অনুবাদ গল্প, বড় গল্প

আপেল ও কমলা – এস্তেবান বেক্কা

১.

প্রথম যেদিন তাকে দেখলাম, ঘটনাচক্রে আমরা দুজনেই তখন ফলের দোকানে রাখা একই কমলার দিকে হাত বাড়িয়েছিলাম। বাইরে থেকে দেখতে অতিশয় লোভনীয়, অথচ খোসা ছাড়ালে ভেতরে শুকিয়ে যাওয়া, আঁশালো কমলার মতো বিরক্তিকর আর কিছুই আমার কাছে নেই। তাই আমি খুব বেছে বেছে ফল কিনছিলাম।

হঠাৎ আমাদের চোখাচোখি হলো। তার তামাটে, রুক্ষ ও পৌরুষদীপ্ত মুখাবয়বের মাঝে চোখ দুটো যেন জ্বলজ্বল করছিল। সেই নীল চোখে এমন এক গভীরতা ছিল যে, মনে হলো আমি অনায়াসেই সেই অতল গহ্বরে ডুবে যেতে পারি। মুহূর্তেই সংবিৎ ফিরে পেলাম, বুঝতে পারলাম আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছি। তড়িঘড়ি করে দৃষ্টি নামিয়ে নিলাম।

সে ধীর স্বরে বলল, “আমি দুঃখিত, আপনিই আগে নিন।”

কথাগুলো ছিল একেবারেই সাধারণ ভদ্রতার খাতিরে বলা। অথচ আমার মনে হলো, সে যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভাষায় কথা বলছে—যেন সে নিঃশব্দে আদেশ করছে, ‘তোমার সব আবরণ খসিয়ে ফেলো। আমি তোমাকে নিবিড়ভাবে উপভোগ করতে চাই।’

আমি একটার পর একটা কমলা বেছে যখন আধা ডজন পূর্ণ করলাম, তখন লজ্জায় আর এক অদ্ভুত অস্বস্তিতে আমার কান-গলা গরম হয়ে উঠল। পুরোটা সময় আমি তার দৃষ্টির উত্তাপ নিজের ওপর অনুভব করছিলাম, কিন্তু সাহস সঞ্চয় করে দ্বিতীয়বার চোখ তুলে তাকাতে পারলাম না। কমলাগুলো ঝুড়িতে রেখে আমি দ্রুত অন্য সারির দিকে পা বাড়ালাম। ফলের দোকানটা পার হওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম, তারপর চট করে একবার পেছন ফিরে তাকালাম। কিন্তু সে ততক্ষণে চলে গেছে।

বাজারের বাকি ফর্দ মেলানোর সময় আমি বড্ড অমনোযোগী হয়ে পড়লাম। এক সারি থেকে অন্য সারিতে যাওয়ার সময় আমার চোখ কেবল তাকেই খুঁজছিল। এমনকি কাউন্টারে চেকআউটের লাইনে দাঁড়িয়েও আমি চারপাশটা ভালো করে দেখে নিলাম। যদি সেই এক মিনিটের ক্ষণস্থায়ী সংযোগটুকু এতটা জীবন্ত না হতো, তবে হয়তো ভাবতাম পুরোটাই আমার মনের ভুল।

বাড়ি ফেরার পথে, তার বলা সেই সামান্য কটি শব্দ আমার মনের মধ্যে অনুরণন তুলতে লাগল। তার কথায় কোনো বিশেষ আঞ্চলিকতা বা জড়তা ছিল না। শব্দগুলো ছিল নিতান্তই নির্দোষ। কিন্তু তার কণ্ঠস্বর ছিল এক কথায় অসাধারণ—এক অনন্য গভীরতা ছিল তাতে। তবুও ভাবছি, কীভাবে সামান্য একটি ক্ষমাপ্রার্থনার আড়ালে সে এমন তীব্র কামনার ইঙ্গিত মিশিয়ে দিল? আমি মাথা ঝাঁকিয়ে সেই ঘোর কাটানোর চেষ্টা করলাম; প্রেমে পড়া কিশোরীর মতো আচরণের জন্য নিজেকেই মনে মনে ভর্ৎসনা করলাম।

