অংশে কম মনে করতাম না। বিধাতা যখন আমাকে এমন রূপ আর গুণ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, তখন আমার যোগ্য সঙ্গিনী হিসেবে কি কোনো নারীকে সৃষ্টি করেননি?
যদি পৃথিবীতে কোনো সুন্দরী নারী না থাকত, তবে মেনে নিতাম। কিন্তু যদি থাকে, তবে আমার চেয়ে যোগ্য পাত্র আর কে হতে পারে? তাই বিশ বছর পার হয়ে গেলেও আমি এখনও বিয়ে করিনি, কারণ আমি আমার রূপ ও গুণকে কোনো অযোগ্য পাত্রে ঢেলে নষ্ট করতে চাই না। আমি ফিরে গিয়ে এমন এক সুন্দরী নারীকে খুঁজে বিয়ে করব, বংশরক্ষার জন্য এক পুত্রসন্তান লাভ করব—তবেই আমার মনের সাধ মিটবে। তখন আর কোনো পিছুটান থাকবে না। আমি শুধু একাই ফিরে আসব না, আমার স্ত্রীকেও সঙ্গে নিয়ে সংসার-সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আপনার কাছে আসব। গুরু কী বলেন?”
সন্ন্যাসী শুনে এক হিমশীতল হাসি হেসে বললেন, “দেখা যাচ্ছে আপনার যুক্তি একেবারেই নিখুঁত, কেবল বিধাতাই যা একটু ভুল করে ফেলেছেন! তিনি যদি আপনাকে একটি কুৎসিত শরীর দিতেন আর সামান্য একটু বুদ্ধিশুদ্ধি দিতেন, তবে হয়তো আপনি সঠিক পথের সন্ধান পেতেন।
প্রাচীনকালে মানুষ প্রায়ই কুষ্ঠরোগ, মৃগীরোগ কিংবা পঙ্গুত্ব নিয়ে জন্মাত, আর সেই জাগতিক অভিশাপ ভোগ করেই তারা অমরত্বের পথ খুঁজে পেত। মোক্ষলাভের নীতিটাও অনেকটা সেই রকম। আপনাকে গড়তে গিয়ে সৃষ্টিকর্তা একটু বেশিই আদর দেখিয়ে ফেলেছেন। যেমন বাবা-মা সন্তানকে অতিরিক্ত স্নেহ করলে তার গায়ে বা মনে আঁচড় লাগার ভয়ে শাসন করতে সাহস পান না। ফলে সন্তান বড় হয়ে ভাবে, তার শরীর ও মন বুঝি অবিনশ্বর, তাই সে যা খুশি তাই করে। কিন্তু যখন অপরাধ করে রাজদণ্ড বা বেত্রাঘাত ভোগ করে, তখন আফসোস করে—বাবা-মা বেশি লাই দিয়েছিলেন বলেই আজ এই দশা।
আপনার এই সুঠাম দেহ আর আদুরে মন মোটেও শুভ লক্ষণ নয়। আপনি নিজেকে ‘প্রথম প্রতিভাবান’ মনে করেন বলে ‘প্রথম সুন্দরী’ রমণীর খোঁজ করছেন। কিন্তু সেই নারীকে পান বা না পান, কিংবা পেলেও—তাঁর কপালে যে ‘প্রথম’ শব্দটিই লেখা থাকবে, তার নিশ্চয়তা কী? আর যদি তাঁকে পাওয়ার পর তাঁর চেয়েও সুন্দরী কাউকে দেখেন, তখন কি তাঁকে ছেড়ে আবার নতুনের পেছনে ছুটবেন?
আবার ধরুন, সেই সুন্দরী রমণীর স্বভাব যদি আপনার মতোই হয়? তিনি যদি সহজে ধরা না দেন এবং আপনার মতোই কোনো ‘প্রথম প্রতিভাবান’-এর অপেক্ষায় থাকেন, তবে হয়তো তাঁকে উপপত্নী হিসেবে পেলেও পেতে পারেন। কিন্তু যদি তিনি কোনো যোগ্য স্বামীর ঘর করেন, তখন আপনি কী করবেন? এই হাজারো প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে নিজের বাসনা মেটাতে গিয়ে আপনি অজান্তেই নরকের পথ প্রশস্ত করবেন। আপনি কি নরকে যেতে চান, নাকি স্বর্গে? যদি স্বেচ্ছায় নরকবাসই আপনার কাম্য হয়, তবে সেই সুন্দরীর খোঁজ চালিয়ে যান। আর যদি স্বর্গে যেতে চান, তবে এই মিথ্যে মোহ ত্যাগ করে আমার সঙ্গে সন্ন্যাস গ্রহণ করুন।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “গুরুদেব, ‘স্বর্গ ও নরক’—এই শব্দগুলো বড়ই গতানুগতিক শোনায়, আপনার মতো উচ্চমার্গীয় সন্ন্যাসীর মুখে এমন কথা ঠিক মানায় না। ধ্যানের মূল কথা হলো আত্ম-উপলব্ধি। শরীরকে জন্ম-মৃত্যুর ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়াই তো বুদ্ধত্ব। সত্যিই কি এমন কোনো স্বর্গ আছে যেখানে যাওয়া যায়? আর কিছু কামজ স্খলন যদি থাকেও, তা বড়জোর নৈতিকতাকে কলুষিত করে—কিন্তু তার জন্য কি সত্যিই কোনো নরক আছে যেখানে পতিত হতে হয়?”
সন্ন্যাসী বললেন, “‘পুণ্যবানেরা স্বর্গে যায় আর পাপীরা নরকে পচে’—এটা হয়তো নেহাতই প্রচলিত কথা। কিন্তু আপনারা যারা নিজেদের জ্ঞানী ভাবেন, তারা সব কিছু থেকেই মুক্তি দাবি করতে পারেন—শুধু শরীর আর কর্মফল থেকে এক চুলও নিস্তার পান না। স্বর্গ বা নরক থাকুক বা না থাকুক, সেটা বড় কথা নয়। যদি স্বর্গ নাও থাকে, তবে ভালো কাজের পুরস্কার হিসেবে স্বর্গকে একটা লক্ষ্য মনে করা উচিত। আর যদি নরক নাও থাকে, তবে পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য নরকের ভয়কে একটা সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত।
যেহেতু আপনি যুক্তির কথা বলছেন, তাই আমি পরকালের কথা বাদ দিয়ে ইহকালের কথাই বলি। এটাও খুব প্রচলিত কথা—’আমি যদি পরস্ত্রীগমন না করি, তবে অন্য কেউ আমার স্ত্রীর সতীত্ব হরণ করবে না।’ এই সহজ সত্যটি থেকেও পৃথিবীর কোনো কামুক পুরুষ রেহাই পায়নি। যে অন্যের স্ত্রী বা কন্যার দিকে কুনজর দেয়, তার নিজের ঘরের মেয়েরাও অন্যের লালসার শিকার হয়। যদি এই চক্র থেকে বাঁচতে চান, তবে ব্যভিচার ছাড়ুন। আর যদি ব্যভিচার চালিয়ে যান, তবে এই কর্মফলের জালে আপনাকে জড়াতেই হবে। এখন আপনিই ঠিক করুন—আপনি কি এই জাল ছিঁড়ে বের হতে চান, নাকি জেনেশুনে তাতে ধরা দিতে চান? যদি ধরা দিতে চান, তবে সেই সুন্দরীর খোঁজ করুন; আর যদি মুক্তি চান, তবে সব মোহ ঝেড়ে ফেলে এই ভিখারি সন্ন্যাসীর সঙ্গী হোন।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “গুরুদেব যা বললেন তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। কিন্তু মূর্খদের বোঝাতে গেলে ধর্মকথার ভয় দেখাতে হয়, যাতে তারা পাপ করতে ভয় পায়। আমাদের মতো শিক্ষিতদের জন্য কি অতটা বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে? দেখুন, বিধাতার আইন কঠোর হলেও, তাঁর বিচার প্রায়ই ক্ষমাশীল হয়। ব্যভিচারের শাস্তি অনেকে পায় ঠিকই, কিন্তু পার পেয়ে যাওয়া লোকের সংখ্যাও তো কম নয়।
যদি সত্যিই এমন হতো যে, পরস্ত্রীগমন করলেই নিজের ঘরে তার বদলা হিসেবে একই ঘটনা ঘটবে, তবে তো স্বর্গের আইনই অপবিত্র হয়ে যেত! আসলে কর্মফল বা চক্রাকার নিয়তির কথা মানুষকে কেবল সাবধান করার জন্যই বলা হয়। যারা পাপী তাদের এটা জানা উচিত, এটুকুই তো উপদেশের মূল কথা—এত ভেঙে বলার কী আছে?”
সন্ন্যাসী বললেন, “আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, এমন ব্যভিচারও আছে যার কোনো শাস্তি হয় না? হয়তো বিধাতার বিচারে ফাঁক আছে, অথবা আপনার সরল বুদ্ধিতে তাই মনে হয়। কিন্তু আমার মতে, পরস্ত্রীগমন করে শাস্তি পায়নি—এমন একজনও নেই। ইতিহাসে লেখা কাহিনী আর লোকমুখে শোনা গল্পের সংখ্যা হাজার হাজার।
একটু ভেবে দেখুন, পরকীয়া পুরুষদের কাছে একটা ‘লাভজনক’ বা বীরত্বের কাজ, তাই তারা বুক ফুলিয়ে তা বলে বেড়ায় এবং সবাই তা জানে। কিন্তু নিজের স্ত্রী বা কন্যা যখন এমন কেলেঙ্কারিতে জড়ায়, সেটা অপমানের বিষয়—তাই লোকে তা চেপে যায়, কেউ জানতেও পারে না। অনেক সময় স্ত্রী এমনভাবে স্বামীকে লুকিয়ে রাখে বা কন্যা পিতাকে অন্ধকারে রাখে যে, তারা নিজেরাও জানে না—আর ভাবে কর্মফল বলে কিছু নেই। একমাত্র চিতায় ওঠার পরেই হয়তো সেই সত্য বিশ্বাস হয়, কিন্তু তখন আর কাউকে তা বলার উপায় থাকে না।
শুধু দৈহিক মিলন করলেই যে ঋণ শোধ করতে হয়, তা নয়। মনে মনে কামভাব আনলেও কর্মফল শুরু হয়ে যায়। ধরুন, কোনো পুরুষের স্ত্রী দেখতে কুৎসিত, রাতে তার সঙ্গে মিলনে সে তেমন সুখ পায় না। তখন সে দিনের বেলায় দেখা কোনো সুন্দরী নারীর কথা কল্পনা করে এবং স্ত্রীকে সেই নারী ভেবে নিজের কামতৃষ্ণা মেটায়। কে জানে, ঠিক সেই মুহূর্তে তার স্ত্রীর মনেও স্বামীর প্রতি ঘৃণা জন্মাচ্ছে না? হয়তো সেও দিনের বেলায় দেখা কোনো সুপুরুষের কথা ভাবছে এবং স্বামীকে সেই পুরুষ ভেবে নিজের জ্বালা মেটাচ্ছে। এমন ঘটনা তো আকছার ঘটে। এতে হয়তো সতীত্ব নষ্ট হয় না, কিন্তু মনের পবিত্রতা তো ঠিকই কলুষিত হয়। এটাও তো পুরুষের কামুকতারই ফল।
আর মনের এইটুকু পাপেই যদি এমন হয়, তবে শরীরে শরীর মেলালে কি দেবতা বা সৃষ্টিকর্তা চুপ করে থাকবেন? তাঁরা কি আপনার স্ত্রীর সতীত্ব রক্ষা করবেন? এসব কেবল মুখের কথা নয়, আপনি কি বিশ্বাস করেন?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “যুক্তি অকাট্য। কিন্তু গুরুর কাছে আমার আরেকটা প্রশ্ন আছে। যার স্ত্রী বা কন্যা আছে, সে যদি অন্যের ক্ষতি করে তবে তার পরিবারের মাধ্যমে সেই ঋণ শোধ হতে পারে। কিন্তু যার স্ত্রী বা কন্যাই নেই, সে যদি ব্যভিচার করে তবে তার ঋণ শোধ হবে কী দিয়ে? এখানে তো স্বর্গের আইন খাটছে না।
আরও একটা কথা, একজন মানুষের স্ত্রী বা কন্যা তো আর অগণিত হয় না, কিন্তু বাইরের জগতে সুন্দরীর সংখ্যা তো সীমাহীন। ধরুন, কারো যদি মাত্র এক-দুজন স্ত্রী থাকে, আর সে যদি বাইরের অগণিত নারীর সঙ্গে ফুর্তি করে—তবে তার স্ত্রীরা পাপ করলেও লাভের অঙ্ক তো আসলের চেয়ে অনেক বেশিই থাকবে। তখন স্বর্গের আইন কী করবে?”
সন্ন্যাসী বুঝতে পারলেন, এই যুবক সহজে দমানোর পাত্র নয়, তর্কে ওস্তাদ। তাই তিনি বললেন, “আপনার যুক্তিবোধ বড়ই তীক্ষ্ণ, আমি আপনার সঙ্গে পেরে উঠব না। তবে এসব কথা কেবল মুখে বললে বিশ্বাস হবে না, কাজে করে দেখলে তবেই বোঝা যাবে। আপনি বরং এক সুন্দরী রমণীকে বিয়ে করে সেই ‘মাংসের গদি’ বা কামশয্যায় শুয়েই জীবনের সত্য উপলব্ধি করুন।
আমার বিশ্বাস, আপনার মধ্যে অসাধারণ প্রতিভা লুকিয়ে আছে, আপনি একদিন সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাবেন। তাই আমি আপনাকে হারাতে চাই না। যখন সবকিছু হাড়ে হাড়ে টের পাবেন, তখন আবার আমার কাছে ফিরে আসবেন, তখন আমরা মুক্তির পথ নিয়ে কথা বলব। আমি আগামীকাল থেকে প্রতিদিন আপনার অপেক্ষায় থাকব।”
এই বলে তিনি ঝুলি থেকে কাগজ-কলম বের করলেন এবং পাঁচ অক্ষরের চারটি চরণের একটি শ্লোক লিখে দিলেন:
“দয়া করে ওই চামড়ার থলি ফেলো দূরে, বোসো গিয়ে তুমি রক্তমাংসের আসনে। জীবিত থাকতেই করো অনুতাপ, করো প্রায়শ্চিত্ত, কফিন যখন হবে বন্ধ, তখন আক্ষেপ কোরো না মনে।”
সন্ন্যাসী তাঁর লেখনী সংবরণ করে সেই কাগজটি ওয়েই ইয়াংশেং-এর হাতে তুলে দিয়ে বিনীত স্বরে বললেন, “আমি নিতান্তই এক স্থূলবুদ্ধির সন্ন্যাসী, কাব্য-অলঙ্কার বা নিষিদ্ধ রসের মারপ্যাঁচ আমি বুঝি না। আমার লেখা এই শ্লোকটি হয়তো শুনতে বড় রূঢ় বা কঠোর মনে হতে পারে, কিন্তু জানবেন—এ আমার অন্তরের পরম সত্য উপলব্ধি। হে গৃহস্থ, এটি আপনি সযত্নে রক্ষা করবেন; ভবিষ্যতে এটিই আমাদের এই সাক্ষাতের সাক্ষী হয়ে থাকবে।”
এই বলে তিনি আসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালেন, যা ছিল বিদায়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
ওয়েই ইয়াংশেং বুঝতে পারলেন যে তাঁকে পরোক্ষভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। যেহেতু সন্ন্যাসী একজন উচ্চমার্গীয় সাধক, তাই তাঁকে অমান্য করে বা অসম্মান করে চলে যাওয়ার ধৃষ্টতা তিনি দেখাতে পারলেন না। তাই তিনি অবনত মস্তকে ক্ষমা চেয়ে বললেন:
“এই অধম শিষ্য স্বভাবতই অজ্ঞ ও অবাধ্য, তাই আপনার মহামূল্যবান উপদেশ এই মুহূর্তে ধারণ করতে অক্ষম। গুরুদেব নিজ গুণে আমাকে ক্ষমা করবেন। ভবিষ্যতে যখন আবার আপনার দ্বারে আসব, তখন যেন আমাকে বিমুখ না করে গ্রহণ করা হয়, এই প্রার্থনাই করি।”
এই বলে তিনি পুনরায় চারবার ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম জানালেন। সন্ন্যাসীও শিষ্টাচার মেনে তাঁকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন এবং অতঃপর দুজনে ভিন্ন পথে যাত্রা করলেন।
এতক্ষণ সন্ন্যাসীর পরিচয় ও কার্যকলাপ সবিস্তারে বর্ণিত হলো। এর পরের আখ্যানে কেবল ওয়েই ইয়াংশেং-এর নারী-লোলুপতা এবং বিবিধ কামশয্যায় তাঁর বিচরণের কথাই প্রাধান্য পাবে, সেখানে সন্ন্যাসীর প্রসঙ্গ আর বিশেষ আসবে না। তবে এই কাহিনীর শেষ অঙ্কে গুফেং সন্ন্যাসীর পরিণতি আবারও দেখা যাবে।
সমালোচকের দৃষ্টিতে পর্যালোচনা:
এই আখ্যানের মূল নায়ক বা ‘প্রধান চরিত্র’ হলেন ওয়েই ইয়াংশেং, আর গুফেং সন্ন্যাসী হলেন নিতান্তই এক গৌণ বা পার্শ্বচরিত্র। অন্য কোনো লেখক হলে হয়তো শুরুতেই ওয়েই ইয়াংশেং-এর কথা দিয়ে গল্প ফাঁদতেন এবং গুফেংকে কেবল অতিথি চরিত্র হিসেবে সামান্য জায়গা দিতেন।
কিন্তু এই রচনায় লেখক ইচ্ছাকৃতভাবে গুফেং-এর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে কাহিনী শুরু করেছেন। এতে পাঠকদের মনে প্রথমে এক ধরণের বিভ্রান্তি বা সন্দেহ জাগতে পারে—তাঁরা হয়তো ভাববেন, এই সন্ন্যাসীই বুঝি পরে ভোল পাল্টে কোনো কদর্য কামলীলায় মত্ত হবেন! কিন্তু না, পরে দেখা যায় বিষয়টি তা নয়। ধ্যানের আলোচনার পরেই লেখকের আসল উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যায়—যা পাঠকদের চমকিত করে।
উপন্যাস রচনার এটি এক অভিনব শৈলী, যেখানে লেখক প্রচলিত ধারা ভাঙার দুঃসাহস দেখিয়েছেন। অন্য কোনো অদক্ষ লেখক এই পথে হাঁটলে হয়তো বিষয়বস্তু বিশৃঙ্খল হয়ে যেত, কে নায়ক আর কে পার্শ্বচরিত্র—তা বোঝাই দায় হতো। কিন্তু এই লেখনীতে সবকিছু স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ, যা পাঠকদের মূল সুরটি ধরতে সাহায্য করে। অধ্যায়ের শেষের ওই কয়েকটি বাক্যেই গল্পের গতিপথ আবার তার মূল লক্ষ্যের দিকে ফিরে এসেছে, ফলে পাঠকদের বুঝতে আর কোনো অসুবিধা হয় না। সত্যিই, এমন নিপুণ বিন্যাস কেবল একজন সিদ্ধহস্ত লেখকের পক্ষেই সম্ভব।
তৃতীয় অধ্যায়: বৃদ্ধ পণ্ডিতের ভুল নির্বাচন এবং সুন্দরী কন্যার নিরুত্তাপ প্রেম
গুফেং সন্ন্যাসীকে বিদায় জানিয়ে পথ চলতে চলতে ওয়েই ইয়াংশেং বিড়বিড় করে অভিযোগ করতে লাগলেন, “এ কেমন আজগুবি কথা! আমি মাত্র কুড়ি বছরের টগবগে যুবক, আমার জীবন যেন এক সদ্য ফোটা ফুল। আর আমাকে কিনা এখনই সন্ন্যাস নিয়ে কষ্ট করতে বলা হচ্ছে? পৃথিবীতে এমন পাষাণ হৃদয়ের মানুষ আর আছে কি? আমি আজ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম এই ভেবে যে, তিনি একজন বিখ্যাত পণ্ডিত ও সন্ন্যাসী; তাঁর কাছে নিশ্চয়ই কোনো উচ্চমার্গীয় দর্শন পাব, তাঁর ধ্যানের কৌশল জেনে আমার সাহিত্যিক চিন্তাভাবনাকে আরও শাণিত করব।
কিন্তু কে জানত যে আমি সেখানে কেবল অবহেলাই পাব? উপহার হিসেবে তিনি আমাকে দিলেন এক ‘কচ্ছপের শ্লোক’—যা কিনা আমার পৌরুষের প্রতি বিদ্রূপ! আমি কি এটি মেনে নিতে পারি? আমি একজন বলিষ্ঠ পুরুষ। আজ যদি আমি কোনো রাজকর্মচারী হতাম, তবে আমি বিশ্ব শাসন করতাম, লক্ষ লক্ষ মানুষকে আমার কথায় ওঠাতাম-বসাতাম। আর আমি কি আমার নিজের স্ত্রীকে সামান্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব না?
আমি এখন এক সুন্দরী নারীর সন্ধান পেয়েছি, তাকে আমি কিছুতেই হাতছাড়া করব না। আমি কিছু ‘কামজ পাপ’ করব ঠিকই, কিন্তু আমার বাড়ির দরজা শক্ত করে বন্ধ রাখব। দেখব, কোন পুরুষ আমার ঋণ শোধ করতে বা আমার স্ত্রীর দিকে হাত বাড়াতে সাহস পায়! তাছাড়া, আমার মতো এমন সুদর্শন স্বামীকে পেলে, অন্য কোনো পুরুষ প্রলোভন দেখালেও সে কি তাতে আগ্রহী হবে? আমি নিশ্চিত, সতীত্ব হারানোর কোনো প্রশ্নই উঠবে না।
যুক্তি অনুযায়ী, তিনি যে শ্লোকটি দিয়েছেন তা ছিঁড়ে তাঁর মুখের ওপর ছুঁড়ে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু না, ভবিষ্যতে যদি তাঁর সঙ্গে আবার দেখা হয়, তখন তাঁর মুখ বন্ধ করার জন্য এটিই হবে আমার প্রমাণ। আমি এটি আমার কাছেই রাখব, দেখব পরে তিনি অনুশোচনা করেন কি না।” এই ভেবে তিনি শ্লোকটি ভাঁজ করে সযত্নে কোমরের বেল্টে লুকিয়ে রাখলেন।
বাড়ি ফিরে তিনি তাঁর কয়েকজন সঙ্গীকে ডেকে নির্দেশ দিলেন যেন তারা শহরের সব ঘটকের কাছে খবর পৌঁছে দেয় যে, তিনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী নারীকে খুঁজছেন। ওয়েই ইয়াংশেং ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান, তাঁর রূপ ও গুণ—দুই-ই ছিল চোখে পড়ার মতো। এমন পাত্রকে কে না জামাই হিসেবে পেতে চায়? আর কোন নারীই বা এমন স্বামী পেতে চাইবে না?
খবর ছড়িয়ে পড়ার পর, প্রতিদিন ঝাঁকে ঝাঁকে ঘটক তাঁর কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসতে লাগল। সাধারণ পরিবারের মেয়েদের দেখতে তিনি নিজেই যেতেন। কিন্তু সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েদের ক্ষেত্রে মান-সম্মান বজায় রাখার জন্য মন্দির বা কোনো নির্জন উদ্যানে দেখা করার ব্যবস্থা করা হতো। সেখানে উভয় পক্ষই লোকচক্ষুর আড়ালে ইচ্ছাকৃতভাবে, অথচ যেন ঘটনাচক্রে দেখা করত এবং একে অপরকে ভালো করে দেখে নিত। কত নারী যে তাঁকে এক নজর দেখে প্রেমে পড়ে বাড়ি ফিরল, তার ইয়ত্তা নেই; কিন্তু ওয়েই ইয়াংশেং কাউকেই পছন্দ করলেন না।
অবশেষে এক ঘটক হতাশ হয়ে বললেন, “তোমার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে অন্য কোনো নারী তোমার যোগ্য নয়। কেবল ‘তিফেই তাওরেন’-এর কন্যা ‘ইউসিয়াং’ই একমাত্র তোমার উপযুক্ত হতে পারে। কিন্তু তার বাবা বড়ই অদ্ভুত মানুষ। তিনি কাউকে তাঁর মেয়ে দেখাতে রাজি হবেন না, আর তুমিও না দেখে বিয়ে করবে না। তাই এ বিয়ে অসম্ভব।”
ওয়েই ইয়াংশেং কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তাঁকে কেন ‘তিফেই তাওরেন’ বলা হয়? আর তুমিই বা কী করে জানলে যে তাঁর কন্যা সুন্দরী? যদি সে সুন্দরীই হয়, তবে কেন তিনি কাউকে দেখাতে চান না?”
ঘটক বললেন, “এই বৃদ্ধ একজন বিখ্যাত পণ্ডিত, কিন্তু তিনি সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে নির্জন জীবনযাপন করেন। তাঁর নিজস্ব জমিজমা আছে, তাই তিনি কারো ওপর নির্ভরশীল নন। জীবনে তিনি কোনো বন্ধু বানাননি, সারাদিন একাই বাড়িতে বসে বই পড়েন। কেউ তাঁর দরজায় কড়া নাড়লে তিনি তো খোলেনই না, এমনকি উত্তরও দেন না।
একবার এক সম্ভ্রান্ত অতিথি তাঁর পাণ্ডিত্যের কথা শুনে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি দীর্ঘক্ষণ দরজায় কড়া নাড়লেন, কিন্তু কোনো সাড়া পেলেন না। অগত্যা সেই অতিথি হতাশ হয়ে দরজার ওপর একটি কবিতা লিখে চলে এলেন। কবিতার দুটি লাইন ছিল এমন:
‘জানি এ তো কেবল পণ্ডিতের পর্ণকুটির, কে জানত, শিক্ষকের দ্বার যেন লোহার প্রাচীর!‘
পরবর্তীতে বৃদ্ধ কবিতাটি দেখে বললেন, ‘তিফেই (লোহার দ্বার) শব্দটি তো ভুল নয়!’ সেই থেকে তিনি এই উপাধি গ্রহণ করে নিজেকে ‘তিফেই তাওরেন’ বলে ডাকতে শুরু করলেন। তাঁর কোনো পুত্রসন্তান নেই, কেবল একটি কন্যা আছে—যে ফুলের মতো সুন্দরী, যার কোনো তুলনা চলে না। সে অনেক বইও পড়েছে, সবই তার বাবার কাছে শেখা। সে কবিতা ও গান রচনা করতে পারে।
তাদের বাড়ির অন্দরমহলের নিয়ম বড়ই কঠোর। বাড়ির মেয়েরা মন্দিরে যায় না, বাইরে বের হয় না। ষোলো বছর বয়স পর্যন্ত সে কখনো বাড়ির চৌকাঠ মাড়ায়নি, এমনকি কোনো বৃদ্ধা মহিলাও তাদের বাড়িতে প্রবেশ করার অধিকার পায় না।
গতকাল সেই বৃদ্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি ঘটক?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’ তখন তিনি আমাকে ভেতরে ডেকে তাঁর কন্যার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘এটি আমার কন্যা। আমি এমন এক উপযুক্ত পাত্র খুঁজছি যে আমার নিজের ছেলের মতো বৃদ্ধ বয়সে আমাকে দেখভাল করবে। তুমি দয়া করে আমার জন্য একজন ভালো পাত্র খুঁজে দাও।’
আমি তখন আপনার কথা বললাম। তিনি বললেন, ‘আমি তাঁর প্রতিভার কথা শুনেছি, কিন্তু তাঁর চরিত্র কেমন?’ আমি বললাম, ‘তিনি বয়সে তরুণ হলেও জ্ঞানে প্রবীণ, কোনো দোষ নেই। তবে একটা সমস্যা হলো, তিনি নিজে পাত্রীকে দেখে পছন্দ না করা পর্যন্ত বিয়ে করতে রাজি নন।’
এই কথা শুনে তাঁর মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। তিনি রেগে বললেন, ‘কী স্পর্ধা! কেবল ইয়াংঝৌ-এর পতিতারা নিজেদের দেহ দেখানোর জন্য পুরুষের সামনে আসে। কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা কীভাবে বিয়ের আগে পুরুষের সঙ্গে দেখা করতে পারে?’ তাঁর এই কঠিন কথা শুনে আমি আর কিছু বলতে সাহস পাইনি, তাই চলে এসেছি। সুতরাং আমি জানি যে এই বিয়ে কিছুতেই সম্ভব নয়।”
ওয়েই ইয়াংশেং সব শুনে মনে মনে ভাবলেন, “আমার এখন কোনো বাবা-মা নেই, ভাই-ও নেই। আগামীকাল বিয়ে করলে কে আমাকে শাসন করবে? এমনকি আমি নিজেও যদি সারাক্ষণ স্ত্রীকে পাহারা দিই, তবে কি আমি কখনো বাইরে যাব না? এই বৃদ্ধের রক্ষণশীলতা তো শাপেবর! আমি যদি ঘরজামাই হয়ে তাঁর বাড়িতে থাকি, তবে আমাকে স্ত্রীর সতীত্ব নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। তাঁর নিজের কন্যাকে তিনি নিজেই চোখে চোখে রাখবেন। আমি সারাজীবন বাইরে থাকলেও কোনো অঘটন ঘটবে না।
কিন্তু সমস্যা হলো, নিজে চোখে না দেখলে আমার মন কিছুতেই শান্ত হবে না। ঘটকের কথায় কীভাবে বিশ্বাস করি?” তাই তিনি ঘটককে বললেন, “তোমার কথা অনুযায়ী, এই বিয়েটি আমার জন্য খুবই সুবিধাজনক। কিন্তু তুমি দয়া করে এমন একটা উপায় বের করো যাতে আমি অন্তত একঝলক তাকে দেখতে পাই। যদি মোটামুটি ভালো হয়, তবেই আমি রাজি হব।”
ঘটক বললেন, “এটা একেবারেই অসম্ভব। যদি আমার কথায় বিশ্বাস না হয়, তবে আপনি লটারি বা ভাগ্য গণনা করে দেখতে পারেন, কিংবা দেবতার কাছে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। যদি কপালে বিয়ে থাকে তবে হবে, না হলে হবে না।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “এ কথা মন্দ বলোনি। আমার এক বন্ধু আছে, যে দেবতার কাছে ‘প্ল্যানচেট’ বা দৈববাণীর মাধ্যমে বিচার চাইতে পারে এবং তা অত্যন্ত কার্যকর। আমি তাকে ডেকে বিচার করিয়েই তোমাকে চূড়ান্ত উত্তর দেব।” ঘটক রাজি হয়ে চলে গেলেন।
পরের দিন ওয়েই ইয়াংশেং উপবাস ও স্নান সেরে শুদ্ধ হয়ে, দেবতার কাছে বিচার চাওয়ার জন্য তাঁর সেই বন্ধুকে বাড়িতে নিয়ে এলেন। তিনি ধূপ জ্বেলে অবনত মস্তকে নিচু স্বরে প্রার্থনা করলেন:
“হে মহাদেবী, আপনার এই অধম শিষ্য অন্য কোনো কিছুর জন্য নয়, কেবল তিফেই তাওরেন-এর কন্যা ইউসিয়াং-এর জন্য আপনার শরণাপন্ন। শুনেছি সে অতুলনীয় সুন্দরী। আমি তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে চাই, কিন্তু সবই শোনা কথা, নিজে চোখে দেখিনি। তাই আপনার কাছে সত্য জানতে চাই। যদি সে সত্যিই অপরূপা হয়, তবে শিষ্য তাকে গ্রহণ করবে, নতুবা প্রত্যাখ্যান করবে। কৃপা করে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিন, কোনো হেঁয়ালির আশ্রয় নেবেন না, যাতে শিষ্য বিভ্রান্ত না হয়।”
প্রার্থনা শেষে তিনি পুনরায় চারবার প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালেন এবং ‘ফুগি’ (বালির ওপর দৈববাণীতে লেখা অক্ষর) বা দৈবকলম ধরে লেখার অপেক্ষায় রইলেন। সত্যই, বালির ওপর একটি কবিতার চারটি লাইন ফুটে উঠল:
“রক্তিম পুষ্পদলে সেই তো প্রথমা, ভূত বা দেবতার নেই কোনো সংশয়। ভয় শুধু, তার রূপে জাগিবে কামনা, ভালো-মন্দের সন্ধিক্ষণে জেনো পরিচয়।”
এটি ছিল প্রথম শ্লোক।
ওয়েই ইয়াংশেং লেখাটি দেখে মনে মনে ভাবলেন, “এর মানে তার রূপের প্রশংসা করা হয়েছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু শেষের বাক্যটি—’তার রূপ কামুকতাকে প্রলুব্ধ করবে’—এটা কি তবে কোনো ইঙ্গিত? তবে কি এই নারী ইতিমধ্যেই কুমারীত্ব হারিয়েছে? কবিতার শেষে ‘প্রথম শ্লোক’ লেখা আছে, তার মানে নিশ্চয়ই আরও একটি শ্লোক আসার বাকি। দেখা যাক পরেরটি কী বলে।”
কিছুক্ষণ বিরতির পর দৈবকলম আবার নড়ে উঠল এবং আরও চারটি বাক্য লিখল:
“সতী বা কামুক, সে তো নারীর দোষ নয়, পুরুষই তো রচিবে তার সংসারের আলয়। লোহার দুয়ার যদি রুদ্ধ থাকে সদা, নীল মাছি কোথা হতে ফেলিবে সেথায় দাগ?”
এটি ছিল দ্বিতীয় শ্লোক, আর নিচে স্বাক্ষরে লেখা ছিল—’তাওরেন’।
‘তাওরেন’ নামটি দেখে ওয়েই ইয়াংশেং বুঝলেন যে এটি স্বয়ং অমর ঋষি ‘লু চুনইয়াং’-এর ছদ্মনাম। তাঁর মনে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। তিনি ভাবলেন, “এই ভদ্রলোক মদ ও নারী—উভয় বিষয়েই অত্যন্ত অভিজ্ঞ। তিনি যখন ভালো বলেছেন, তখন নিশ্চয়ই মেয়েটি ভালো হবে।
আর দ্বিতীয় শ্লোকটি আমার মনের সন্দেহ দূর করার জন্যই লেখা হয়েছে, আমাকে কেবল সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। আমি মনে করি আমার এই রক্ষণশীল শ্বশুরমশাই আমাকে কড়া শাসনে রাখবেন, তাই চিন্তার কোনো কারণ নেই। শেষের দুটি বাক্য তো স্পষ্টই বলছে যে, তাঁর ওই ‘লোহার দরজার’ ভেতর বাইরের কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। সুতরাং আর সন্দেহের অবকাশ নেই।”
তিনি শূন্যে লু চুনইয়াং-কে ধন্যবাদ জানিয়ে ঘটককে ডেকে পাঠালেন। তাঁকে বললেন, “দেবতার দৈববাণী খুবই ইতিবাচক হয়েছে। এখন আর কোনো লুকোছাপার প্রয়োজন নেই, তুমি সোজাসুজি বিয়ের প্রস্তাব দাও।”
ঘটক মহাখুশি হয়ে তিফেই তাওরেন-এর বাড়িতে গেলেন এবং ওয়েই ইয়াংশেং-এর বিয়ের প্রস্তাবের কথা জানালেন। কিন্তু তাওরেন বললেন, “সে প্রথমে মেয়েকে দেখতে চেয়েছিল, এর মানে সে চরিত্র বা গুণের চেয়ে রূপকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। তার মনের অস্থিরতা এতেই বোঝা যায়। আমি একজন চরিত্রবান জামাই চাই, এমন চঞ্চলমতি কাউকে চাই না।”
ঘটক বিয়ের ঘটকালির টাকা পাওয়ার লোভে চতুরতার সঙ্গে উত্তর দিলেন, “সে মেয়েকে দেখতে চেয়েছিল কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়। তার ভয় ছিল, যদি মেয়ের চালচলন হালকা হয় বা অলক্ষুণে হয়, তবে ভবিষ্যতে তার ভাগ্যে স্ত্রী-সুখ জুটবে না। কিন্তু এখন আপনার বাড়ির কঠোর নিয়মকানুন এবং আপনার কন্যার সুশিক্ষার কথা জানতে পেরে তার মন শান্ত হয়েছে। তাই সে বিশেষভাবে আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পাঠিয়েছে।”
তাওরেন ঘটকের কথা যুক্তিযুক্ত মনে করলেন এবং শেষ পর্যন্ত বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হলেন। শুভ দিনক্ষণ দেখে বিয়ের আয়োজন করা হলো।
যদিও ওয়েই ইয়াংশেং ঘটকের কথা শুনেছিলেন এবং দেবতার বাণীতে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন, তবুও নিজের চোখে না দেখার কারণে তাঁর মনের কোণে একটা খচখচানি লেগেই ছিল।
অবশেষে বাসর রাতে, যাবতীয় লোকাচার শেষে তাঁরা যখন নির্জন শয়নকক্ষে প্রবেশ করলেন, তখন তিনি নববধূর মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আশ্বস্ত হলেন। তাঁর মুখে হাসি ফুটল।
নববধূর রূপ কেমন ছিল? একটি নতুন কবিতাই তার প্রমাণ:
“রমনী সুন্দরী অতি, সর্বাঙ্গ আর আনন, যেন মূর্তিমতী সুষমা, লাবণ্যের কানন। বিষাদেও অপরূপ, মুখ ভারেও শোভন, ভ্রূ-কুটিলে রোষেও সে হরে সবার মন।”
এটি ‘ই কিউ চিন ই’ সুরের ওপর রচিত।
আর নবদম্পতির সেই প্রথম মিলনের আনন্দ কেমন ছিল? তারও প্রমাণ একটি কবিতায়:
“তারার মতো আঁখি দুটি, মুদলে তবু চায়, বালিশে যেন দুটি পিচ ফুল, পাপড়ি মেলে রয়। সুগন্ধি সেই ওষ্ঠাধর, রোধিতে চাহিলেও, জিহ্বার পরশে বাঁধ ভাঙে, শিহরন জাগায়। কান্না থামলে সোহাগ বাড়ে, ভালোবাসার নাই শেষ, কোমল বুকে বিন্দু বিন্দু, কামের স্বেদ-আবেশ। চারটি নয়ন মেলে যখন, দুজনে দুজন পানে চায়, দুটি হৃদয় জ্বলে যেন, তপ্ত চুল্লির শিখায়।”
এটি ‘ইউ লুও চুন’ সুরের ওপর রচিত।
তবে ইউসিয়াং যদিও রূপের ডালি সাজিয়ে বসেছিলেন, তাঁর মধ্যে কামকলার বড়ই অভাব ছিল। এক-দুটি বিষয় স্বামীর একেবারেই পছন্দ হলো না। কারণ তাঁর বাবার কঠোর শাসন আর মায়ের কড়া নজরদারিতে বড় হওয়ায়, তিনি কোনোদিন কোনো অশ্লীল কথা শোনেননি, কোনো মন্দ দৃশ্য দেখেননি। তিনি কেবল ‘লিয়ে নু চুয়ান’ (সতী সাধ্বী নারীদের জীবনী) বা ‘নু শিয়াও চিং’ (নারীদের কর্তব্য)-এর মতো নীতিমূলক বই পড়েছেন। ফলে তাঁর চিন্তা-চেতনা ছিল ওয়েই ইয়াংশেং-এর কামুক মনের সম্পূর্ণ বিপরীত।
তাঁর চালচলনও ছিল অবিকল তাঁর বাবার মতো, তাই স্বামী তাঁকে ঠাট্টা করে ‘নারী পণ্ডিত’ বলে ডাকতেন। তাঁকে কোনো কামোদ্দীপক বা আদিরসাত্মক কথা বললেই লজ্জায় তাঁর মুখ লাল হয়ে যেত এবং তিনি সেখান থেকে উঠে চলে যেতেন।
ওয়েই ইয়াংশেং দিনের বেলায় কামশয্যায় মিলিত হতে খুব পছন্দ করতেন। তিনি উত্তেজনা বাড়ানোর জন্য স্ত্রীর গোপন অঙ্গ দেখতে চাইতেন। কিন্তু কয়েকবার তিনি যখন স্ত্রীর নিম্নাঙ্গের পোশাক খুলতে গেলেন, স্ত্রী এমনভাবে চিৎকার করে উঠলেন যেন তাঁকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হচ্ছে! অগত্যা ওয়েই ইয়াংশেং-কে থামতে হতো।
রাতের বেলাতেও যখন মিলন হতো, তা ছিল নেহাতই কর্তব্য পালনের মতো—অনিচ্ছাকৃত এবং নিরুত্তাপ। সহবাসের পদ্ধতিতেও স্ত্রী কেবল চিরাচরিত ‘মধ্যপন্থা’ বা সাধারণ নিয়মই মেনে চলতেন, নতুন কোনো আসন বা কায়দা-কানুন চেষ্টা করতে তিনি কিছুতেই রাজি হতেন না।
ওয়েই ইয়াংশেং যদি “পাহাড় থেকে আগুন নেওয়া” (নারীর ওপর থেকে মিলন) ভঙ্গি করতে চাইতেন, স্ত্রী বলতেন—”এ তো স্বামীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার শামিল!”