বাজার নিয়ে গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে হাত ফসকে চাবিটা পড়ে গেল, আর তা তুলতে গিয়ে ডিমগুলো প্রায় ফেলেই দিয়েছিলাম। সে তখনও আমার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে বিচরণ করছিল। তাকে নিয়ে এই চিন্তাই যেন আমাকে আজ বড় বেশি অদক্ষ করে তুলছে।

ঘরে ঢুকে দেখলাম অ্যানসারিং মেশিনে বেশ কটি বার্তা জমা হয়েছে। রান্নাঘরে সদাইপাতি গোছাতে গোছাতে আমি বার্তাগুলো শুনতে লাগলাম।

“মিয়ারা, মিয়ারা, মিয়ারা! ধরো প্লিজ! আমি জেনি… ঠিক আছে। মনে হচ্ছে তুমি নেই। শোনো, আমাকে একটা ফোন করো এবং কথা দাও যে তুমি শুক্রবার রাতে পিছিয়ে যাচ্ছো না। বিশ্বাস করো, বিলের বন্ধুটি কিন্তু বেশ সুপুরুষ এবং আকর্ষণীয়। তোমার আরেকটু বেশি বাইরে বের হওয়া উচিত। পরে কথা হবে, বান্ধবী।” বিপ।

“মিয়ারা, আমি টম জেনকিন্স। কাল ক্লাস শেষ হওয়ার পর শিক্ষক সভা আছে। ডিন ছাত্র মূল্যায়নের বিষয়ে স্বভাবসুলভ একগাদা আবোলতাবোল বকবেন, কিন্তু আমি তোমাকে এটা থেকে বাঁচাতে পারব না। কাল দেখা হবে,” বিপ।

“মিস মিয়ারা মার্টিন? আশা করি নামটা সঠিক উচ্চারণ করছি। সান কোস্ট কনডোস থেকে একটি সৌজন্যমূলক কল করছি, আপনাকে জানাতে চাই যে আপনি জিতেছেন…”

আমি বিরক্ত হয়ে মেশিনটা বন্ধ করে দিলাম। মাঝে মাঝে ভাবি, এমন কোনো প্রাণঘাতী ভাইরাস কেন কেউ তৈরি করে না যা শুধুমাত্র এই টেলি-মার্কেটারদেরই আক্রমণ করবে?

আজকের ক্লাসগুলো অন্যদিনের চেয়েও বেশি ক্লান্তিকর ছিল। আশা করলাম, দীর্ঘ সময় উষ্ণ স্নান করলে হয়তো আমার ঘাড়ের এই আড়ষ্টতা দূর হবে। বাথরুমে ঢুকে বাথটাব পূর্ণ করতে শুরু করলাম। মনে হলো জলে কিছু ফেনা বা বুদবুদ থাকলে মনটা হয়তো একটু ভালো হবে। তাই বড়দিনের উপহার হিসেবে পাওয়া পিচ ফলের গন্ধযুক্ত সলিউশনটা বেশ খানিকটা ঢেলে দিলাম।

আমি ইডিথ পিয়াফের একটি সিডি চালিয়ে বাথরুম পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য ভলিউমটা বেশ বাড়িয়ে দিলাম। নিজেকে বহুবার কথা দিয়েছি যে, ফরাসি ভাষায় ‘মেসি বোকু’ (ধন্যবাদ)-এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে শিখব, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। অবশ্য তাতে কিছু যায় আসে না; গানের অর্থ না বুঝলেও তার কণ্ঠের মাদকতা আমি উপভোগ করি।