যদি “উল্টো মোমবাতি জ্বালানো” (বিপরীত রতি) করতে চাইতেন, স্ত্রী বলতেন—”এতে স্বামীর কর্তৃত্ব লঙ্ঘন হয়।”
তাঁর দুটি পা কাঁধে তুলতেও অনেক সাধ্যসাধনা করতে হতো। আর চরম আনন্দের মুহূর্তেও তিনি কোনো শব্দ করতেন না, চিৎকার করতেন না—যা পুরুষের পৌরুষকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাঁকে ‘আমার জান, আমার প্রাণ’ বলে আদর করলেও তিনি বোবা নারীর মতো চুপ করে থাকতেন, কোনো উত্তর দিতেন না।
ওয়েই ইয়াংশেং নববধূর মধ্যে ভালোবাসার সেই উত্তাপ বা প্রাণবন্ততা না দেখে মনে মনে বড়ই কষ্ট পেলেন। তিনি ভাবলেন, “এর শিক্ষা বড় একঘেয়ে। আমি এখন কিছু বিশেষ কৌশলে ওকে নতুন করে গড়ে তুলব।”
পরদিন তিনি সোজা এক বিখ্যাত চিত্রকর্মের দোকানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। সেখান থেকে তিনি কিনে আনলেন ‘শুনগং মি শি’ বা ‘বসন্ত প্রাসাদের গোপন ইতিহাস’—নামে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দুর্লভ কামশাস্ত্রের চিত্রপুঁথি। কথিত আছে, এটি বিখ্যাত চিত্রকর ঝাও জিয়াং-এর নিজের হাতে আঁকা। তাতে মোট ছত্রিশটি চিত্র ছিল, যা তাং যুগের কবিতার ‘ছত্রিশটি বসন্ত প্রাসাদের’ রূপক অর্থে অঙ্কিত।
তিনি মনে মনে ঠিক করলেন, এটি বাড়ি নিয়ে গিয়ে ইউসিয়াং-এর সঙ্গে বসে দেখবেন। এতে বধূ বুঝতে পারবে যে নারী-পুরুষের মিলনের এই বিচিত্র পদ্ধতিগুলো তাঁর নিজের মনগড়া নয়, বরং প্রাচীনকাল থেকেই সম্ভ্রান্তরা এর চর্চা করে আসছেন—যার প্রমাণ হিসেবে ঝাও জিয়াং-এর এই অমর শিল্পকর্ম তো চোখের সামনেই আছে।
ইউসিয়াং যখন বইটি প্রথম হাতে নিলেন, তিনি জানতেন না এর ভেতরে কী রহস্য লুকিয়ে আছে। তিনি সরল মনে পাতা উল্টাতে লাগলেন। প্রথম দুটি পৃষ্ঠায় বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল ‘হান গং ই ঝাও’ (হান প্রাসাদের রেখে যাওয়া ছবি)। ইউসিয়াং ভাবলেন, “হান প্রাসাদে তো অনেক গুণবতী রানী ও উপপত্নী ছিলেন, এ নিশ্চয়ই তাঁদেরই প্রতিকৃতি। দেখি তো, তাঁদের রূপ কেমন ছিল।”
কিন্তু তৃতীয় পৃষ্ঠায় আসতেই তাঁর চক্ষু চড়কগাছ! ছবিতে দেখা গেল, এক কৃত্রিম পাহাড়ের ওপর এক উলঙ্গ পুরুষ এক নারীকে জড়িয়ে ধরে সঙ্গমে লিপ্ত। লজ্জায় তাঁর মুখ টকটকে লাল হয়ে গেল। তিনি উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, “ছি ছি! এমন অশুভ জিনিস তুমি কোথা থেকে আনলে? এ তো আমাদের ঘরের পবিত্রতা নষ্ট করছে! এক্ষুনি দাসীকে ডেকে এটা পুড়িয়ে ফেলো।”
ওয়েই ইয়াংশেং তাড়াতাড়ি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “আরে করো কী! এ এক প্রাচীন শিল্পকর্ম, এর দাম একশ স্বর্ণমুদ্রা। আমি এক বন্ধুর কাছ থেকে চেয়ে এনেছি। যদি তুমি এর দাম হিসেবে একশ স্বর্ণমুদ্রা দিতে পারো তবে পুড়িয়ে ফেলো। আর যদি না পারো, তবে এটি যত্ন করে রাখো। আমি দু-একদিন দেখে তারপর ফেরত দেব।”
ইউসিয়াং বললেন, “কিন্তু এমন অলক্ষুণে জিনিস দেখে লাভটা কী?”
ওয়েই ইয়াংশেং বোঝালেন, “যদি এটি সত্যিই অশুভ হতো, তবে কি কোনো শিল্পী এত যত্ন করে আঁকতেন? আর সংগ্রাহকরাই বা এত চড়া দামে কিনতেন? সৃষ্টির শুরু থেকেই নারী-পুরুষের মিলন হলো প্রথম পবিত্র কাজ। তাই সাহিত্যিকরা একে রঙ-তুলিতে ফুটিয়ে তোলেন, রেশম দিয়ে বাঁধাই করেন এবং সযত্নে সংগ্রহে রাখেন—যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
তা না হলে, মিলনের সঠিক নীতিগুলো কালক্রমে হারিয়ে যাবে। স্বামী স্ত্রীকে ত্যাগ করবে, স্ত্রী স্বামীকে ছেড়ে যাবে। সৃষ্টির ধারা বন্ধ হয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত মানবজাতিই বিলুপ্ত হবে। আজ আমি এটি এনেছি কেবল নিজের দেখার জন্য নয়, তোমাকে শেখানোর জন্যও। যাতে তুমি গর্ভধারণ ও সন্তান উৎপাদনের এই চমৎকার কৌশলগুলো সম্পর্কে জানতে পারো এবং তোমার বাবার সেই সেকেলে শিক্ষার কারণে ভুল পথে পরিচালিত না হও। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের কোনো ক্ষতি হোক, তা আমি চাই না। এতে রাগ করার কী আছে?”
ইউসিয়াং বললেন, “আমি বিশ্বাস করি না যে এটা কোনো ভালো কাজ। যদি এটা সত্যিই ভালো কাজ হতো, তবে প্রাচীনকালে যারা নিয়মকানুন তৈরি করেছিলেন, তারা কেন মানুষকে দিনের আলোয় সবার সামনে এটা করতে শেখাননি? কেন সবাই চোরের মতো রাতের আঁধারে, লোকচক্ষুর আড়ালে এই কাজ করে? এতেই বোঝা যায় যে এটা কোনো সৎ কাজ নয়।”
ওয়েই ইয়াংশেং হেসে বললেন, “তোমার কথায় যুক্তি আছে, কিন্তু এতে তোমার কোনো দোষ নেই। সব দোষ তোমার বাবার। তিনি তোমাকে সারাজীবন ঘরের কোণে আটকে রেখেছেন, তোমার কোনো অভিজ্ঞ সখী বা বান্ধবীও ছিল না যে তোমাকে কামতত্ত্ব বা রতিশাস্ত্র সম্পর্কে কিছু বলবে। তাই তুমি এত সহজ সরল আর মানুষের স্বভাব সম্পর্কে কিছুই জানো না।
একটু ভেবে দেখো তো, পৃথিবীর কোন স্বামী-স্ত্রী দিনের আলোয় মিলিত হয় না? কোন কাজটা গোপনে করা হয় না যাতে মানুষ জানতে পারে? যদি স্বামী-স্ত্রী দিনের আলোয় মিলন না করত, তবে এই চিত্রকর জানলেন কী করে? কীভাবে তিনি এত নিখুঁতভাবে এই ভঙ্গিগুলোর বর্ণনা দিলেন, যা দেখলেই শরীরের রক্ত গরম হয়ে ওঠে?”
ইউসিয়াং পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “তাহলে আমার বাবা-মা কেন দিনের আলোয় এসব করেন না?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, তুমি জানলে কী করে যে তোমার বাবা-মা দিনের আলোয় মিলন করেন না?”
ইউসিয়াং বললেন, “যদি করতেন, তবে আমি নিশ্চয়ই দেখতাম। ষোলো বছর বয়স পর্যন্ত আমি তো একবারও তাঁদের এমন কিছু করতে দেখিনি, এমনকি কানেও শুনিনি।”
ওয়েই ইয়াংশেং হো হো করে হেসে উঠলেন, “কী বোকা মেয়ে তুমি! এই কাজ কি কখনো সন্তানদের সামনে করা হয়? সন্তান ছাড়া বাড়ির দাসী-চাকররা কে না দেখে? কে না শোনে? তাঁরা যখন মিলিত হতে চান, তখন নিশ্চয়ই খেয়াল রাখেন যে তুমি আশেপাশে নেই। দরজা বন্ধ করে তারপর শুরু করেন। যদি তুমি তাঁদের দেখে ফেলতে, তবে পাছে তোমার মনে অকালপক্ক কামভাব জাগে বা তুমি অসুস্থ হয়ে পড়ো—সেই ভয়েই তো তাঁরা তোমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখেন।”
ইউসিয়াং কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “হুঁ, তাঁরা দিনের বেলাতেও প্রায়ই দরজা বন্ধ করে ঘুমান। হয়তো তখন এই কাজই করেন। কিন্তু তবুও, এমন লজ্জাজনক কাজ! তুমি আমাকে দেখছ আর আমি তোমাকে দেখছি—এভাবে কি আর এটা করা যায়?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “শোনো প্রিয়ে, দিনের আলোর মিলন রাতের চেয়ে দশগুণ বেশি আনন্দদায়ক। এর আসল মজাটাই হলো—আমি তোমাকে দেখব আর তুমি আমাকে দেখবে, তবেই তো উত্তেজনা চরমে পৌঁছাবে। পৃথিবীতে কেবল দুই ধরনের দম্পতি দিনের আলোয় মিলিত হতে পারে না।”
ইউসিয়াং জানতে চাইলেন, “কোন দুই ধরনের দম্পতি?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “এক, যদি কুৎসিত স্বামীর সুন্দরী স্ত্রী থাকে। আর দুই, যদি সুন্দরী স্ত্রীর স্বামী কুৎসিত হয়।”
ইউসিয়াং অবাক হয়ে বললেন, “কেন? তারা কেন দিনের আলোয় পারে না?”
ওয়েই ইয়াংশেং ব্যাখ্যা করলেন, “দেখো, মিলনের সময় তোমাকে আমাকে ভালোবাসতে হবে আর আমাকে তোমাকে ভালোবাসতে হবে—তবেই তো আত্মা আর রক্ত এক হয়ে চরম সুখ পাওয়া যাবে। ধরো, স্ত্রীর গায়ের রঙ বরফের মতো ফর্সা, ত্বক রত্নের মতো মসৃণ ও কোমল। স্বামী যখন তার কাপড় খুলে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে মিলন শুরু করে, তখন তার উত্তেজনা স্বাভাবিকভাবেই দশগুণ বেড়ে যায়। পুরুষের লিঙ্গ তখন অজান্তেই আরও শক্ত, আরও স্থূল এবং দীর্ঘ হয়ে ওঠে।
কিন্তু যদি সেই নারী তার স্বামীকে দেখে দানবের মতো মনে করে? স্বামীর গায়ের রঙ যদি কালো আর চামড়া খসখসে হয়? কাপড় পরা অবস্থায় হয়তো বোঝা যায় না, কিন্তু উলঙ্গ হলে তার কদাকার চেহারা আর লুকানো থাকে না। ফর্সা স্ত্রীর পাশে তাকে আরও বিশ্রী দেখায়। তখন স্ত্রীর মনে কি ঘৃণা জন্মাবে না? মনে ঘৃণা থাকলে তা আচরণে প্রকাশ পাবেই। আর তা দেখলে পুরুষের কামদণ্ড—তা যতই শক্ত হোক না কেন—মুহূর্তেই নুয়ে পড়বে। তখন আনন্দের বদলে কেবল অপমানই জুটবে। তার চেয়ে তাদের জন্য রাতের অন্ধকারই ভালো, যাতে সব খুঁত ঢাকা পড়ে যায়।
তোমার আর আমার মতো দম্পতির কথা আলাদা। আমরা দুজনেই ফর্সা, দুজনেই সুন্দর। আমাদের যদি দিনের আলোয় একে অপরের সৌন্দর্য দেখে আনন্দ না হয়, তবে এই রূপ-যৌবনের কী দাম? সারাজীবন যদি কম্বলের নিচে অন্ধের মতো হাতড়েই কাটাই, তবে কুৎসিত দম্পতির সঙ্গে আমাদের পার্থক্য কী রইল? যদি আমার কথায় বিশ্বাস না হয়, তবে এসো, একবার পরীক্ষা করে দেখি—রাতের চেয়ে এর স্বাদ কেমন!”
ওয়েই ইয়াংশেং-এর এই যুক্তি শুনে ইউসিয়াং-এর মনের বরফ গলতে শুরু করল। মুখে কিছু না বললেও তাঁর গাল দুটো লজ্জায় আর উত্তেজনায় রাঙা হয়ে উঠল, যা তাঁর সুপ্ত কামনারই বহিঃপ্রকাশ।
ওয়েই ইয়াংশেং বুঝলেন, কাজ হয়েছে। তিনি চাইলেন তখনই মিলনে লিপ্ত হতে, কিন্তু ভাবলেন—এই তো সবে তার মনে কামনার আগুন জ্বলেছে, এখনো তা দাউদাউ করে জ্বলেনি। এখন যদি তাড়াহুড়ো করি, তবে তা হবে ক্ষুধার্ত মানুষের মতো খাবার না চিবিয়ে গিলে ফেলার শামিল—তাতে আসল স্বাদ পাওয়া যাবে না। বরং তাকে আরও কিছুক্ষণ ‘কষ্ট’ দেওয়া যাক, তার তৃষ্ণা আরও বাড়ুক।
তিনি একটি বড় কেদারা টেনে তাতে আরাম করে বসলেন এবং ইউসিয়াং-কে নিজের কোলে বসালেন। তারপর সেই কামশাস্ত্রের বইটি খুলে এক এক করে ছবি দেখাতে শুরু করলেন। বইটি সাধারণ কোনো বই ছিল না; প্রতিটি পাতার একপাশে ছিল রঙিন কামচিত্র বা রতিভঙ্গিমা, আর অন্যপাশে ছিল তার কাব্যিক ব্যাখ্যা বা টীকা। টীকার প্রথম কয়েক ছত্রে ছবির পরিস্থিতি বর্ণনা করা হয়েছে, আর শেষের দিকে শিল্পীর নিপুণতার প্রশংসা করা হয়েছে।
ওয়েই ইয়াংশেং প্রতিটি ছবি দেখিয়ে তাকে কল্পনা করতে শেখালেন, যাতে ভবিষ্যতে সে নিজে থেকেই এই ভঙ্গিগুলো অনুকরণ করতে পারে। তিনি প্রতিটি ব্যাখ্যা পড়ে শোনাতে লাগলেন:
প্রথম ছবি: ভ্রমরের পুষ্পমধু অন্বেষণ টীকা: নারী ‘তাইহু’ পাথরের ওপর বসে আছে, তার দুই পা প্রশস্ত। পুরুষ তার হাত দিয়ে ‘জেড দণ্ড’ বা লিঙ্গটিকে যোনির মুখে স্থাপন করে ডানে-বায়ে নাড়াচাড়া করছে—যেন ফুলের সঠিক কেন্দ্রটি খুঁজে বের করছে। এই পর্যায়ে নারী-পুরুষ উভয়েই প্রাথমিক স্তরে আছে, এখনো চূড়ান্ত আনন্দের সাগরে ডোবনি। তাই তাদের চোখ খোলা, আর মুখের ভাবও স্বাভাবিক।
দ্বিতীয় ছবি: মৌমাছির মধুচক্র নির্মাণ টীকা: নারী নরম বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। তার দুই হাত বিছানায় শক্তভাবে রাখা, আর দুই পা শূন্যে ভাসমান—যেন পুরুষের আগমনকে স্বাগত জানাচ্ছে। সে পুরুষকে পথ দেখাচ্ছে যাতে সে ভুল পথে না গিয়ে সোজা ‘ফুলের গভীরে’ প্রবেশ করতে পারে। এই সময় নারীর অনুভূতি এক ক্ষুধার্ত মানুষের মতো, আর পুরুষের মুখে কিছুটা শঙ্কা আর উত্তেজনার ছাপ—যা দর্শকদের মনেও এক অদ্ভুত শিহরণ জাগায়। সত্যিই, চিত্রকরের কী অসাধারণ দক্ষতা!
তৃতীয় ছবি: পথহারা পাখির নীড়ে ফেরা টীকা: নারী কারুকার্যময় শয্যায় হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। তার দুটি পা আকাশের দিকে উঁচানো, আর দুই হাত দিয়ে সে পুরুষের দুই পা জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে। মনে হচ্ছে চূড়ান্ত আনন্দের ঢেউ লাগতে শুরু করেছে, আবার পরমুহূর্তেই যেন হারিয়ে যাওয়ার ভয়! উভয় পক্ষই এই মুহূর্তে কঠোর পরিশ্রমে লিপ্ত, দৃশ্যটি বড়ই জীবন্ত। রঙ আর তুলির কী জাদুকরী খেলা!
চতুর্থ ছবি: ক্ষুধার্ত অশ্বের আহারের দিকে ধাবমান টীকা: নারী বিছানায় শুয়ে দুই হাত দিয়ে পুরুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে—যেন তাকে শেকলে বেঁধে রেখেছে। পুরুষ তার কাঁধ দিয়ে নারীর দুই পা আটকে রেখেছে। তার ‘জেড দণ্ড’ বা লিঙ্গটি সম্পূর্ণরূপে যোনির গভীরে প্রবেশ করেছে, এক চুল পরিমাণও বাইরে নেই। এই মুহূর্তে নারী-পুরুষ উভয়েই প্রায় চরম শিখরে পৌঁছে গেছে। তাদের চোখ আধবোজা, জিভ যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে আবার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে—দুজনের মুখেই একই আবেশের ছাপ। ধন্য চিত্রকরের লেখনী!
পঞ্চম ছবি: দুই ড্রাগনের ক্লান্ত দ্বৈরথ টীকা: নারীর মাথা বালিশের একপাশে এলিয়ে পড়েছে, দুই হাত অবশ হয়ে পড়ে আছে—যেন তুলোর মতো নরম। পুরুষের মাথাও নারীর কাঁধের কাছে ঢলে পড়েছে, তার শরীরও শিথিল, যেন শক্তি নিঃশেষিত। এটি চরম আনন্দের বা স্খলনের পরবর্তী অবস্থা। মনে হচ্ছে তাদের আত্মা শরীর ছেড়ে কোনো সুগন্ধি রাজ্যে পাড়ি দিয়েছে, সুখের ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছে। প্রবল ঝড়ের পর প্রকৃতির শান্ত রূপ। তবে নারীর দুটি পা এখনো নিচে নামেনি, পুরুষের কাঁধ আর বাহুর মাঝে আটকে আছে—এটুকুই যা প্রাণের লক্ষণ। তা না হলে মনে হতো দুটি মৃতদেহ পাশাপাশি শুয়ে আছে—যা দর্শকদের মনে করিয়ে দেয় যেন তারা একই কফিনে অনন্ত শয্যায় শায়িত।
সেই চিত্রগুলো দেখতে দেখতে ইউসিয়াং-এর অজান্তেই শরীরে কামভাবের শিহরন খেলে গেল। ওয়েই ইয়াংশেং যখন আরও একটি পাতা উল্টে পরের ছবিটি দেখাতে চাইলেন, ইউসিয়াং বইটি আলতো করে ঠেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, “কী অদ্ভুত বই! এসব দেখে আমার কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। তুমি বরং নিজেই দেখো, আমি এখন শুতে যাব।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “আরে, এখনো তো আসল দৃশ্যগুলো দেখাই বাকি! এসো, আমরা একসঙ্গে সব দেখে তারপরই ঘুমাতে যাব।”
ইউসিয়াং একটু ঝাঁঝিয়ে উত্তর দিলেন, “সব আজকেই দেখতে হবে কেন? কাল কি নেই?”
ওয়েই ইয়াংশেং বুঝতে পারলেন যে বধূ আসলে মিলনের জন্য অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। তিনি আলতো করে তাঁকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করলেন। সাধারণত চুম্বনের সময় ইউসিয়াং মুখ শক্ত করে রাখতেন, দাঁতের পাটি খুলতেন না, এমনকি জিভ বের করতে বললেও পারতেন না। দীর্ঘ এক মাস ঘর করেও তিনি জানতেন না স্বামীর জিভ কতটা দীর্ঘ হতে পারে।
কিন্তু এবার যখন ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ালেন, তখন যেন জাদুর স্পর্শে তাঁর জিভ দাঁতের বাধা অতিক্রম করে বেরিয়ে এল। ওয়েই ইয়াংশেং ফিসফিস করে বললেন, “প্রিয়তমা, চলো আমরা বিছানায় না গিয়ে আজ এই বড় কেদারাটিকে ‘কৃত্রিম পাহাড়’ হিসেবে ব্যবহার করি এবং বইয়ের সেই ছবির মতো মিলন উপভোগ করি। কেমন হবে?”
ইউসিয়াং একটু নকল রাগ দেখিয়ে বললেন, “ছি! এটা কি কোনো মানুষের কাজ?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “ঠিক বলেছ, এটা মানুষের কাজ নয়, এটা তো দেব-দেবীদের লীলাখেলা! এসো, আমরা দুজনে আজ এক মুহূর্তের জন্য দেবতা হয়ে যাই।” এই বলে তিনি ইউসিয়াং-এর নিম্নাঙ্গের পোশাকের ফিতা খুলতে শুরু করলেন।
ইউসিয়াং মুখে ‘না’ বললেও হাত দিয়ে বাধা দিলেন না; বরং নিজের হাত স্বামীর কাঁধে রেখে তাঁকে পোশাক খুলতে সাহায্য করলেন। দেখা গেল, তাঁর অন্তর্বাস ইতিমধ্যেই কামরসে ভিজে একাকার—সেই ছবিগুলো দেখার ফলেই এই অবস্থা।
ওয়েই ইয়াংশেং নিজের নিম্নাঙ্গের পোশাকও দ্রুত খুলে ফেললেন। তারপর ইউসিয়াং-কে কেদারায় বসিয়ে তাঁর দুই পা দুই দিকে ফাঁক করে দিলেন এবং নিজের ‘জেড দণ্ড’ বা লিঙ্গটি যোনির গভীরে প্রবেশ করালেন। এরপর তিনি নিজের উপরের পোশাক খুলতে শুরু করলেন।
প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন তিনি প্রথমেই উপরের পোশাক খুললেন না? এর কারণ, ওয়েই ইয়াংশেং ছিলেন কামকলায় অত্যন্ত পারদর্শী। তিনি জানতেন, যদি শুরুতেই তিনি সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হতেন, তবে স্ত্রীর মনে উত্তেজনা থাকলেও লজ্জায় তিনি হয়তো বাধা দিতেন বা ভনিতা করতেন। তাই তিনি আগে ‘দুর্গ’ দখল করে নিলেন—অর্থাৎ মিলনে লিপ্ত হয়ে গেলেন, যাতে বাকি বাধাগুলো নিজে থেকেই সরে যায়। এটি যেন রাজাকে বন্দি করে শত্রুর কেল্লা জয় করার এক নিখুঁত রণকৌশল!
ইউসিয়াং সত্যিই তাঁকে সব পোশাক খুলে ফেলতে দিলেন, কেবল নিজের পায়ের মোজা বা পাদুকা খুললেন না। কেন? কারণ মোজার ভেতরেই পা ঢাকা থাকে। নারীরা যখন পা ছোট রাখার জন্য বাঁধত (Foot binding), তখন কেবল পায়ের নিচের অংশটিই সুন্দর হতো, কিন্তু আঙুলগুলো থাকত কুঁকড়ানো ও অগোছালো—যা দেখতে খুব একটা সুখকর ছিল না। তাছাড়া, সেই তিন ইঞ্চির ছোট পা যখন মোজায় ঢাকা থাকত, তখনই তা পুরুষের কাছে বেশি আকর্ষণীয় লাগত। অন্যথায়, তা দেখাত পাপড়িহীন ফুলের মতো বিবর্ণ। তাই ওয়েই ইয়াংশেং-ও তা খোলার চেষ্টা করলেন না।
নিজের সমস্ত পোশাক খুলে ফেলার পর, তিনি পুরোদমে প্রস্তুত হলেন। স্ত্রীর ছোট পা দুটি কেদারার হাতলে স্থাপন করে, তিনি লিঙ্গটিকে যোনির ভেতরে ডানে-বায়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন—ঠিক যেন কামশাস্ত্রের প্রথম দৃশ্য: ভ্রমরের পুষ্পমধু অন্বেষণ।
কিছুক্ষণ অনুসন্ধানের পর, ইউসিয়াং নিজের হাত সোজা করে কেদারার ওপর রাখলেন এবং নিজের নিতম্ব নাড়িয়ে যোনিকে স্বামীর ছন্দের সঙ্গে মেলাতে শুরু করলেন। লিঙ্গ বামে গেলে তিনি কোমর বামে হেলান, ডানে গেলে ডানে। হঠাৎ এক বিশেষ বিন্দুতে আঘাত লাগতেই তিনি এমন এক অদ্ভুত সুখ অনুভব করলেন—যা না চুলকানি, না ব্যথা; এক অসহ্য অথচ পরম আরামদায়ক অনুভূতি! তিনি ওয়েই ইয়াংশেংকে বললেন, “ওগো, এখন ওভাবেই থাকো, আর ডানে-বায়ে হাতড়ে আমাকে পাগল কোরো না।”
ওয়েই ইয়াংশেং বুঝতে পারলেন যে তিনি ‘ফুলের মর্মস্থল’ খুঁজে পেয়েছেন। তাই তিনি স্ত্রীর কথা মেনে নিয়ে সেই নির্দিষ্ট বিন্দুতেই মনোযোগ দিলেন। অগভীর থেকে গভীর, ধীর থেকে দ্রুত—কয়েকশ বার ওঠানামা চলল। উত্তেজনার বশে ইউসিয়াং-এর হাত অজান্তেই তাঁর নিজের নিতম্বের নিচে চলে গেল এবং উরু দুটিকে ওপরের দিকে তুলে ধরল—যা হুবহু কামশাস্ত্রের দ্বিতীয় দৃশ্যের সঙ্গে মিলে গেল।
ওয়েই ইয়াংশেং তখন স্ত্রীর দুই পা নিজের কাঁধে তুলে নিলেন, দুই হাত দিয়ে তাঁর সরু কোমর জড়িয়ে ধরলেন এবং লিঙ্গটি সম্পূর্ণ ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দিলেন। এই সময় যোনির ভেতরটা আরও ভরাট ও আঁটসাঁট মনে হলো। আরও কয়েকশ বার ঘর্ষণের পর তিনি লক্ষ্য করলেন, ইউসিয়াং-এর চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে, চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, যেন তিনি জ্ঞান হারাতে চলেছেন।
ওয়েই ইয়াংশেং তাঁকে আলতো ধাক্কা দিয়ে বললেন, “প্রিয়তমা, আমি বুঝতে পারছি তুমি চরম মুহূর্তের খুব কাছে। এই শক্ত কেদারায় তোমার কষ্ট হচ্ছে, চলো বিছানায় গিয়ে শেষ করি।”
ইউসিয়াং তখন উত্তেজনার শিখরে, তিনি ভয় পেলেন যে এখন বিছানায় যেতে গেলে লিঙ্গটি বেরিয়ে যাবে এবং তাঁর সমস্ত আনন্দ মাটি হয়ে যাবে। তাছাড়া, তাঁর হাত-পা তখন এতটাই অবশ ও দুর্বল যে নড়াচড়া করার শক্তিও নেই। তাই তিনি চোখ বন্ধ রেখেই মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালেন।
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “ওগো, তুমি কি হাঁটতে পারছ না?” ইউসিয়াং আবার মাথা নাড়লেন।
তখন ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “তবে আমি তোমাকে কোলে করে নিয়ে যাব।” তিনি স্ত্রীর দুই পা নিজের কোমরে জড়িয়ে নিলেন। ইউসিয়াং দুই হাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরলেন এবং তাঁর মুখে নিজের জিভ ঢুকিয়ে দিলেন। ওয়েই ইয়াংশেং তাঁকে কোলে তুলে নিলেন, কিন্তু অবাক করা বিষয়—লিঙ্গটি যোনির ভেতরেই রইল, বের করা হলো না! হাঁটতে হাঁটতেই তিনি কোমরের দোলায় সঙ্গম চালিয়ে যেতে লাগলেন, যেন ঘোড়ায় চড়ে ফুলশয্যায় যাচ্ছেন।
বিছানায় স্ত্রীকে শুইয়ে দিয়ে, তিনি দুই পা আবার কাঁধে তুলে নিলেন এবং নতুন উদ্যমে শুরু করলেন। আরও কয়েকশ বার ওঠানামার পর, ইউসিয়াং হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, “ওগো, আমি আর পারছি না! আমি মরে গেলাম!” তিনি ওয়েই ইয়াংশেংকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলেন এবং মুমূর্ষু রোগীর মতো গোঙাতে লাগলেন। ওয়েই ইয়াংশেং বুঝতে পারলেন যে স্ত্রীর কামরস নির্গত হচ্ছে। তিনিও লিঙ্গটিকে যোনির গভীরে ঠেকিয়ে সজোরে ঘর্ষণ দিলেন এবং স্ত্রীর সঙ্গে সেই পরম সুখের মৃত্যুতে সামিল হলেন।
তাঁরা দুজনে কিছুক্ষণ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে নিথর হয়ে পড়ে রইলেন। জ্ঞান ফেরার পর ইউসিয়াং বললেন, “আমি কি সত্যি সত্যিই মরে গিয়েছিলাম? তুমি কি জানো?”
ওয়েই ইয়াংশেং হেসে বললেন, “আমি জানব না কেন? এটাকে মৃত্যু বলে না, এটাকে বলে ‘হারিয়ে যাওয়া’ বা ‘মূর্ছা যাওয়া’।”
ইউসিয়াং অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “হারিয়ে যাওয়া মানে কী?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “পুরুষের আছে ‘ইয়াং’ রস আর নারীর আছে ‘ইয়ান’ রস। যখন আনন্দের চরম সীমায় পৌঁছানো যায়, তখন সেই রস শরীর থেকে নির্গত হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে সারা শরীরের চামড়া, মাংস আর হাড়গোড় একসাথে শিথিল হয়ে যায়, মানুষ ঘোরের মধ্যে তলিয়ে যায়—যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। একেই বলে ‘হারিয়ে যাওয়া’। সেই কামসূত্রের পঞ্চম দৃশ্যটি ঠিক এমন অবস্থারই ছবি।”
ইউসিয়াং বললেন, “তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, হারিয়ে যাওয়ার পরেও আবার বেঁচে ফিরে আসা যায়। তাহলে তো এটা মৃত্যু নয়! যদি তাই হয়, তবে আজ থেকে আমি প্রতিদিন ‘হারিয়ে যেতে’ চাই, প্রতি রাতে এমন মরতে চাই!”
ওয়েই ইয়াংশেং হেসে বললেন, “আমি কি তোমাকে ভুল কিছু বলেছিলাম? এখন বলো, এই কামসূত্রের বইটি কি সত্যিই এক অমূল্য রত্ন নয়?”
ইউসিয়াং বললেন, “সত্যিই এটি এক অমূল্য রত্ন! ইশ, যদি এটি কিনে নিজের কাছে রাখা যেত! আমার শুধু ভয় হয় পাছে তোমার সেই বন্ধু এসে এটি ফেরত নিয়ে যায়।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “আরে পাগলি, ওটা তো তোমাকে একটু ভয় দেখানোর জন্য বলেছিলাম। আসলে ওটা আমি নিজের টাকা দিয়েই কিনেছি।”
এ কথা শুনে ইউসিয়াং খুশিতে গদগদ হয়ে গেলেন। কথা শেষ করে তাঁরা উঠে পোশাক পরলেন এবং আবার সেই কামশাস্ত্রের বই দেখতে বসলেন। দেখতে দেখতে যখন আবার উত্তেজনা চরমে উঠল, তখন তাঁরা পুনরায় কামলীলায় মত্ত হলেন।
সেই দিন থেকে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এক নতুন গভীরতা পেল, তাঁদের ভালোবাসা আরও গাঢ় হলো।
কামশাস্ত্র পাঠ করার পর থেকে ইউসিয়াং-এর সেই শুষ্ক নীতিজ্ঞান এখন প্রেমরসে সিক্ত হলো। রাতে মিলনের সময় তিনি আর সেই একঘেয়ে ‘মধ্যপন্থা’ বা সনাতন রীতি মেনে চলতেন না, বরং নিত্যনতুন রতিভঙ্গি বা আসন তাঁর পছন্দ হয়ে উঠল। তিনি এখন ‘মোমবাতি উল্টো করে জ্বালানো’ (বিপরীত রতি) বা ‘পাহাড় ডিঙিয়ে আগুন নেওয়া’ (নারীর ওপর থেকে মিলন)—সবকিছুতেই রাজি ছিলেন। মিলনের সময় তাঁর উত্তেজনাময় চিৎকার আর উন্মত্ত আচরণ দিন দিন বাড়তেই লাগল।
ওয়েই ইয়াংশেং স্ত্রীর এই কামতৃষ্ণা আরও উসকে দেওয়ার জন্য বইয়ের দোকান থেকে একগাদা আদিরসাত্মক বই কিনে আনলেন। তার মধ্যে ছিল ‘এম্ব্রয়ডার্ড বেড হিস্ট্রি’ (সূচিকর্মখচিত শয্যার ইতিহাস), ‘রুই জুন চুয়ান’, ‘চি পো জি চুয়ান’-এর মতো বিখ্যাত সব চটি বই—সব মিলিয়ে প্রায় বিশটির মতো। তিনি সেগুলো পড়ার টেবিলে সাজিয়ে রাখলেন যাতে স্ত্রী সহজেই দেখতে পান। আর আগেকার সেই সব গুরুগম্ভীর নীতিমূলক বইগুলোকে তাকে তুলে রাখতে হলো।
স্বামী-স্ত্রীর সেই শয্যাসঙ্গমের আনন্দ এতটাই বিচিত্র ও বর্ণিল ছিল যে, তিনশ ষাটটি কামসূত্রের ছবিতেও তা পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হতো না।
সত্যিই বলা যায়: বীণা বা সেতারের সাধ্য নেই সেই সুরের মূর্ছনা তোলার, ঘণ্টা বা দামামার সাধ্য নেই সেই আনন্দের রেশ ছড়াবার।
ওয়েই ইয়াংশেং-এর দিনকাল বেশ সুখেই কাটছিল, কেবল একটি বিষয় ছাড়া—স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যতই মধুর হোক না কেন, শ্বশুর-জামাইয়ের সম্পর্ক ছিল অম্ল-মধুর। এর কারণ কী?
কারণ, শ্বশুরমশাই তাইফেই দাওরেন ছিলেন একজন সনাতনপন্থী ও নিষ্ঠাবান ভদ্রলোক। তিনি সাদামাটা জীবনযাপন পছন্দ করতেন, জাঁকজমক দু’চোখে দেখতে পারতেন না। আদিরসাত্মক বা লঘু কথাবার্তা তাঁর ঘোর অপছন্দ ছিল, তিনি কেবল ধর্মতত্ত্ব ও নীতিজ্ঞান নিয়েই আলোচনা করতে ভালোবাসতেন।
ওয়েই ইয়াংশেং যখন প্রথম জামাই হয়ে এ বাড়িতে পা রেখেছিলেন, তখন তাঁর জমকালো পোশাক-আশাক আর চটুল চালচলন দেখে বৃদ্ধের মনে বিরক্তি জন্মেছিল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, “এই ছেলেটি দেখতে সুন্দর হলেও ভেতরটা ফাঁপা, জীবনে এর দ্বারা কিচ্ছু হবে না। আমার মেয়েটা বড় ভুল জায়গায় গিয়ে পড়ল।”
কিন্তু যেহেতু পণ গ্রহণ করা হয়ে গেছে এবং বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে, তাই এখন আর ফেরানোর উপায় নেই। অগত্যা তিনি এই ভুল মেনে নিয়েছিলেন এবং আশা করেছিলেন যে, বিয়ের পর কঠোর শাসন করে জামাইকে তিনি একজন খাঁটি মানুষে পরিণত করবেন। তাই জামাইয়ের কথাবার্তা বা আচরণে তিনি তিলমাত্র ছাড় দিতেন না। সামান্য বেফাঁস কথা বললেই তিরস্কার করতেন, এমনকি বসা বা দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে একটু ত্রুটি পেলেই বকাঝকা করতেন।
ওয়েই ইয়াংশেং ছিলেন স্বাধীনচেতা তরুণ, অল্প বয়সেই মা-বাবাকে হারিয়েছেন, মাথার ওপর কারো শাসন ছিল না। তিনি কেন এই বুড়োর খবরদারি সহ্য করবেন? কয়েকবার তিনি শ্বশুরের মুখের ওপর জবাব দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পাছে স্ত্রী মনে কষ্ট পান বা তাঁদের দাম্পত্য সুখে ছেদ পড়ে—এই ভয়ে তিনি দাঁতে দাঁত চেপে সব সহ্য করতেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, “আমি প্রথমে তাঁর মেয়ের রূপের মোহেই এখানে এসেছিলাম। যেহেতু তিনি মেয়েকে অন্যের হাতে তুলে দিতে রাজি ছিলেন না এবং ঘরজামাই খুঁজছিলেন, তাই আমি রাজি হয়েছিলাম। এখন তিনি আমাকে এত চাপ দিচ্ছেন কেন? তিনি তো একজন সেকেলে পুঁথিগত বিদ্যার পণ্ডিত! আমি তাঁকে বদলানোর চেষ্টা করছি না, অথচ তিনি উল্টো আমাকে নিজের ছাঁচে গড়তে চাইছেন!