পোশাক খুলতে খুলতে জেনির ঠিক করা শুক্রবারের সেই ডাবল ডেটের কথা ভাবছিলাম। তার শেষ প্রচেষ্টাটি ছিল চরম ব্যর্থ। লোকটিকে দেখতে-শুনতে ভদ্রস্থই মনে হয়েছিল, পোশাক-আশাকেও বেশ রুচিশীল। প্রথম দেখায় ভেবেছিলাম সন্ধ্যাটা হয়তো মন্দ কাটবে না। কিন্তু আমাদের মাঝে কোনো রসায়নই ছিল না। অবশেষে সে যখন আমাকে নাচের প্রস্তাব দিল, তখন আমি কেবল সংগীত শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছিলাম। সে আমার কোমরে হাত রেখে কিছু বলার জন্য ঝুঁকে এল। ঈশ্বর! তার নিঃশ্বাসে ছিল বিকট দুর্গন্ধ। বেচারার দাঁতের মাড়িতে হয়তো কোনো সংক্রমণ ছিল। যাই হোক, ওখানেই আমার সমস্ত আগ্রহের ইতি ঘটল। শুক্রবার বিলের এই নতুন বন্ধুর সাথে আবার ভাগ্য পরীক্ষা করতে যাব কি না, তা আমাকে শীঘ্রই ঠিক করতে হবে।

বাথরুমে ঢুকে দুটো লাইলাক গন্ধযুক্ত মোমবাতি জ্বালালাম এবং বৈদ্যুতিক আলো নিভিয়ে দিলাম। খোঁপার কাঁটাগুলো একে একে খুলে ফেলতেই একরাশ চুল পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। মাথাটা নিচু করে ঝাঁকাতেই চুলের স্পর্শ মেঝে ছুঁয়ে গেল। আমি সেগুলো আবার কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে ফেলে দিলাম।

সম্পূর্ণ অনাবৃত অবস্থায়, আমি ভ্যানিটির পেছনের আয়নায় নিজেকে দেখলাম। মোমবাতির কম্পমান আলোয় আমার প্রতিবিম্ব বেশ মোহময়ী লাগছিল। আয়নার ওপাশের রমণীটি বেশ আকর্ষণীয়, এমনকি সুন্দরীও বলা চলে। সে তো আমিই। তাহলে কেন আমি নিজের ভেতর সেই সৌন্দর্য অনুভব করতে পারছি না?

আমি জলের কল বন্ধ করে একরাশ সুগন্ধি ফেনার মাঝে নিজেকে সমর্পণ করলাম। জলটা বেশ গরম ছিল, জোর করেই নিজেকে সেই উষ্ণতার গভীরে নামাতে হলো। আমি সবসময় অতিরিক্ত গরম জল পছন্দ করি, যদিও প্রথমে তা কিছুটা কষ্টদায়ক মনে হয়। কিন্তু সেই তীব্র দহনের জ্বালা কমে আসার সাথে সাথেই তা এক অনাবিল আনন্দে রূপান্তরিত হয়। মনে হয়, একটি অনুভূতির তীব্রতাই যেন অন্যটির গভীরতা পরিমাপ করে দেয়।

আমি বাথটাবের কিনারে মাথা এলিয়ে দিয়ে আঁখি মুদলাম, নিজেকে সমর্পণ করলাম ইডিথ পিয়াফের মদির কণ্ঠস্বরে। ফরাসি ভাষার একটি বর্ণও আমার বোধগম্য ছিল না, তবুও সেই সুরের মূর্ছনায় কী এক তীব্র কামনার মাদকতা মিশে ছিল! আমি অনুভব করলাম, তিনি প্রেম, আনন্দ এবং অবশ্যই—বেদনার গান গাইছেন। সেই সুরে ছিল এক আকুল আকাঙ্ক্ষার আর্তনাদ। কিসের এই আকাঙ্ক্ষা? কোনো এক চরম প্রেমিকের জন্য? নাকি শুধুই শরীরী মিলন? হ্যাঁ, সেই সুরে নিঃসন্দেহে এক আদিম কামনার আহ্বান ছিল।