তাছাড়া, আমি একজন প্রেমিক পুরুষ। ভবিষ্যতে আমি এমন কিছু প্রেমলীলা বা কীর্তি গড়তে চাই যা মানুষের মুখে মুখে ফিরবে। আমি কি কেবল তাঁর মেয়ের আঁচল ধরেই সারাজীবন কাটিয়ে দেব? যদি আমাকে এভাবে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়, এক পাও এদিক-ওদিক ফেলার জো না থাকে, একটা কথাও বেশি বলার হুকুম না থাকে—তবে তো একদিন সামান্য ভুলের জন্য আমাকে মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হতে পারে!
আমি এখন না পারছি তর্ক করতে, না পারছি সহ্য করতে। এখন একটাই পথ খোলা আছে—মেয়েকে বাপের কাছে গচ্ছিত রেখে বলা যে আমি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাচ্ছি। তারপর অন্য কোথাও গিয়ে মুক্তি খুঁজব। বিশ্বের সেরা সুন্দরী নারীকে তো বিয়ে করেই ফেলেছি। এখন যদি দ্বিতীয় কোনো সুন্দরীর দেখা পাই—তাঁকে বিয়ে করতে না পারলেও—অন্তত কয়েক রাতের ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কে জড়িয়েও যদি আমার পূর্বজন্মের ঋণ শোধ করতে পারি, তবে সেটাই বা মন্দ কী?”
মনস্থির করার পর, তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন বিষয়টি স্ত্রীকে জানাবেন এবং তারপর শ্বশুরের কাছে অনুমতি চাইবেন। কিন্তু তাঁর ভয় হলো, ইউসিয়াং হয়তো শয্যাসঙ্গমের সুখ ছেড়ে তাঁকে যেতে দিতে চাইবেন না। আর যদি স্ত্রীর কাছ থেকে বাধা আসে, তবে শ্বশুরের কাছে মুখ ফুটে বলা কঠিন হবে।
তাই তিনি ইউসিয়াং-কে অন্ধকারে রেখেই সরাসরি শ্বশুরের কাছে গিয়ে বললেন, “শ্বশুরমশাই, আপনার এই জামাই এতদিন এক অজ পাড়াগাঁয়ে পড়ে ছিল। সেখানে আমার ওপর না ছিল কোনো সুযোগ্য গুরুর ছায়া, আর না ছিল নিচে কোনো গুণী বন্ধুর সঙ্গ। তাই আমার বিদ্যার্জনে কোনো উন্নতিই হয়নি। এখন আমি আপনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দেশভ্রমণে বের হতে চাই, যাতে আমার জ্ঞানের পরিধি বাড়ে এবং মন প্রসারিত হয়।
যেখানেই আমি কোনো যোগ্য গুরু বা উপকারী বন্ধু পাব, সেখানেই আমি জ্ঞানার্জন করব। আর যখন পরীক্ষার সময় হবে, তখন আমি প্রাদেশিক পরীক্ষায় অংশ নেব। কে জানে, হয়তো এক পরীক্ষায় আমি দুটি পদও পেয়ে যেতে পারি! তখন অন্তত প্রমাণ হবে যে, আমাকে জামাই হিসেবে গ্রহণ করে আপনি ভুল করেননি। আপনি কি আমাকে অনুমতি দেবেন?”
তাইফেই দাওরেন খুশি হয়ে বললেন, “তুমি আমার বাড়িতে ছয় মাস ধরে আছ, কিন্তু এই প্রথম তোমার মুখে কোনো কাজের কথা শুনলাম। ঘর ছেড়ে বিদ্যার্জনের জন্য বের হওয়া তো খুবই মহৎ কাজ, আমি কেন রাজি হব না?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “আপনি রাজি হলেও, আমার ভয় হয় আপনার মেয়ে আমাকে নির্দয় ভাববে। নতুন বিয়ের কদিনের মধ্যেই আমি তাকে ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছি। আমার মনে হয়, যদি আপনি বলেন যে এটা আপনারই আদেশ, আমার এতে কোনো হাত নেই—তবে আর কোনো বাধা থাকবে না। আমি নির্বিঘ্নে যেতে পারব।”
দাওরেন বললেন, “চমৎকার বলেছ। ঠিক আছে, তাই হবে।”
আলোচনা শেষে, দাওরেন তাঁর মেয়ের সামনে ওয়েই ইয়াংশেং-কে জোর করে উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে পাঠাতে চাইলেন। ওয়েই ইয়াংশেং এমন ভান করলেন যেন তিনি যেতে নারাজ, কিন্তু শ্বশুরের কঠোর আদেশের পর অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজি হলেন।
ইউসিয়াং তখন দাম্পত্য সুখের সপ্তম স্বর্গে অবস্থান করছেন। হঠাৎ শুনলেন যে স্বামী চলে যাচ্ছেন! মায়ের কোল থেকে শিশুকে ছিনিয়ে নিলে যেমন কষ্ট হয়, এ কষ্ট তার চেয়ে কম নয়। তিনি কিছুতেই এটি মেনে নিতে পারছিলেন না। স্বামীর বিরহ সহ্য করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব মনে হলো। তিনি চাইলেন স্বামী চলে যাওয়ার আগেই যেন আগামী দিনের সমস্ত পাওনা বা কামসুখ অগ্রিম মিটিয়ে দিয়ে যান।
ওয়েই ইয়াংশেং-ও জানতেন যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে, সঙ্গীহীন একাকী যাত্রা। কে জানে, চট করে কোনো নারীর সঙ্গ জুটবে কি না। তাই তিনিও স্ত্রীকে উজাড় করে সেবা দিলেন। এটি যেন এক বিদায়ী ভোজের আয়োজন—যা অতিথিদের জন্য হলেও, গৃহকর্তা নিজেও তাতে সমানভাবে অংশ নিলেন।
টানা কয়েক রাত ধরে তাঁদের যে উত্তাল মিলন হলো, তা কোনো সাধারণ ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়—কেবল সেই দম্পতিই তা জানল। অবশেষে বিদায়ের লগ্ন এল। ওয়েই ইয়াংশেং শ্বশুর ও স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তাঁর ভৃত্যকে সঙ্গে করে অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন।
এরপর ওয়েই ইয়াংশেং-এর জীবনে আরও অনেক বিচিত্র ও অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল, যা পরের অধ্যায়ে জানা যাবে।
সমালোচকের মন্তব্য:
এই উপন্যাসের আখ্যানভাগ বড়ই বিচিত্র। কখনো নীতিবাক্য শুনিয়ে লেখক শ্রোতাদের লোম খাড়া করে দেন, আবার কখনো চরম কামুকতার বর্ণনায় দর্শকদের আত্মার বাঁধন আলগা করে দেন। যারা অগভীর দৃষ্টিতে দেখে, তারা হয়তো লেখককে দ্বিধাগ্রস্ত বা বিভ্রান্ত মনে করতে পারে। কিন্তু তারা জানে না যে, মানুষের মনকে প্রভাবিত করার এই সূক্ষ্ম কৌশল আসলে লেখকের এক সুচিন্তিত প্রয়াস।
একটু ভেবে দেখুন, সেই কামশাস্ত্রের বইটি দেখার আগে ইউসিয়াং কেমন ধর্মপ্রাণ ও লাজুক ছিলেন! আর সেটি দেখার পর তিনি কেমন কামুক ও চঞ্চল হয়ে উঠলেন! সতীত্ব এবং কামুকতা, উচ্চমার্গীয় চিন্তা এবং আদিম প্রবৃত্তি—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আসলে খুবই সামান্য, এবং তা প্রায়শই পুরুষের কামনার আগুনেই নির্ধারিত হয়।
তাই স্বামীদের কি এ বিষয়ে আরও সতর্ক থাকা উচিত নয়?
চতুর্থ অধ্যায়: নির্জন গ্রামের বিষণ্ণ অতিথি ও ডাকাতের সঙ্গে রতি-আলাপনে নিশিযাপন
ওয়েই ইয়াংশেং শ্বশুর ও স্ত্রীকে বিদায় জানিয়ে বিদ্যার্জনের অজুহাতে গৃহত্যাগ করলেন। কিন্তু তাঁর যাত্রাপথের কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ছিল না; যেখানে সুন্দরী রমণীর সন্ধান মিলত, সেখানেই তিনি ডেরা গাড়তেন। প্রতিটি প্রদেশ বা জেলায় তিনি কিছুদিন করে অবস্থান করতেন।
ওয়েই ইয়াংশেং ছিলেন এক প্রতিভাবান তরুণ পণ্ডিত। পরীক্ষায় তাঁর ফলাফল ছিল ঈর্ষণীয় এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতিমূলক আড্ডায় যোগ দিতে তিনি পছন্দ করতেন। তাঁর বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছিল, যা সুধীমহলে সমাদৃত ছিল। হাজার মাইলের মধ্যে এমন কোনো শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন না যিনি তাঁর নাম জানতেন না। ফলে তিনি যেখানেই যেতেন, স্থানীয় সুহৃদরা তাঁকে তাঁদের সাহিত্যচক্রে যোগ দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতেন।
কিন্তু ওয়েই ইয়াংশেং সাহিত্যচর্চা বা বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশাকে নিতান্তই গৌণ বিষয় মনে করতেন। তাঁর জীবনের প্রধান ও পরম লক্ষ্য ছিল সুন্দরী রমণীদের খুঁজে বের করা। প্রতিদিন সকালে উঠে তিনি রাজপথ থেকে শুরু করে ছোট ছোট অলিগলি—সব জায়গায় একবার চক্কর দিতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তিনি যাদের দেখতেন তারা সবাই ছিল সাধারণ মানের; কোনো অসামান্য রূপসী বা কামশয্যার যোগ্য সঙ্গিনী তাঁর চোখে পড়ত না।
একদিন এক নির্জন গ্রামের সরাইখানায় আশ্রয় নিলেন তিনি। কিন্তু বিধি বাম! তাঁর সঙ্গে থাকা দুজন ভৃত্যই সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়ল, তারা নড়াচড়া করার মতো অবস্থায় ছিল না। তিনি বাইরে বের হতে চাইলেন, কিন্তু সঙ্গী ছাড়া বের হলে সম্ভ্রান্ত মহিলাদের সামনে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে—এই ভয়ে একা বের হলেন না। অগত্যা একা ঘরে বসে তিনি চরম একঘেয়েমি ও বিরক্তি বোধ করতে লাগলেন।
হঠাৎ তিনি দেখলেন পাশের ঘর থেকে এক সহযাত্রী এসে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “মহাশয়কে একা বসে থাকতে দেখে মনে হচ্ছে আপনি বেশ বিরক্ত বোধ করছেন। আমার কাছে এক বোতল উৎকৃষ্ট মদ আছে, যদি আপত্তি না থাকে তবে আমার সঙ্গে এক পেয়ালা পান করবেন কি?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “আমরা দুজন তো অপরিচিত, আপনাকে অকারণে বিরক্ত করব কেন?”
লোকটি বিনীতভাবে বললেন, “শুনেছি শিক্ষিত ও গুণী ব্যক্তিরা খুব উদার মনের হন, মহাশয় কেন এত সংকোচ করছেন? আমি যদিও এক নিম্নশ্রেণির মানুষ, তবে বন্ধু বানাতে আমার বড়ই শখ। কেবল আপনি একজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ভেবে এতক্ষণ সাহস পাইনি। এখন যেহেতু আমরা একই সরাইখানায় আছি, এমন সুযোগ তো আর মিলবে না। এসে কিছুক্ষণ বসলে ক্ষতি কী?”
ওয়েই ইয়াংশেং তখন বিরক্তির চরম সীমায় ছিলেন, কথা বলার জন্য একজন সঙ্গী খুঁজছিলেন। তাই তিনি রাজি হয়ে গেলেন। লোকটির সঙ্গে তাঁর কক্ষে গেলেন। লোকটি তাঁকে সম্মানের সঙ্গে উপরের আসনে বসিয়ে নিজে পাশে বসলেন। ওয়েই ইয়াংশেং বারবার তাঁকে সমান আসনে বসার অনুরোধ জানালে, তিনি ওয়েই ইয়াংশেং-এর নাম জিজ্ঞাসা করলেন।
ওয়েই ইয়াংশেং নিজের নাম বললেন এবং পাল্টা তাঁর সম্মানসূচক নাম বা উপাধি জানতে চাইলেন।
লোকটি বললেন, “আমি এক নগণ্য মানুষ, আমার কোনো বিশেষ নাম নেই। লোকে আমাকে কেবল ‘সাই কুনলুন’ নামে ডাকে।”
ওয়েই ইয়াংশেং অবাক হয়ে বললেন, “এমন অদ্ভুত নাম! ‘সাই কুনলুন’—এই তিনটি অক্ষর কেন বেছে নিলেন?”
লোকটি বললেন, “সত্যি কথা বললে মহাশয় হয়তো ভয় পাবেন এবং আমার সঙ্গে আর পান করতে চাইবেন না।”
ওয়েই ইয়াংশেং হেসে বললেন, “আমিও এক সাহসী পুরুষ। আপনি দেবতা বা ভূত—যাই হোন না কেন, আমার সামনে দাঁড়ালে আমি ভয় পাব না। উঁচুনীচু, জ্ঞানী বা মূর্খ—এসব ভেদাভেদ আমি করি না। যদি আমাদের মনের মিল হয়, তবে কিসের আপত্তি?”
সাই কুনলুন তখন বললেন, “তবে সোজাসুজিই বলি। আমি পেশায় একজন তস্কর বা চোর। আমি দেয়াল টপকাতে ওস্তাদ। হাজার ফুট উঁচু ভবন বা শত স্তরের পুরু প্রাচীর—যাই হোক না কেন, আমি কোনো কষ্ট ছাড়াই পাখির মতো উড়ে শোবার ঘরে প্রবেশ করতে পারি এবং জিনিসপত্র নিয়ে হাওয়া হয়ে যেতে পারি। আমি একই বাড়িতে দ্বিতীয়বার চুরি করি না এবং গৃহস্থকে টেরও পেতে দিই না।
লোকে বলে, প্রাচীনকালে এক ‘কুনলুন’ ছিলেন, যিনি কুও লিং গং-এর দুর্ভেদ্য প্রাসাদে প্রবেশ করে সুন্দরী হং জিয়াও-কে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি তাঁর জীবনে কেবল একবারই এমন দুঃসাহসিক কাজ করেছিলেন। আর আমি যে কত শতবার এমন কাজ করেছি, তার ইয়ত্তা নেই! তাই লোকে আমাকে তাঁর চেয়েও বড় মনে করে ‘সাই কুনলুন’ (কুনলুনের চেয়েও সেরা) বলে ডাকে।”
ওয়েই ইয়াংশেং চমকে উঠে বললেন, “আপনি এত দিন ধরে এই পেশায় আছেন এবং এত নামডাকও হয়েছে—সবাই আপনাকে চেনে। তবুও কি আপনি কোনো বিপদে পড়েননি?”
সাই কুনলুন বললেন, “যদি বিপদে পড়তাম তবে কি আর এমন সাহসী হতাম? প্রাচীন প্রবাদে বলে, ‘চোরকে ধরতে হলে চোরাই মালসহ ধরতে হয়’। যতক্ষণ না কেউ আমাকে চোরাই মালসহ হাতেনাতে ধরছে, ততক্ষণ আমি নিজে স্বীকার করলেও কেউ আমার কিচ্ছু করতে পারবে না। দূর-দূরান্তের সবাই আমাকে চেনে এবং সম্মান করে। তাদের ভয়, আমাকে রাগিয়ে দিলে পাছে আমি তাদের ক্ষতি করি।
তবে আমার জীবনে কিছু নীতি আছে, যাকে আমি বলি ‘পাঁচটি চুরি না করার নিয়ম’: ১. দুর্দিনে চুরি না করা। ২. সুদিনে চুরি না করা। ৩. পরিচিতের ঘরে চুরি না করা। ৪. একবার চুরির পর দ্বিতীয়বার সেখানে না যাওয়া। ৫. এবং অসতর্ক মানুষের ঘরে চুরি না করা।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “এই পাঁচটি নীতি তো বড়ই অদ্ভুত ও আকর্ষণীয়! দয়া করে একটু বুঝিয়ে বলুন।”
সাই কুনলুন ব্যাখ্যা করলেন: “১. যদি কারো খারাপ সময় যায়—যেমন কেউ অসুস্থ, বা শোকে কাতর, কিংবা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়েছে—তখন যদি আমি তার ঘরে চুরি করি, তবে তা হবে আগুনে ঘি ঢালার মতো নিষ্ঠুরতা। সে আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না। তাই আমি সেখানে যাই না। ২. যদি কারো বাড়িতে কোনো শুভ অনুষ্ঠান থাকে—যেমন বিয়ে, গৃহপ্রবেশ, বা সন্তান জন্মদান—সে যখন আনন্দে মগ্ন, তখন যদি আমি চুরি করি তবে তা অলক্ষণ হবে এবং ভবিষ্যতে তার কাজে বাধা আসবে। তাই আমি সেখানে যাই না। ৩. যাদের আমি চিনি না, তাদের ঘরে চুরি করলে দোষের কিছু নেই। কিন্তু যারা প্রতিদিন আমার সঙ্গে দেখা করে, হাত মেলায়—তাদের ঘরে চুরি করলে তারা হয়তো আমাকে সন্দেহ করবে না, কিন্তু তাদের মুখের দিকে তাকালে আমার নিজেরই লজ্জা লাগবে। তাই আমি সেখানে যাই না। ৪. ধনী ব্যক্তিদের অঢেল সোনাদানা থাকে। আমি একবার তাদের ভাণ্ডার থেকে কিছু নিলে তা তাদের কাছে সাহায্য নেওয়ার মতোই—এতে দোষের কী আছে? কিন্তু যদি একবার চুরি করে তার স্বাদ পেয়ে বারবার তাদের বিরক্ত করি, তবে আমি লোভী বলে গণ্য হব। এমন নিচু কাজ আমি করি না। ৫. যারা সবসময় চোরের ভয়ে তটস্থ থাকে, প্রতি রাতে আতঙ্কে ঘুমায় না, মুখে কেবল চোরের কথা বলে—তারা আমাকে খারাপ ভাবে। তাই আমিও তাদের পছন্দ করি না। কিন্তু একবার তাদের ঘরে চুরি করলে তারা আমার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়ে যাবে এবং সতর্ক হয়ে যাবে, তখন দ্বিতীয়বার ঢোকা কঠিন হবে। কিন্তু যারা উদার মনের মানুষ, যারা জানে ধনসম্পদ ক্ষণস্থায়ী এবং তা নিয়ে মাথা ঘামায় না, কিংবা অসতর্কতাবশত দরজা খোলা রাখে—তাদের ঘরে চুরি করা মানে দুর্বলকে ভয় দেখানো। আমি কি তেমন কাপুরুষ? এটাই হলো আমার ‘পাঁচটি চুরি না করার’ নীতি।
দূর-দূরান্তের মানুষ আমার এই গুণগুলো জানে বলেই তারা আমাকে চোর জেনেও ঘৃণা করে না, বরং আমার সঙ্গে মিশতে অপমানবোধ করে না। এখন যদি মহাশয় আপত্তি না করেন, তবে আসুন আমরা দুজনে ভাই হিসেবে শপথ নিই। ভবিষ্যতে যদি আপনার কোনো কাজে আসি, তবে আমি আপনার জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত।”
ওয়েই ইয়াংশেং তাঁর কথা শুনে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন, “ডাকাতদের মধ্যেও যে এমন নীতিবান ও সাহসী মানুষ আছে, তা জানতাম না! যদি আমি এর সঙ্গে বন্ধুত্ব করি, তবে আমার লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই। যদি আমি হং জিয়াও বা হং ফু-এর মতো কোনো সুন্দরী রমণীর খোঁজ পাই—যারা ধনী পরিবারের কড়া পাহারায় থাকে, যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা অসম্ভব—তখন যদি আমি একে সেই প্রাচীন ‘কুনলুন’-এর মতো ব্যবহার করতে পারি, তবে কী দারুণ ব্যাপারই না হবে!”
এই কথা ভেবে উত্তেজনায় তাঁর হাত-পা কাঁপতে লাগল। কিন্তু যখন শুনলেন যে ভাই হিসেবে শপথ নিতে হবে, তখন তাঁর মনে কিছুটা দ্বিধা হলো। মুখে “খুব ভালো” বললেও মনে মনে তিনি পুরোপুরি সায় দিতে পারছিলেন না।
সাই কুনলুন তাঁর মনের ভাব বুঝতে পেরে বললেন, “মহাশয় মুখে রাজি হলেও, মনে মনে এখনো দ্বিধায় আছেন। আপনি কি কোনো আইনি ঝামেলায় পড়ার ভয় পাচ্ছেন? নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি যতই দুঃসাহসিক কাজ করি না কেন, আমি কখনোই ধরা পড়ব না। আর যদি ধরাও পড়ি, তবে আমি একাই মরব—কখনোই কোনো নির্দোষ বন্ধুকে জড়াব না। মহাশয়কে এ নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।”
ওয়েই ইয়াংশেং দেখলেন যে লোকটি তাঁর মনের সংশয় ধরে ফেলেছেন এবং তা দূরও করেছেন। তাই তিনি এবার মন থেকেই রাজি হলেন। তাঁরা দুজনে মিলে তিনটি পশু বলি দিলেন, কাগজে তারিখ ও শপথবাক্য লিখলেন এবং সরাইখানায় বসে রক্তমিশ্রিত মদ পান করে শপথ নিলেন যে তাঁরা সুখে-দুঃখে, এমনকি মৃত্যুতেও একে অপরের পাশে থাকবেন। সাই কুনলুন বয়সে বড় হওয়ায় তিনি ‘বড় ভাই’ এবং ওয়েই ইয়াংশেং ‘ছোট ভাই’ হিসেবে পরিচিত হলেন। তাঁরা একসাথে বলি দেওয়া পশুর মাংস খেলেন এবং মধ্যরাত পর্যন্ত পানভোজনে মেতে রইলেন।
শোবার সময় হলে ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “আলাদা ঘুমালে আমরা দুজনেই একাকীত্ব অনুভব করব। তার চেয়ে বরং আমরা দুজনেই আমার বিছানায় শুয়ে মন খুলে কথা বলি এবং এই দীর্ঘ রাত গল্প করে কাটাই। কী বলেন?”
সাই কুনলুন বললেন, “চমৎকার প্রস্তাব।” তাঁরা দুজনে পোশাক পরিবর্তন করে একই বিছানায় শুয়ে পড়লেন।
বিছানায় শুতেই ওয়েই ইয়াংশেং-এর পুরনো স্বভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, “হায়! এমন সুন্দর রাত, অথচ পাশে কোনো সুন্দরী রমণী নেই যাকে একটু দেখতে পারি!”
সাই কুনলুন শুনে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভাই, কেন আপনি এমন কথা বলছেন? আপনি কি বিয়ে করেননি? নাকি আপনি এখনো পাত্রী খুঁজে বেড়াচ্ছেন?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “বিয়ে তো করেছি। কিন্তু একজন পুরুষ কি কেবল এক নারীর আঁচল ধরে সারা জীবন কাটাতে পারে? স্ত্রীর বাইরেও আরও কয়েকজনকে কামসঙ্গী বা প্রেমিকা হিসেবে খুঁজে বের করা উচিত। বড় ভাইকে সত্যি বলছি, আমার স্বভাব বড়ই প্রেমপাগল। আমি যে এবার পড়াশোনার নাম করে বাইরে এসেছি, তা আসলে সুন্দরী রমণীদের খুঁজে বের করার জন্যই।
আমি অনেক প্রদেশ ও জেলা ঘুরেছি। কিন্তু যেসব মহিলাদের দেখেছি, তারা হয় মেকআপের আস্তরণে নিজেদের কালো ত্বক ঢেকে রাখে, অথবা দামী গয়না ও মুক্তার মালায় নিজেদের জৌলুস বাড়ায়। এমন কোনো মহিলা কি নেই যে প্রসাধন ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে সুন্দরী? এদের দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি, তাই অজান্তেই মুখ ফসকে এই কথাগুলো বেরিয়ে এল।”
সাই কুনলুন হেসে বললেন, “ভাই, আপনি বড় ভুল করছেন। পৃথিবীর সত্যিকারের সতী-সাধ্বী ও রূপসী নারীদের কি কখনো রাস্তায় দেখা যায়? যাদের আপনি বাইরে দেখেন, তারা কখনোই ভালো ঘরের মেয়ে নয়। সাধারণ পরিবারের মেয়েদের কথা বাদই দিলাম, এমনকি বারাঙ্গনাদের মধ্যেও যারা কুৎসিত এবং যাদের কেউ চায় না—তারাই কেবল রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাসিমুখে নিজেদের বিকিয়ে দেয়। যাদের একটু কদর আছে, তারা ঘরে বসে থাকে; খদ্দেররা তাদের খুঁজে বের করে।
তাহলে ভালো পরিবারের মেয়েদের কথা কী বলব? তারা কি কখনো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরের পুরুষদের নিজেদের রূপ দেখাবে? যদি আপনি সত্যিই সম্ভ্রান্ত ও সুন্দরী নারীদের খবর জানতে চান, তবে আমাকে জিজ্ঞাসা করুন।”
ওয়েই ইয়াংশেং শুনে অবাক হয়ে মাথা তুললেন, “এ তো বড় অদ্ভুত কথা! বড় ভাই তো কখনো রতি-নিবাসে বা নিষিদ্ধ পল্লীতে যান না, তবে আপনি ওই সব গোপন খবর জানলেন কী করে?”
সাই কুনলুন বললেন, “আমি যদিও আমোদ-প্রমোদের জায়গায় যাই না, তবে আমার চোখ সব দেখে আর কান সব শোনে। আপনাকে একটা প্রশ্ন করি—পৃথিবীর সুন্দরী নারীরা কি ধনী পরিবারে বেশি থাকে, নাকি দরিদ্র পরিবারে?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “স্বাভাবিকভাবেই ধনী পরিবারে বেশি।”
সাই কুনলুন আবার প্রশ্ন করলেন, “তাহলে ধনী পরিবারের সুন্দরী নারীদের কি দিনের বেলা মুখে মেকআপ আর শরীরে দামী পোশাক পরা অবস্থায় ভালোভাবে দেখা যায়, নাকি রাতে মেকআপ ধুয়ে এবং পোশাক খুলে যখন তারা প্রাকৃতিক অবস্থায় থাকে—তখন ভালোভাবে দেখা যায়?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “স্বাভাবিকভাবেই মেকআপ ছাড়া এবং পোশাকহীন অবস্থায় তাদের আসল রূপ ধরা পড়ে।”
সাই কুনলুন বললেন, “তাহলে ব্যাপারটা পরিষ্কার। আমরা যারা সিঁদেল চোর, আমরা দরিদ্রের কুঁড়েঘরে যাই না। আমরা যাই সেখানে, যেখানে মণি-মুক্তা আর ঐশ্বর্য উপচে পড়ে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা অনেক কিছু দেখি।
আমরা যখন যাই, তখন গভীর রাত, চারদিক নিস্তব্ধ। তখন তারা হয়তো পোশাক খুলে চাঁদের আলোয় বসে থাকে, অথবা মশারির পর্দা সরিয়ে বাতির মৃদু আলোয় ঘুমে অচেতন থাকে। আমি ভয় পাই পাছে তারা জেগে ওঠে, তাই সঙ্গে সঙ্গেই জিনিসপত্রে হাত দিই না। আমি অন্ধকারে লুকিয়ে তাদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকি—তারা নড়াচড়া করছে কি না তা দেখি। যতক্ষণ না তারা গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়, ততক্ষণ আমি অপেক্ষা করি।
এই সুযোগে আমি তাদের আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখি। কেবল মুখ বা গায়ের রঙই নয়, এমনকি তাদের কাম-অঙ্গের গঠন, যোনি-প্রদেশের উচ্চতা বা কেশবিন্যাস—সবকিছুই আমার চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে ধরা দেয়। এই কয়েকশ মাইল দূরত্বের মধ্যে কোন মহিলা দেখতে অপরূপা, আর কে দেখতে সাধারণ—সবই আমার নখদর্পণে। যদি আপনি এই পথে হাঁটতে চান, তবে শুধু আমাকে হুকুম করুন।”
ওয়েই ইয়াংশেং প্রথমে বিছানার চাদরের নিচে কান পেতে শুনছিলেন। কিন্তু সাই কুনলুনের এই কথাগুলো শুনে তিনি উত্তেজনায় অজান্তেই বুক উন্মুক্ত করে উঠে বসলেন এবং বলে উঠলেন:
“বড় ভাই, আপনার কথা একেবারে খাঁটি। ধনী পরিবারের মেয়েদের সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালেই রাখা হয়। এমনকি যদি কখনো দেখাও যায়, তা হয় আবছা—পরিষ্কার দেখা যায় না। কেবল আপনাদের মতো দুঃসাহসীরাই তাদের রূপের নাগাল পান।
আচ্ছা, আরেকটা কথা বলুন—আপনি যখন সেই সুন্দরী রমণীদের দেখেন এবং তাদের সেই ভরা কাম-অঙ্গ বা যোনি-প্রদেশ চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয়, তখন কি আপনার শরীরে কামভাব জাগে না? তখন আপনি কী করেন?”
সাই কুনলুন হেসে বললেন, “যখন তরুণ ছিলাম, তখন এই দৃশ্য দেখে নিজেকে সামলাতে পারতাম না। প্রায়ই অন্ধকারে লুকিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে হস্তমৈথুন করতাম, আর কল্পনা করতাম যেন আমিই তাদের সঙ্গে মিলিত হচ্ছি। কিন্তু পরে যখন অনেক দেখেছি, তখন আর ওসবে পাত্তা দিতাম না। তখন যোনিকে আমার কাছে একটা সাধারণ জিনিস মনে হতো, কোনো উত্তেজনা হতো না।
তবে হ্যাঁ, যখন দেখতাম তারা তাদের স্বামীর সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত, মুখে গোঙানি আর কামজ শব্দ করছে, এবং যোনি থেকে ঘর্ষণের আওয়াজ আসছে—তখন আমার রক্তেও কিছুটা দোলা লাগত।”
ওয়েই ইয়াংশেং বুঝলেন যে সাই কুনলুন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং রসালো অংশের কথা বলছেন। তাই তিনি আগ্রহভরে পাশ ফিরে শুয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলেন।
সাই কুনলুন বললেন, “মহাশয় যদি আপত্তি না করেন, তবে আমি আপনাকে আমার অভিজ্ঞতার এক-দুটি ঘটনা শোনাতে পারি। আপনি কি শুনতে রাজি?”
ওয়েই ইয়াংশেং উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, “অসাধারণ! আপনার সঙ্গে এক রাত গল্প করা তো দেখছি দশ বছর পড়াশোনা করার চেয়েও বেশি লাভজনক! দয়া করে তাড়াতাড়ি বলুন।”
সাই কুনলুন বললেন, “আমি জীবনে এত কিছু দেখেছি যে কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না। আপনি যা জিজ্ঞাসা করবেন, আমি তারই উত্তর দেব।”
ওয়েই ইয়াংশেং জিজ্ঞাসা করলেন, “দয়া করে বলুন, মহিলারা কি সঙ্গম বেশি পছন্দ করে, নাকি অপছন্দ করে?”
সাই কুনলুন উত্তর দিলেন, “স্বাভাবিকভাবেই তারা পছন্দ করে। একশ জন মহিলার মধ্যে হয়তো এক-দুজন পাওয়া যাবে যারা মিলন অপছন্দ করে, বাকি সবাই পছন্দ করে। তবে এই পছন্দকারীদের মধ্যে দুটি ভাগ আছে।
প্রথম দলের মহিলারা মনে মনেও মিলন চায় এবং মুখেও তা প্রকাশ করে। আর দ্বিতীয় দলের মহিলারা মনে মনে চাইলেও মুখে অনিচ্ছার ভান করে, যতক্ষণ না স্বামী তাদের জোর করে বাধ্য করে। তারপর তারা তাদের আসল রূপ দেখায়।
প্রথম ধরনের নারীদের বোঝা সহজ। আমি অন্ধকারে লুকিয়ে দেখতাম, তারা স্বামীদের মিলনের জন্য তাড়া দিচ্ছে। তখন ভাবতাম, এরা বুঝি খুব কামুক, সারারাত সঙ্গম করলেও এদের ক্লান্তি আসবে না। কিন্তু বাস্তবে, কয়েকবার ওঠানামার পরেই তারা নেতিয়ে পড়ত। মিলন শেষ হওয়ার পর তারা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তে চাইত; স্বামী আর কিছু করুক বা না করুক, তাতে তাদের কিছু যেত আসত না।
কিন্তু যারা মনে মনে চায় অথচ বাইরে অনিচ্ছার ভান করে—তাদের বোঝা বড় কঠিন। একবার এক বাড়িতে চুরি করতে গিয়েছিলাম। দেখলাম স্বামী তার স্ত্রীকে মিলনের জন্য টানাটানি করছে, কিন্তু স্ত্রী নারাজ। স্বামী তার ওপর উঠে পড়ল, কিন্তু সে ধাক্কা দিয়ে স্বামীকে নামিয়ে দিল। স্বামী ভাবল স্ত্রী হয়তো আজ মিলন করতে চায় না, তাই সে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল।
সেই মহিলা তখন ইচ্ছে করে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে লাগল যাতে স্বামীর ঘুম ভেঙে যায়। যখন দেখল স্বামী জাগছে না, তখন সে হাত দিয়ে স্বামীকে নাড়া দিল। তাতেও কাজ হলো না দেখে সে হঠাৎ জোরে চিৎকার করে উঠল—’চোর! চোর!’
অন্য কোনো সাধারণ চোর হলে হয়তো ভয় পেয়ে পালাত। কিন্তু আমি বুঝলাম, সে আসলে আমাকে দেখে চোর বলে চিৎকার করছে না; সে তার স্বামীকে জাগাতে চাইছে যাতে তারা মিলন করতে পারে।
আমার অনুমান ভুল ছিল না। স্বামী ধড়মড় করে জেগে ওঠার পর, সে চালাকি করে বলল, ‘ও কিছু না, বিড়াল ইঁদুর ধরে লাফিয়েছিল। আমি ভুল শুনে চোর ভেবেছিলাম।’ এরপর সে স্বামীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল এবং নিজের যোনিকে স্বামীর লিঙ্গের সঙ্গে ঘষতে লাগল। স্বামী তখন উত্তেজিত হয়ে আবার তার ওপর উঠে মিলন শুরু করল।
প্রথমে সে নিজেকে সংযত রেখেছিল, কোনো শব্দ করেনি। কিন্তু কয়েকশ বার ওঠানামার পর সে ধীরে ধীরে গোঙাতে শুরু করল এবং তার যোনি থেকে কামরস ক্ষরণ হতে লাগল। মাঝপথে স্বামীর স্খলন হয়ে গেল, কিন্তু স্ত্রীর উত্তেজনা তখনো কমেনি। সে লজ্জায় স্বামীকে আবার মিলন করতে বলতে পারছিল না, তাই অসুস্থ মানুষের মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগল। সে স্বামীকে দিয়ে নিজের বুক ঘষাতে ও পেট মালিশ করাতে লাগল, কিছুতেই তাকে ঘুমাতে দিল না। অগত্যা স্বামী আবার তার ওপর উঠে নতুন উদ্যমে শুরু করল। ভোর না হওয়া পর্যন্ত তাদের থামার নামগন্ধ ছিল না।
আমি সারারাত পাহারা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম কাজ শেষ হলে জিনিসপত্র নেব, কিন্তু ভোর হয়ে যাওয়ায় আমাকে খালি হাতেই পালিয়ে আসতে হলো। তাই বলছি, এই ধরনের চাপা স্বভাবের নারীদের বোঝা বড়ই কঠিন।”
ওয়েই ইয়াংশেং আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা বলুন তো, মহিলারা যখন মিলন করে, তখন কি তারা খুব বেশি উত্তেজিত হয়, নাকি কম?”
সাই কুনলুন বললেন, “স্বাভাবিকভাবেই বেশি উত্তেজিত হয়। দশজনের মধ্যে একজন হয়তো কম উত্তেজিত হয়, বাকি সবাই চরম উত্তেজনা অনুভব করে। তবে মহিলাদের তিন ধরনের উত্তেজনার শব্দ আছে, যা কেবল আমরা আড়ি পাতা চোরেরাই পরিষ্কার শুনতে পাই—মিলনরত স্বামীরা তা টের পায় না।”
ওয়েই ইয়াংশেং জানতে চাইলেন, “সেই তিনটি ধরন কী কী?”
সাই কুনলুন বললেন, “প্রথমত, যখন মিলন শুরু হয় কিন্তু তারা তখনো পুরোপুরি আনন্দ পায়নি—তখন তারা মনে মনে উত্তেজিত না হলেও বাইরে উত্তেজনার ভান করে, যাতে স্বামী খুশি হয়। এই সময় তাদের মুখের শব্দগুলো খুব স্পষ্ট শোনা যায়, তারা যেসব কথা বলে তা পরিষ্কার বোঝা যায়। এটা হলো এক ধরনের উত্তেজনা।
দ্বিতীয়ত, যখন তারা সত্যিই আনন্দ পেতে শুরু করে, তখন তাদের মন, মুখ, এমনকি পঞ্চ ইন্দ্রিয় ও শরীরের প্রতিটি অঙ্গ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এই সময় তাদের মুখের কথা অস্পষ্ট হয়ে যায়, ঘন ঘন শ্বাস পড়ে। এটা হলো দ্বিতীয় ধরনের উত্তেজনা।
আর তৃতীয়ত, যখন তারা আনন্দের চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন তারা এতটাই ক্লান্ত ও অবশ হয়ে পড়ে যে হাত-পা নাড়ানোর শক্তিও থাকে না। তখন তাদের শব্দগুলো গলার ভেতরেই আটকে থাকে, বাইরে খুব একটা শোনা যায় না।
একবার এক বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে দেখেছিলাম, স্বামী-স্ত্রী মিলন করছে। শুরুতে তারা খুব এলোমেলোভাবে নড়াচড়া করছিল, মনে হচ্ছিল যেন বজ্রপাত হচ্ছে! কিন্তু পরে সেই মহিলা একদম স্থির ও শব্দহীন হয়ে গেল, যেন স্বামী তাকে মেরেই ফেলেছে। আমি কৌতূহলী হয়ে কাছে গিয়ে কান পাতলাম। শুনলাম তার গলার ভেতর থেকে কেবল ‘ইইই ইয়া ইয়া’ জাতীয় অস্ফুট শব্দ বের হচ্ছে—না সেটা কথা, না সেটা দীর্ঘশ্বাস।
এই দৃশ্য দেখে আমি বুঝলাম সে পরমানন্দে বিভোর। তখন অজান্তেই আমার নিজের কামভাব এত বেড়ে গেল যে, হস্তমৈথুন ছাড়াই আমার শরীর শিথিল হয়ে গেল এবং বীর্যপাত ঘটল। তাই আমি জানি, মহিলাদের এই তৃতীয় ধরনের এক গভীর উত্তেজনা আছে।”
সাই কুনলুনের এই জীবন্ত বর্ণনা শুনে ওয়েই ইয়াংশেং-এর শরীরও শিথিল হয়ে এল এবং উত্তেজনায় তাঁর নিজের লিঙ্গ থেকেও কামরস নির্গত হয়ে বিছানা ভিজিয়ে দিল। তিনি আরও কিছু জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে ভোর হয়ে গেছে।
তাঁরা দুজনে উঠে স্নান সেরে আবার মুখোমুখি বসলেন এবং হাসি-ঠাট্টায় মাতলেন। কয়েক দিন একসাথে থাকার ফলে তাঁদের বন্ধুত্ব আরও গভীর হলো।
অবশেষে ওয়েই ইয়াংশেং মনের কথা খুলে বললেন, “বড় ভাই, আমি নারী সঙ্গকেই আমার জীবন মনে করি। আপনার সঙ্গে দেখা হওয়া আমার পরম সৌভাগ্য। আমার মনের একটা সুপ্ত বাসনা আপনাকে না বললে হয়তো বড় সুযোগ হারাব। আমার অনুরোধ, আপনি আপনার দেখা সেরা সুন্দরীদের মধ্যে থেকে একজনকে বেছে নিন। এমন কোনো উপায় বের করুন যাতে আমি অন্তত একবার তাকে দেখতে পাই। যদি সে সত্যিই অপরূপা হয়, তবে—বড় ভাইকে বলছি—আমার কপালে ‘লাল পাখি’ বা সৌভাগ্যের লিখন আছে। আমি যখনই কোনো নারীকে দেখি, আমাকে আর খুঁজতে হয় না; সে নিজেই আমার কাছে ধরা দেয়। তখন বড় ভাই শুধু আপনার অলৌকিক ক্ষমতা দেখিয়ে বাকি কাজটা সেরে দেবেন, কেমন?”