চোখ মেলতেই স্মৃতির দুয়ার খুলে গেল। সেই অচেনা পথিকের কণ্ঠস্বর, তার উচ্চারিত সেই চারটি শব্দ যেন ফরাসি গানের সুরকে ছাপিয়ে আমার কর্ণকুহরে বেজে উঠল। তখনই আমি নিশ্চিত হলাম, আমি ভুল বুঝিনি। সে আসলে আমাকে কী বোঝাতে চেয়েছিল, তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। না, ওটা আমার কল্পনাপ্রসূত ছিল না। সেই সুপুরুষ শয়তানটি ছদ্মবেশী ভদ্রতার আড়ালে মাত্র চারটি শব্দে আমাকে স্পর্শ করেছিল, আমার ভেতর জাগিয়ে তুলেছিল এক সুপ্ত অগ্নিশিখা।

প্রথমে এই অনুভূতি শনাক্ত করা কিছুটা বিভ্রান্তিকর ছিল। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার পরেও আমার মনের ভাব ছিল মিশ্র। প্রথম প্রবৃত্তি ছিল ক্রোধের, একজন অচেনা পুরুষের এমন ধৃষ্টতায় ক্ষুব্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাকে স্বীকার করতেই হলো, এই আকস্মিক মুখোমুখি হওয়ার ঘটনায় আমি এক গোপন, নিষিদ্ধ রোমাঞ্চ অনুভব করছিলাম।

আমি পুনরায় চোখ বন্ধ করলাম। মানসপটে ভেসে উঠল তার তামাটে মুখাবয়ব আর সেই নীল চোখের গভীর চাউনি। মনে হলো, তার সেই দৃষ্টি যেন আমাকে এখনো বন্দি করে রেখেছে। এই কল্পনামাত্রই আমার বক্ষচূড়া কঠিন হয়ে উঠল, এক তীব্র তাড়নায় হাত দুটি সেদিকে ধাবিত হলো। আমি এই লাগামহীন চিন্তাকে থামানোর জন্য নিজের অঙ্গে নখ বসালাম, কিন্তু তাতে সেই সুখের অনুভূতি যেন আরও গাঢ় হলো।

আমি হাঁটু দুটো তুলে ধরলাম, দু’পা শক্ত করে চেপে রাখলাম। নিজের অজান্তেই একটি হাত আমার উদর বেয়ে নিচে নেমে গেল। তিমিরঘেরা সাগরের এক নীরব জলচরের ন্যায় আমার হাতটি উরুর কঠিন চাপ ভেদ করে নিজের পথ করে নিল। আমার আঙুলগুলো এক চরম সুখের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমাকে প্রলুব্ধ করল, আর অবশ হয়ে আমার দু’পা সেই সুখের কাছে আত্মসমর্পণ করে খুলে গেল।

আমার যোনি তখন কামনায় কম্পমান। শরীরের এই আদিম দাবির কাছে আমি ছিলাম বড়ই অসহায়। আমার অন্য হাতটি তখন বক্ষযুগল ছেড়ে নিচের এই প্রবল তৃষ্ণার সঙ্গ দিতে এগিয়ে গেল। আমি নিজেকে ঘর্ষণ করতে শুরু করলাম, আর তখনই যেন সেই অভিশপ্ত কণ্ঠস্বর আবারও শুনতে পেলাম—

“দুঃখিত,” সে বলেছিল, “আপনি আগে নিন।”

কিন্তু এখন আমার কানে বাজল অন্য কথা, “এসো, আমার জন্য এসো। তুমি জানো, তুমি এটাই চাও।”

আমি দু’পা নামিয়ে শরীরটাকে ধনুকের মতো বাঁকিয়ে ধরলাম। দুটি আঙুল যতদূর সম্ভব গভীরে প্রবেশ করিয়ে আড়াআড়িভাবে স্থাপন করলাম, আর অন্য হাতটি উন্মাদের মতো আমার যোনিশলাকা মন্থন করতে লাগল। চারপাশের জলের আলোড়নে মনে হলো আমি যেন এক উত্তাল তরঙ্গের শিখরে আরোহণ করছি। কামুকতার এক চূড়ান্ত মুহূর্তে পৌঁছে আমি সেই নির্জন গৃহকোণে সুখের আর্তনাদ করে উঠলাম। ভূকম্পনের পরবর্তী মৃদু কম্পনের ন্যায় ছোট ছোট শিহরন আমার সারা শরীরে বয়ে গেল, আমি থরথর করে কাঁপতে লাগলাম।

২.

তাকে দেখবার পূর্বে আমার কেবল একটি আপেলেরই তৃষ্ণা ছিল। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে, প্রাত্যহিক জটলার মধ্য দিয়ে যখন আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম, তখনই এই তীব্র আকাঙ্ক্ষাটি আমাকে গ্রাস করল। গাড়িতে জ্যাজ মিউজিকের সিডি বাজছিল, আর আমি কিছু আনাড়ি চালককে আমার ধারেকাছে ঘেঁষতে দিচ্ছিলাম না। আমার নাইন-ইলেভেন পর্শে গাড়ির শক্তিশালী ইঞ্জিন আর গিয়ারগুলো যেন আমার চেয়েও বেশি অধৈর্য হয়ে উঠেছিল। ট্র্যাফিকের ধীর গতিতে আটকে থাকা একটি রেসিং কারের গর্জন মোটেও ধৈর্যশীল শোনায় না।

হঠাৎ করেই আমার একটি সুন্দর, রসালো ম্যাকিনটোশ আপেলে বড়সড় কামড় বসানোর ইচ্ছে হলো। এই আচমকা খেয়ালগুলো সবসময়ই আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, আর আমি সব কাজ ফেলে সেই খেয়াল মেটাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আমি ভিড় কাটিয়ে পর্শেটিকে ঘুরিয়ে প্রথম যে সুপারমার্কেটটি নজরে এলো, তার পার্কিং লটে ঢুকিয়ে দিলাম। আইনের তোয়াক্কা না করে অগ্নিনির্বাপক যানের জন্য নির্দিষ্ট নিষিদ্ধ স্থানেই গাড়িটি দাঁড় করিয়ে রাখলাম।

আপেলটি সংগ্রহের জন্য আমি ভেতরে ছুটে গেলাম। একটি বড়সড় পাকা আপেল বেছে নিয়ে জ্যাকেটের পকেটে পুরলাম। দোকান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথেই তাকে আমার নজরে পড়ল। সে তখন কমলা বাছছিল।

রূপের বিচারে তাকে হয়তো দশে আট দেওয়া যেত। বেশ লোভনীয়, যদিও ঠিক অপ্সরা বা দেবীতুল্য রূপসী নন। তার পোশাকে ছিল একজন গ্রন্থাগারিকের মতো পরিপাটি ভাব। মুখে প্রসাধন বা মেকআপের লেশমাত্র ছিল না, চুলগুলো শক্ত করে পেছনে বাঁধা। আমি নিশ্চিত নই তার মধ্যে ঠিক কী এমন ছিল যা আমাকে মুহূর্তে উত্তেজিত করে তুলেছিল, কিন্তু অনুভূতিটা ছিল সেই আপেলের মতোই—আমি তাকে তখন এবং ওভাবেই চাইছিলাম।

আমি পাশের সারি দিয়ে হেঁটে তার ঠিক বিপরীতে পৌঁছালাম। কাছ থেকে তার আকর্ষণ আরও তীব্র মনে হলো। আমি প্রথমেই তার অনামিকা পরীক্ষা করলাম, দেখলাম সেখানে কোনো আংটি নেই—সে সম্পূর্ণ মুক্ত। আমি চাইছিলাম সে মুখ তুলে আমার দিকে তাকাক, কিন্তু সে কমলা টিপে দেখতেই মগ্ন ছিল।

অগত্যা সে যে ফলটিতে হাত রেখেছিল, আমিও সেটিতেই হাত রাখলাম। স্পর্শ পেতেই সে চমকে তাকাল।