সাই কুনলুন মাথা নেড়ে বললেন, “না ভাই, এটা সম্ভব নয়। আমার জীবনে একটা কঠোর নিয়ম আছে—’একবার চুরি করার পর দ্বিতীয়বার সেখানে না যাওয়া’। যাদের জিনিসপত্র আমি চুরি করেছি, তাদের ঘরেই আমি দ্বিতীয়বার ঢুকতে পারি না; আর সম্ভ্রান্ত মহিলাদের ইজ্জত নিয়ে খেলা করা তো দূরের কথা!
তবে আমি একটা কাজ করতে পারি। এখন থেকে আমি আপনার জন্য নতুন করে সুন্দরী রমণীদের খোঁজ করব। যখন কোনো বাড়িতে অপরূপ সুন্দরী দেখব, তখন আমি তাদের জিনিসপত্র চুরি করব না। বরং ফিরে এসে আপনার সঙ্গে আলোচনা করব এবং আপনার অভিপ্রায় পূর্ণ করতে সাহায্য করব। এটা করা যেতে পারে।”
ওয়েই ইয়াংশেং লজ্জিত হয়ে বললেন, “আমি বুঝতে ভুল করেছিলাম, আপনাকে চোর ভেবে অভদ্র প্রস্তাব দিয়ে ফেলেছি। কিন্তু যেহেতু আপনি আমাকে সাহায্য করতে রাজি হয়েছেন, আমার একটি অনুরোধ—যদি কোনো অসাধারণ সুন্দরীকে দেখেন, তবে দয়া করে তার ঘরে চুরি করবেন না। আজকের প্রতিশ্রুতির কথা ভুলবেন না। কাজ সফল হলে ছোট ভাই আপনাকে উপযুক্ত পুরস্কার দিতে কার্পণ্য করবে না।”
সাই কুনলুন বললেন, “ভাই, আপনি আমাকে চিনতে সত্যিই ভুল করেছেন। যদি আমি পুরস্কারের লোভে কাজ করতাম, তবে এতদিনে অনেক সম্পদ জমাতে পারতাম। এমনকি ভবিষ্যতে আপনি বড় কর্মকর্তা হলেও আপনার সাহায্য বা টাকার ওপর আমি নির্ভরশীল নই। আমি ওসব চাই না।
আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, আমি আপনাকে এক সুন্দরী রমণী উপহার দেব। এখন থেকে আপনার আর ভবঘুরের মতো ঘোরার দরকার নেই। এখানেই কোথাও ঘর ভাড়া নিয়ে পড়াশোনার ভান করুন। শুধু আমার ওপর নির্ভর করে থাকবেন না; আপনি নিজেও যদি কোনো ভালো মেয়ের খোঁজ পান, তবে নিজের মতো চেষ্টা চালাবেন। আর আমি যদি কোনো সন্ধান পাই, তবে আপনাকে খবর দেব। দুদিক থেকে খোঁজ চালালে আপনি অবশ্যই আপনার মনের মানুষকে খুঁজে পাবেন, বিফল হবেন না।”
ওয়েই ইয়াংশেং অত্যন্ত খুশি হলেন। তিনি তখনই লোক পাঠিয়ে ভাড়ার জন্য ঘর খুঁজতে বললেন। বিদায়ের সময় তিনি সাই কুনলুনকে চারবার সম্মানসূচক প্রণাম জানিয়ে বিদায় নিলেন।
ওয়েই ইয়াংশেং-এর পরবর্তী অদ্ভুত অভিজ্ঞতা কেমন ছিল, তা পরের অধ্যায়ে জানা যাবে।
সমালোচকের মন্তব্য:
সাই কুনলুন-এর চরিত্র বিচার করলে দেখা যায়, তিনি ওয়েই ইয়াংশেং-এর চেয়ে অন্তত দশগুণ ভালো মানুষ! প্রশ্ন জাগে—ওয়েই ইয়াংশেং কি খারাপ লোকের সঙ্গ পেয়েছিলেন, নাকি সাই কুনলুনই ভুল করে খারাপ লোকের পাল্লায় পড়েছিলেন?
পঞ্চম অধ্যায়: সুন্দরীদের অন্বেষণ, পুষ্প-তালিকা প্রণয়ন এবং শ্বেতকেশী মাকে গ্রহণের অদ্ভুত পরিকল্পনা
সাই কুনলুন বিদায় নেওয়ার পর, ওয়েই ইয়াংশেং একটি মন্দিরে আস্তানা গাড়লেন। এই মন্দিরটি ছিল সন্তানদাতা দেবতা ‘ঝাং জিয়ান’-এর উপাসনালয়। মন্দিরে কক্ষ সংখ্যা ছিল খুবই কম এবং সাধারণত সেখানে অতিথিদের থাকার অনুমতি দেওয়া হতো না।
কিন্তু ওয়েই ইয়াংশেং দ্বিগুণ ভাড়া দিতে চাইলেন। যেখানে অন্য জায়গায় মাসে এক ‘তালেন’ (মুদ্রা) ভাড়া লাগত, সেখানে তিনি দুই তালেন দিতে রাজি হলেন। পুরোহিত সামান্য বাড়তি লাভের লোভে নীতি বিসর্জন দিয়ে তাঁকে থাকার অনুমতি দিলেন।
প্রশ্ন হলো, কেন তিনি এত বেশি ভাড়া দিয়ে এখানেই থাকতে চাইলেন? কারণ, এই মন্দিরের দেবতা ঝাং জিয়ান ছিলেন অত্যন্ত জাগ্রত। দূর-দূরান্ত থেকে অনেক নিঃসন্তান নারী সন্তান লাভের আশায় এখানে আসতেন। ওয়েই ইয়াংশেং চেয়েছিলেন এই জায়গাটিকে তাঁর ‘সুন্দরী নির্বাচনের ক্ষেত্র’ বা শিকার ধরার ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করতে। তাই তিনি এখানেই ডেরা পাতলেন।
এখানে আসার পর দেখলেন, প্রতিদিন দলে দলে মহিলারা ধূপ জ্বালাতে আসছেন। এই ধূপ জ্বালাতে আসা মহিলারা অন্য মন্দিরের দর্শনার্থীদের চেয়ে একটু আলাদা। প্রতি দশজনের মধ্যে অন্তত এক-দুজন বেশ সুন্দরী।
এর কারণ কী? আসলে, অন্য মন্দিরে যারা পুজো দিতে যান, তাঁরা বেশিরভাগই বয়স্ক বা প্রৌঢ়া—তরুণী কমই থাকেন। ফলে ওয়েই ইয়াংশেং-এর চোখে পড়ার মতো কেউ সেখানে মিলত না। কিন্তু এখানে যারা সন্তান কামনায় আসেন, তাঁরা প্রায় সবাই নববিবাহিতা বা তরুণী বধূ। বয়স্কদের তো মাসিক বন্ধ হয়ে যায়, সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না; আর মধ্যবয়সীদেরও প্রজনন ক্ষমতা কমে আসে। তাই সন্তানপ্রার্থী হিসেবে যারা আসত, তাদের বয়স সাধারণত চৌদ্দ থেকে বিশ বছরের মধ্যে।
এই পাঁচ-ছয় বছরের ব্যবধানের মেয়েদের—দেখতে ভালো বা মন্দ যাই হোক না কেন—মুখে তারুণ্যের এক গোলাপি আভা থাকে, যা অলক্ষ্যেই পুরুষের মন হরণ করে। তাই প্রতি দশজনের মধ্যে অন্তত এক-দুজন ওয়েই ইয়াংশেং-এর কামুক দৃষ্টিতে ধরা পড়ত।
ওয়েই ইয়াংশেং প্রতিদিন ভোরে উঠে পরিপাটি করে সেজেগুজে দেবতার মূর্তির সামনে পায়চারি করতেন। যখনই কোনো রমণীকে মন্দিরে প্রবেশ করতে দেখতেন, তখনই তিনি ঝাং জিয়ানের বিশাল মূর্তির আড়ালে আত্মগোপন করতেন। সেখানে দাঁড়িয়ে পুরোহিতের প্রার্থনা শুনতেন, এবং আড়চোখে দেখতেন নারীরা কীভাবে ধূপ জ্বেলে পূজা নিবেদন করছে। এই ফাঁকে তাদের মুখশ্রী ও অঙ্গভঙ্গি খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করতেন না।
তারপর যেই না তারা একটু অমনোযোগী হতো, তিনি হঠাৎ করে মূর্তির আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতেন। সেই নারীরা তাঁর অনিন্দ্যসুন্দর রূপ দেখে চমকে উঠত! তাদের সরল মনে ধারণা জন্মাত—হয়তো তাদের ভক্তি দেখে স্বয়ং দেবতা ঝাং জিয়ান জীবন্ত হয়ে সন্তান বর দিতে মর্ত্যে নেমে এসেছেন। কিন্তু যখন তিনি সিঁড়ি দিয়ে নেমে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতেন, তখন তাদের ভুল ভাঙত। তারা বুঝতে পারত ইনি দেবতা নন, রক্তমাংসের মানুষ।
ততক্ষণে অবশ্য যা হওয়ার হয়ে গেছে—তাদের মন ও প্রাণ সেই ‘জীবন্ত ঝাং জিয়ান’ হরণ করে নিয়েছে। এই আকস্মিক দর্শনে নারীরা মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়ত। তাদের চঞ্চল আঁখি থেকে কামনার ইঙ্গিত ভেসে আসত, এবং তারা যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও পা টেনে টেনে ফিরে যেত। কেউ কেউ তো আবার সংকেত হিসেবে ইচ্ছে করে নিজেদের রুমাল ফেলে রেখে যেত।
এই ঘটনাগুলোর পর থেকে ওয়েই ইয়াংশেং-এর আচরণে আরও লঘুতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা দেখা দিল। তিনি প্রায়ই দম্ভ করে বলতেন, “পৃথিবীর সমস্ত সুন্দরী রমণী কেবল আমার উপভোগের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে।”
মন্দিরে আসার পর থেকে তিনি একটি ছোট পকেট ডায়েরি বা গোপন খাতা রাখতেন, যা সবসময় তাঁর জামার ভেতরের পকেটে লুকানো থাকত। খাতার মলাটে বড় বড় চারটি অক্ষরে লেখা ছিল—“বসন্তের বিচিত্র বর্ণ সংগ্রহ”।
মন্দিরে আগত কোনো নারীর মধ্যে সামান্য সৌন্দর্য দেখলেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা সেই খাতায় টুকে নিতেন। অমুক মহিলা, বয়স কত, স্বামীর নাম কী, কোথায় থাকেন—সব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিখে রাখতেন। পাশে লাল কালির বৃত্ত এঁকে তাদের রূপের মান নির্ধারণ করতেন।
- বিশেষ শ্রেণি: তিনটি বৃত্ত।
- উচ্চ শ্রেণি: দুটি বৃত্ত।
- মধ্যম শ্রেণি: একটি বৃত্ত।
প্রতিটি নামের পাশে তিনি চার থেকে ছয়টি লাইনে মন্তব্য লিখতেন, যেখানে তাদের রূপ ও গুণের রসালো বর্ণনা থাকত।
প্রশ্ন হলো, ওয়েই ইয়াংশেং এত মহিলার নাম-ধাম ও স্বামীর পরিচয় জানতেন কী করে? এর রহস্য হলো, মহিলারা যখন ধূপ জ্বালাতে আসত, তখন পুরোহিত তাদের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করতেন এবং সেই সময় তাদের নাম, বয়স, কার স্ত্রী এবং বাড়ির ঠিকানা জিজ্ঞাসা করতেন। নারীটি নিজে উত্তর না দিলেও সঙ্গে থাকা দাসী বা ভৃত্য তার হয়ে উত্তর দিত। ওয়েই ইয়াংশেং আড়ালে দাঁড়িয়ে সেসব মুখস্থ করে নিতেন এবং তারা চলে যাওয়ার পর ডায়েরি বের করে তা লিপিবদ্ধ করতেন।
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি ওই এলাকার সমস্ত সুন্দরী রমণীর তথ্য সংগ্রহ করে ফেললেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এত নাম থাকলেও তারা সবাই ছিল প্রথম বা মধ্যম শ্রেণির; তিনটি বৃত্ত পাওয়ার যোগ্য বা ‘বিশেষ শ্রেণি’র একজনও ছিল না।
তিনি মনে মনে ভাবলেন, “সমালোচনার পর, আমার আবার সেই অর্ধ-বয়সী সুন্দরী মহিলার কথা মনে পড়ছে। যদিও তিনি প্রৌঢ়া, কিন্তু তাঁর তারুণ্যের দীপ্তি এতটুকুও ম্লান হয়নি। অন্য সব বাদ দিলেও, তাঁর চোখ দুটি যেন একজোড়া অমূল্য রত্ন। শুরুতে তিনি আমার দিকে বেশ কয়েকবার তাকিয়েছিলেন, কিন্তু আমি অন্য দুজনকে দেখতে ব্যস্ত থাকায় তাঁর দিকে নজর দিইনি।
এখন মনে হচ্ছে এটা বড় অন্যায় হয়েছে। তাছাড়া, একজন সুন্দরী তরুণীর সঙ্গে যখন তিনি ছিলেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই তার শ্যালিকা বা কোনো আত্মীয় হবেন। তাই সেই তরুণীকে পেতে হলে এই বয়স্ক সুন্দরীকেও কিছুটা সম্মান দেখানো উচিত। তিনি আবার আমাকে সাহায্য করতে এবং মজা করতে বেশ আগ্রহী ছিলেন; তিনিই তো ইশারা করে অন্য দুজনকে আমার দিকে তাকাতে প্ররোচিত করেছিলেন—যা স্পষ্টতই একজন অভিজ্ঞ ও রসবতী নারীর লক্ষণ।
যদি আমি তাঁকে খুঁজে পাই এবং বশ করতে পারি, তবে অন্য দুজনকেও অনায়াসেই আমার কামশয্যায় আনতে পারব। আমি এখন তাঁকেও আমার এই খাতায় অন্তর্ভুক্ত করব এবং তাঁর সম্পর্কে একটি চমত্কার প্রশস্তি লিখব। প্রথমত, তাঁর সেই পরোক্ষ সহায়তার পুরস্কার হিসেবে; আর দ্বিতীয়ত, যদি তাঁকে খুঁজে পাই তবে এই খাতাটি তাঁকে দেখিয়ে খুশি করা যাবে। তখন তিনি নিশ্চয়ই আমার হয়ে কাজ করতে রাজি হবেন।
আমি কলম তুলে নিলাম এবং সেই তরুণী সুন্দরীদের নামের পাশে থাকা ‘দুই’ বৃত্তটি কেটে ‘তিন’ বৃত্তে পরিবর্তন করলাম। আর যেহেতু সেই বয়স্ক মহিলা কালো পোশাক পরেছিলেন, তাই আমি তাঁকে একটি বিশেষ নাম দিলাম:
এক কৃষ্ণবর্ণা সুন্দরী:
- বয়স: অনুমানে ঊনচল্লিশ, কিন্তু তারুণ্য আঠারোর মতো সজীব।
- শারীরিক গঠন: দেখে মনে হয় বিদুষী ও শান্ত, কিন্তু তাঁর ভেতরের আবেগ ও কামনা অত্যন্ত তীব্র।
- পর্যালোচনা: এই মহিলার গোপন কামতৃষ্ণা প্রবল, তাঁর প্রেমের জোয়ার দ্রুত প্রবাহিত হয়। তাঁর কোমর যদিও যুবতীদের চেয়ে কিছুটা স্থূল, কিন্তু তাঁর ভ্রূ-যুগল নতুনদের সঙ্গেও পাল্লা দিতে পারে। তাঁর গাল গোলাপের চেয়েও রক্তিম, ত্বক স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ। সবচেয়ে মুগ্ধকর হলো তাঁর চঞ্চল চোখ দুটি—যা স্থির থাকলেও মনে হয় অশ্রুসজল, যেন পাহাড়ের নিচে ঝিলিক দেওয়া বিদ্যুতের মতো। তিনি এক পা না নড়লেও তাঁর শরীর এমনভাবে দোলে, যা পাহাড়ের চূড়ায় ভাসা মেঘের মতো হালকা। নিঃসন্দেহে, তিনি অন্য দুই তরুণীর সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিতে পারেন!
লেখা শেষ করে, আমি প্রতিটি নামের ওপর তিনটি করে বৃত্ত আঁকলাম এবং যথারীতি খাতাটি জামার পকেটে লুকিয়ে রাখলাম।
সেই দিন থেকে, ঝাং জিয়ান মন্দিরে যাওয়া বা না যাওয়া আমার মর্জির ওপর নির্ভর করত। যেসব মহিলারা আসত, তাদের দেখা বা না দেখাও আমার ইচ্ছাধীন ছিল। আমি কেবল এই তিন সুন্দরী রমণীকেই আমার হৃদয়ের মণিকোঠায় গেঁথে রাখলাম এবং সারাদিন এই খাতাটি বুকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। কিন্তু হায়, তাদের কোনো চিহ্নই মিলল না।
আমি মনে মনে ভাবলাম, “সাই কুনলুন তো সবচেয়ে ধূর্ত এবং তাঁর নখদর্পণে সব পথঘাট। তাঁকেই কেন জিজ্ঞাসা করছি না?” কিন্তু একটা সমস্যা ছিল। তিনি আমাকে একজন সুন্দরী খুঁজে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে তাঁর কোনো দেখা নেই। হয়তো তিনি খোঁজার কাজেই ব্যস্ত আছেন। এখন যদি আমি তাঁকে আমার নিজের পছন্দের কথা বলি, তবে তিনি ভাববেন আমার বুঝি অন্য কাউকে পছন্দ হয়েছে এবং তখন তিনি তাঁর দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন। তাছাড়া, কোনো নাম-ধাম ছাড়া তাঁকে কোথায় খুঁজতে বলব?
তাই ঠিক করলাম, আপাতত এই তিনজনের কথা মনেই চেপে রাখব এবং আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করব। হয়তো তিনি নিজেই কাউকে খুঁজে এনে আমাকে জানাবেন। কে জানে? পৃথিবীতে অন্য সবকিছুর প্রাচুর্য থাকলেও, সত্যিকারের সুন্দরী নারীর সংখ্যা বড়ই কম।
এরপর থেকে প্রতিদিন সকালে আমি হয় বাইরে খুঁজতে বের হতাম, নয়তো ঘরে অলসভাবে পড়ে থাকতাম। একদিন হঠাৎ রাস্তায় সাই কুনলুনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আমি তাঁকে খপ করে ধরে জিজ্ঞাসা করলাম, “বড় ভাই, সেদিন যে কাজের কথা দিয়েছিলেন, তার কোনো খবর নেই কেন? ভুলে গেছেন নাকি?”
সাই কুনলুন বললেন, “সবসময় মনে আছে, ভুলব কী করে? তবে ভাই, সাধারণের ভিড় বেশি, অসাধারণের দেখা মেলা ভার। সম্প্রতি একজনকে খুঁজে পেয়েছি। তোমাকে জানাতেই যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।”
ওয়েই ইয়াংশেং শুনে আনন্দে উদ্ভাসিত হলেন এবং বললেন, “যদি তাই হয়, তবে চলুন আমার বাসায় গিয়ে বিস্তারিত কথা বলি।”
দুজনে হাতে হাত রেখে একসঙ্গে বাসায় প্রবেশ করলেন। গৃহকর্মীকে কোনো অজুহাতে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে, তাঁরা দুজন ঘরের দরজা শক্ত করে বন্ধ করলেন এবং সেই ‘শুভ কাজের’ চক্রান্ত করতে বসলেন।
কে জানে কোন নারীর ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে এমন একজন দক্ষ রসিক পুরুষের সঙ্গে তাঁর দেখা হলো? আবার কে জানে কোন স্বামীর কপাল পুড়ল যে এমন এক লম্পট পরপুরুষের নজর তাঁর স্ত্রীর ওপর পড়ল?
হে পাঠক, আপনাদের আর অনুমানের প্রয়োজন নেই; পরের অধ্যায়েই এর বিস্তারিত বিবরণ অপেক্ষা করছে।
দ্বিতীয় খণ্ড: জাগরণের পর গ্রীষ্মকালীন ধ্যান
ষষ্ঠ অধ্যায়: ক্ষুদ্র প্রতিভার আস্ফালন এবং তুচ্ছ বিষয়ে হাস্যাস্পদ পরিণতি
কবিতা:
যদি না থাকে রতিশয্যার নিপুণ কৌশল,
তবে ক্ষুদ্র বিদ্যা নিয়ে ডেকো না অমঙ্গল।
কে দেখেছে অন্ধকারে প্যান আন-এর রূপ?
রণক্ষেত্রে কি জ্বলে জিয়ান-এর প্রতিভার ধূপ?
আত্মা যখন ফেরে সেই প্রাচীন চু রাজ্যে,
জিজ্ঞাসো তাকে—কেন এসেছিল ইয়াংতাই-এর মাঝে?
যদি চাও জন্মে জন্মে হতে কামুক পুরুষ,
তবে নিজের মানদণ্ড নিজেই কোরো পরখ।
সাই কুনলুন আসনে বসার পর প্রথমেই ওয়েই ইয়াংশেংকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভাই, এই কদিনে তোমার কি কোনো নতুন বা বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে?”
ওয়েই ইয়াংশেং ভয় পেলেন, পাছে সত্যি কথা বললে সাই কুনলুন নিজের দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে দেন। তাই তিনি মিথ্যে বললেন, “না ভাই, তেমন কিছুই হয়নি।”
সঙ্গে সঙ্গেই তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “বড় ভাই, আপনি যে সুন্দরীর কথা বলছিলেন, সে কে? কোথায় থাকে? তার বয়স কত? আর দেখতেই বা কেমন?”
সাই কুনলুন বললেন, “আমি কেবল একজনকে নয়, মোট তিনজনকে খুঁজে বের করেছি। কিন্তু শর্ত হলো—তোমাকে এদের মধ্যে মাত্র একজনকে বেছে নিতে হবে। খবরদার! লোভ করে সবাইকে চাইতে যেও না, তাহলে পুরো কাজটাই পণ্ড হবে।”
ওয়েই ইয়াংশেং মনে মনে সন্দেহ করলেন, “আমি মনে মনে তিনজনকে পছন্দ করে রেখেছি, আর উনিও বলছেন তিনজনের কথা। তবে কি এই তিনজনই সেই তিনজন যাদের আমি সেদিন মন্দিরে দেখেছিলাম? যদি তাই হয়, তবে একজনকে বাগে পেলেই বাকি দুজন এমনিতেই আমার জালে ধরা দেবে; তখন আর ওঁর সাহায্যের দরকার হবে না।”
তাই তিনি মুখে বললেন, “এ কী বলছেন! একজনকে পেলেই আমার জীবন ধন্য, এমন লোভ করার সাহস আমার নেই!”
সাই কুনলুন বললেন, “বেশ। তাহলে তোমাকে আরেকটা প্রশ্ন করি—তুমি কি একটু স্বাস্থ্যবতী নারী পছন্দ করো, নাকি ছিপছিপে গড়ন?”
ওয়েই ইয়াংশেং উত্তর দিলেন, “নারীর শরীর স্বাস্থ্যবতী হলে তার একরকম সৌন্দর্য আছে, আবার ছিপছিপে হলেও তার আলাদা মাদকতা আছে। তবে স্বাস্থ্যবতী এমন হওয়া উচিত নয় যে শরীরে পোশাক আঁটে না; আর ছিপছিপে এমন হওয়া উচিত নয় যে হাড়গোর বেরিয়ে থাকে। গড়ন ঠিকঠাক হলেই হলো।”
সাই কুনলুন বললেন, “তাহলে তো তিনজনই তোমার পছন্দ হবে। আবার জিজ্ঞাসা করি—তুমি কি চঞ্চল বা চপলা নারী পছন্দ করো, নাকি শান্ত-ধীরস্থির?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “অবশ্যই চঞ্চল। বিছানায় মূর্তির মতো শান্ত নারী শুয়ে থাকলে কি কোনো সুখ পাওয়া যায়? তার চেয়ে একা ঘুমানোই ভালো।”
সাই কুনলুন মাথা নেড়ে বললেন, “তবে তো মুশকিল! তিনজনই তোমার উপযুক্ত নয়।”
ওয়েই ইয়াংশেং অবাক হয়ে বললেন, “আপনি কী করে বুঝলেন যে তারা শান্ত?”
সাই কুনলুন বললেন, “ওই তিনজনই প্রায় একই ধাঁচের। রূপের দিক থেকে তারা হয়তো ষোল আনা খাঁটি, কিন্তু ‘চঞ্চলতা’ বা ‘আদিখ্যেতা’ তাদের স্বভাবে খুব একটা নেই।”
ওয়েই ইয়াংশেং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, “ওটা কোনো সমস্যাই নয়। নারীদের আবেগ আর আচরণ তো শিখিয়ে নেওয়া যায়। বড় ভাইকে বলতে দ্বিধা নেই, আমার স্ত্রী যখন প্রথম এসেছিল, তখন সেও খুব শান্ত আর লাজুক ছিল। কিন্তু আমি আমার কৌশলে মাত্র কয়েকদিনেই তাকে চঞ্চল করে তুলেছি। এখন সে রতি-ক্রীড়ায় অত্যন্ত পারদর্শী। যদি সেই তিন মহিলার রূপ মনকাড়া হয়, তবে তারা শান্ত হলেও আমি তাদের বদলে ফেলার মন্ত্র জানি।”
সাই কুনলুন বললেন, “বেশ, মেনে নিলাম। এবার শেষ প্রশ্ন—তুমি কি দেখা হওয়া মাত্রই তাকে পেতে চাও, নাকি কয়েক মাস ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে ধীরে ধীরে পেতে চাও?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “বড় ভাই, আপনাকে সত্যিটাই বলি। আমার শরীরের কামাগ্নি বড়ই তীব্র। তিন-পাঁচ রাত কোনো নারীর সঙ্গ না পেলেই আমার স্বপ্নদোষ হয়। এখন এতদিন ঘরছাড়া থাকায় এই কামনা আমাকে বড়ই অস্থির করে তুলেছে। সুন্দরী নারী না পেলে কোনোমতে নিজেকে সামলে রাখি, কিন্তু হাতের নাগালে পেলে হয়তো নিজেকে ধরে রাখতে পারব না।”
সাই কুনলুন বললেন, “তাহলে বাকি দুজনকে আপাতত বাদ দাও, শুধু এই একজনের কথাই বলি। অন্য দুজন ধনী ও অভিজাত পরিবারের কন্যা, তাদের বাগে আনতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু এই একজন হলো এক গরিবের স্ত্রী, তাকে বশ করা অনেক সহজ।
যেহেতু আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম, তাই সবসময়ই আমার মাথায় এটা ছিল। যখনই কোনো রমণীকে দেখতাম, খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতাম। একদিন এক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, দেখলাম এই মহিলাটি ঘরের ভেতর বসে আছে, দরজার বাইরে একটি বাঁশের চিক বা পর্দা ঝুলছে।
যদিও পর্দার আড়াল থেকে খুব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না, তবুও মনে হলো তার মুখে যেন এক রক্তিম আভা খেলছে, আর তার শুভ্র ত্বক থেকে যেন মুক্তো বা রত্নখণ্ডের মতো জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। তার পুরো অবয়ব দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো দক্ষ শিল্পীর আঁকা সুন্দরী নারীর ছবি পর্দার ওপারে বাতাসে দুলছে।
আমি হেঁটে গিয়ে দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। দেখলাম ভেতর থেকে এক পুরুষ বেরিয়ে এল। লোকটা বেশ মোটা আর অগোছালো, পরনে জীর্ণ পোশাক। সে এক বান্ডিল রেশমি সুতা নিয়ে বাজারে বিক্রি করতে যাচ্ছিল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম। প্রতিবেশীরা বলল তার নাম ‘কুয়ান লাওশি’, সে একজন নিতান্তই ভালোমানুষ, তাই লোকে তাকে ‘সৎ কুয়ান’ বলে ডাকে। ওই মহিলাটি হলো তার স্ত্রী।
আমার ভয় হলো পাছে পর্দার আড়াল থেকে ঠিকমতো না দেখে ভুল করে ফেলি। তাই কয়েকদিন পর আবার ওই পথ দিয়ে গেলাম। দেখলাম সে আজও ভেতরে বসে আছে। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। আমি পর্দা সরিয়ে সোজা ভেতরে ঢুকে গেলাম এবং বললাম যে আমি তার স্বামীকে খুঁজছি, কিছু রেশমি সুতা কিনতে চাই।
সে বলল তার স্বামী বাড়িতে নেই। তবে যদি সুতা কিনতেই হয়, তবে বাড়িতে অনেক আছে, আমি দেখে নিতে পারি। এই বলে সে সুতা বের করতে গেল। আমি দেখলাম তার হাতের দশটি আঙুল যেন পদ্মের কুঁড়ি, আর তার দুটি ছোট পা তিন ইঞ্চির বেশি হবে না। হাত-পা দেখা গেলেও শরীরের অন্য অংশের মাংস দেখা যাচ্ছিল না, তাই বুঝতে পারলাম না সে কালো না ফর্সা।
আমি আবার একটা কৌশল করলাম। দেখলাম তার তাকের ওপর আরও এক বান্ডিল সুতা আছে। তাই তাকে বললাম, ‘এগুলো ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। ওই ওপরেরটা নামিয়ে দেখান তো কেমন?’ সে রাজি হলো এবং হাত তুলে তা নামাতে গেল।
তুমি তো জানো, এখন গ্রীষ্মকাল। সে খুব পাতলা সুতির জামা পরেছিল। যখন সে হাত তুলল, তখন তার জামার দুটি বড় হাতা কনুই ছাড়িয়ে কাঁধ পর্যন্ত উঠে গেল। কেবল তার দুটি নিটোল বাহুই পুরোপুরি দেখা গেল না, তার বুকের উন্নত স্তনযুগলও আবছাভাবে আমার নজরে এল। সত্যিই ভাই, তা বরফের মতো শুভ্র আর আয়নার মতো উজ্জ্বল! আমার জীবনে দেখা নারীদের মধ্যে সেই সেরা।
তাকে অনেকক্ষণ বিনা কারণে খাটালাম বলে নিজেরই খারাপ লাগল, তাই এক বান্ডিল সুতা কিনে বেরিয়ে এলাম। বলো ভাই, এই মহিলাটিকে তুমি চাও কি না?”
ওয়েই ইয়াংশেং উত্তেজিত হয়ে বললেন, “সে যদি এতটাই নিখুঁত হয়, তবে কেন চাইব না? কিন্তু তার সঙ্গে দেখা হবে কী করে? আর দেখা হওয়ার পর তাকে বাগে পাবই বা কী করে?”
সাই কুনলুন বললেন, “ওটা কোনো কঠিন কাজ নয়। আমি এখনই তোমার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে যাব। তার স্বামী যখন বাইরে যাবে, তখন আমি আগের মতোই সুতা কেনার ভান করে ভেতরে ঢুকব এবং তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাব। তুমি তাকে একনজর দেখলেই বুঝতে পারবে সে তোমার পছন্দ কি না।
আমার মনে হয়, সে সারাদিন ওই মোটা আর বেরসিক স্বামীর সঙ্গে একঘেয়ে সংসার করে, তার জীবনে কোনো আনন্দ নেই। হঠাৎ তোমার মতো সুপুরুষকে দেখলে কি তার মন চঞ্চল হবে না? তুমি তাকে একটু ইশারা-ঙ্গিতে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা কোরো। যদি সে মুখের ওপর রেগে না যায়, তবে আমি ফিরে এসে তোমার জন্য সব ব্যবস্থা করে দেব। তিন দিনের মধ্যেই তাকে তুমি তোমার কামশয্যায় পাবে। আর যদি দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক গড়তে চাও, তবে সে দায়িত্বও আমার।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “যদি তাই হয়, তবে আমি আপনার কাছে চিরঋণী থাকব। তবে একটা খটকা লাগছে—আপনার তো অলৌকিক চুরিবিদ্যা আর দেয়াল টপকানোর ক্ষমতা আছে, পৃথিবীতে কোনো কাজই তো আপনার অসাধ্য নয়। তবে কেন কেবল এই গরিব ঘরের বউকেই বাগে আনা যাবে, আর অন্য দুজনের বেলায় আপনি পিছিয়ে যাচ্ছেন? শেষ পর্যন্ত কি গরিবদের ঠকানোই সহজ, আর ধনীদের ঘাঁটানোর সাহস নেই?”
সাই কুনলুন হেসে বললেন, “পৃথিবীর সব কাজেই গরিবদের ঠকানো সহজ আর ধনীদের ঘাঁটানো কঠিন—এটা সত্য। কিন্তু নারী হরণ বা পরকীয়ার ক্ষেত্রে উল্টো নিয়ম খাটে: ধনীদের ঠকানো সহজ, কিন্তু গরিবদের ঘাঁটানো বড়ই কঠিন।”
ওয়েই ইয়াংশেং অবাক হয়ে বললেন, “সে কী! কেন এমন হবে?”
সাই কুনলুন ব্যাখ্যা করলেন, “শোনো তবে। ধনী পরিবারে একজন পুরুষের তিন-চারজন স্ত্রী বা উপপত্নী থাকে। স্বামী যখন একজনের ঘরে রাত কাটায়, তখন বাকিরা একাকী থাকে। প্রাচীনকাল থেকেই বলা হয়, ‘পেট ভরা থাকলে আর গা গরম থাকলে কামভাব জাগে’। ওই মহিলারা পেট ভরে খায়, দামী ও উষ্ণ পোশাক পরে, আর সারাদিন কোনো কাজ না থাকায় অলস বসে থাকে। তাদের মাথায় কেবল ওই একটা চিন্তাই ঘোরে।
যখন আর কোনো উপায় থাকে না, তখন যদি কোনো পরপুরুষ তাদের বিছানায় ঢুকে পড়ে, তবে তারা বরং খুশিই হয়—কেন তাকে ফিরিয়ে দেবে? এমনকি যদি স্বামী এসে দেখেও ফেলে, তবে সে ধনী পরিবারের মান-সম্মান নষ্ট হওয়ার ভয়ে চুপ থাকে। যদি সে পরপুরুষকে ধরে কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়, তবে তার নিজের বদনাম হবে। আর যদি সবাইকে মেরে ফেলতে চায়, তবে সে তার সাধের সুন্দরী স্ত্রীকে হারাতে চায় না।
স্ত্রীকে হারাতে না চাইলে, শুধু প্রেমিককে মেরে ফেলার কোনো যুক্তি থাকে না। তাই সে রাগ চেপে রেখে, লোকলজ্জার ভয়ে ব্যাপারটা ধামাচাপা দেয় এবং প্রেমিককে প্রাণ নিয়ে পালাতে দেয়।
কিন্তু গরিবের ঘরে থাকে মাত্র একজন স্ত্রী। তারা প্রতি রাতে একসঙ্গে ঘুমায়। ওই মহিলা সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটে আর পেটে ক্ষুধা থাকে বলে তার মনে অহেতুক কামভাব জাগে না। আর যদি কখনো সে ভুল করে কোনো পরপুরুষের সঙ্গে মিলিতও হয় এবং স্বামী তা দেখে ফেলে—তবে সেই গরিব মানুষটি সম্মানের তোয়াক্কা করে না। সে হয় প্রেমিককে ধরে সোজা কাজীর কাছে নিয়ে যায়, নয়তো রাগের মাথায় দুজনকেই একসঙ্গে কুপিয়ে মারে।
তাই বলছি—পরকীয়ার ক্ষেত্রে গরিবদের ঘাঁটানো কঠিন, আর ধনীদের ঠকানোই সহজ।”
ওয়েই ইয়াংশেং অবাক হয়ে বললেন, “যদি তাই হয়, তবে আজ আপনার কথা আর যুক্তিতে মিল পাচ্ছি না কেন? একটু আগেই তো বললেন ধনীদের ঠকানো সহজ!”