“দুঃখিত,” আমি বললাম, “আপনি আগে নিন।” এবং ধীরলয়ে আমার হাতটি সরিয়ে নিলাম।

আমার চোখে ধরা পড়ার সাথে সাথে তার চেহারার সেই বিরক্তির রেশটুকু ম্লান হয়ে গেল। আমি তার দৃষ্টির সাথে নিজের দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছিলাম, আর ক্ষণিকের জন্য আমার মনে এই প্রত্যয় জন্মাল—আমি যদি তাকে আদেশ করতাম, ‘আমাকে অনুসরণ করো’, তবে সে হাতের ওই জঘন্য কমলাটি ফেলে আমার পিছু নিত। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল এবং দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম, মনে মনে চাইছিলাম সে যেন আবার চোখ তুলে তাকায়। কিন্তু সে তাকাল না। সে পেছনে না তাকিয়েই ফলের সারি ধরে এগিয়ে গেল। আমি তাকে হারালাম। আর আমি হারতে ঘৃণা করি।

আমি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম এবং দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম। আমি আমার পর্শে গাড়িটি পার্কিং লটের কোণে নিয়ে গেলাম, যেখান থেকে তার বেরিয়ে আসা স্পষ্ট দেখা যায়। কিছুটা সময় লাগল বটে, কিন্তু আমার হাতে সময় কাটানোর মতো একটি আপেল ছিল; আমি ধীরেসুস্থে সেটি খেতে লাগলাম। আমার মনে হয়, এটি ছিল আমার খাওয়া সর্বকালের সেরা আপেল।

কিছুক্ষণ পর সে একটি গাঢ় নীল ভলভো ওয়াগনে চড়ে বের হলো। আমরা যখন পার্কিং লট থেকে বের হলাম, আমি তার চেয়ে মাত্র এক গাড়ি পেছনে ছিলাম। তার পিছু নেওয়া বেশ সহজ ছিল। আমি ভাবছিলাম, তার মাথায় কি অনেক দুশ্চিন্তা কাজ করছে, নাকি সেও অন্য দশজন আনাড়ি চালকের মতোই। সে আমাকে একটি সাধারণ, মধ্যবিত্ত শহরতলির দিকে নিয়ে গেল। সত্যি বলতে, তার সবকিছুই এত সাধারণ ছিল যে, আমি বুঝতে পারছিলাম না কেন আমি তাকে অনুসরণ করার জন্য এত কসরত করছি।

সে শান্ত পাড়ার রাস্তা ধরে এগোতে শুরু করলে আমি গাড়ির গতি কমিয়ে আরও পেছনে সরে গেলাম। আমি প্রস্তুত ছিলাম, তাই সে যখন তার বাড়ির ড্রাইভওয়েতে গাড়ি ঢোকাল, আমি রাস্তার কার্বের পাশে সন্তর্পণে গাড়ি থামিয়ে দিলাম। তার ছোট র‍্যাঞ্চ বাড়িটির সাথে অন্য বাড়িগুলোর একমাত্র পার্থক্য ছিল রঙের। দরজার দিকে যাওয়ার পথে সে হাত থেকে কিছু একটা ফেলে দিল, আর তার বাজারের ব্যাগগুলো প্রায় পড়েই যাচ্ছিল।

সে ভেতরে যাওয়ার পর, আমি গাড়ি নিয়ে রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলাম এবং বাড়ির ঠিক উল্টোদিকে পার্ক করলাম। আমি বাড়িটি পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরেই আমি ভেতরের বিন্যাসটি মনে মনে কল্পনা করে নিতে পারলাম। একটি র‍্যাঞ্চ বাড়ির ফ্লোর প্ল্যান সাধারণত সীমিত ধরনের হয় এবং জানালার অবস্থান দেখেই অনেক কিছু আঁচ করা যায়।

আমি তার অবয়বকে কিছুক্ষণ নড়াচড়া করতে দেখলাম—যেটি সম্ভবত রান্নাঘর। ধারণা করলাম, সে হয়তো তার কেনা জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে। তারপর সে নিশ্চয়ই বাড়ির পেছনের দিকে চলে গেছে। আমি অপেক্ষা করলাম, কিন্তু আর কোনো নড়াচড়া চোখে পড়ল না। সম্ভবত শোবার ঘরে। হয়তো সে স্নানের জন্য বাথটাব প্রস্তুত করছে।