সাই কুনলুন শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “আমার কথা আর কাজে কোনো বিরোধ নেই ভাই। আসলে এই পরিবারটি এবং ওই ধনী পরিবারটির পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই এই মুহূর্তে সিল্ক বিক্রেতার স্ত্রীকে বশ করা সহজ, আর ওই দুই ধনী গৃহবধূর নাগাল পাওয়া কঠিন।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “আমার মন তো ওই দুই রমণীর দিকেই ঝুঁকছে। দয়া করে তাদের বিষয়ে বিস্তারিত বলুন, যাতে বুঝতে পারি আপনি আমার জন্য কতখানি কষ্ট স্বীকার করেছেন।”
সাই কুনলুন তখন বিস্তারিত বর্ণনা দিলেন, “ওই দুই রমণীর মধ্যে বড়জনের বয়স কুড়ির কোঠায়, আর ছোটজনের বয়স ষোল-সতেরো। তারা বাপের বাড়িতে আপন বোন ছিল, আর এখন শ্বশুরবাড়িতে তারা জা বা ভাশুর-বউ। তাদের শ্বশুরবংশ অভিজাত রাজকর্মচারীর পরিবার, তবে তাদের স্বামীরা কেবলই পণ্ডিত।
বড় ভাইয়ের নাম ‘উয়ুন শেং’, তাঁর সঙ্গে ওই বড় বোনের বিয়ে হয়েছে চার-পাঁচ বছর। আর ছোট ভাইয়ের নাম ‘ইয়িয়ুন শেং’, তাঁর সঙ্গে ছোট বোনের বিয়ের বয়স তিন মাসও পেরোয়নি। রূপের দিক থেকে তারা দুজনেই ওই সিল্ক বিক্রেতার স্ত্রীর মতোই অপরূপা। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা দুজনেই স্বভাবগতভাবে বড়ই নিস্তেজ ও শান্ত।
বিছানায় মিলনের সময় তারা না শরীর নাড়ায়, না মুখ খোলে। দেখে মনে হয় যেন এই কাজটি তাদের পছন্দই নয়। একে তো তারা নিজেরা কামুক নয়, তার ওপর স্বামীদেরও অন্য কোনো উপপত্নী বা স্ত্রী নেই—তাই তারা প্রতি রাতে স্বামীদের সঙ্গেই ঘুমায়। এমন পরিস্থিতিতে তাদের বশ করা বড়ই কঠিন। তুমি যদি হাজার চেষ্টায় তাদের সুপ্ত কামাগ্নি জাগিয়েও তোলো, তবুও তাদের স্বামীদের অনুপস্থিতিতে সুযোগ পাওয়া—সে তো কয়েক মাসের ধৈর্যের ব্যাপার! তার চেয়ে ওই সিল্ক বিক্রেতার স্ত্রীই ভালো, তার স্বামী প্রায়ই ব্যবসায় বাইরে থাকে, তাকে বাগে আনা অনেক সহজ।”
ওয়েই ইয়াংশেং বুঝতে পারলেন যে সাই কুনলুন যাদের কথা বলছেন, তারা সেই মন্দির-ফেরত সুন্দরীদের মতোই। তাই তিনি তাদের লোভ ছাড়তে পারলেন না। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বললেন, “বড় ভাইয়ের বুদ্ধি নিঃসন্দেহে প্রখর, কিন্তু এখানে দেখার একটু ভুল হচ্ছে। আপনি বলছেন ওই দুই রমণী শান্ত এবং কামশীতল—এর কারণ নিশ্চয়ই তাদের স্বামীদের ‘পৌরুষদণ্ড’ ছোট এবং রতিশক্তি কম। তাই বেচারিরা আসল আনন্দ পায় না বলেই এমন আচরণ করে। কিন্তু যদি আমার মতো পুরুষের ছোঁয়া পায়, তবে দেখবেন ওই শান্ত নদীও আর শান্ত থাকবে না।”
সাই কুনলুন মুচকি হেসে বললেন, “আমি নিজের চোখে দেখেছি, ওই দুই ভাইয়ের পৌরুষও খুব একটা ছোট নয়, আর তাদের শক্তিও ফেলনা নয়। হয়তো খুব দীর্ঘদেহী বা স্থূল পুরুষের চেয়ে সামান্য কম হতে পারে। আচ্ছা, তোমাকে একটা প্রশ্ন করি—তোমার নিজের পৌরুষের মাপ কত? তোমার রতিশক্তি কতক্ষণ স্থায়ী হয়? আমাকেও একটু জ্ঞান দাও, যাতে তোমার দক্ষতার গভীরতা বুঝে আমি নিশ্চিন্তে ঘটকালি করতে পারি।”
ওয়েই ইয়াংশেং দম্ভভরে বললেন, “এ নিয়ে বড় ভাইকে একদম ভাবতে হবে না। আমার পৌরুষ আর শক্তি—দুটোই যথেষ্ট। যে কোনো বড় মাপের নারীকে আমি তৃপ্ত করে তবেই থামব। আমি সেই সব কৃপণ অতিথির মতো নই যারা পেট ভরে খাওয়ার পরেও ক্ষুধার্ত থাকে, কিংবা নেশা করার পর হুঁশ হারিয়ে ফেলে।”
সাই কুনলুন আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “সে তো বুঝলাম। কিন্তু একটু পরিষ্কার করে বলো ভাই, সাধারণত কতবার ঘর্ষণের পর তোমার স্খলন হয়?”
ওয়েই ইয়াংশেং এড়িয়ে গিয়ে বললেন, “নারীদের সঙ্গে রতি-ক্রীড়ার সময় আমি কোনো নিয়ম বা সংখ্যা গুনে চলি না। আমি তাকে অগণিতবার সুখ দেওয়ার পরেই ক্ষান্ত হই। অত সংখ্যা কে মনে রাখে?”
সাই কুনলুন নাছোড়বান্দা, বললেন, “সংখ্যা মনে না থাকলেও সময় তো মনে থাকার কথা। ঘড়ির কাঁটায় কতক্ষণ টিকতে পারো?”
আসলে ওয়েই ইয়াংশেং-এর ক্ষমতা ছিল বড়জোর ‘অর্ধেক প্রহর’ (আধ ঘণ্টা)। কিন্তু পাছে সাই কুনলুন তাঁকে অযোগ্য ভেবে কাজ ছেড়ে দেন, তাই তিনি বাড়িয়ে বললেন, “আমার শক্তি পুরো এক প্রহর (দুই ঘণ্টা) পর্যন্ত টিকে থাকে!”
সাই কুনলুন বললেন, “তাহলে তো এ সাধারণ শক্তি, খুব একটা আহামরি কিছু নয়। স্বামী-স্ত্রীর ঘরোয়া মিলনের জন্য এটুকু যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু পরের ঘরে সিঁদ কেটে পরকীয়া করতে গেলে এই শক্তিতে কুলাবে না। সেখানে অনেক বেশি দম লাগে।”
ওয়েই ইয়াংশেং আশ্বাস দিয়ে বললেন, “বড় ভাই, চিন্তা করবেন না। আমি সেদিন বাজার থেকে খুব দামী কামোদ্দীপক ওষুধ কিনেছি। এখন শুধু কোনো নারী নেই বলে আমার বীরত্ব দেখানোর সুযোগ পাচ্ছি না। যদি কাজটা সফল হয়, তবে সময়মতো কিছু মালিশের ওষুধ ব্যবহার করব, তখন দেখবেন আমি কত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারি।”
সাই কুনলুন বললেন, “শোনো ভাই, কামোদ্দীপক ওষুধ শুধু সময় বাড়াতে পারে, কিন্তু আকার বড় করতে পারে না। যদি কারোর পৌরুষদণ্ড প্রাকৃতিকভাবেই মোটা ও শক্তিশালী হয়, তবে ওষুধ ব্যবহারে সে প্রতিভাবান পণ্ডিতের মতো ফল পায়—যেমন পরীক্ষার আগে টনিক খেলে মেধাবী ছাত্রের কলম আরও ভালো চলে। কিন্তু যার যন্ত্রটি ছোট ও সরু, ওষুধ মাখলেও সে ওই খালি পেটের মূর্খ পণ্ডিতের মতোই রয়ে যাবে—যে হাজার টনিক গিলেও পরীক্ষার খাতায় কিছু লিখতে পারে না।
এখন আসল কথায় আসি—তোমার ওই জিনিসটি আসলে কত বড়? লম্বায় কত ইঞ্চি?”
ওয়েই ইয়াংশেং আমতা আমতা করে বললেন, “বলার দরকার নেই, শুধু জেনে রাখুন ওটা ছোট নয়।”
সাই কুনলুন যখন দেখলেন যে ওয়েই ইয়াংশেং মুখ ফুটে বলবেন না, তখন তিনি ঝট করে তাঁর পাজামার ফিতা ধরে টান দিলেন এবং বললেন, “খুলেই দেখাও না দেখি!”
ওয়েই ইয়াংশেং লজ্জায় বারবার বাধা দিতে লাগলেন, কিন্তু সাই কুনলুন ছাড়ার পাত্র নন। তিনি বললেন, “যদি না দেখাও, তবে আমি তোমার হয়ে এই বিপজ্জনক কাজে নামব না। আমি যদি জোর করে তোমাকে ওই নারীর ঘরে ঢুকিয়ে দিই, আর তোমার যন্ত্রের খোঁচায় সে সুখের বদলে ব্যথা পায়, বা চিৎকার করে ওঠে, কিংবা বলে যে তুমি তাকে ধর্ষণ করছ—তখন কী হবে? তখন বিপদে পড়লে তোমাকেই ফাঁসতে হবে। না দেখে আমি এই ঝুঁকি নেব কেন?”
ওয়েই ইয়াংশেং দেখলেন সাই কুনলুন রেগে যাচ্ছেন। তাই তিনি লাজুক হেসে বললেন, “আমার পৌরুষদণ্ডও দেখার মতো বস্তু, তবে দিনের আলোয় বন্ধুর সামনে বের করাটা কি শোভন?”
অগত্যা তিনি পাজামার বাঁধন আলগা করে নিজের গোপনাঙ্গ বের করলেন। দুই হাতে ধরে সাই কুনলুনকে কয়েকবার দেখিয়ে বললেন, “এই হলো আমার সেই ‘ছোট’ পৌরুষ। বড় ভাই, এবার নিজের চোখেই দেখুন।”
সাই কুনলুন কাছে গিয়ে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেন। তিনি দেখলেন: যন্ত্রটির গা উজ্জ্বল সাদা, কিন্তু অগ্রভাগ টকটকে লাল। গোড়ায় হালকা লোম, আর চামড়ার নিচে নীলচে শিরাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মাপে লম্বায় দুই ইঞ্চির একটু কম, আর ওজনেও খুব একটা ভারী নয়। কোনো তেরো বছরের কুমারী কিশোরী হয়তো এটি সহ্য করতে পারবে, কিংবা সতেরো বছরের সমকামী বালকের কাছে এটি প্রিয় হতে পারে। উত্তেজনায় এটি লোহার মতো শক্ত বটে, কিন্তু আকৃতিতে মনে হয় যেন এক বিশাল কাঁটা; আর শিথিল হলে ধনুকের মতো বেঁকে থাকে, দেখতে ঠিক যেন এক মোটা চিংড়ি মাছ!
সাই কুনলুন বেশ কিছুক্ষণ সেই বস্তুটি নিরীক্ষণ করলেন, তারপর কোনো কথা না বলে চুপ করে রইলেন।
ওয়েই ইয়াংশেং ভাবলেন, সাই কুনলুন নিশ্চয়ই এর স্থূলতা দেখে অবাক হয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। তাই তিনি গর্বভরে বললেন, “এটা তো এখন নরম অবস্থায় দেখছেন, যদি শক্ত হয় তবে এর রূপ আরও দেখার মতো হবে!”
সাই কুনলুন মুচকি হেসে বললেন, “নরম অবস্থায় যখন এই হাল, তখন শক্ত হলেও এর দৌড় কতদূর তা বোঝা যাচ্ছে। ওটা এবার ভেতরে ঢোকাও।”
কথা শেষ করেই তিনি অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন, “হায় ভাই! তুমি নিজের মাপ নিজেই জানো না? তোমার এই যন্ত্রটি অন্য পুরুষের যন্ত্রের তিন ভাগের এক ভাগও নয়, আর তুমি কিনা এটা নিয়েই পরের স্ত্রী চুরি করতে যেতে চাও?
আমি যখন তোমাকে প্রথমে বিভিন্ন জায়গায় হন্যে হয়ে নারী খুঁজতে দেখেছিলাম, তখন ভেবেছিলাম তোমার ঝুলিতে নিশ্চয়ই বিশাল কিছু আছে—যা দেখলে মানুষ ভয় পায় বলেই তুমি সহজে দেখাতে চাও না। কিন্তু কে জানত যে এটি কেবল এক ‘মাংসের চুলকানি-যন্ত্র’! এটি দিয়ে বড়জোর যোনিপথের বাইরের লোমগুলো ঘষে সুড়সুড়ি দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু আসল গভীর জায়গায় এটি কোনো কাজেই আসবে না।”
ওয়েই ইয়াংশেং অপমানিত বোধ করে বললেন, “বড় ভাইকে বলতে দ্বিধা নেই, আমার এই ছোট জিনিসটি যদিও খুব বিশাল নয়, তবুও অতীতে অনেকে এর প্রশংসা করেছে। এটি এতটা অকেজোও নয়।”
সাই কুনলুন ব্যঙ্গ করে বললেন, “যদি কেউ প্রশংসা করেও থাকে, তবে সে নিশ্চয়ই কোনো অনভিজ্ঞ কুমারী মেয়ে—যে কখনো আসল পুরুষের স্বাদ পায়নি। সে দেখলে হয়তো দু-চারটে ভালো কথা বলতেও পারে। কিন্তু অভিজ্ঞ নারী বা আমার মতো জহুরির কাছে এর কোনো দাম নেই।”
ওয়েই ইয়াংশেং জিজ্ঞাসা করলেন, “বড় ভাইয়ের কথা শুনে মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সব পুরুষের পৌরুষদণ্ডই কি আমার চেয়ে বড়?”
সাই কুনলুন বললেন, “এই জিনিসটি আমি পেশাগত কারণে প্রায়ই দেখি। আমার জীবনে হাজারেরও বেশি দেখেছি। কিন্তু সত্যি বলছি ভাই, তোমার মতো এমন ‘সুন্দর’ ও ‘পরিপাটি’ (অর্থাৎ পুতুলের মতো ছোট) দ্বিতীয়টি আমি আর দেখিনি!”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “আচ্ছা, অন্যদের কথা না হয় বাদ দিলাম। কিন্তু ওই তিন মহিলার স্বামীদের পৌরুষদণ্ড আমার চেয়ে কেমন—সেটা তো অন্তত বলবেন?”
সাই কুনলুন স্পষ্ট জবাব দিলেন, “তোমার চেয়ে অন্তত এক-দুই গুণ স্থূল এবং এক-দুই গুণ দীর্ঘ।”
ওয়েই ইয়াংশেং অবিশ্বাস ভরা হাসি হেসে বললেন, “আমি জানি বড় ভাই, আপনার কথা সত্য নয়। আপনি আসলে আমাকে এই কাজে সাহায্য করতে চান না, তাই এসব অজুহাত দেখাচ্ছেন। এখন তা প্রমাণিত হলো। আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, ওই দুই ধনী ভাইয়ের গোপন খবর হয়তো আপনি রাতে চুরি করতে গিয়ে দেখেছেন—সেটা মানলাম।
কিন্তু ওই সিল্ক বিক্রেতার স্বামী? তাকে তো আপনি দিনের বেলা মাত্র একবারই দেখেছিলেন, তাও পোশাক পরা অবস্থায়। আপনি তো তার নগ্ন দেহ বা গোপনাঙ্গ দেখেননি। তবে কী করে জানলেন যে তার ‘জিনিস’ আমার চেয়ে এক-দুই গুণ লম্বা?”
সাই কুনলুন বললেন, “ওই দুজনেরটা আমার নিজের চোখে দেখা, আর এই একজনেরটা কানে শোনা। আমি যখন প্রথমে তাকে দেখেছিলাম, তখন তার প্রতিবেশীর কাছে খোঁজ নিয়েছিলাম। প্রতিবেশী আমাকে তার নাম বলেছিল। আমি কৌতূহলবশত জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘এমন এক সুন্দরী নারী ওই মোটা স্বামীর সঙ্গে ঘর করছে, তাদের দাম্পত্য জীবন কেমন?’
প্রতিবেশী বলেছিল, ‘তার স্বামী দেখতে মোটা আর কদাকার হলেও তার পৌরুষদণ্ড নাকি অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই তাদের মধ্যে খুব একটা ঝগড়াঝাঁটি হয় না।’
আমি আবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘তার পৌরুষদণ্ড কত বড়?’ প্রতিবেশী উত্তর দিয়েছিল, ‘ফিতা দিয়ে তো আর মাপিনি! তবে গ্রীষ্মকালে যখন সে হালকা পোশাক পরে, তখন তার সেই জিনিসটি পাজামার ভেতর লাঠির মতো দুলতে থাকে। তাই জানি যে তার পৌরুষ বেশ জবরদস্ত।’
আজ তোমাকে দেখানোর জন্য পীড়াপীড়ি করার এটাই কারণ। তা না হলে কি আমি অকারণে পরের গোপনাঙ্গ দেখতে চাইতাম?”
ওয়েই ইয়াংশেং বুঝতে পারলেন যে সাই কুনলুন সত্য কথাই বলছেন। এতে তিনি বেশ হতাশ হলেন। তবুও তিনি হাল না ছেড়ে বললেন, “বড় ভাই, নারী-পুরুষের সম্পর্ক তো কেবল দৈহিক কামনার ওপর নির্ভর করে না। হতে পারে সে আমার মেধা দেখে আমাকে পছন্দ করবে, কিংবা আমার রূপ দেখে ভালোবাসবে। যদি মেধা আর রূপ না থাকে, তবেই কেবল শারীরিক দক্ষতার ওপর নির্ভর করতে হয়। আমার তো এই দুটোই আছে। হয়তো সে আমার রূপ আর গুণের খাতিরে আমার শারীরিক সীমাবদ্ধতা কিছুটা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে। কে জানে?
দয়া করে বড় ভাই, কাজটি শেষ করে দিন। সামান্য এক ত্রুটির জন্য আমার এতসব গুণাবলীকে বাতিল করে দেবেন না। বন্ধুর প্রতি আপনার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা থেকে পিছিয়ে আসবেন না।”
সাই কুনলুন বললেন, “শোনো ভাই, মেধা আর রূপ হলো পরকীয়ার ক্ষেত্রে ‘টোপ’ বা ‘ওষুধের অনুপান’ (আদা)-এর মতো। এর কাজ কেবল গন্ধ দিয়ে ওষুধকে শরীরের ভেতরে প্রবেশ করানো। একবার প্রবেশ করার পর, ওষুধই রোগ সারায়—আদার আর দরকার হয় না।
পুরুষ যদি পরকীয়া করতে গিয়ে মেধা বা রূপহীন হয়, তবে সে নারীর অন্দরমহলে বা হৃদয়ে প্রবেশই করতে পারবে না। কিন্তু একবার ভেতরে ঢোকার পর, দরকার হয় আসল শারীরিক দক্ষতার। বিছানায় শুয়ে কি আর মুখের সৌন্দর্য দেখে বা পেটে কবিতা লিখে কাজ হয়?
যদি পৌরুষদণ্ড ক্ষুদ্র হয় এবং রতিশক্তি সীমিত হয়, তবে মেধা আর রূপ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেও কোনো লাভ হবে না। মিলনের সময় যদি সেই সুন্দরী নারীকে দু-একবারও চরম তৃপ্তি দিতে না পারো, তবে সে বিরক্ত হয়ে যাবে।
পুরুষ যখন জীবন বাজি রেখে পরকীয়া করে, তখন তার উদ্দেশ্য থাকে সেই নারীর সঙ্গে মন খুলে সারা জীবন বা অন্তত জীবনের অর্ধেক সময়টা সুখে কাটানো। যদি কেবল একবার-দুবার ক্ষণস্থায়ী আনন্দের জন্য হয়, তবে কেন এত ঝুঁকি নেবে?
আর পুরুষের কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু নারী যখন স্বামীকে লুকিয়ে পরপুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন সে কত সতর্কতা আর ভয়ের মধ্য দিয়ে যায়—কেবলমাত্র একটু সুখের আশায়। এখন সেই চরম মুহূর্তে যদি সে কোনো আনন্দই না পায়—বরং ‘মুরগির’ মতো কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরুষের খেলা শেষ হয়ে যায়—তবে কি তার ইজ্জত আর জীবনের ঝুঁকি নেওয়াটা বৃথা যাবে না?
ভাই, আমাকে ভুল বুঝো না। তোমার যেটুকু পৌরুষ আর শক্তি আছে, তা দিয়ে নিজের স্ত্রীকে আগলে রাখা বা তাকে বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করাই যথেষ্ট। কিন্তু ওইটুকু সম্বল নিয়ে পাগলামি করে পরের স্ত্রীকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা কোরো না।
আজ আমি অভিজ্ঞ ছিলাম বলেই পরিস্থিতি বুঝে তোমাকে থামালাম। যদি আমি মাপজোক না করে হুটহাট তোমাকে কাজে নামিয়ে দিতাম—যদি ‘জামা শরীরের চেয়ে বড় হতো’ (অর্থাৎ পাত্রী যদি তোমার ক্ষমতার বাইরে হতো)—তবে কি পুরো ব্যাপারটা ভেস্তে যেত না? সেই নারী হয়তো অভিযোগ করত, আর তুমি আমাকে অবিশ্বস্ত বা অপদার্থ ভাবতে যে আমি জেনেশুনে তোমাকে এমন এক ‘বড়’ নারীর পাল্লায় ফেলেছি যাকে সামলানো তোমার সাধ্যের বাইরে। আমি হয়তো একটু রূঢ়ভাবে কথা বললাম, কিন্তু ভাই, রাগ কোরো না।”
ওয়েই ইয়াংশেং যখন দেখলেন যে সাই কুনলুনের যুক্তি এতই তীক্ষ্ণ ও অকাট্য, তখন তিনি বুঝলেন যে এই কাজ আর হওয়ার নয়। তাঁর আর কোনো উত্তর ছিল না। সাই কুনলুন তাঁকে আরও কিছু সান্ত্বনার কথা বলে উঠে চলে গেলেন। ওয়েই ইয়াংশেং একরাশ হতাশা নিয়ে তাঁকে বিদায় জানালেন।
তাঁর এই গভীর হতাশার পর কী ঘটল, তা পরের অধ্যায়ে চূড়ান্তভাবে জানা যাবে।
সমালোচকের পর্যালোচনা: প্রতিটি যুক্তিতেই লেখক অসাধারণ সব রূপক ব্যবহার করেছেন, যা পাঠকদের অনাবিল আনন্দ দেয়। যেমন—”কামোদ্দীপক ওষুধ হলো পরীক্ষার সময় টনিক”, “মেধা এবং রূপ হলো ওষুধের অনুপান (আদা)” ইত্যাদি। এমন উদাহরণ অগণিত। যদিও এগুলো আপাতদৃষ্টিতে রসিকতা মনে হয়, তবুও এর মধ্যে নিহিত আছে মানবজীবনের গভীর সত্য। আমি সত্যিই জানি না লেখকের হৃদয়ে কত সহস্র ছিদ্র (অনুভূতি) আছে, যা তাঁকে মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝায় এত সূক্ষ্মদর্শী করে তুলেছে!
সপ্তম অধ্যায়: ওয়েই ইয়াংশেং-এর রোদন, পৌরুষের অক্ষমতায় অনুশোচনা এবং জানু পেতে অলৌকিক সমাধানের প্রার্থনা
বলা বাহুল্য, সাই কুনলুনের নির্মম সত্য কথায় ওয়েই ইয়াংশেং-এর যাবতীয় উচ্ছ্বাস যেন বরফের মতো জমে গেল। তিনি জীবন্মৃতের মতো হয়ে গেলেন। নিজের বাসায় একা বসে তিনি ভাবতে লাগলেন:
“আমি বিশ বছরের বেশি সময় ধরে বেঁচে আছি, অনেক কিছু দেখেছি। কিন্তু সত্যি বলতে, অন্য পুরুষের ‘গোপনাঙ্গ’ খুব একটা দেখার সুযোগ হয়নি। সাধারণ মানুষ তো তা পোশাকের আড়ালেই রাখে। কেবল অল্পবয়সী সমকামী বালকেরা, যারা আমার সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য প্যান্ট খোলে, তাদেরটাই শুধু দেখেছি। কিন্তু তাদের বয়স আমার চেয়ে কম, তাই স্বভাবতই তাদের অঙ্গ আমার চেয়ে ছোট। আমি সারাদিন যা দেখি তা আমার চেয়ে ক্ষুদ্র, তাই নিজেরটাকে আমার বেশ বড় মনে হতো।
কিন্তু এখন সাই কুনলুন বলছেন যে তিনি যা দেখেছেন তার কোনোটাই আমার চেয়ে ছোট নয়! তাহলে কি আমারটা আসলেই অকেজো? কিন্তু কেন?
তবে একটা বিষয়—বাড়িতে যখন আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হতাম, তখন তো সেও আনন্দ পেত! এমনকি আগে যখন বারাঙ্গনা বা দাসীদের সঙ্গে ফুর্তি করতাম, তারাও তো একইভাবে উত্তেজিত হতো, তাদেরও কামরস ক্ষরণ হতো। যদি আমার এই ‘জিনিস’ তাদের সুখ না-ই দিত, তবে তারা কি নিজে থেকে উত্তেজিত হতো?
এর মানে কি সাই কুনলুনের কথা পুরোপুরি সত্য নয়? তিনি কি আমাকে এড়ানোর জন্য অজুহাত দেখাচ্ছেন?
ওয়েই ইয়াংশেং কিছুক্ষণ সন্দেহ করলেন, আবার কিছুক্ষণ ভাবলেন। হঠাৎ বিদ্যুতের মতো একটা উপলব্ধি তাঁর মাথায় এল—
“বুঝেছি! স্ত্রীর যোনি তো আসলে এক অপরিণত জিনিস, যা আমি নিজেই প্রথম খুলেছিলাম। আমারটা যত বড়, তার পথও তত প্রশস্ত হয়েছে; আমারটা যত লম্বা, তার গভীরতাও ততটুকু হয়েছে। ছোটর সঙ্গে ছোট এবং সরুর সঙ্গে সরু—একে অপরের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলে যায় বলেই তারা আনন্দ পায়। ঠিক যেমন কান পরিষ্কার করার কাঠি—খুব ছোট একটা জিনিস কানের সরু ছিদ্রে ঘুরলে যেমন আরাম লাগে, তেমনই। কিন্তু যদি কানটা হাতির মতো বড় হতো আর কাঠিটা ছোট হতো—তবে কি আর আরাম লাগত?
সেদিন সাই কুনলুন বলেছিলেন যে, মহিলারা মনে আনন্দ না পেলেও মুখে সুখের ভান করতে পারে। কে জানে, হয়তো সেই দাসী আর বারাঙ্গনারা আমার টাকার লোভে মিথ্যে প্রশংসা করত! হয়তো মনে কোনো সুখ না পেলেও মুখে ভান করে আমাকে ঠকাত!
যদি ভান করা যায়, তবে কি কামরস ক্ষরণের অভিনয়ও করা যায় না? সাই কুনলুনের কথা পুরোপুরি বিশ্বাসও করা যায় না, আবার অবিশ্বাসও করা যায় না। ঠিক আছে, এখন থেকে যখনই কোনো পুরুষের সঙ্গে দেখা হবে, আমি তাদের পৌরুষদণ্ড কেমন তা মনোযোগ দিয়ে দেখব। তাহলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
সেই দিন থেকে, বন্ধুদের সঙ্গে সাহিত্য আলোচনায় বসলে—যখন কেউ প্রস্রাব করতে যেত, তিনিও তার সঙ্গে যেতেন। বন্ধুরা মলত্যাগ করতে গেলে, তিনিও যেতেন। তিনি আড়চোখে বন্ধুদেরটা দেখতেন, আবার নিজেরটার সঙ্গে তুলনা করতেন।
সত্যিই, দেখা গেল—কারোর চেয়ে তাঁরটা শক্তিশালী নয়। রাস্তায় হাঁটার সময় যদি দেখতেন কোনো কুলি বা মজুর ভারী বোঝা বইছে বা কাজ করছে—আর তার নিম্নাঙ্গ কিছুটা উন্মুক্ত—তবে তিনি আড়চোখে তার পৌরুষদণ্ডটিও মেপে নিতেন। হায়! দেখা গেল সবারটাই তাঁর চেয়ে আকারে বড় এবং দীর্ঘ।
এই তুলনামূলক গবেষণার পর, ওয়েই ইয়াংশেং-এর কামুকতা ধীরে ধীরে উবে গেল, তাঁর সাহসও চুপসে গেল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, “সাই কুনলুনের প্রতিটি কথা তেতো ওষুধের মতো হলেও তা না মেনে উপায় নেই। তিনি একজন অভিজ্ঞ পুরুষ। সেদিন তাঁর কাছে উপহাসের পাত্র হয়ে আমি লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলাম। এখন যদি কোনো পরনারীর সঙ্গে মিলনের মাঝপথে সে আমাকে নিয়ে বিদ্রূপ করে, তবে কি আমি নিজে থেকে সরে আসব? নাকি অপমানের মুখে লাথি খেয়ে বের হতে হবে?
আজ থেকে নারী চুরির চিন্তা বাদ। আমি বরং মন দিয়ে আমার আসল কাজটাই করি। যদি পরীক্ষায় পাস করে যশ-খ্যাতি অর্জন করতে পারি, তবে টাকা খরচ করে কয়েকজন সুন্দরী কুমারী মেয়েকে উপপত্নী হিসেবে ঘরে আনব। তারা আমাকে সম্মান করবে, অবহেলা করবে না। কেন আমি খামাকা শক্তি খরচ করে অন্যের দুয়ারে ধরনা দিতে যাব?”
সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর, সত্যিই সেই দিন থেকে তিনি সমস্ত আলসামি ঝেড়ে ফেললেন এবং কেবল পরীক্ষার পড়াশোনায় মনোনিবেশ করলেন। যখন দেখতেন মহিলারা মন্দিরে পূজা দিতে আসছে, তিনি আর তাদের দেখতে যেতেন না। এমনকি বাইরে কারো সঙ্গে দেখা হয়ে গেলেও তিনি মুখ ফিরিয়ে ভেতরে চলে আসতেন। রাস্তায় কোনো নারী দেখলে মাথা নিচু করে চলে যেতেন—সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এভাবেই প্রায় দিন দশেক কেটে গেল। কিন্তু পনেরো দিন পার হতে না হতেই ওয়েই ইয়াংশেং আর তাঁর কামনার লাগাম ধরে রাখতে পারলেন না; তাঁর নিভে যাওয়া সাহস আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
একদিন তিনি রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলেন। হঠাৎ দেখলেন, এক যুবতী নারী হাত দিয়ে দরজার পর্দা কিছুটা তুলে অর্ধেক মুখ বের করে পাশের বাড়ির এক মহিলার সঙ্গে কথা বলছে। ওয়েই ইয়াংশেং দূর থেকেই তা লক্ষ্য করলেন এবং তাঁর চলার গতি কমিয়ে দিলেন। তিনি এক কদমকে ভেঙে তিন কদম করে হাঁটতে লাগলেন, যাতে খুব ধীরে ধীরে এগিয়ে সেই রমণীর কণ্ঠস্বর শুনতে পান এবং মুখশ্রী দেখতে পারেন।
তিনি শুনলেন, যুবতীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটি শব্দ যেন বাঁশির সুরের মতো স্পষ্ট ও সুমিষ্ট; আর তাঁর গলার স্বর কখনো লঘু, কখনো গুরুগম্ভীর—ঠিক যেমনটি হওয়া উচিত। তিনি লুকিয়ে দরজার কাছে গেলেন এবং যুবতীর মুখ ও হাবভাব অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেন। আশ্চর্যের বিষয়, সাই কুনলুনের বর্ণনার সঙ্গে যুবতীর চেহারা হুবহু মিলে গেল!
তাঁর মনে হলো, এ নারীও যেন মুক্তা বা রত্নের মতো দ্যুতিময়; যেন কোনো এক অপরূপা নারীর চিত্রপট পর্দার অন্তরালে বাতাসে দুলছে। তিনি মনে মনে ভাবলেন, “ইনিই কি সেই নারী যার কথা সাই কুনলুন সেদিন বলেছিলেন?”
কিছুক্ষণ একদৃষ্টে দেখার পর, তিনি আরও কয়েকটা বাড়ি পার হয়ে গেলেন এবং ইচ্ছে করেই একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভাই, এখানে কি ‘কুয়ান লাওশি’ নামে কোনো সিল্ক বিক্রেতা থাকেন? তাঁর বাড়িটা কোন দিকে?”
লোকটি বলল, “আপনি তো পার হয়ে এসেছেন। ওই যে পর্দার আড়াল থেকে যে মহিলা কথা বলছিলেন, ওটাই তাঁর বাড়ি।”
ওয়েই ইয়াংশেং নিশ্চিত হলেন যে তাঁর অনুমান সত্য। তিনি আবার ফিরে এসে সেই বাড়িটির দিকে একবার ভালো করে তাকালেন এবং তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ডেরায় ফিরে গেলেন।
ফিরে এসে তিনি মনে মনে ভাবলেন, “শুরুতে সাই কুনলুন যখন আমার কাছে ওই নারীর রূপের বর্ণনা দিয়েছিলেন, তখন আমি বিশ্বাস করিনি। ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো জহুরির মতো আসল রত্ন চিনতে পারেন না। কিন্তু কে জানত যে তাঁর দৃষ্টি এতই তীক্ষ্ণ, যেন ঐশ্বরিক চোখ! এই একজনকেই যখন তিনি ভুল দেখেননি, তখন বাকি দুজন যে কতটা অপরূপা হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
হায়! এমন সুন্দরী রমণীরা হাতের নাগালে আছে, আবার এমন এক সাহসী পুরুষও আছেন যিনি আমার জন্য এত কষ্ট করতে রাজি। কেবল আমার নিজের এই একটি ‘ছোট’ অক্ষমতার জন্য তিনটি সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল! এ কষ্ট আমি কী করে সহ্য করি?”
চরম হতাশায় তিনি ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন। এরপর পাজামা খুলে নিজের পৌরুষদণ্ড বের করে কিছুক্ষণ বাম দিক থেকে, কিছুক্ষণ ডান দিক থেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। হঠাৎ তাঁর মাথায় রক্ত চড়ে গেল। তিনি ভাবলেন, “ইচ্ছে করছে এখনই একটা ধারালো ছুরি দিয়ে এটাকে কেটে ফেলি! এমন নামমাত্র অকেজো জিনিস রেখে লাভ কী?”
তিনি আবার বিধাতাকে দোষারোপ করতে লাগলেন, “হে ঈশ্বর, এ তোমারই দোষ! তুমি যখন আমাকে এত গুণ আর প্রতিভা দিয়েছিলে, তখন শেষ পর্যন্ত কৃপণতা করলে কেন? আমার মেধা আর রূপ—দুটোই দেখার মতো, কিন্তু কাজের বেলায় অষ্টরৎ! তুমি আমাকে সব দিয়েছ, কেবল এই একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস দিতেই কার্পণ্য করলে?
এটাকে কয়েক ইঞ্চি লম্বা বা কয়েক গুণ মোটা করতে কি তোমার খুব বেশি খরচ হতো? কেন অন্যের শরীরের অতিরিক্ত অংশ থেকে কিছুটা নিয়ে আমার এই অভাব পূরণ করলে না? যদি বলো যে প্রত্যেকের শারীরিক গঠন পূর্বনির্ধারিত, তা বদলানো যায় না—তবে কেন আমার নিজের পায়ের মাংস বা শরীরের সমস্ত শক্তি এর ওপর সমানভাবে ভাগ করে দিলে না? তাতেই তো কাজ হয়ে যেত! কেন অপ্রয়োজনীয় জিনিস অন্য জায়গায় বিলালে? যা দরকার তা নেই, আর যা দরকার নেই তা অঢেল—এটা কি তোমার অবিচার নয়?
এখন চোখের সামনে এমন লোভনীয় খাবার দেখেও খেতে পারছি না, যেন আমি এক ক্ষুধার্ত মানুষ যার মুখে ঘা হয়েছে। এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে?”
এই কথা ভাবতে ভাবতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করার পর মনটা একটু হালকা হলো। তিনি পোশাক ঠিকঠাক করে মন ভালো করার জন্য মন্দিরের দরজার সামনে হাঁটতে বেরুলেন। হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল দেয়ালের ওপর সাঁটানো একটি নতুন পোস্টার বা বিজ্ঞাপনের দিকে।
ওয়েই ইয়াংশেং কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখলেন, তাতে লেখা আছে: “স্বর্গীয় দূতের আগমন: শিখুন কামশাস্ত্রের গুহ্যবিদ্যা, ক্ষুদ্র পৌরুষকে পরিণত করুন বিশাল পুরুষত্বে!”
এই চারটি ছিল শিরোনামের বড় অক্ষর, নিচে ছোট অক্ষরে আরও বিস্তারিত লেখা ছিল। তাতে বলা হয়েছে যে, সেই সাধু পুরুষ এই এলাকায় এসেছেন এবং সাময়িকভাবে অমুক মন্দিরের অমুক কক্ষে অবস্থান করছেন। যাঁরা এই বিদ্যা শিখতে আগ্রহী, তাঁরা যেন সত্বর যোগাযোগ করেন, দেরি করলে আর দেখা পাওয়া যাবে না।
ওয়েই ইয়াংশেং দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলেন। “এ তো অদ্ভুত ঘটনা! আমার পৌরুষ ছোট বলে আমি যখন হতাশায় ডুবছি, ঠিক তখনই এমন একজন মহাপুরুষ এখানে এসে যৌনবিদ্যা বা কামকলা শেখাচ্ছেন—এটা কি ঈশ্বরেরই অলৌকিক ইশারা নয়?”
তিনি আর দেরি করলেন না। দ্রুত নিজের ঘরে ফিরে একটি খামে উপহার বা দক্ষিণা ভরে সিলগালা করলেন এবং ভৃত্যকে সেটা বহন করতে বললেন। তারপর তিনি নিজেই ছুটে গেলেন সাধুর ডেরায়।
গিয়ে দেখলেন, সেই জাদুকর বা সাধুর চেহারা বড়ই অদ্ভুত—মাথার চুল ধবধবে সাদা, কিন্তু মুখটা একেবারে শিশুর মতো মসৃণ ও কান্তিমান। তাঁকে দেখে ওয়েই ইয়াংশেং ভক্তিভরে করজোড় করে জিজ্ঞাসা করলেন, “মহাত্মন, আপনি কি কামকলা বা যৌনবিদ্যা শেখান?”
সাধু বললেন, “হ্যাঁ, শেখাই।”
তারপর ওয়েই ইয়াংশেং জানতে চাইলেন, “আমি কি সেই বিদ্যা শিখতে পারি?”
সাধু পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “আপনি কি অন্যের সুখের জন্য শিখতে চান, নাকি নিজের সুখের জন্য?”
ওয়েই ইয়াংশেং অবাক হয়ে বললেন, “দয়া করে বুঝিয়ে বলুন—অন্যের জন্য শেখা কেমন, আর নিজের জন্য শেখাই বা কেমন?”
সাধু ব্যাখ্যা করলেন, “শুনুন তবে। যদি আপনি কেবল নারীদের তৃপ্ত করতে চান, তাদের চরম সুখ দিতে চান—কিন্তু নিজের আনন্দের তোয়াক্কা করেন না, তবে এই বিদ্যা শেখা খুব সহজ। এর জন্য শুধু কিছু ‘বীর্য-স্তম্ভন’ ওষুধ খেতে হবে, যাতে সহজে স্খলন না হয়; আর পৌরুষদণ্ডে কিছু কামোদ্দীপক মালিশ মাখতে হবে। এতে আপনার লিঙ্গ অসাড় হয়ে যাবে, লোহার মতো শক্ত হবে, কিন্তু আপনি নিজে কোনো ব্যথা বা সুখ অনুভব করবেন না। এটাই হলো অন্যের জন্য শেখা।
আর যদি চান যে নিজের শরীর এবং নারী—উভয়েই একসঙ্গে সমান আনন্দ পাবে; যোনি এবং লিঙ্গ উভয়েই ঘর্ষণের সুখ-দুঃখ অনুভব করবে—একবার টানলে দুজনেই শিহরিত হবে, একবার ঠেললে দুজনেই সুখসাগরে ভাসবে—তবে সেটা হলো ‘পারস্পরিক আনন্দ’। কিন্তু এই চরম আনন্দের মুহূর্তে সমস্যা হলো—নারীরা দেরি করে চরম সীমায় পৌঁছায়, আর পুরুষরা দ্রুত ঝরে পড়ে।
পুরুষকে আরও বেশি আনন্দ দিতে হবে অথচ বীর্যপাত হতে দেওয়া যাবে না; আবার নারীকে বারবার চরম সুখ দিতে হবে এবং আরও আনন্দিত করতে হবে—এই বিশেষ বিদ্যা শেখা সবচেয়ে কঠিন। এর জন্য কঠোর সাধনা প্রয়োজন, তারপর ওষুধের প্রয়োগ। তবেই এমন দিব্য আনন্দ লাভ করা সম্ভব।
আপনি যদি এই দ্বিতীয় বিদ্যাটি শিখতে চান, তবে আমার সঙ্গে কয়েক বছর দেশভ্রমণ করতে হবে। ধীরে ধীরে এর গূঢ় রহস্য বুঝতে পারবেন, তবেই তা ফলপ্রসূ হবে। এ তো একদিনের কাজ নয়।”
ওয়েই ইয়াংশেং এই কথা শুনে যেন হাতে চাঁদ পেলেন। তিনি মৃত মানুষের মতো পুনর্জীবন লাভ করে সঙ্গে সঙ্গে সাধুর পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন এবং বললেন, “যদি তাই হয়, তবে আপনার দয়া আমার কাছে পুনর্জন্মের সমান।”
সাধু দ্রুত তাঁকে হাত ধরে তুলে বললেন, “ভাই, আপনি আমার মতো বা আমার চেয়েও মহৎ কাজ করতে চাইছেন, কেন আমাকে এমন বড় প্রণাম করছেন?”
ওয়েই ইয়াংশেং আবেগে গদগদ হয়ে বললেন, “গুরুদেব, আমার স্বভাব বড়ই কামুক, নারীই আমার প্রাণ। কিন্তু জন্মগত শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে আমি আমার বুকের ভেতরের আগুন নেভাতে পারিনি। আজ যখন আপনার মতো একজন মহাপুরুষের দেখা পেয়েছি, তখন কি আমি আপনাকে ‘উত্তর দিকে মুখ করে’ (গুরুর আসনে বসিয়ে) প্রণাম না করে পারি? এত আকুল হয়ে আপনার কাছে ভিক্ষা চাইব না তো কার কাছে চাইব?”
কথা শেষ করে তিনি ভৃত্যকে ডেকে উপহারের বাক্সটি আনতে বললেন। তারপর নিজের হাতে তা সাধুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “এটি সামান্য কিছু প্রণামী, কেবল আপনার দর্শনের জন্য। যদি আমার শরীরের এই ত্রুটি সংশোধন হয়, তবে আমি পরে আরও বড় উপহার দেব।”
সাধু বিনীতভাবে বললেন, “এই কাজ মুখে বলা যতটা সহজ, করা ততটা সহজ নয়। দশ ভাগের নয় ভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ সফল হতে পারে না। তাই এত বড় উপহার আমি নিতে সাহস পাচ্ছি না।”
ওয়েই ইয়াংশেং দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, “চেষ্টা করলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। আমার কামতৃষ্ণা এতই প্রবল যে আমি জীবনের ঝুঁকি নিতেও পরোয়া করি না। যদি এই পরিবর্তনে ভালো ফল হয়—যদি আমার এই ক্ষুদ্র পৌরুষ বিশাল পুরুষত্বে পরিণত হয়—তবে আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব। আর যদি অপারেশনের সময় ভুলবশত ছুরি লেগে আমার মৃত্যুও হয়, তবুও সেটা আমার কপাল বলেই মেনে নেব, কোনো অভিযোগ করব না। হে বৃদ্ধ মহাত্মন, আপনি কোনো দ্বিধা করবেন না।”
জাদুকর বললেন, “শুনুন বাছা, এই শল্যচিকিৎসায় আমার হাত অত্যন্ত পাকা, আত্মবিশ্বাসের কোনো অভাব নেই; আমার ছুরির পোঁচে তিলমাত্র ভুল হবে না। কিন্তু রূপান্তরের পর এর তিনটি এমন কঠোর শর্ত বা অসুবিধা রয়েছে, যার কারণে আমি সহজে এই কাজে হাত দিতে সাহস পাই না। আমি একে একে সেই তিনটি বিষয় খুলে বলছি। শোনার পর যদি আপনি তবুও রাজি থাকেন, তবেই আমি আপনার আদেশ পালন করব। আর যদি তিনটির মধ্যে একটিতেও আপনার আপত্তি থাকে, তবে আমি জোর করব না।”
ওয়েই ইয়াংশেং অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী সেই তিনটি অসুবিধা?”
জাদুকর গম্ভীর স্বরে বললেন, “প্রথম অসুবিধা হলো, এই অস্ত্রোপচারের পর পূর্ণ তিন মাস কোনোভাবেই নারীসঙ্গ বা সহবাস করা যাবে না। যদি ভুলবশত একবারও মিলন করেন, তবে শরীরের ভেতরটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানুষের ‘ইয়াং’ সত্তা আর কুকুরের কিডনি একে অপরের সঙ্গে মিশবে না। তখন কেবল ওই নকল অঙ্গটিই যে খসে পড়বে তা নয়, আপনার আসল অঙ্গটিও পচে গলে যাবে। আমি শুরুতে যে বিপদের কথা বলেছিলাম, তা এই কারণেই।
দ্বিতীয় অসুবিধা হলো, এই অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর এর তেজ এতই বৃদ্ধি পাবে যে, কেবল বিশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সী অভিজ্ঞ ও যুবতী নারীরাই তা সহ্য করতে পারবে। বিশ বছরের কম বয়সী, কিংবা যারা কুমারী অথবা সবেমাত্র যৌবনে পা দিয়েছে—তারা এর ধকল সইতে পারবে না। এমনকি কুমারী মেয়েদের ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই এই অঙ্গ ধারণ করলে কুমারী নারীদের স্পর্শ করা বা বিবাহ করা আপনার জন্য নিষিদ্ধ হবে। অন্যথায়, আপনার নিজের পুণ্য তো ক্ষয় হবেই, উপরন্তু নারীহত্যার পাপে আপনি জর্জরিত হবেন।
তৃতীয় অসুবিধা হলো, এই প্রক্রিয়ায় শরীরের মূল জীবনীশক্তি বা ‘প্রাকৃতিক শক্তি’ অস্ত্রোপচারের সময় অনেকটাই ক্ষয়ে যায়। যদিও পরবর্তীকালে আপনার রতিশক্তি অটুট থাকবে, কিন্তু প্রজনন ক্ষমতা বা সন্তান উৎপাদনের শক্তি আর আগের মতো থাকবে না। যদি বা কপালগুণে সন্তান হয়, তবে তারা হবে স্বল্পায়ু; খুব কম সন্তানই দীর্ঘজীবী হবে। আমি আপনাকে দেখে বুঝতে পারছি আপনি তরুণ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী। প্রথমত, আপনার কামতৃষ্ণা এতই প্রবল যে তিন মাস ব্রহ্মচর্য পালন করা আপনার জন্য কঠিন হবে। দ্বিতীয়ত, আপনি নারীলোভী, তাই ভবিষ্যতে কুমারী মেয়েদের ছেড়ে দেবেন এমনটি মনে হয় না। আর তৃতীয়ত, আপনার বয়স কম, হয়তো এখনো কোনো পুত্রসন্তান নেই।
আমার মনে হয় এই তিনটি বিষয়ই আপনার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তাই আমি সন্দিহান যে আপনি সব শর্তে রাজি হবেন কি না বা এই ঝুঁকি নেওয়ার সাহস করবেন কি না।”
ওয়েই ইয়াংশেং দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, “বৃদ্ধ মহাশয়, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। এই তিনটি শর্তের কোনোটিই আমার পথের কাঁটা হবে না। আপনি শুধু আমার জন্য এই রূপান্তরটুকু করে দিন।”
জাদুকর অবাক হয়ে বললেন, “কীভাবে বুঝলেন যে এগুলো বাধা নয়?”
ওয়েই ইয়াংশেং ব্যাখ্যা করলেন, “প্রথমত, আমি এখন প্রবাসে আছি, অনেকটা অতিথির মতো নিঃসঙ্গ জীবন। এই অস্ত্রোপচার না করলেও আমাকে একাই ঘুমাতে হচ্ছে। তাই অস্ত্রোপচারের পর তিন মাস সংযম পালন করা আমার জন্য কোনো কঠিন কাজ নয়। সুতরাং প্রথম বিষয়টি নিয়ে ভাবার কিছু নেই।
দ্বিতীয়ত, কুমারী নারীদের প্রসঙ্গ। আমার নিজের স্ত্রী তো আছেনই। তাছাড়া আমি মনে করি, রতি-ক্রীড়ার ক্ষেত্রে কুমারী মেয়েরা সবচেয়ে অকেজো। তারা কিছুই জানে না, আবেগের গভীরতা বোঝে না—তাদের সঙ্গে মিলনে কী এমন সুখ? আসল সুখ তো বিশ পার হওয়া অভিজ্ঞ নারীদের কাছেই পাওয়া যায়। তারা রতি-ক্রীড়ার শুরু, মধ্য, ছন্দ, পরিবর্তন এবং সমাপ্তি—সবটাই বোঝে। বিষয়টি লেখার মতো; প্রতিটি অনুচ্ছেদের যেমন নিজস্ব লিখনশৈলী থাকে, অভিজ্ঞ নারীরাও তেমনই দক্ষ। একজন আনাড়ি লেখক কি কখনো ভালো সাহিত্য রচনা করতে পারে? তাই দ্বিতীয় শর্তটি আমার জন্য বাধা তো নয়ই, বরং আমার রুচির সঙ্গে মানানসই।
তৃতীয়ত, সন্তান বা বংশরক্ষা। অন্যরা এই বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দেয় বটে, কিন্তু আমি একে খুবই হালকাভাবে দেখি। পৃথিবীতে সুসন্তান পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার, অধিকাংশই হয় কুপুত্র বা অবাধ্য। যদি ভাগ্যক্রমে ভালো সন্তান হয় তো ভালো কথা। কিন্তু যদি কুপুত্র জন্মায়, তবে সে বংশের মান ডোবায় এবং বাবাকে জ্বালাতন করে মারে—এমন সন্তান দিয়ে কী লাভ? তাছাড়া, দশজনের মধ্যে এক-দুজন পুরুষ তো প্রাকৃতিকভাবেই নিঃসন্তান হয়, এটা তাদের ভাগ্য। তারা তো আর পুরুষাঙ্গ পরিবর্তন করতে গিয়ে নিঃসন্তান হয়নি!
আমি আজ মনস্থির করেছি, দরকার হলে আমি নিঃসন্তান থাকব, তবুও এই কলঙ্ক আমাকে মুছতেই হবে। আর যদি ভাগ্যে থাকে, তবে অস্ত্রোপচারের সময় খুব বেশি শক্তি ক্ষয় না হলে হয়তো সন্তান হবে এবং তারা অকালেও মারা যাবে না। এসব ভবিষ্যতের কথা, আমি তা নিয়ে ভাবি না। আমি একজন নিঃসন্তান ব্যক্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি।
বৃদ্ধ মহাশয় যা বললেন, আমি তা সহ্য করতে পারব এবং পালন করতে পারব। এতে আর কী অসুবিধা আছে? দয়া করে আমাকে আর সন্দেহ করবেন না, শুধু আমার খোলসটা বদলে দিন।”
জাদুকর বললেন, “যেহেতু আপনার সংকল্প এতই দৃঢ় এবং আপনি সব জেনেশুনেই বিষপান করতে রাজি, তাই আমি আর বাধা দেব না। তবে একটি শুভ দিনক্ষণ বেছে নিতে হবে। কাজটি হয় আপনার বাসায়, নয়তো আমার এই কুঁড়েঘরে অতি গোপনে করতে হবে। কাকপক্ষীও যেন টের না পায়। যদি কেউ জেনে যায় বা লুকিয়ে দেখতে আসে, তবে কাজে ব্যাঘাত ঘটবে।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “আমার বাসায় অনেক লোকের আনাগোনা, সেখানে গোপনীয়তা রক্ষা করা কঠিন। তার চেয়ে আপনার ডেরাতেই কাজটা সারা যাক।”
দুজনে একমত হলেন। জাদুকর তখন উপহারের বাক্সটি গ্রহণ করলেন এবং একটি পঞ্জিকা বের করে দিনক্ষণ দেখতে লাগলেন। তিনি একটি ‘অগ্নি তিথি’ বা আগুনের দিন বেছে নিলেন। কারণ পুরুষাঙ্গ আগুনের সঙ্গে সম্পর্কিত—আগুন যত শক্তিশালী হবে, তেজ ও সমৃদ্ধি তত বাড়বে।
অস্ত্রোপচারের দিন ঠিক হওয়ার পর, ওয়েই ইয়াংশেং অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে বিদায় নিলেন। কিন্তু তিনি জানলেন না, তাঁর জীবনের সমস্ত পাপের বীজ ওখানেই রোপিত হলো। এতেই প্রমাণিত হয় যে, কামকলা বা কৃত্রিম রতিবিদ্যা শেখা উচিত নয়। কারণ, এমন কোনো ব্যক্তি নেই যে এই বিদ্যা কেবল নিজের স্ত্রীকে খুশি করার জন্য শেখে এবং শেষ পর্যন্ত অন্যের স্ত্রীকে কলঙ্কিত করে না।
সমালোচকের পর্যালোচনা:
অন্যান্য লেখকরা হয়তো সরাসরি ওয়েই ইয়াংশেং-এর ক্ষুদ্র পৌরুষের সমস্যা এবং তা সমাধানের জন্য জাদুকরকে ডাকার প্রসঙ্গেই চলে যেতেন। কিন্তু এই গ্রন্থের লেখক কেন মাঝখানে সেই সিল্ক বিক্রেতার স্ত্রীর প্রসঙ্গ আনলেন, যাকে নায়ক বাগে পেয়েও শারীরিক অক্ষমতার ভয়ে পিছিয়ে এলেন? এবং কেন তারপর নায়কের সেই গভীর হতাশা ও কান্নার দৃশ্য আঁকলেন?
এর কারণ, লেখক দেখাতে চেয়েছেন যে একজন রোমান্টিক বা কামুক নায়কও পরিস্থিতির চাপে পড়ে হঠাৎ করে দার্শনিকের মতো চিন্তা করতে পারে। ওই মুহূর্তটিতে ওয়েই ইয়াংশেং-এর সামনে একটি সুযোগ ছিল—তিনি চাইলে সেই হতাশাকে কাজে লাগিয়ে কামনার পথ ছেড়ে দিতে পারতেন। যদি তিনি তখন নিজের পথ পরিবর্তন করতেন, তবে তাঁর ভবিষ্যৎ খ্যাতি ও সম্পদ অক্ষত থাকত এবং তাঁর স্ত্রী ও উপপত্নীদের অন্য পুরুষের শয্যাসঙ্গিনী হয়ে তাঁর পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হতো না।
এটি প্রমাণ করে যে, একজন অত্যন্ত পাপিষ্ঠ ব্যক্তিও যদি একটিমাত্র সঠিক চিন্তায় ফিরে আসে, তবে সে মুক্তির তীরে পৌঁছাতে পারে। আর একবার ফিরে আসার পর, দ্বিতীয়বার মন পরিবর্তন করা উচিত নয়। পাঠকদের এই বিষয়টিতে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া উচিত। তবেই তাঁরা আখ্যানের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ‘খেজুরের মধ্যে জলপাইয়ের স্বাদ’ (মিষ্টির ভেতরেও ভিন্ন স্বাদ) আস্বাদন করতে পারবেন। লেখকের এই গভীর উদ্দেশ্য গল্পের শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি বোঝা যাবে না।
অষ্টম অধ্যায়: তিন মাসের কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন, বন্ধুদের বিস্ময় এবং সুন্দরীদের বিমুগ্ধতা
জাদুকরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ওয়েই ইয়াংশেং নিজ গৃহে ফিরে এলেন। কিন্তু একাকী শয্যায় শুয়ে যখনই তিনি কল্পনা করলেন যে, অঙ্গ পরিবর্তনের পর নারীদের সঙ্গে কী উত্তাল কামক্রীড়ায় মেতে উঠবেন, তখনই তাঁর কামাগ্নি দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সেই মুহূর্তে নিজেকে দমন করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ল। অগত্যা তিনি হাত মেরে নিজের আদিম ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে চাইলেন এবং করলেন।
ওয়েই ইয়াংশেং-এর দুজন সুদর্শন ভৃত্য ছিল—একজনের নাম ‘শু সি’ ও অন্যজনের নাম ‘জিয়ান কিয়াও’। শু সি-র বয়স ষোল বছর। যেহেতু সে অল্পবিস্তর লেখাপড়া জানত, তাই ওয়েই ইয়াংশেং তাঁর সমস্ত বইপত্র তাকে দেখাশোনা করতে দিতেন। সে ছিল তাঁর জীবন্ত ‘বইয়ের বাক্স’, তাই তার নাম রাখা হয়েছিল শু সি। আর জিয়ান কিয়াও-এর বয়স আঠারো। ওয়েই ইয়াংশেং তাকে একটি প্রাচীন তলোয়ার সংরক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সে ছিল যেন তলোয়ারের খাপ, তাই তার নাম জিয়ান কিয়াও।
দুজনেই দেখতে নমনীয় ও সুন্দর, যেন রমণীয় নারী। তবে জিয়ান কিয়াও-এর স্বভাব ছিল কিছুটা অভিমানী। অন্যদিকে শু সি ছিল অত্যন্ত ধূর্ত ও চতুর। তাই ওয়েই ইয়াংশেং তাকেই বেশি ভালোবাসতেন। এই বিশেষ রাতে শু সি ডেকে কিছু উপহার দিলেন। শু সি আবদার করে বলল, “মনিব, আপনি তো এতদিন কেবল নারীদেরই কদর করতেন, পুরুষদের ঘৃণা করতেন; আমাদের দিকে ফিরেও তাকাতেন না। আজ হঠাৎ এত অনুকম্পা কেন? কোনো পুরনো ঋণ শোধ করছেন নাকি?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “না রে, আজ আমি তোকে বিদায় জানাচ্ছি।”
শু সি আঁতকে উঠে বলল, “সে কী! আপনি কি আমাকে বিক্রি করে দেবেন?”
ওয়েই ইয়াংশেং হেসে বললেন, “তোকে বিক্রি করার সাধ্য আমার নেই।” এরপর তিনি তাঁর অঙ্গ পরিবর্তনের পরিকল্পনা বিস্তারিত খুলে বললেন।
শু সি বলল, “তাহলে তো আপনার পরিবর্তনের পর সেই যন্ত্রটি কয়েক গুণ বিশাল হয়ে যাবে! তা দিয়ে আপনি পরের ঘরের নারীদের সুখ দিতে পারবেন বটে!”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “তা ঠিক।”
শু সি তখন চতুরতার সঙ্গে বলল, “মনিব, আপনি যখন নারী শিকারে বেরোবেন, তখন নিশ্চয়ই আপনার সঙ্গে একজন বিশ্বস্ত ভৃত্য লাগবে। আমাকে আপনার সঙ্গী করবেন। যদি আপনার হাতে অতিরিক্ত বা ‘উচ্ছিষ্ট’ কোনো নারী থাকে—যাকে আপনি একা সামলাতে পারছেন না—তবে আমাকে একটি দেবেন। যাতে আমিও একটু নারীর স্বাদ নিতে পারি। একজন রসিক এবং রোমান্টিক প্রভুর সঙ্গে থাকার এইটুকু সুবিধা তো আমার পাওনা!”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “এ তো সহজ কথা। প্রবাদে আছে—’মনিবের পেট ভরা থাকলে অধীনস্থদের ক্ষুধা লাগে না’। তুই আমার সঙ্গে ঘুমাবি, আর অধীনস্থ দাসীদের সঙ্গে ফুর্তি করবি। একজন কেন, কয়েক ডজন নারী জুটবে তোর কপালে।”
শু সি শুনে আনন্দে গদগদ হয়ে গেল।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ওয়েই ইয়াংশেং একটি অত্যন্ত শক্তিশালী পুরুষ কুকুর ও একটি মাদী কুকুর কিনলেন এবং বাড়ির দুটি ভিন্ন জায়গায় বেঁধে রাখলেন। নির্ধারিত দিনে শু সি-কে সঙ্গে নিয়ে এবং জিয়ান কিয়াও-কে দিয়ে একটি ভোজের আয়োজন করিয়ে তিনি জাদুকরের সেই গোপন কুঁড়েঘরে উপস্থিত হলেন। জাদুকরের বাড়িটি ছিল অত্যন্ত নির্জন, সেখানে অপরিচিত কারও আনাগোনা ছিল না, তাই গোপনীয়তা রক্ষার জন্য জায়গাটি ছিল আদর্শ।
সেদিন ওয়েই ইয়াংশেং-কে দেখে জাদুকর তাঁকে প্রস্তুত হতে বললেন। তিনি আগেই ওয়েই ইয়াংশেং-এর গোপনাঙ্গে একটি বিশেষ ভেষজ প্রলেপ বা অ্যানেস্থেশিয়া লাগিয়ে দিলেন, যাতে অস্ত্রোপচারের সময় ছুরি চালালে ব্যথা না লাগে। প্রলেপটি লাগানোর সময় প্রথমে বরফের মতো ঠান্ডা লাগল, কিন্তু কিছুক্ষণ পর মনে হলো যেন ওই জায়গাটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে—চিমটি কাটলেও ব্যথা নেই, চুলকালেও অনুভূতি নেই। ওয়েই ইয়াংশেং নিশ্চিন্ত হলেন যে কাটার সময় কোনো কষ্ট হবে না।
কিছুক্ষণ পর মদ্যপানের আয়োজন করা হলো। জাদুকরের সঙ্গে মদ পান করতে করতে তাঁরা কুকুর দুটির মিলনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। প্রাণী দুটিকে এক নির্জন স্থানে আনা হলো এবং একসঙ্গে ছেড়ে দেওয়া হলো। কুকুর দুটি ভাবল মালিক হয়তো তাদের প্রতি সদয় হয়ে মিলনের সুযোগ দিচ্ছেন, তাই তারা কামমত্ত হয়ে একে অপরের সঙ্গে মিশে গেল। হায়! অবলা জীবেরা কি জানত যে মালিক তাদের এই আদিম উত্তেজনাকেই পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করবেন?
কুকুর দুটিকে আনার সময় তাদের গলায় দড়ি বাঁধা ছিল, যা খোলা হয়নি। জাদুকর যখন দেখলেন যে তারা উত্তেজনার চরম শিখরে পৌঁছেছে, তখন তিনি দুই ভৃত্যকে নির্দেশ দিলেন দুই দিক থেকে দড়ি ধরে জোরে টানতে। পুরুষ কুকুরটি তখন কিছুতেই আলাদা হতে চাইছিল না, মুখ দিয়ে করুণ আর্তনাদ করছিল এবং তার পেছনের দুই পা দিয়ে মাদী কুকুরের যোনিদেশ শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল। মাদী কুকুরটিও আলাদা হতে চাইছিল না, সেও চিৎকার করছিল এবং তার পেছনের পা দিয়ে পুরুষাঙ্গটি ধরে রেখেছিল।
ঠিক সেই চরম মুহূর্তে, জাদুকর ক্ষিপ্রহস্তে ছুরি চালালেন। তিনি চোখের পলকে পুরুষ কুকুরটির অণ্ডকোষ ও বিশেষ কাম-গ্রন্থি (কিডনি) কেটে নিলেন। তারপর মাদী কুকুরের যোনি চিরে পুরুষ কুকুরের আটকে থাকা পুরুষাঙ্গ ও তার সংলগ্ন অংশ বের করে আনলেন। তিনি সেই জীবন্ত ও তেজদীপ্ত মাংসপিণ্ডকে চারটি টুকরো করলেন।
এরপর অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ওয়েই ইয়াংশেং-এর পৌরুষদণ্ডের চারপাশের চামড়ায় চারটি গভীর ফাটল সৃষ্টি করলেন এবং সেই গরম থাকা অবস্থাতেই কুকুরের গ্রন্থিগুলো প্রতিটি ফাটলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন। চারটি টুকরো স্থাপন করা শেষ হলে, বাইরে একটি অলৌকিক ভেষজ মলম লাগিয়ে তোয়ালে দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিলেন। অস্ত্রোপচার শেষ করে তাঁরা আবার মদ্যপানে বসলেন।
ওয়েই ইয়াংশেং সেই রাত জাদুকরের বাড়িতেই কাটালেন। রাতে ঘুমানোর আগে তিনি জাদুকরের কাছ থেকে শয্যা-যুদ্ধের আরও অনেক গূঢ় কৌশল শিখে নিলেন। পরদিন তিনি সুস্থ হওয়ার জন্য নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেন।
দীর্ঘ তিন মাস তিনি কঠোর সংযম পালন করলেন। কেবল কামবাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করাই নয়, তিনি এমনকি কৌতূহলবশত নিজের সেই নতুন পরিবর্তিত অঙ্গটি দেখার জন্যও বাঁধন খোলেননি।
তিন মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর অবশেষে তিনি তোয়ালে খুললেন এবং ভেষজ জল দিয়ে অঙ্গটি ধৌত করলেন। সাবধানে পর্যবেক্ষণ করার পর তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “এ কী বিশাল! কী শক্তিশালী! সত্যিই এক আমূল পরিবর্তন হয়েছে! এই অদ্ভুত ‘যন্ত্র’ দিয়ে এবার পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করা সম্ভব!”
কয়েক দিন পর, হঠাৎ সাই কুনলুন এসে হাজির। তিনি কিছুটা ব্যঙ্গ করে বললেন, “ভাই, শুনলাম তুমি নাকি এতদিন ঘর থেকে বের হওনি, বাড়িতেই বসে ছিলে। তা পড়াশোনার নিশ্চয়ই অনেক উন্নতি হয়েছে?”
ওয়েই ইয়াংশেং বাঁকা হাসি হেসে বললেন, “পুঁথিগত বিদ্যার উন্নতি তেমন না হলেও, রতিবিদ্যার উন্নতি হয়েছে অসামান্য।”
সাই কুনলুন হেসে উড়িয়ে দিলেন, “যার মেধা বা পুঁজিই কম, তার উন্নতিও সীমিত হতে বাধ্য।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “বড় ভাই ভুল করছেন। প্রবাদে আছে—’তিন দিন না দেখলে একজন পণ্ডিতকেও নতুন করে চিনে নিতে হয়’। আর দীর্ঘ তিন মাস আলাদা থাকার পর আমার কি কোনো উন্নতিই হবে না? তিন ফুট লম্বা শিশুও তো পরে বিশাল পুরুষে পরিণত হয়। খরগোশের মতো দ্রুতগামী সৈন্য কি শুরুতে কুমারী মেয়ের মতো লাজুক ছিল না? কেবল মরা মানুষের অঙ্গই ছোট হয় বা বাড়ে না; কিন্তু জীবন্ত মানুষের অঙ্গ যে কত বড় হতে পারে, তা কি কেউ অনুমান করতে পারে?”
সাই কুনলুন বললেন, “আমি এই আজগুবি কথা বিশ্বাস করি না। তেরো-চৌদ্দ বছরের কিশোরদের স্খলন হওয়ার আগেই তাদের অঙ্গ প্রতিদিন বাড়তে থাকে। কিন্তু কুড়ি বছরের বেশি বয়সে কি আর পুরুষাঙ্গ বাড়তে পারে? আর যদি বাড়েও, তবে তা হবে সুতা বা চুলের মতো সামান্য—ইঞ্চি বা ফুটের হিসেবে নয়।”
ওয়েই ইয়াংশেং দম্ভভরে বললেন, “সুতা বা চুল তো নস্যি! ইঞ্চি বা ফুট দিয়েও এর বৃদ্ধির বর্ণনা করা যথেষ্ট হবে না।”
সাই কুনলুন বললেন, “এ একেবারে অসম্ভব। পৃথিবীতে মানুষ হঠাৎ ধনী হতে পারে, কিন্তু হঠাৎ বিশাল পৌরুষের অধিকারী হতে পারে না। যেহেতু তুমি এত বড়াই করছ, তবে ওটা বের করে আমাকে দেখাও দেখি।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “আগেরবার বের করে আপনাকে দেখিয়ে অনেক বিদ্রূপ ও অবহেলা সহ্য করতে হয়েছে। এবার আর সেই সাহস পাই না।”
সাই কুনলুন বললেন, “ভাই, মজা কোরো না। চটপট বের করো। যদি সত্যিই উন্নতি হয়ে থাকে, তবে আমি তোমার ভূয়সী প্রশংসা করব এবং আগের ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইব।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “শুধু মুখে প্রশংসা করে লাভ নেই। যদি এর যোগ্য কোনো ‘বাস্তব কাজ’ বা সেই সুন্দরীদের খুঁজে দেন—প্রথমত এটি পরীক্ষা করার জন্য, আর দ্বিতীয়ত এটিকে উৎসাহিত করার জন্য—তবেই ভাইয়ের এই প্রতিভা লালন করার মহান উদ্দেশ্য সার্থক হবে।”
সাই কুনলুন বললেন, “যদি সত্যিই উন্নতি হয়ে থাকে, তবে আমি কথা দিচ্ছি—আগের দিন যা বলেছিলাম, তা আমি অবশ্যই করে দেখাব।”
ওয়েই ইয়াংশেং কিছুটা সংকোচের সঙ্গে বললেন, “যেহেতু আপনি নাছোড়বান্দা, তাই আবার আমাকে লজ্জায় ফেললেন।”
অগত্যা তিনি নিজের নিম্নাঙ্গের পোশাক তুলে কোমরে গুঁজলেন, তারপর পাজামা খুললেন। দুই হাতে পরম যত্নে নিজের পৌরুষদণ্ডটি ধরে রাখলেন—যেন কোনো পারস্যের বাদশাহর সামনে এক মহামূল্যবান রত্ন বা উপঢৌকন পেশ করছেন! তিনি সাই কুনলুনকে বললেন, “উন্নতি হয়েছে কি না, নিজের চোখেই দেখুন।”
সাই কুনলুন প্রথমে দূর থেকে দেখে সন্দেহ করলেন। ভাবলেন, এ ব্যাটা নিশ্চয়ই কোনো গাধার কিডনি বা কৃত্রিম কিছু কোমরে ঝুলিয়ে আমাকে বোকা বানাতে চাইছে! কিন্তু কাছে এসে যখন ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলেন, তখন তাঁর চক্ষু চড়কগাছ! তিনি বুঝতে পারলেন, এটি কোনো নকল বস্তু নয়—এ একেবারে খাঁটি জিনিস!
বিস্ময়ে তাঁর জিভ বেরিয়ে এল। তিনি তোতলামি করে বললেন, “ভা… ভাই! তুমি কোন জাদুমন্ত্র বলে এমন এক মরা ইঁদুরকে জ্যান্ত বাঘ বানিয়ে ফেলেছ? কী সেই পদ্ধতি, যার ছোঁয়ায় এমন দুর্বল ও ক্ষুদ্র জিনিস এতটা বিশাল ও শক্তিশালী হয়ে উঠল?”
ওয়েই ইয়াংশেং গর্বভরে বললেন, “আমি জানি না কী কারণে ভাইয়ের উপস্থিতি টের পেয়ে এটি হঠাৎ এভাবে জেগে উঠল! মনে হচ্ছে এটি রাগে ফুঁসছে এবং আপনার সঙ্গে শক্তিমত্তার প্রতিযোগিতায় নামতে চাইছে। বিশ্বাস করুন, এমনকি আমি নিজেও একে এখন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না।”
সাই কুনলুন বললেন, “আমাকে আর ধাঁধায় রেখো না। আমি চামড়ার ওপর স্পষ্ট অস্ত্রোপচারের দাগ দেখতে পাচ্ছি। আর চারপাশের চামড়ার রঙও চার রকম—এ তো স্বাভাবিক নয়! বলো তো ভাই, আসলে কী কৌশল খাটিয়ে এটি তৈরি করেছ? আমাকে সত্যিটা খুলে বলো।”
সাই কুনলুনের জেরার মুখে পড়ে ওয়েই ইয়াংশেং আর সত্য গোপন রাখতে পারলেন না। তিনি তাঁর অঙ্গ পরিবর্তনের পুরো কাহিনী—সেই জাদুকর, কুকুরের কিডনি প্রতিস্থাপন, এবং তিন মাসের সাধনার কথা—বিস্তারিত খুলে বললেন।
সব শুনে সাই কুনলুন অভিভূত হয়ে বললেন, “ভাই, তোমার এই অদম্য কামতৃষ্ণা এবং জেদ সত্যিই অবাক করার মতো! এমন তীব্র বাসনাকে তো আর বাধা দেওয়া সম্ভব নয়। আমাকে এই অসাধ্য সাধন করতেই হবে। আজই আমি তোমার সঙ্গে সেই সিল্ক বিক্রেতার বাড়িতে যাব এবং সুযোগ বুঝে তোমাকে সেখানে ঢোকানোর ব্যবস্থা করব।”
ওয়েই ইয়াংশেং আনন্দে আত্মহারা হলেন। তিনি দ্রুত পোশাক পরিবর্তন করে সাই কুনলুনের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন।
গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছে সাই কুনলুন তাঁকে এক নিরাপদ স্থানে দাঁড় করিয়ে রেখে নিজে খোঁজ নিতে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে হাসিমুখে বললেন, “অভিনন্দন ভাই, অভিনন্দন! আজ রাতেই তোমার মনবাসনা পূর্ণ হবে।”
ওয়েই ইয়াংশেং অবাক হয়ে বললেন, “এখনো তো দেখাই হলো না, আর আপনি নিশ্চিত হলেন কী করে যে আজ রাতেই কাজ হবে?”
সাই কুনলুন বললেন, “আমি একটু আগে প্রতিবেশীর কাছ থেকে খোঁজ নিয়েছি। শুনলাম, তার স্বামী রেশম বিক্রি করতে দূর দেশে গেছে, দশ-বারো দিনের আগে ফিরবে না। এখন তুমি আমার সঙ্গে গিয়ে খুব সাবধানে ও মনোযোগ দিয়ে তাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করবে। যদি তার মধ্যে সামান্যতম আবেগ বা আগ্রহ দেখতে পাও, তবে আমি কথা দিচ্ছি—আজ রাতেই তোমাকে তার অন্দরমহলে পাচার করে দেব। তখন তুমি টানা দশ-বারো রাত ধরে তার সঙ্গে রতিসুখ উপভোগ করতে পারবে।”
ওয়েই ইয়াংশেং-এর খুশির সীমা রইল না। তাঁরা দুজনে দ্রুত পায়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে গেলেন।
দরজার সামনে পৌঁছে সাই কুনলুন পর্দা তুলে ওয়েই ইয়াংশেং-কে নিয়ে সোজা ভেতরে ঢুকে পড়লেন। তিনি হাঁক দিলেন, “মিস্টার কুয়ান কি বাড়িতে আছেন?”
ভেতর থেকে মহিলার কণ্ঠ ভেসে এল, “না, তিনি বাড়িতে নেই।”
সাই কুনলুন বললেন, “বড় মুশকিল হলো তো! আমি কয়েক কেজি ভালো মানের রেশম কিনতে চেয়েছিলাম। এখন তিনি নেই, কী করি?”
মহিলা বললেন, “অন্য কোথাও থেকে কিনে নিন না।”
তখন ওয়েই ইয়াংশেং যোগ করলেন, “শহরে রেশম কেনার জায়গার কি অভাব আছে? কিন্তু আমরা হলাম আপনার পুরনো ও নিয়মিত খদ্দের। আপনাদের ছেড়ে অন্য কাউকে বিরক্ত করা কি ঠিক হবে?”
মহিলা একটু অবাক হয়ে বললেন, “আপনারা যদি নিয়মিত খদ্দেরই হবেন, তবে আমি আপনাদের চিনতে পারছি না কেন?”
সাই কুনলুন চটপটে উত্তর দিলেন, “মহাশয়া, গত গ্রীষ্মকালে আমি একবার রেশম কিনতে এসেছিলাম। তখনও কর্তা বাড়িতে ছিলেন না, আপনি নিজেই লেনদেন করেছিলেন। তাক থেকে রেশম পেড়ে দিয়েছিলেন। এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন?”
মহিলার মনে পড়ল, “ও হ্যাঁ! একবারের কথা মনে পড়ছে বটে।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “যেহেতু মহাশয়া মনে রেখেছেন, তাই আর কথার কথা নয়। এখন যদি রেশম থাকে, তবে তা বের করে আমাদের দিন। নিজের লক্ষ্মী কেন পায়ে ঠেলে অন্যকে দেবেন?”
মহিলা বললেন, “কিছু রেশম আছে বটে, কিন্তু আপনাদের পছন্দ হবে কি না জানি না।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “আপনার রেশম পছন্দ হবে না—এ কি হতে পারে? বরং আমি এই দরিদ্র মানুষ তা কেনার যোগ্য কি না, সেটাই ভাবার বিষয়।”
মহিলা বললেন, “ভালো কথা, আপনারা তবে বসুন। আমি বের করে দিচ্ছি।”
সাই কুনলুন কৌশল করে ওয়েই ইয়াংশেং-কে ওপরের আসনে (মহিলার কাছাকাছি) বসালেন এবং নিজে নিচের আসনে বসলেন—যাতে ওয়েই ইয়াংশেং খুব কাছ থেকে মহিলাকে প্রলুব্ধ করার সুযোগ পান।
মহিলা এক বান্ডিল রেশম বের করে ওয়েই ইয়াংশেং-এর হাতে দিলেন। ওয়েই ইয়াংশেং রেশম হাতে নেওয়ার আগেই বলে উঠলেন, “এই রেশমের রঙটা বড্ড হলদেটে মনে হচ্ছে, সম্ভবত এটা ব্যবহার করা যাবে না।”
তারপর হাতে নিয়ে ভালো করে দেখে আবার বললেন, “কী অদ্ভুত ব্যাপার! কিছুক্ষণ আগে মহাশয়া যখন হাতে নিয়েছিলেন, তখন এটি হলুদ লাগছিল। কিন্তু এখন আমার হাতে আসতেই এটি ধবধবে সাদা হয়ে গেল! এর কারণ কী?”
তিনি ইচ্ছে করে কিছুক্ষণ ভাবার ভান করে বললেন, “বুঝেছি! মহাশয়ার হাত এতটাই ফর্সা ও উজ্জ্বল যে তার পাশে রেশমকেও হলুদ বা ম্লান দেখাচ্ছিল। আর এখন আমার হাত কালো, তাই এই হলুদ রেশমকেও তার পাশে সাদা দেখাচ্ছে।”
এই কথা শুনে মহিলার চোখ দুটি কৌতূহলী হয়ে ওয়েই ইয়াংশেং-এর হাতের ওপর নিবদ্ধ হলো। তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে গম্ভীরভাবে বললেন, “মহাশয়ের হাতও তো কালো নয়।” কথাটি বলার সময় তাঁর মুখে কোনো হাসির রেখা ছিল না।
সাই কুনলুন ফোড়ন কেটে বললেন, “তাঁর হাত হয়তো আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চেয়ে কালো নয়, কিন্তু মহাশয়ার হাতের মতো অমন দুগ্ধধবল তো নয়!”
মহিলা বললেন, “রেশম যদি সাদাই হয়, তবে কিনছেন না কেন?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “এটি তো আমার নোংরা হাতের ছোঁয়ায় সাদা দেখাচ্ছে, এটি তো আসল সাদা নয়। যদি মহাশয়ার মুখের রঙের মতো উজ্জ্বল হতো, তবেই না বুঝতাম এটি খাঁটি রেশম! দয়া করে আর একটু ভালো মানের কিছু থাকলে দেখান।”
সাই কুনলুন বললেন, “পৃথিবীতে এমন সাদা রেশম কোথায় পাবেন যা মহাশয়ার মুখশ্রীর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে? ওনার মুখের মতো রঙ হলেই তো যথেষ্ট!”
এ কথা শুনে মহিলার চোখ এবার সোজাসুজি ওয়েই ইয়াংশেং-এর মুখের ওপর পড়ল। তিনি কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন, তারপর মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বললেন, “আমারও মনে হয় পৃথিবীতে এমন সাদা রেশম আর নেই।”
প্রিয় পাঠক, আপনারা কি জানেন কেন তিনি আগে হাসেননি, আর এখনই বা কেন হাসলেন? কেন তিনি আগে তাকাননি, আর এখনই বা কেন হঠাৎ তাকালেন?
আসলে, এই মহিলাটি ছিলেন ‘ক্ষীণদৃষ্টি’ বা ‘স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন’ (Myopic)। তিনি দুই ফুটের বেশি দূরের জিনিস স্পষ্ট দেখতে পেতেন না। শুরুতে, ওয়েই ইয়াংশেং যখন ভেতরে ঢুকেছিলেন, তখন তিনি ভেবেছিলেন ইনি একজন সাধারণ ব্যবসায়ী। কিন্তু যখন ‘দরিদ্র ব্যক্তি’ শব্দটি শুনলেন, তখন বুঝলেন ইনি একজন পণ্ডিত। তবুও তিনি তাঁকে একজন সাধারণ খদ্দের হিসেবেই ভাবছিলেন এবং ভালো করে তাকানোর প্রয়োজন মনে করেননি। কারণ চোখ কুঁচকে কাউকে দেখার চেষ্টা করাটা তাঁর কাছে কষ্টকর ছিল, তাই তিনি সাধারণত পুরুষদের দিকে খুব একটা তাকাতেন না।
তবে, নারী হিসেবে তাঁর মনেও পুরুষের প্রতি সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা ছিল। তিনিও চাইতেন সঠিক পাত্র নির্বাচন করতে, যেনতেনভাবে নিজেকে বিলিয়ে দিতে নয়। যদি কোনো নারী খুব কামুক হন এবং তাঁর দৃষ্টিশক্তিও ভালো থাকে—তবে একজন সুদর্শন সুপুরুষকে দেখলে কি তিনি নিজেকে সামলাতে পারতেন? তখন তো তাঁর সতীত্ব কবেই ধুলোয় মিশে যেত!
তাই হয়তো প্রকৃতি তাঁকে গড়তে গিয়ে এক অদ্ভুত কৌশল অবলম্বন করেছিল। তাঁকে এই ক্ষীণদৃষ্টি দেওয়া হয়েছিল যাতে তিনি তাঁর স্বামী ছাড়া অন্য কাউকে—এমনকি পুরাণের সুদর্শন প্যান আন বা সং ইউ-কেও—পরিষ্কারভাবে দেখতে না পান। এটি তাঁকে অনেক পাপ থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। তাই বলা যায়, ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন নারীরা স্বভাবতই বেশি সতী হন এবং কম স্খলনের শিকার হন—কারণ তাঁদের চোখ কোনো বাড়তি প্রলোভন তৈরি করে না।
এই মহিলাটি যদি ওয়েই ইয়াংশেং-এর ওই কয়েকটি চতুর কথার ফাঁদে না পড়তেন, যদি ওই কথাগুলো তাঁকে বাধ্য না করত ভালো করে তাকাতে—তবে আপনি সারাদিন তাঁর সামনে বসে হাজার চেষ্টা করলেও তিনি ভাবতেন আপনি মেঘের আড়ালে আছেন; কিছুই টের পেতেন না।
কিন্তু যেই না তিনি একবার হাতে তাকালেন, একবার মুখে তাকালেন—অমনি তাঁর মন গলে গেল। তিনি মুগ্ধ হয়ে গেলেন এবং আর চোখ ফেরাতে পারলেন না। তিনি ওয়েই ইয়াংশেং-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, “মহাশয় কি সত্যিই রেশম কিনবেন? যদি সত্যিই কিনতে চান, তবে আমার শোবার ঘরে একটা খুব ভালো মানের জিনিস রাখা আছে। আমি সেটা বের করে দিচ্ছি।”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “আমি তো বিশেষভাবে খুঁজতে এসেছি, কেন কিনব না? দয়া করে তাড়াতাড়ি বের করে দেখান।”
মহিলা ভেতরে গেলেন এবং সত্যিই এক বান্ডিল উৎকৃষ্ট রেশম নিয়ে ফিরে এলেন। তিনি দাসীকে ডেকে দুই পেয়ালা চা আনতে বললেন এবং সাই কুনলুন ও ওয়েই ইয়াংশেং-কে আপ্যায়ন করলেন। ওয়েই ইয়াংশেং পুরো চা খেলেন না, অর্ধেক রেখে দিলেন—এটি গৃহকর্ত্রীর প্রতি সম্মান দেখানোর এক পুরনো রীতি। মহিলা তা দেখে আবার ওয়েই ইয়াংশেং-এর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন এবং রেশমটি তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
রেশম নেওয়ার ছলে ওয়েই ইয়াংশেং মহিলার হাত আলতো করে ধরলেন এবং একটু চাপ দিলেন। মহিলা কিছুই জানেন না বা বোঝেন না—এমন ভান করলেন। কিন্তু রেশম ছাড়ার সময় তিনি তাঁর নখ দিয়ে ওয়েই ইয়াংশেং-এর তালুতে আলতো করে একটি আঁচড় কেটে দিলেন—যা ছিল সম্মতির এক গোপন সংকেত!
সাই কুনলুন পরিস্থিতি বুঝে বললেন, “এই বান্ডিলটি সত্যিই চমৎকার, এটি কিনে নিন।” তিনি ওয়েই ইয়াংশেং-এর হাতে টাকার থলি দিলেন। ওয়েই ইয়াংশেং নির্ধারিত ওজনের রৌপ্যমুদ্রা মেপে মহিলার হাতে দিলেন।
মহিলা বললেন, “এই রৌপ্যখণ্ডগুলো তো দেখছি খুব চকচকে, কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে—এগুলো কি খাঁটি? নাকি ওপরটা ভালো আর ভেতরটা নকল?”
ওয়েই ইয়াংশেং দ্ব্যর্থবোধক হাসি হেসে বললেন, “মহাশয়া যদি চিন্তিত হন, তবে আমি রেশম এবং রৌপ্য—দুটোই এখানে রেখে যাচ্ছি। আজ রাতে আপনি নিজেই একটি খণ্ড ভেঙে বা গলিয়ে পরীক্ষা করে দেখুন না কেন? বড়াই করে বলছি না, আমাদের রৌপ্য ওপর থেকে ভেতর পর্যন্ত পুরোটাই এক রকম খাঁটি।”
মহিলা বললেন, “থাক, অতশত করার দরকার নেই। যদি কোনো গোলমাল না হয়, তবে পরের বারও লেনদেন করা যাবে। আর যদি ঠকান, তবে এই একবারের জন্যই খদ্দের হবেন, আর নয়।”
সাই কুনলুন রেশম নিয়ে ওয়েই ইয়াংশেং-কে ফেরার তাড়া দিলেন। বিদায় নেওয়ার সময় ওয়েই ইয়াংশেং আবার মহিলার দিকে তাকিয়ে কয়েকবার চোখ টিপলেন। মহিলা যদিও স্পষ্ট দেখতে পেলেন না, তবু তিনি এর অর্থ ঠিকই বুঝতে পারলেন এবং চোখ ছোট করে হাসতে হাসতে তাঁদের বিদায় জানালেন।
ওয়েই ইয়াংশেং তাঁর বাসায় ফিরে সাই কুনলুনকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কাজের তো দেখছি আট-নয় আনা হয়েই গেছে। কিন্তু আজ রাতে ভেতরে ঢুকব কী করে?”
সাই কুনলুন বললেন, “আমি সব খোঁজখবর নিয়ে রেখেছি। তাঁর বাড়িতে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি নেই, কেবল ওই এগারো-বারো বছরের দাসীটি থাকে। সে রাতে বিছানায় পড়ামাত্রই কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে পড়ে। তাঁর বাড়িটি এমন নয় যে মাটির গর্তে লুকানো, আবার বহুতল ভবনও নয়। আমি তোমাকে পিঠে করে ছাদে উঠে যাব। সেখান থেকে কয়েকটা টালি সরিয়ে, সিলিং-এর কাঠ ফাঁক করে তোমাকে আকাশ থেকে সোজা তাঁর ঘরে নামিয়ে দেব।”
ওয়েই ইয়াংশেং ভয় পেয়ে বললেন, “যদি শব্দ পেয়ে প্রতিবেশীরা চোর চোর বলে তেড়ে আসে, তখন কী হবে?”
সাই কুনলুন অভয় দিয়ে বললেন, “আরে, আমি তো পাশেই পাহারায় আছি, চিন্তা করো না। তবে একটা কথা ভাই—ওই মহিলা কিন্তু যাওয়ার সময় বলেছিলেন যে, ‘আপনি দেখতে ভালো হলেও কাজের কি না তা সন্দেহ আছে’। এবং ‘যদি তাঁকে খুশি করতে না পারেন, তবে এই একবারের জন্যই খদ্দের হবেন’। ভাইয়ের সেই দম্ভোক্তি কি এবার সত্যি প্রমাণিত হবে? তোমাকে কিন্তু নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। তাঁকে কোনোভাবেই হতাশ করা যাবে না। মনে রেখো—একবার যদি অন্দরমহলে প্রবেশ করেও ব্যর্থ হও, তবে দ্বিতীয়বার আর ঢোকার সুযোগ পাবে না।”
ওয়েই ইয়াংশেং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, “এমনটা হবে না ভাই, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”
দুজন হেসে উঠলেন। তাঁরা সূর্য ডোবার এবং চাঁদ ওঠার প্রতীক্ষায় রইলেন, যাতে সেই ‘নিষিদ্ধ রতি-পরীক্ষায়’ অবতীর্ণ হতে পারেন। তবে সেই পরীক্ষক (মহিলা) কীভাবে পরীক্ষা নেবেন তা এখনো অজানা; প্রশ্নপত্র হাতে পেলেই সব জানা যাবে।
সমালোচকের পর্যালোচনা:
উপন্যাস হলো রূপকের খেলা। যেহেতু একে ‘রূপক’ বলা হচ্ছে, তাই এর সব ঘটনাকে বাস্তব ভাবা ঠিক নয়। এই অধ্যায় থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কুকুরের কিডনি কেটে মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করা—এটি কোনো বাস্তব চিকিৎসা পদ্ধতি নয়। বরং এর রূপক অর্থ হলো—ওয়েই ইয়াংশেং ভবিষ্যতে যা করবেন, তা হবে ‘কুকুর এবং শূকরের’ মতো জঘন্য ও পাশবিক কাজ।
তৃতীয় অধ্যায়ে সাই কুনলুনের মতো এক তস্করের সঙ্গে জোট বাঁধা এবং তাঁকে ‘ভাই’ হিসেবে সম্মান করার অর্থ হলো—নায়কের চরিত্র এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা চোর-ডাকাতের চেয়েও নিচু স্তরে নেমে গেছে। এই সবই লেখকের তীব্র ঘৃণা এবং নিন্দার বহিঃপ্রকাশ। স্পষ্টতই ওয়েই ইয়াংশেং এখন এক ‘কুকুর-প্রবৃত্তির লম্পট’ এবং ‘চৌর্যবৃত্তির সমর্থক’।
পাঠকদের উচিত নয় এই নিন্দাকে প্রশংসা হিসেবে গ্রহণ করা, বা মিথ্যাকে সত্য ভাবা। কেউ যেন মনে না করেন যে কুকুরের অঙ্গ সত্যিই মানুষের দেহে লাগানো যায় বা উচিত, কিংবা চোরকে সত্যিই বন্ধু বানানো যায়। এটি বরং চোরদের ওপরও এক কলঙ্ক। লেখকের এই গভীর বার্তা অনুধাবন করা হাজার বছরের সাহিত্যমোদী পাঠকদের জন্য এক পরম সৌভাগ্যের বিষয়।
নবম অধ্যায়: অদ্ভুত কামুকতা, অটল নীতিবোধ, এবং অর্জিত সুখের ভাগাভাগি
কুয়ান লাওশির স্ত্রী, যার নাম ‘ইয়ান ফাং’, ছিলেন এক গ্রাম্য পণ্ডিতের কন্যা। শৈশব থেকেই তাঁকে সুশিক্ষা দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। তাঁর অসামান্য রূপের কারণে বাবা-মা তাঁকে সহজে কারো হাতে তুলে দিতে চাইতেন না।
অবশেষে ষোলো বছর বয়সে, পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী এক মেধাবী ছাত্র তাঁকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠান। বাবা-মা ছেলেটির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখে বিয়েতে সম্মতি দেন। কিন্তু বিধাতার লিখন কে খণ্ডাবে? বিয়ের এক বছর পূর্ণ হতে না হতেই স্বামী এক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এক বছর বৈধব্য জীবন কাটানোর পর, ইয়ান ফাং শেষ পর্যন্ত কুয়ান লাওশিকে পুনর্বিবাহ করেন।
এই নারী স্বভাবত কামুক হলেও তাঁর মধ্যে নীতিবোধ ছিল প্রবল। যখনই তিনি কোনো নারীকে ব্যভিচারে লিপ্ত হতে দেখতেন, তখন তিনি আড়ালে হাসতেন। তিনি তাঁর সখীদের বলতেন:
“আমরা হয়তো পূর্বজন্মে কোনো ভালো কাজ করিনি, তাই এ জন্মে নারী হয়ে জন্মেছি। সারাজীবন আমাদের চার দেয়ালের মাঝে বন্দি থাকতে হয়, কেবল স্বামীর সঙ্গে রতি-ক্রীড়া বা সহবাসের মাধ্যমেই আমরা জীবনের স্বাদ পাই। তাহলে একজন নারীকে কামুক বলায় দোষ কী?
তবে মনে রেখো—স্বামী ও স্ত্রী হলো স্বর্গ ও মর্ত্যের মতো একে অপরের পরিপূরক, আর এই বন্ধন বাবা-মায়ের আশীর্বাদে নির্ধারিত। তাই স্বামীর সঙ্গে শরীরী আনন্দ করাটাই স্বাভাবিক ও ধর্মসম্মত। কিন্তু যদি কেউ অন্য পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ায়, তবে তা সীমা লঙ্ঘন এবং ঘোর অন্যায়। স্বামী জানলে প্রহার করবে, আর সমাজ জানলে ছি-ছি করবে।
মারধর বা নিন্দার ভয় না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু এই কাজটি (পরকীয়া) যদি করতেই হয়, তবে তা নিজের ইচ্ছামতো এবং পূর্ণ তৃপ্তির সঙ্গে করা উচিত। শেষ পর্যন্ত স্বামী তো নিজেরই! মিলনের সময় দুজনকেই তো বিবস্ত্র হয়ে বিছানায় যেতে হয়। তাড়াহুড়ো না করে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধীরেসুস্থে প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করলে তবেই না অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতার স্বাদ পাওয়া যায়!
তাড়াহুড়ো করে কেবল কর্ম সারা হলে, সঠিক জায়গায় আঘাত লাগল কি না, আসল সুখ পাওয়া গেল কি না—তা বোঝার উপায় থাকে না। এতে কি কোনো আনন্দ আছে? এ তো অনেকটা ক্ষুধা ও ভোজনের মতো—ক্ষুধার সময় খাবার নেই, আর খাবার সামনে এলে ক্ষুধা নেই। ক্ষুধা ও তৃপ্তি—উভয়ই না মিললে শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে।
যে নারীরা বিপথগামী হয়, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন—পরে প্রেমিকদের জন্য যে কামুক দৃষ্টি তুলে রাখো, তা স্বামী নির্বাচনের সময় কেন ব্যবহার করো না? যদি মিথ্যে খ্যাতির মোহ থাকে, তবে একজন মার্জিত পুরুষকে বেছে নাও; যদি কেবল রূপের কাঙাল হও, তবে একজন সুদর্শন পুরুষকে বেছে নাও; আর যদি খ্যাতি বা রূপ কিছুই না চাও—কেবল কামশয্যায় আসল কাজটুকু চাও—তবে একজন শক্তিশালী ও বলিষ্ঠ পুরুষকে খুঁজে নাও। তবেই আর কোনো ভুল হবে না। তখন কেন নিজের স্বামীকে ছেড়ে অন্য কারো বিছানায় যাবে?”
তাঁর সখীরা সবাই একবাক্যে স্বীকার করত, “যাঁরা অভিজ্ঞ, তাঁদের কথার ওজনই আলাদা। প্রতিটি বাক্যই আন্তরিক এবং গভীর অর্থপূর্ণ।”
ইয়ান ফাং কীভাবে এই অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন?
তিনি যখন কুমারী ছিলেন, তখন তিনিও মিথ্যে খ্যাতি আর রূপের মোহে পড়েছিলেন, আবার বিছানায় ‘আসল কাজ’ বা পূর্ণ তৃপ্তিও চাইতেন। প্রথম স্বামীকে বিয়ে করার পর দেখলেন—ছেলেটির কিছু মেধা আছে, রূপও আছে। তিনি ভেবেছিলেন হয়তো তিনটেই (মেধা, রূপ ও পৌরুষ) পূর্ণমাত্রায় পেয়েছেন।
কিন্তু হায়! কে জানত যে তাঁর ‘মূলধন’ (পৌরুষদণ্ড) অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং রতিশক্তিও বড়ই কম! বিছানায় উঠে শরীর গরম হওয়ার আগেই তাঁকে নেমে যেতে হতো। ইয়ান ফাং ছিলেন এক অদম্য কামুক নারী, তিনি স্বামীকে অলস হতে দিতেন না, উৎসাহিত করে আবার উপরে আসতে বলতেন। কিন্তু দুর্বল শরীর কি আর এত ধকল সইতে পারে? এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বেচারা স্বামী কঠিন রোগে ভুগে মারা গেলেন।
এই বড় ধাক্কা খাওয়ার পর ইয়ান ফাং-এর জ্ঞানচক্ষু খুলল। তিনি বুঝলেন যে ‘মেধা’ আর ‘রূপ’—এই দুটি জিনিস দেখতে ভালো হলেও কাজের বেলায় অসার। আর তিনটি গুণ একসঙ্গে পাওয়া তো প্রায় অসম্ভব! তাই তিনি মিথ্যে মোহ ত্যাগ করে আসল সত্যকে বেছে নিলেন।
পরবর্তীতে স্বামী নির্বাচনের সময় তিনি মেধা বা রূপের তোয়াক্কা করলেন না—কেবল একজন শক্তিশালী ও বলিষ্ঠ পুরুষকেই খুঁজলেন, যিনি কামশয্যায় তাঁকে পূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারবেন। কুয়ান লাওশিকে দেখে তাঁর মনে হলো—লোকটা মোটা আর হাবাগোবা হলেও তার গায়ের জোর নেকড়ের মতো। তিনি বুঝতে পারলেন যে এই লোকটিই তাঁর ‘কাজের মানুষ’। তাই ধনী-দরিদ্র বিচার না করে তিনি তাঁকেই বিয়ে করলেন।
শুরুতে তিনি কেবল স্বামীর শক্তিটাই চেয়েছিলেন, তাঁর ‘যন্ত্রপাতির’ (পৌরুষদণ্ড) পরিমাপ জানতেন না। তিনি ভাবতেন, শক্তিশালী পুরুষদের যুদ্ধ জয়ের জন্য দীর্ঘ বর্শা বা বড় কুঠারের প্রয়োজন নেই; ছোট অস্ত্র দিয়েও তারা শত্রুকে ঘায়েল করতে পারে।
কিন্তু বাসর রাতে তিনি অবাক হয়ে দেখলেন—এ তো কোনো সাধারণ অস্ত্র নয়, যেন এক আঠারো ফুট লম্বা বর্শা! ইয়ান ফাং আনন্দে আত্মহারা হলেন। বিয়ের পর থেকে তিনি স্বামীকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতেন এবং মনে আর কোনো ভুল ধারণা স্থান দেননি। যেহেতু স্বামীর ব্যবসা ছোট ছিল এবং আয়ও কম ছিল, তাই তিনি নিজেই সারাদিন স্বামীর জন্য রেশম গুছিয়ে দিতেন। এতে প্রতিদিন এক-দু টাকা বাড়তি আয় হতো, ফলে কুয়ান লাওশি বেশ আরাম-আয়েশেই দিন কাটাতে পারতেন।
সেদিন ঘটনাচক্রে ইয়ান ফাং যখন পর্দা তুলে প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলছিলেন, ঠিক তখনই ওয়েই ইয়াংশেং দরজার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তাঁকে দুবার মনোযোগ দিয়ে দেখেছিলেন। কিন্তু ক্ষীণদৃষ্টির কারণে ইয়ান ফাং কেবল দরজার সামনে দিয়ে একজন মানুষের ছায়া সরে যেতে দেখলেন, লোকটির চেহারা কেমন ছিল তা বুঝতে পারলেন না।
কিন্তু কে জানত যে ওই প্রতিবেশী মহিলাটি ওয়েই ইয়াংশেংকে দেখে মনে মনে পছন্দ করে ফেলেছে! সেই মহিলার বয়স ত্রিশের বেশি। তাঁর স্বামীও রেশম বিক্রি করতেন এবং কুয়ান লাওশির সঙ্গেই ব্যবসা করতেন। তাঁরা অংশীদার না হলেও সহকর্মীর মতো ছিলেন।
এই প্রতিবেশী মহিলাটি দেখতে কুৎসিত হলেও স্বভাবে ছিলেন ঘোর কামুক। প্রথমত, তাঁর বদনাম থাকায় কেউ তাঁকে চাইত না; দ্বিতীয়ত, তাঁর স্বামী ছিলেন অত্যন্ত বদরাগী ও হিংস্র—সামান্য ভুলেই স্ত্রীকে বেদম প্রহার করতেন। তাই মহিলাটি সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতেন এবং কোনো খারাপ কাজ করার সাহস পেতেন না।
সেদিন তিনি ওয়েই ইয়াংশেংকে খুব কাছ থেকে ও স্পষ্টভাবে দেখেছিলেন। ওয়েই ইয়াংশেং চলে যাওয়ার পর, তিনি রাস্তা পার হয়ে ইয়ান ফাং-এর কাছে এসে বললেন: “ওগো, কিছুক্ষণ আগে এক অপরূপ সুদর্শন পুরুষ এ পথ দিয়ে যাচ্ছিল। সে তোমাকে দুবার খুব ভালো করে দেখে গেল। তুমি কি জানো?”
ইয়ান ফাং বললেন, “তুমি তো জানো আমার চোখ ঝাপসা দেখে। আমি এখানে বসে থাকি, আর পর্দার আড়াল থেকে রোজ কত পুরুষই তো আমাকে দেখে যায়। দেখতে দাও না, তাতে আমার কী?”
মহিলা বললেন, “আরে, সাধারণ কোনো পুরুষ হলে কি আর বলতাম? কিন্তু কিছুক্ষণ আগে যে গেল, তাকে তিন দিন তিন রাত ধরে দেখলেও চোখের আশ মিটবে না।”
ইয়ান ফাং হেসে বললেন, “বলো কী! তার কি তবে বারো আনা মেধা আছে?”
মহিলা উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, “বারো আনা কেন? আমার তো মনে হয় তার একশ কুড়ি আনা রূপ আর মেধা আছে! আমি সারাদিন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কত মানুষ দেখি, কিন্তু এমন সুন্দর কাউকে আজ পর্যন্ত দেখিনি। তার মুখের ত্বক এত ফর্সা যে মনে হয় দুধে-আলতা। ভ্রু, চোখ, নাক, কান—কোনোটারই খুঁত নেই। তার শরীরটা যেন কোনো শিল্পীর হাতে গড়া রেশমের পুতুল! এমনকি ছবিতেও পুরুষ মানুষ এত সুন্দর হয় না। সত্যি বলছি, তাকে নিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে।”
ইয়ান ফাং বললেন, “হাসালে ভাই! তুমি এমনভাবে বলছ যেন তাকে চিবিয়ে খাবে। আমি বিশ্বাস করি না পৃথিবীতে এমন কোনো পুরুষ আছে। আর যদি থাকেও, তাতে আমার কী? সে তার মতো, আমি আমার মতো। তাকে নিয়ে ভেবে কী লাভ?”
মহিলা বললেন, “তুমি তাকে নিয়ে ভাবছ না, কিন্তু আমি দেখেছি সে তোমাকে নিয়ে কতটা ভাবছে! সে তো তোমাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল, যেন আত্মাটাই হারিয়ে ফেলেছে। যেতে চায় কিন্তু পা সরে না; দাঁড়াতে চায় কিন্তু পাছে লোকে কিছু বলে—তাই ভয়ে ভয়ে চলে গেল। আবার কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বিদায়বেলায় আরেকবার দেখে গেল। আহা! তার জন্য কি তোমার একটুও মায়া হয় না? তুমি তাকে দেখোনি, তাই ভাবছ না। কিন্তু আমি তাকে দেখেছি বলেই তোমার হয়ে আমিই তার প্রেমে পড়ে গেছি!”
ইয়ান ফাং বললেন, “মনে হচ্ছে তার ওই অবস্থা আমার জন্য নয়, তোমার জন্য। তুমি নিজেই প্রেমে পড়েছ, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছ না—তাই মিথ্যে মিথ্যে আমাকে জড়াচ্ছ।”
মহিলা বললেন, “আমার যা ছিরি, সে কি আর আমার দিকে ফিরে তাকাবে? আসলে সে তোমার জন্যই পাগল। যদি বিশ্বাস না হয় তবে দেখো—সে আবার আসবে। আমি দূর থেকে তাকে দেখলেই তোমাকে জানাব। তুমি তখন বাইরে এসে দাঁড়িও। তাতে তুমিও তাকে দেখতে পাবে, আর সেও তোমাকে দেখে ধন্য হবে।”
ইয়ান ফাং বললেন, “বেশ, সে আসুক তখন দেখা যাবে।” মহিলা আরও অনেক আকাশ-কুসুম গল্প শুনিয়ে চলে গেলেন।
ইয়ান ফাং দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিন পর্যন্ত সেই আগন্তুককে দেখার জন্য আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু অনেক দিন পার হওয়ার পরেও যখন তাঁকে আর দেখা গেল না, তখন তিনি আশা ছেড়ে দিলেন।
কিন্তু আজ, যখন সেই আগন্তুক (ওয়েই ইয়াংশেং) রেশম কিনতে এলেন, তখন তাঁর সেই ভুবনভোলানো রূপ দেখে ইয়ান ফাং-এর মনে স্বাভাবিকভাবেই পুরনো কথাগুলো জেগে উঠল। ওয়েই ইয়াংশেং চলে যাওয়ার পর তিনি ভাবতে লাগলেন:
“আগের দিন প্রতিবেশী যা বলেছিল, ইনিই কি সেই ব্যক্তি? তাঁর বাইরের রূপ দেখে তো মনে হলো সত্যিই তিনি প্রথম শ্রেণির পুরুষ। কিন্তু তাঁর ভেতরের ‘মেধা’ বা ক্ষমতা কেমন, তা তো জানি না!
কিছুক্ষণ আগে তিনি এক দারুণ চতুর ও ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেছিলেন—’আজ রাতে ভেঙে বা গলিয়ে পরীক্ষা করে দেখবেন’। তিনি যদিও রৌপ্যের কথা বলছিলেন, কিন্তু এর ভেতরে যে অন্য অর্থ (মিলনের ইঙ্গিত) লুকিয়ে ছিল, তা স্পষ্ট।
যদি আজ রাতে সত্যিই তিনি আসেন, তবে আমি কী করব? তাঁকে কি প্রত্যাখ্যান করব, নাকি গ্রহণ করব? আমার সারাজীবনের মান-সম্মান, ভালো-মন্দ—সবই তো এই মুহূর্তের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। নিজের বিচার-বুদ্ধি দিয়ে ঠিক করাটাই শ্রেয়।”
তিনি যখন এসব চিন্তায় মগ্ন, তখন সেই প্রতিবেশী মহিলাটি আবার এসে হাজির হলেন এবং বললেন, “কী গো, কিছুক্ষণ আগে যে লোকটি রেশম কিনে গেল, তাকে কি তুমি চিনতে পেরেছ?”
ইয়ান ফাং বললেন, “না তো, চিনি না।”
মহিলা বললেন, “আরে, ইনিই তো সেই ব্যক্তি যার কথা আমি আগের দিন বলেছিলাম! তুমি কি বুঝতে পারছ না যে পৃথিবীতে এমন দ্বিতীয় কোনো পুরুষ নেই যে এত সুন্দর হতে পারে?”
ইয়ান ফাং বললেন, “সত্যিই সুদর্শন। তবে মনে হলো স্বভাবটা বড্ড হালকা বা চটুল—একজন ভদ্রলোকের মতো গম্ভীর নয়।”
মহিলা টিপ্পনী কেটে বললেন, “ওমা! তুমি দেখি আবার দার্শনিক হয়ে গেলে! পৃথিবীতে এমন কোন ভদ্রলোক আছে যে পরস্ত্রীকে দেখতে আসে? আমরা তো চাই কেবল একজন পুরুষ মানুষ—তাকে তো আর পাল্লায় মেপে দেখব না যে সে হালকা না ভারী!”
ইয়ান ফাং বললেন, “কথাটা ঠিক, কিন্তু মানুষের সামনে তো একটু গাম্ভীর্য বজায় রাখা উচিত। কিছুক্ষণ আগে উনি যেভাবে আমাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করলেন… ভাগ্যিস আমার কর্তা বাড়িতে ছিলেন না! থাকলে কী যে হতো!”
মহিলা কৌতূহলী হয়ে বললেন, “কীভাবে তোমাকে প্রলুব্ধ করলেন? আমাকে সব খুলে বলো তো।”
ইয়ান ফাং বললেন, “আরে ওসব ছ্যাবলামো কথা শুনে কী হবে?”
কিন্তু প্রতিবেশী মহিলাটি ছিলেন অত্যন্ত কামুক স্বভাবের। ‘প্রলুব্ধ’ শব্দটি শুনেই তাঁর শরীরে শিহরণ খেলে গেল। তিনি ভাবলেন, আগন্তুক নিশ্চয়ই ইয়ান ফাং-কে জড়িয়ে ধরেছিলেন বা চুমু খেয়েছিলেন! উত্তেজনায় তিনি ইয়ান ফাং-এর গায়ে হাত দিয়ে চাপাচাপি শুরু করলেন—বামে চাপ দেন, ডানে খোঁচা মারেন—যেন জোর করেই সব কথা বের করবেন।
ইয়ান ফাং তাঁর হাতে নাজেহাল হয়ে অবশেষে বললেন, “কিছুক্ষণ আগে তাঁরা দুজনে (ওয়েই ইয়াংশেং ও সাই কুনলুন) একসঙ্গে এসেছিলেন। আলাদা আর কী হবে? প্রলুব্ধ করা মানে হলো—কথার ফাঁকে ফাঁকে চোখ টিপে ইশারা করা আর দৃষ্টি দিয়ে আকর্ষণ করার চেষ্টা করা। এটুকুই।”
মহিলা বললেন, “তাহলে তো তোমারও উচিত ছিল একটু ভালো উদ্দেশ্য বা সাড়া দেওয়া।”
ইয়ান ফাং বললেন, “আমি যে তাঁকে গালি দিয়ে বের করে দিইনি, সেটাই তো যথেষ্ট! আর কী ভালো উদ্দেশ্য দেখাব?”
মহিলা বললেন, “এ তোমার নিষ্ঠুরতা! আমাকে দোষ দিও না ভাই, কিন্তু এমন সুন্দরী নারী আর এমন সুদর্শন পুরুষ—এ তো স্বর্গের গড়া জুটি! পৃথিবীর নিয়মে না হলেও, মনের বিচারে তোমাদের স্বামী-স্ত্রী হওয়া উচিত ছিল।”
প্রতিবেশী মহিলাটি ফুসলাতে লাগলেন, “যদি কপালের ফেরে স্বামী-স্ত্রী হওয়া সম্ভব নাও হয়, তবুও তাদের অন্তত গোপনে মিলিত হওয়া উচিত—যাতে উভয়ের অতৃপ্ত বাসনা পূর্ণ হয়। আমার স্পষ্ট কথা বোন, ওই বেরসিক কুয়ান লাওশি তোমার মতো রত্নের যোগ্যই নয়। আহা! এমন একটি সদ্যফোটা পদ্মফুল কিনা গরুর গোবরের স্তূপে পড়ে অনাদরে ঝরে যাবে—এ যে বড়ই পরিতাপের বিষয়!
শোনো, যদি সেই যুবক আবার আসে, তবে আমি নিজে এগিয়ে গিয়ে তোমার হয়ে দূতীগিরি করব। জীবনে যদি এক-দুবার এমন পুণ্যকাজ (সুপুরুষের সঙ্গ লাভ) করা যায়, তবেই নারীজন্ম সার্থক হয়, নতুবা সবই বৃথা।”
মহিলার এই অনর্গল প্ররোচনা শুনতে শুনতে ইয়ান ফাং মনে মনে এক গভীর হিসাব কষতে লাগলেন। তিনি ভাবলেন:
“এই প্রতিবেশী মহিলাটি তো দেখছি ওই যুবকের জন্য একেবারে পাগল হয়ে আছে! যেহেতু সে আমার বাড়ির ঠিক উল্টো দিকেই থাকে, তাই তাকে যদি এখন কিছু মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে না রাখি বা তার লোলুপ জিহ্বায় কিছুটা ভাগ না দিই, তবে সে হয়তো হিংসায় জ্বলে আমার সব গোপন অভিসার ভেস্তে দেবে।
তাছাড়া, ওই নবাগত যুবকের আসল রতিশক্তি বা ক্ষমতা কেমন, তা তো আমি এখনো জানি না। তার চেয়ে বরং একেই আগে সুযোগ দেওয়া যাক। একে দিয়েই যুবকটিকে পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া যাক—যেন এক প্রকার ‘মহড়া’ বা ‘অগ্নিপরীক্ষা’।
যদি দেখি যুবকের ক্ষমতা বা পৌরুষ অসামান্য, তবে আমি পরে আসরে নামব। তখন এই কুৎসিত নারী কি আর আমার রূপের কাছে টিকতে পারবে? আমার অধিকার কে কাড়বে? আর যদি দেখি সে দুর্বল বা অকেজো, তবে তাকে এক ধাক্কায় দূর করে দেব। তাতে আমার সতীত্ব বা সম্মান—কোনোটিই নষ্ট হবে না। সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না—কী চমৎকার ফন্দি!”
ইয়ান ফাং-এর মুখে সম্মতির আভাস পেয়ে প্রতিবেশী মহিলার কামাগ্নি যেন ধিকিধিকি জ্বলে উঠল, উত্তেজনায় তাঁর নাসারন্ধ্র দিয়ে যেন তপ্ত বাষ্প নির্গত হতে লাগল। তিনি আর ধৈর্য ধরতে পারছিলেন না। উল্টো তিনি ইয়ান ফাং-এর ওপর দোষ চাপিয়ে অনুযোগ করলেন, “তুমি কেন আগেই চিঠি পাঠিয়ে বা লোক মারফত তাকে আসতে বলোনি?”
তিনি জিদ ধরলেন যে, আজ রাতেই যেন সেই যুবককে ডাকার ব্যবস্থা করা হয়। আবার পরমুহূর্তেই তাঁর কুটিল মনে সন্দেহের দানা বাঁধল। তিনি ভাবলেন:
“ইয়ান ফাং হয়তো প্রথমে আবেগের বশে কথা দিয়েছিল, কিন্তু এখন হয়তো তার মত পাল্টেছে। সে হয়তো এমন সুপুরুষকে অন্য কারো হাতে তুলে দিতে নারাজ। তাই সে আমাকে বিদায় করে দিয়ে একাই সেই অমৃতসুধা পান করতে চায়।”
কিছুক্ষণ ধরে অভিযোগ করার পর, ইয়ান ফাঙ হেসে বলল: “আমি তোমাকে মজা করছিলাম। আমার মনে হচ্ছে, সে (পুরুষটি) এখন আবার আসবে, শুধু তার সাথে কাজ করার জন্য তৈরি হয়ে যাও।”
প্রথমে এক পাত্র গরম জল গরম করে সেই নারীকে নিয়ে সে তার নিম্নদেশ পরিষ্কার করল। তারপর একটা ‘বসন্তের সোফা’ (খাট) এনে বিছানার আড়াআড়ি দিকে রাখল, আর সে নিজে শুয়ে পড়ল, যাতে তারা কাজ করলে সে শুনতে পায়।
সে সেই নারীকে বড় দরজা ভালোভাবে বন্ধ করে দিতে বলল, এবং দরজার আড়ালে চুপিসারে দাঁড়াতে বলল। সে (পুরুষটি) এলে নিশ্চয়ই আলতো করে টোকা দেবে; তুমি একটা টোকা শুনলেই দরজা খুলে তাকে ভেতরে আসতে দেবে। তাকে যেন বারবার টোকা দিতে না হয়, পাছে পাশের বাড়ির লোক শুনতে পায়। তাকে ভেতরে আসার পর আবার দরজা ভালো করে ভেজিয়ে দেবে, আর দুজনে একসাথে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়বে। তবে, তার সাথে কথা বলার সময় স্বর খুব আস্তে রাখতে হবে, পাছে সে তোমাকে চিনে ফেলে।
নারীটি বশ্যতার সাথে আদেশ মেনে নিল। ইয়ান ফাঙ শুয়ে পড়ল। নারীটি তখন বড় দরজার পাশে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
এক দণ্ডেরও বেশি সময় অপেক্ষা করার পরও কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সে ঘরে ফিরে এলো, ইয়ান ফাঙকে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, এমন সময় অন্ধকারের মধ্যে কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। নারীটি ভাবল, এ নিশ্চয়ই ইয়ান ফাঙ, সে পুরুষের ভান করে তার সাথে ইয়ার্কি করছে। সে তখন তার (পুরুষটির) প্যান্টের দিকে হাত বাড়ালো। হাতটি নামতেই, বিশাল এক জিনিস তার হাতে ধাক্কা দিল, তখন সে বুঝতে পারল এ আসল মানুষটি।
সে তখন মিষ্টি কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল: “ওগো আমার প্রাণের ধন, তুমি কোথা থেকে এলে?”
উই ইয়াংশেন (পুরুষটি) বলল: “আমি ছাদ থেকে নেমে এসেছি।”
নারীটি বলল: “বাহ্, কী দারুণ ক্ষমতা! এবার বিছানায় গিয়ে শোওয়া যাক।”
দু’জন তখন নিজ নিজ জামাকাপড় খুলতে শুরু করল। উই ইয়াংশেন পুরোপুরি খোলার আগেই, নারীটি সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে চিত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। উই ইয়াংশেন তার পেটের উপর উঠে তার দুটি পা খুঁজে কাঁধের উপর তুলে নিতে চাইছিল, কিন্তু আর সে পা খুঁজে পেল না। সে কি জানত যে, বিছানায় ওঠার সময় থেকেই পা দুটি আকাশের দিকে উঁচু হয়ে তার যোনি মেলে ধরে আছে, শুধু পুরুষাঙ্গ প্রবেশের অপেক্ষায়।
উই ইয়াংশেন ভাবল, এই নারী এমন একজন কামুক, তাইলে আর সেইসব নম্রতার কৌশল কোনো কাজে লাগবে না, বরং তাকে একটা প্রথম ধাক্কা দেওয়া যাক। সে তার নিম্নদেশ উঁচু করে, যোনি থেকে এক ফুটেরও বেশি উপরে তুলে, তার পুরুষাঙ্গ সোজা নিচের দিকে এক আক্রমণ হানলো।
নারীটি যেন শুকরের মতো চিৎকার করে উঠল: “ওহ্! আর না! দয়া করে আস্তে করো।”
উই ইয়াংশেন তার দুটি হাত দিয়ে যোনিটি ভালো করে ফাঁক করে, আস্তে আস্তে আলতো করে অনেকক্ষণ ধরে ঘষতে লাগল। শুধু এক ইঞ্চি মুণ্ডটি প্রবেশ করল, বাকিটা বাইরেই রইল, ভেতরে ঢুকতে পারল না। উই ইয়াংশেন আবার তার পুরুষাঙ্গ শক্ত করে ভেতরের দিকে এক আক্রমণ হানলো।
নারীটি আবার চিৎকার করে উঠল: “আর না! দয়া করে একটু থুথু ব্যবহার করো।”
উই ইয়াংশেন বলল: “ওটা শুধু ছোট পুরুষ পতিতাদের সাথে ব্যবহার করা হয়, নারীদের সাথে কাজ করতে থুথু ব্যবহার করার কী যুক্তি আছে? এই নিয়ম ভাঙা যাবে না, শুষ্কভাবে করাই ভালো।” সে আবার তার পুরুষাঙ্গ শক্ত করে সোজা নিচের দিকে আক্রমণ হানলো।
নারীটি বলল: “আর না! যদি তুমি নিয়ম না ভাঙো, তবে বের করে নাও, আমি নিজেই কিছু ব্যবহার করছি।”
উই ইয়াংশেন শুনেই তার পুরুষাঙ্গটি বের করে নিল, যাতে সে নিজে ব্যবহার করতে পারে। নারীটি হাত প্রসারিত করে তাতে অনেক থুথু দিল, যোনিটি ফাঁক করে তার অর্ধেক ভেতরে ঢেলে দিল, বাকিটা পুরুষাঙ্গের উপর মাখালো। সে উই ইয়াংশেনকে বলল: “এবার কোনো সমস্যা নেই, ধীরে ধীরে ঢুকিয়ে দাও।”
উই ইয়াংশেন তার ক্ষমতা দেখাতে চাইল, কোনো দেরি না করে, তার দুটি হাত দিয়ে নারীটির দুটি পা ধরে, শব্দ করে তার পরিবর্তিত এবং লম্বা পুরুষাঙ্গটি একবারে ভেতরে আক্রমণ করল।
নারীটি আবার চিৎকার করে উঠল: “কী ব্যাপার, তোমরা পড়াশোনা জানা লোকেরাও এত অভদ্র? মানুষের জীবন-মৃত্যুর তোয়াক্কা না করে একবারে শেষ পর্যন্ত ঢুকিয়ে দিলে? এখন ভেতরে জায়গা হচ্ছে না, তাড়াতাড়ি কিছু বের করে নাও।”
উই ইয়াংশেন বলল: “ভেতরে জায়গা হচ্ছে না, তার মানে কি এখন বাইরে থাকবে? বরং উচিত হবে এটাকে একটু সচল রাখা, ঠাণ্ডা বসতে না দেওয়া।” এই বলে সে কাজ শুরু করল।
প্রথম কয়েকবার নারীটি সইতে পারল না, প্রতিবার ধাক্কার সময় অবশ্যই একবার “আহ্” বলে চিৎকার করত। কয়েকশো বার ধাক্কা দেওয়ার পর আর কোনো শব্দ শোনা গেল না। কয়েকশো বার পার হওয়ার পর, সেই নারী অসীম কামোত্তেজক ভঙ্গি দেখাতে শুরু করল, আর অসীম কামার্ত আওয়াজ করতে লাগল, যা মানুষকে সংযত হতে দেয় না। ফলে, সে (পুরুষটি) এক দফা জোরালো করে তুলল, দ্রুত তাকে (নারীটিকে) চরমসুখে পৌঁছাতে চাইল, যাতে সে নিজেও চরমসুখে যেতে পারে।
কিন্তু সেই নারীটি কিছুটা ধূর্ত ছিল, সে স্পষ্টতই দু’বার চরমসুখে পৌঁছেছিল, কিন্তু জিজ্ঞেস করলে শুধু বলল, “না, হয়নি।” কেন সে সত্যি কথা বলল না? কারণ সে বদলি হিসেবে এসেছিল, পাছে ইয়ান ফাঙ শুনতে পায় এবং মনে করে তার কাজ শেষ হয়ে গেছে, তাই সে এসে তাকে (নারীটিকে) দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে বলবে। উই ইয়াংশেন এটাকে সত্যি মনে করে আর চরমসুখে গেল না। একসময় আর সংবরণ করতে না পেরে, সেও একবার চরমসুখে গেল। চরমসুখে যাওয়ার পরেও কাজ থামানো উচিত নয়, তবে আগের মতো আর সাহসী হওয়ার শক্তি ছিল না।
নারীটি পুরুষাঙ্গটি ইতস্তত করতে দেখে জিজ্ঞেস করল: “তুমি কি চরমসুখে গেছ?” উই ইয়াংশেন পাছে সে তার ক্ষমতার অভাবের জন্য তাকে নিয়ে হাসে, তাই সেও বলল, “না, যাইনি।”
প্রথমে জিজ্ঞেস করার আগে, এটা একবার নরম হচ্ছিল, একবার শক্ত। কিন্তু এই প্রশ্নটি করার পর, ব্যাপারটা যেন এমন হলো যে, একজন ছাত্র ঘুমাতে যাচ্ছিল, কিন্তু শিক্ষক তাকে মারলেন, তখন তার পড়ার উৎসাহ ঘুমানোর আগের চেয়েও এক গুণ বেড়ে গেল। ফলে, সে একটানা কয়েকশো বার ধাক্কা দিতে শুরু করল, কোথাও থামল না।
নারীটি চিৎকার করে উঠল: “ওগো আমার প্রাণের ধন, আমি চরমসুখে গেছি, আমি মরে যাব! তুমি এখন নড়ো না, আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ো।” উই ইয়াংশেন তখন থামল এবং তাকে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলো।
আসলে, নারীটির মুখ দেখতে কুৎসিত হলেও তার পা দুটি ছোট ছিল; তার ত্বক কালো হলেও খুব বেশি রুক্ষ ছিল না, তাই অন্ধকারে তাকে বদলি হিসেবে চেনা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, ইয়ান ফাং বিছানার পাশেই আড়ালে লুকিয়ে কান পেতে সব শুনছিলেন। শুরুতে তিনি যখন শুনলেন যে ওই প্রতিবেশী মহিলাটি ব্যথায় চিৎকার করছেন, কষ্ট পাচ্ছেন এবং ওয়েই ইয়াংশেং-এর পৌরুষদণ্ড সহজে প্রবেশ করছে না, তখন তিনি নিশ্চিত হলেন—যন্ত্রটি বেশ বড় এবং ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত।
এরপর তিনি লক্ষ্য করলেন, লোকটির মিলনকৌশল বেশ দক্ষ এবং অভিজ্ঞ। তাঁর ধাক্কা দেওয়ার গতিতে একটা ছন্দ আছে, যা দেখে মনেই হয় না তিনি কোনো আনাড়ি। আবার তিনি দেখলেন, মাঝপথে পুরুষটি কিছুটা শিথিল বা নিস্তেজ হয়ে পড়লেন। তখন ইয়ান ফাং-এর মনে কিছুটা অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্যের উদয় হলো। কিন্তু পরমুহূর্তেই যখন দেখলেন যে তিনি আবার দ্বিগুণ তেজে জেগে উঠলেন এবং আগের চেয়েও বেশি উৎসাহ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, তখন ইয়ান ফাং মনে মনে দারুণ খুশি হলেন।
তিনি ভাবলেন: “এতে প্রমাণিত হয় যে ইনি অন্দরমহলের এক মহাবীর, কামের জগতে এক অশ্বারোহী সেনাপতি! এখন যদি আমি নিজেকে এর কাছে সমর্পণ করি, তবে আমার আর কোনো আক্ষেপ থাকবে না।”
ওয়েই ইয়াংশেং যখন ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন ইয়ান ফাং চেয়েছিলেন লেপের নিচে ঢুকে সব রহস্য ফাঁস করে দিতে। কিন্তু পরক্ষণেই থমকে গেলেন। তাঁর ভয় হলো—অন্ধকারে যদি যুবকটি তাঁর (ইয়ান ফাং-এর) মুখ না দেখে এবং ভাবে যে তিনি ওই কুৎসিত মহিলাটির মতোই দেখতে, তবে হয়তো সে তাঁকেও ভোগ করার চেষ্টা করবে।
তাছাড়া, দীর্ঘক্ষণ রতি-ক্রীড়ার পর পুরুষ সাধারণত ক্লান্ত থাকে। এখন যদি তাকে কোনো অপরূপ রূপ দেখিয়ে নতুন করে উত্তেজিত না করা যায়, তবে হয়তো সে আর সহজে জেগে উঠবে না।
তাই তিনি চুপি চুপি আলমারির কাছে গেলেন। আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করলেন, পাত্রে কিছু জল গরম করতে দিলেন এবং এক আঁটি খড় জ্বালিয়ে নিলেন। তারপর হাতে একটি জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে তিনি শোবার ঘরে প্রবেশ করলেন।
তিনি সশব্দে বিছানার পর্দা সরিয়ে দিলেন, গায়ের লেপ টান দিয়ে ফেলে দিয়ে ঝাঁঝালো স্বরে বললেন: “কে সেই লম্পট দুশ্চরিত্র? গভীর রাতে পরের বাড়িতে ঢুকে নারীর সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছ? এর মানে কী? এক্ষুনি উঠে এসে সব স্পষ্ট করে বলো!”
ওয়েই ইয়াংশেং ঘুমের ঘোর থেকে ধড়মড় করে জেগে উঠলেন। তাঁর বুক কাঁপতে লাগল। তিনি ভাবলেন, “এ নিশ্চয়ই মহিলার স্বামী! সে এতক্ষণ বাড়িতেই লুকিয়ে ছিল, ইচ্ছে করে স্ত্রীকে আমার সঙ্গে শুতে দিয়েছে যাতে পরে আমাকে হাতেনাতে ধরে ব্ল্যাকমেইল করতে পারে!” ভয়ে তাঁর দাঁতে দাঁত বাড়ি খেতে লাগল।
কিন্তু যখন তিনি মুখ তুলে তাকালেন, তখন অবাক হয়ে দেখলেন—যিনি মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন, তিনিই তো সেই সুন্দরী রমণী যাঁর সঙ্গে তিনি এতক্ষণ কল্পনায় মিলিত হচ্ছিলেন!
তিনি মনে মনে ভাবলেন, “এদের ঘরে আবার তৃতীয় কোনো ব্যক্তি এল কোত্থেকে?”
তিনি দ্রুত মাথা নামিয়ে পাশে শোয়া নারীটির দিকে তাকালেন। মোমবাতির আলোয় তিনি দেখতে পেলেন—হায়! এ যে এক অত্যন্ত বীভৎস দর্শন নারী! তার মুখ বসন্তের কালো দাগে ভরা, মাথায় খড়ের মতো রুক্ষ ছোট চুল, আর গায়ের রঙ যেন লোম না ছাড়ানো শুয়োরের চামড়ার মতো কদাকার!
তিনি শিউরে উঠে বললেন, “এ… এ কে?”
বিছানায় শোয়া নারীটি তখন বললেন, “তুমি ভয় পেয়ো না বাছা। আমি কেবল সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করেছি। আমি উল্টো দিকের বাড়িতে থাকি। মনে নেই? সেদিন তুমি যখন দরজার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলে, তখন আমিই তোমার সঙ্গে কথা বলেছিলাম।
ইয়ান ফাং বলল, তোমার চেহারা যদিও ভালো, কিন্তু তোমার ক্ষমতা বা রতিশক্তি হয়তো তেমন নয়। পাছে তার লুকিয়ে প্রেম করার বদনাম হয়, তাই সে আমাকে পাঠিয়েছিল তোমাকে পরীক্ষা করার জন্য। এখন মনে হচ্ছে তুমি পরীক্ষায় ভালোভাবেই পাস করেছ। তাই এবার তুমি তার সঙ্গে নিশ্চিন্তে শোও।
নীতিগতভাবে আমারও এপাশে শুয়ে থাকা উচিত এবং পুরস্কার হিসেবে আরও কিছু সুখ নেওয়া উচিত। কিন্তু পাশে যদি কেউ বাধা হয়ে থাকে, তবে তোমাদের দু’জনের মিলনটা ঠিক জমবে না। তার চেয়ে বরং আমি বাড়ি গিয়েই ঘুমাই।”
এই বলে তিনি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। কেবল একটি তোষকের জ্যাকেট আর একটি মোটা ট্রাউজার গায়ে চাপালেন, বাকি সব কাপড়চোপড় হাতে ঝুলিয়ে নিলেন।
যাওয়ার সময় তিনি ওয়েই ইয়াংশেং-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার চেহারা কুৎসিত হলেও, জেনো—আমি তোমার একজন যোগ্য সেবিকা। আমাদের এই সম্পর্কটি কিন্তু আমিই শুরু করিয়ে দিয়েছিলাম। আজ রাতে তোমার সঙ্গে একবার মিলন হওয়াটা একদিকে যেমন বড় বোনের (ইয়ান ফাং) সদিচ্ছা, অন্যদিকে আমাদের পূর্বজন্মের লিখন। পরে যদি কখনো সময় পাও, তবে আমার সঙ্গেও একটু শুয়ে যেও, একেবারে নির্দয় হয়ো না।”
এই বলে তিনি ইয়ান ফাং-কে কয়েকবার কৃতজ্ঞতাসূচক প্রণাম জানালেন এবং তাঁকে এই সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলেন।
ওয়েই ইয়াংশেং-এর মনে হলো তিনি যেন মাতাল অবস্থা থেকে সদ্য জেগে উঠেছেন, কিংবা কোনো দুঃস্বপ্ন থেকে বাস্তবে ফিরেছেন। তিনি ভাবলেন: “হায়! যদি না সাই কুনলুন আমাকে অস্ত্রোপচারের জন্য উৎসাহিত করতেন, তবে আজ আমার কী দশা হতো! আমি হয়তো সেই প্রাচীন কিন রাজ্যে পরীক্ষা দিতে আসা সু-চিন-এর মতো হতাম, যে মেধা থাকার পরেও অকৃতকার্য হয়ে ব্যর্থ মনোরথে ফিরে গিয়েছিল।”
ইয়ান ফাং সেই মহিলাকে বিদায় জানিয়ে দরজা বন্ধ করে ঘরে ফিরে এলেন। তিনি ওয়েই ইয়াংশেং-এর দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম রাগে বললেন: “আমি জানতাম আজ রাতে তুমি আমাকে সহজে ছাড়বে না, তাই আমি তোমার জন্য একজন ‘বদলি’ বা ‘খোরপোশ’ রেখেছিলাম। তুমি তো তার সঙ্গে একবার কাজ সেরেই ফেলেছ, তাতে আমার ঋণ কিছুটা শোধ হয়েছে। এখনো বেরোচ্ছ না কেন? এখানে কী করছ?”
ওয়েই ইয়াংশেং বললেন, “ঋণ তো মেটেইনি, বরং তোমার অপরাধ আরও বেড়েছে! আমাকে ঠকানোর শাস্তি তোমাকে পেতে হবে। এখন তো প্রায় মাঝরাত, আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি বিছানায় এসো।”
ইয়ান ফাং বললেন, “দাঁড়াও, এত অধৈর্য হয়ো না। তুমি বরং উঠে জামাকাপড় পরে একটা জরুরি কাজ সারো, তবেই একসঙ্গে শোয়া যাবে।”
ওয়েই ইয়াংশেং অবাক হয়ে বললেন, “এখন মিলন ছাড়া আর কী জরুরি কাজ থাকতে পারে?”
ইয়ান ফাং বললেন, “তোমাকে অত মাথা ঘামাতে হবে না, শুধু উঠে পড়ো।”
এই বলে তিনি আলমারির কাছে গেলেন। আগে যে জল গরম করতে দিয়েছিলেন, তা একটি চওড়া পাত্রে ঢেলে বিছানার সামনে নিয়ে এলেন। তিনি ওয়েই ইয়াংশেং-কে বললেন, “তাড়াতাড়ি ওঠো এবং শরীরটা ভালো করে ধুয়ে নাও। অন্য কারো শরীরের নোংরা আবর্জনা আমার পবিত্র শরীরে লাগিও না।”
ওয়েই ইয়াংশেং হেসে বললেন, “অকাট্য যুক্তি! সত্যিই এটা খুবই জরুরি কাজ। আমি তো শুধু শরীর দিয়েই কাজ করিনি, তার সঙ্গে চুমুও খেয়েছি। তাহলে তো আমার ভালো করে কুলি করাও উচিত!”
ওয়েই ইয়াংশেং যখন বাটি চেয়ে জল নিতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তিনি অবাক হয়ে দেখলেন—শয্যার পাশের একটি পাত্রে বাটি ভর্তি গরম জল রাখা আছে, আর তার ওপরে একটি দাঁত মাজার কাঠি বা ব্রাশ সযত্নে সাজানো।
তিনি মনে মনে ভাবলেন, “কী নিখুঁত নারী! যদি তিনি এইটুকু না করতেন, তবে আমি তাঁকে একজন অপরিচ্ছন্ন নারী ভাবতাম—যিনি শরীর বা মনের পবিত্রতার তোয়াক্কা করেন না।”
ইয়ান ফাং যখন দেখলেন যে ওয়েই ইয়াংশেং হাত-মুখ ধুয়ে ও কুলি করে পরিচ্ছন্ন হয়েছেন, তখন তিনিও নিজের নিম্নদেশ ধুয়ে নিলেন।
প্রশ্ন জাগতে পারে, একটু আগেই তো সেই কুৎসিত নারীর সঙ্গে মিলনের পর তিনি একবার ধুয়ে নিয়েছিলেন, তবে আবার কেন পরিষ্কার করতে গেলেন? এর কারণ হলো, ওয়েই ইয়াংশেং যখন ওই নারীর সঙ্গে মিলন করছিলেন, তখন ইয়ান ফাং বিছানার পাশে আড়ালে শুয়ে সব শুনছিলেন। উত্তেজনায় তাঁর নিজের শরীর থেকেও কামরস ক্ষরিত হয়েছিল। পাছে ওয়েই ইয়াংশেং তা টের পেয়ে তাঁকে উপহাস করেন, তাই তিনি সাবধানতাবশত আরেকবার ধুয়ে নিলেন।
ধোয়ার পর তিনি একটি ভেজা তোয়ালে দিয়ে গা মুছে নিলেন এবং সিন্দুক থেকে একটি সুগন্ধি রুমাল বের করে বালিশের পাশে রাখলেন। তারপর ঘরের আলো নিভিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলেন।
ওয়েই ইয়াংশেং তাঁকে আবেগে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি একাধারে তাঁকে চুম্বন করছিলেন, আর অন্য হাতে তাঁর শরীরের আবরণ উন্মোচন করছিলেন। তিনি অনুভব করলেন, ইয়ান ফাং-এর স্তনযুগল এতটাই ভরাট যে এক মুঠোয় ধরে না, অথচ ছেড়ে দিলে তা পুরো বক্ষদেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকে—কারণ তা মাখনের মতো কোমল ও নরম, ভেতরে কোনো কঠিন মাংসপিণ্ড নেই। যখন তিনি তাঁর নিম্নাঙ্গের পোশাক সরালেন এবং গোপন অঙ্গ স্পর্শ করলেন, দেখলেন তাও স্তনের মতোই মসৃণ ও কোমল।
ওয়েই ইয়াংশেং তাঁকে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। প্রথমে তাঁর ছোট দুটি পা নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। তারপর তাঁর কোমর ও নিতম্ব সামান্য উঁচু করে, ঠিক সেই কুৎসিত নারীর সঙ্গে মিলনের পদ্ধতি অনুকরণ করেই দূর থেকে আঘাত করতে শুরু করলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল—প্রথমে নারীটি যেন কিছুটা ব্যথা বা চাপ অনুভব করেন, যাতে পরবর্তী সুখ আরও গভীর হয়। কিন্তু আশ্চর্য! এত জোরে আঘাত করার পরেও ইয়ান ফাং এমন ভাব করলেন যেন তিনি কিছুই টের পাননি।
ওয়েই ইয়াংশেং মনে মনে ভাবলেন, “সাই কুনলুনের একটি কথাও মিথ্যে নয়! যদি না কুয়ান লাওশির পৌরুষদণ্ড সত্যিই মোটা ও দীর্ঘ হতো, তবে এই নারীর যোনিপথ এত প্রশস্ত ও গভীর হতো কী করে? আমি যদি অস্ত্রোপচার না করাতাম, তবে আমার সেই ক্ষুদ্র অঙ্গটি বিশাল শস্যভাণ্ডারে পড়ে থাকা একটি শস্যদানার মতো হারিয়ে যেত—এর গভীরতা মাপা তো দূরের কথা! এখন যদিও আমার ‘অস্ত্র’ যথেষ্ট দীর্ঘ নয়, কিন্তু কৌশলী ‘সামরিক বিন্যাস’ বা রতি-কৌশল দিয়ে সেই অভাব পূরণ করতে হবে।”
এই ভেবে তিনি মাথার নিচ থেকে বালিশটি টেনে নিয়ে ইয়ান ফাং-এর কোমরের নিচে স্থাপন করলেন। তারপর একজন দক্ষ সেনাপতির মতো রণকৌশল সাজিয়ে নতুন উদ্যমে আক্রমণ শুরু করলেন।
ইয়ান ফাং তখনও চরম সুখে পৌঁছাননি। কিন্তু তিনি লক্ষ্য করলেন, ওয়েই ইয়াংশেং মাথার নিচ থেকে বালিশ সরিয়ে কোমরের নিচে দিলেন, অথচ মাথার নিচে অন্য কিছু দিলেন না। এতেই তিনি বুঝলেন—এই লোকটি কোনো সাধারণ প্রেমিক নন, ইনি একজন ঝানু ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়।
মিলনের সময় কোমরের নিচে বালিশ দেওয়া একটি সাধারণ কৌশল, এতেই বা তাঁকে এতটা অভিজ্ঞ বলা হবে কেন?
জানতে হবে যে, নারী-পুরুষের রতি-ক্রীড়া আর যুদ্ধক্ষেত্রের নীতি হুবহু এক। যে সেনাপতি পরিস্থিতি বুঝে কৌশল বদলাতে পারেন, তিনিই যুদ্ধে জয়ী হন। পুরুষ যখন নারীর গভীরতা বুঝতে পারে, তখনই সে জানে কখন এগোতে হবে আর কখন পিছু হটতে হবে। নারী যখন পুরুষের দৈর্ঘ্য বুঝতে পারে, তখনই সে জানে কীভাবে তাকে গ্রহণ করতে হবে। একেই বলে—”নিজেকে জানো, শত্রুকে জানো, তবেই শত যুদ্ধে জয়ী হবে।”
পুরুষের লিঙ্গের দৈর্ঘ্য যেমন ভিন্ন হয়, নারীর যোনিপথের গভীরতাও তেমনই ভিন্ন হয়। যার যোনিপথ অগভীর, তার জন্য খুব দীর্ঘ লিঙ্গ কোনো কাজে আসে না। তখন ধাক্কা দেওয়ার সময় অতিরিক্ত অংশ বাইরে রাখতে হয়। যদি জোর করে পুরোটা ভেতরে ঢোকানো হয়, তবে নারীটি সুখের বদলে কেবল যন্ত্রণাই পাবে। আর সঙ্গী যদি কষ্ট পায়, তবে পুরুষ কি একা আনন্দ পেতে পারে?
অন্যদিকে, যার যোনিপথ গভীর, তার জন্য দীর্ঘ লিঙ্গ প্রয়োজন; সামান্য ছোট হলেও সেখানে পূর্ণ তৃপ্তি মেলে না। কিন্তু পুরুষের লিঙ্গের দৈর্ঘ্য তো আর ইচ্ছে করলেই বাড়ানো যায় না (যদি না অস্ত্রোপচার করা হয়)। এই পরিস্থিতিতে সহায়ক পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়। তখন কোমর ও নিতম্বের নিচে বালিশ বা উঁচু কিছু রাখলে যোনিপথ ওপরে উঠে আসে এবং লিঙ্গের নাগাল পায়। ফলে ধাক্কা দেওয়ার সময় সহজেই গভীরে পৌঁছানো যায়।
সুতরাং, কোমরের নিচে বালিশ দেওয়ার এই কৌশলটি কেবল তখনই কার্যকর যখন পুরুষের লিঙ্গ ছোট অথচ নারীর যোনিপথ গভীর। বালিশ যে মিলনের জন্য অপরিহার্য, তা কিন্তু নয়। ওয়েই ইয়াংশেং-এর লিঙ্গ মোটা হলেও লম্বায় খুব বেশি বাড়েনি (জাদুকর কেবল মোটাই করতে পেরেছিলেন, লম্বা নয়)—তাই ইয়ান ফাং-এর গভীরতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে তিনি এই কৌশল নিলেন।
কিন্তু ওয়েই ইয়াংশেং-এর অভিজ্ঞতার প্রমাণ মিলল অন্য এক জায়গায়। তিনি কোমরের নিচে বালিশ দিলেন ঠিকই, কিন্তু মাথার নিচ থেকে বালিশটি সরিয়ে নিলেন।
সাধারণ মানুষ এই সূক্ষ্ম বিষয়টি বোঝে না। যদি নারীর কোমরের নিচে বালিশ থাকে এবং মাথার নিচেও বালিশ থাকে, তবে তাঁর শরীর ধনুকের মতো বেঁকে যায়—দুই প্রান্ত উঁচু আর মাঝখানটা নিচু। এর ওপর যখন পুরুষ ভার চাপায়, তখন নারীর দমবন্ধ হয়ে আসে এবং কষ্ট হয়।
তাছাড়া, মাথার নিচে বালিশ থাকলে নারীর মুখ ও চিবুক বুকের দিকে ঝুঁকে থাকে। ফলে পুরুষের পক্ষে তাকে চুম্বন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। পুরুষকে চুমু খেতে হলে অনেক নিচে ঝুঁকতে হয়, আর নারীকেও ঘাড় উঁচু করতে হয়—এতে অহেতুক শক্তি ক্ষয় হয় এবং আনন্দের ব্যাঘাত ঘটে।
তাই যাঁরা রতিশাস্ত্রে পারদর্শী, তাঁরা জানেন—কোমরের নিচে বালিশ থাকুক বা না থাকুক, ঘাড়ের নিচ থেকে বালিশ অবশ্যই সরিয়ে দেওয়া উচিত। এতে নারীর রেশমি চুল বিছানায় ছড়িয়ে পড়ে, তাঁর রক্তিম ওষ্ঠাধর আকাশের দিকে উন্মুক্ত থাকে এবং তাঁর শরীর পুরুষের সঙ্গে সমান্তরালভাবে মিশে যেতে পারে।
এতে কেবল নিচের ‘ছিদ্র’ (যোনি) নয়, উপরের ‘ছিদ্র’ (মুখ)-ও সমানভাবে সক্রিয় থাকে। পুরুষের ‘জেড দণ্ড’ বা লিঙ্গ যেমন নারীর যোনিতে প্রবেশ করে, তেমনই নারীর চঞ্চল জিহ্বা পুরুষের মুখে প্রবেশ করে। এতে উভয়েরই সুবিধা হয়—আনন্দ সমানভাবে ভাগ হয়ে যায় এবং কোনো কিছুই অপূর্ণ থাকে না।
ওয়েই ইয়াংশেং এক হাতে বালিশটি সরিয়ে অন্য হাতে ইয়ান ফাং-এর ঘাড় আলতো করে ধরে বিছানায় শুইয়ে দিলেন, যাতে তাঁর মুখ সোজা থাকে এবং চুম্বনের জন্য প্রস্তুত থাকে।
ইয়ান ফাং মনে মনে দারুণ খুশি হলেন। তিনি বুঝলেন, ইনি সত্যিই এক ওস্তাদ প্রেমিক।
বালিশ সরানোর পর, ওয়েই ইয়াংশেং আবার ইয়ান ফাং-এর ছোট পা দুটি নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। দুই হাত দিয়ে বিছানায় ভর দিয়ে তিনি পূর্ণ শক্তিতে ধাক্কা দিতে শুরু করলেন। প্রতিটি ধাক্কায় লিঙ্গটি অর্ধেক বেরিয়ে আসছিল, আবার প্রতিটি প্রবেশে তা শেষ পর্যন্ত আঘাত করছিল।
তবে একটা বিষয় লক্ষণীয়—ধাক্কা দেওয়ার গতি ছিল দ্রুত, কিন্তু প্রবেশের গতি ছিল ধীর। এর কারণ কী? তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে দ্রুত প্রবেশ করালে যোনিপথে চপচপ শব্দ হবে, যা শুনে প্রতিবেশীরা সন্দেহ করতে পারে। তাই তিনি নিজেকে সংযত রেখেছিলেন।
কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর, যোনিপথ ধীরে ধীরে সংকুচিত ও আঁটসাঁট হয়ে এল—প্রথমদিকের মতো আর শিথিল রইল না। ওয়েই ইয়াংশেং বুঝতে পারলেন যে কুকুরের কিডনি বা জাদুকরী প্রভাব কাজ করতে শুরু করেছে এবং তাঁর লিঙ্গ স্ফীত হয়ে উঠেছে। এতে তিনি শতগুণ শক্তি অনুভব করলেন এবং তাঁর ঘর্ষণের গতি আরও তীব্র হয়ে উঠল।
ইয়ান ফাং শুরুতে নীরব ছিলেন। কিন্তু এই পর্যায়ে তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। শরীর মোচড় দিয়ে তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “ওগো প্রিয়তম! কী দারুণ লাগছে!”
ওয়েই ইয়াংশেং ফিসফিস করে বললেন, “প্রিয়তমা, সবে তো শুরু! এখনই এত ভালো লাগলে চলবে? আমাকে শেষ পর্যন্ত করতে দাও, দেখো কেমন লাগে। তবে একটা সমস্যা—আমি মিলনের সময় নীরবতা পছন্দ করি না। ভেতরে শব্দ না হলে আমার উত্তেজনা আসে না। কিন্তু তোমার এই ঘরটি ছোট, প্রতিবেশীরা শুনতে পেলে কেলেঙ্কারি হবে। তাই আমি মন খুলে করতে পারছি না। এখন কী করি?”
ইয়ান ফাং অভয় দিয়ে বললেন, “কোনো চিন্তা নেই। এপাশে তো খালি জায়গা, আর অন্যপাশে প্রতিবেশীর রান্নাঘর—রাতে ওখানে কেউ থাকে না। তুমি নিশ্চিন্তে যা খুশি করতে পারো।”
ওয়েই ইয়াংশেং খুশি হয়ে বললেন, “তবে আর পায় কে!”
এরপর তাঁর কাজের ভঙ্গি আগের চেয়ে উল্টে গেল—ধাক্কা ধীর, কিন্তু প্রবেশ দ্রুত ও সজোরে। প্রবেশের সময় তিনি এমন শব্দ করতে লাগলেন যেন কোনো ভিক্ষুক ইটের ওপর বাটি ঠুকে শব্দ করছে—ইচ্ছে করেই মানুষকে শোনাচ্ছে যাতে তারা দয়া করে!
এক দফা উদ্দাম মিলনের পর ইয়ান ফাং-এর কামভাব প্রবল হয়ে উঠল। তিনি “ওগো, জান, সোনা” বলে প্রলাপ বকতে লাগলেন এবং তাঁর যোনি থেকে কামরস উপচে পড়তে লাগল। ওয়েই ইয়াংশেং দেখলেন যে অবস্থা বেশ ভেজাভেজি হয়ে গেছে, তাই তিনি মুছে আবার নতুন করে শুরু করতে চাইলেন এবং রুমাল নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালেন।
কিন্তু রুমাল হাতে পাওয়ার আগেই ইয়ান ফাং ছোঁ মেরে সেটা কেড়ে নিলেন, মুছতে দিলেন না। এর কারণ কী?
আসলে, ইয়ান ফাং-এর স্বভাবও ছিল ওয়েই ইয়াংশেং-এর মতোই—তিনিও নীরব ও শুষ্ক মিলন পছন্দ করতেন না। মিলনের সময় যত বেশি কামরস ক্ষরিত হতো, ঘর্ষণের শব্দ তত বেশি চটুল ও উত্তেজনাপূর্ণ হতো। তাই তিনি চাইতেন তাঁর শরীর সেই রসে ভিজে থাকুক, এমনকি তিনি তাঁর স্বামীকেও মাঝপথে মুছতে দিতেন না। কাজ শেষ হওয়ার পরেই কেবল তিনি উঠে নিজেকে পরিষ্কার করতেন। এটি ছিল তাঁর এক বিশেষ বিলাসিতা।
ওয়েই ইয়াংশেং যখন দেখলেন যে সঙ্গিনী মুছতে নারাজ, তখন তিনি এর কারণটি অনুমান করতে পারলেন এবং দ্বিগুণ উৎসাহে শব্দ করে মিলন চালিয়ে গেলেন।
আরও এক দফা ঝোড়ো মিলনের পর ইয়ান ফাং তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করে উঠলেন, “ওগো, আমি আর পারছি না! আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি! তুমি এবার আমার সঙ্গে ‘হারিয়ে যাও’ (স্খলন করো)!”
ওয়েই ইয়াংশেং নিজের অসীম ক্ষমতা দেখাতে চাইলেন, তাই তিনি এখনই শেষ করতে রাজি ছিলেন না।
ইয়ান ফাং অনুনয় করে বললেন, “আমি তোমার ক্ষমতা বুঝেছি, এ কোনো সাধারণ শক্তি নয়। কিন্তু এখন যদি তুমি না থামো… সারারাত ধরে তুমি ধকল সয়েছ, দুজন নারীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছ—এটা তোমার জন্যও কঠিন। পরের রাতের জন্য কিছু শক্তি জমা রাখো। আমাকে একেবারে নিঃশেষ করে দিও না, যাতে আমি আর উপভোগ করতে না পারি।”
ওয়েই ইয়াংশেং দেখলেন যে কথাগুলো যুক্তিযুক্ত এবং হৃদয়স্পর্শী। তাই তিনি ইয়ান ফাং-কে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে শেষবারের মতো সজোরে ধাক্কা দিলেন। তারপর দুজনে একসঙ্গে চরম সুখের সাগরে তলিয়ে গেলেন।
কাজ শেষ হওয়ার পর, দু-চারটে কথা বলতে না বলতেই ভোরের আলো ফুটে উঠল। ইয়ান ফাং ভয় পেলেন যে দেরি করে বের হলে পাছে কেউ দেখে ফেলে। তাই তিনি ওয়েই ইয়াংশেং-কে উঠতে বাধ্য করলেন এবং নিজেও কাপড় পরে তাঁকে বিদায় জানাতে গেলেন।
এরপর থেকে ওয়েই ইয়াংশেং সকাল-সন্ধ্যা যখন খুশি দরজা দিয়েই আসা-যাওয়া করতে লাগলেন—আর ছাদের ওপর দিয়ে চোরের মতো ঢোকার প্রয়োজন হলো না। একে অপরের প্রতি আসক্তি এতই বেড়ে গেল যে, ওয়েই ইয়াংশেং অনেক সময় দিনের বেলাতেও ইয়ান ফাং-এর বাড়িতে লুকিয়ে থাকতেন। ইয়ান ফাং অসুস্থতার ভান করে দরজা বন্ধ রাখতেন, বাইরে বের হতেন না। দিনের আলোয় তাঁরা সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে একে অপরের শুভ্র তনু দেখতেন এবং অবাধে কামলীলায় মত্ত হতেন।
সেই কুৎসিত প্রতিবেশী মহিলাটিও এক-দু রাত পর পর এসে হাজির হতেন। ওয়েই ইয়াংশেং তাঁকে ফেরাতে পারতেন না, তাই মাঝে মাঝে তাঁকেও কিছুটা তুষ্ট করতেন—পুরোপুরি না হলেও অন্তত তাঁর মুখ বন্ধ রাখার মতো ব্যবস্থা করতেন।
আশেপাশের প্রতিবেশীরা মাঝে মাঝে সন্দেহজনক শব্দ পেত ঠিকই। কিন্তু তারা ভাবত যে কুখ্যাত দস্যু সাই কুনলুন বুঝি নিজেই এসে ওই বিধবা বা একলা নারীর ওপর অত্যাচার করছে। তারা ঘুণাক্ষরেও ভাবত না যে সাই কুনলুন আসলে অন্যের (ওয়েই ইয়াংশেং-এর) হয়ে কাজ করছেন। তাই সন্ধ্যা হতে না হতেই ভয়ে সবাই যার যার দরজা বন্ধ করে দিত, পাছে সাই কুনলুন বিরক্ত হয়ে তাদের ক্ষতি করে।
ফলে টানা দশ-বারো রাত ধরে তাঁরা নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে রাত কাটাতে পারলেন। কুয়ান লাওশি ফিরে আসার আগ পর্যন্ত তাঁদের এই সুখের আসরে কেউ বাধা দিল না।
সাই কুনলুন আশঙ্কা করছিলেন যে ওয়েই ইয়াংশেং বয়সে তরুণ এবং স্বভাবত চঞ্চলমতি; পাছে তিনি আবেগের বশে কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলেন। তাই তিনি ওয়েই ইয়াংশেং-কে দিনের বেলাতেও প্রেমিকার দরজায় উঁকিঝুঁকি মারতে কড়াভাবে নিষেধ করে দিয়েছিলেন।
এর পরিবর্তে তিনি নিজেই দূতের ভূমিকা পালন করতেন। সারাদিন সুতা কেনার ছলে তিনি দুজনের মধ্যে গোপন সংবাদ আদান-প্রদান করতেন। কুয়ান লাওশি নিজেও কয়েকবার বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন। তখন সাই কুনলুন কেবল বলতেন যে তিনি ব্যবসার পুরনো খদ্দের এবং গিন্নির সঙ্গে লেনদেনে অভ্যস্ত।
কুয়ান লাওশি এতটাই সরল ছিলেন যে, তিনি একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং তাঁদের কথা বলতে দিতেন। তিনি স্ত্রীকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতেন এবং ঘুণাক্ষরেও সন্দেহের অবকাশ রাখতেন না। এই অটুট সরলতার কারণেই তাঁকে ‘কুয়ান লাওশি’ বা ‘সৎ কুয়ান’ বলা হতো।
এতেই প্রমাণিত হয় যে, লোকমুখে প্রচলিত উপনাম বা খেতাবগুলো এক বিন্দুও মিথ্যে হয় না—যা মানুষ নিজের জন্য বেছে নেওয়া কেতাদুরস্ত ছদ্মনামের চেয়ে অনেক বেশি সত্য। পৃথিবীতে বন্ধু নির্বাচনের সময় তার চরিত্র বা কাজকর্ম দিনের পর দিন পর্যবেক্ষণ করার প্রয়োজন নেই। কেবল জিজ্ঞাসা করুন লোকটির আড়ালের নাম বা উপাধিটি কী; তবেই আপনি বুঝতে পারবেন তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করা উচিত কি না।
সমালোচকের মন্তব্য:
হাজার বছরের যে গোপন রহস্য সহস্র স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করেও জানা সম্ভব ছিল না, তা আজ সাধারণ মানুষের কাছে উন্মোচিত হয়ে গেল। আহা! এ বড়ই পরিতাপের বিষয়!

Leave a Reply