তাকে নগ্ন অবস্থায় কল্পনা করতে আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না। যদিও আমি তাকে ক্ষণিকের জন্য দেখেছি, তবুও আমি স্পষ্ট জানতাম তার শরীর কেমন হতে পারে। তার ম্যাড়ম্যাড়ে স্কার্টের নিচে নিশ্চয়ই একটি উঁচু, সুডৌল নিতম্ব এবং দীর্ঘ উরু লুক্কায়িত আছে, সাথে সুগঠিত মাংসল পদযুগল। সে সেইসব নারীদের একজন, যাদের কোমর দীর্ঘ। তার স্তনদ্বয় বেশ ব্যবধানে অবস্থিত হবে, যার মধ্যমণি হবে ডলারের মুদ্রার মতো বড় ও গাঢ় রঙের স্তনবৃন্ত। সে বেশ গর্বভরে মাথা উঁচু করে হাঁটে, তাই সেই মার্জিত গ্রীবার নিচে তার কলারবোনগুলো নিশ্চয়ই স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠবে।

ভাবলাম, স্নানের সময় সে কি তার সেই দীর্ঘ, উজ্জ্বল কেশরাশি এলিয়ে দেয়? অবশ্যই দেয়। এটাই তো স্বাভাবিক—কাজের সময় সব শক্ত করে বাঁধা, আর ঘরে ফিরলেই রাজহাঁসের মতো মুক্ত। মনের চোখে সেই দৃশ্য দেখে আমি উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। আমার প্রায় স্খলনের উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু আমি কখনোই ওভাবে হস্তমৈথুনে অভ্যস্ত নই।

না, আমি এর জন্য অপেক্ষা করব। অপেক্ষা করব যতক্ষণ না সে আমার কাছে এটি প্রার্থনা করে। কিছু জিনিস আপেলের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে মেটাতে একটু বেশি সময় নেয়।

৩.

সকালের ক্লাসগুলো ভাগ্যক্রমে কম হতাশাজনক ছিল। হয়তো ছাত্ররা অবশেষে বিষয়গুলো বুঝতে শুরু করেছে। আমার ইচ্ছা ছিল তাদের কাছে অতীতকে জীবন্ত করে তোলা। আমি ইতিহাসের চক্রাকার তত্ত্বে বিশ্বাসী। ইতিহাস কখনোই ধুলোবালি মাখা, অপ্রাসঙ্গিক ঘটনার নীরস নথি ছিল না। এটি সর্বদা ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। এর শিক্ষা না বোঝা এবং তা না মানার ফলেই আমরা ভিয়েতনামের মতো নিরর্থক সংঘাতের জটে আটকা পড়েছিলাম, আর এখন ইরাক নামক যে জয়হীন জগাখিচুড়ি তৈরি হচ্ছে, তাতেও জড়িয়ে পড়েছি। ইতিহাসের কোনো বিচক্ষণ ছাত্রের কাছেই এসব স্থানে আমাদের জড়িয়ে পড়াটা অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হতো। দুর্ভাগ্যক্রমে, আমাদের নীতিনির্ধারকরা ঐতিহাসিক নজিরের যে মূল্য দেন, তা আমার প্রথম বর্ষের ছাত্রদের মতোই—নগণ্য।

দুপুরে ক্যাফেটেরিয়ায় জেনি আমাকে ধরে বসল। সে মহিলাদের ট্র্যাক কোচ, আর তার জীবনের একমাত্র হতাশা তার স্টপওয়াচকে ঘিরে। সে এক প্রাণশক্তিতে ভরপুর, চকলেট রঙের ছিপছিপে শরীরের অধিকারী। তার পায়ের পদক্ষেপ যদি আরেকটু দীর্ঘ হতো, তবে হয়তো সে অলিম্পিক দলে সুযোগ পেত। আমি জানতাম তার মনে কী ঘুরপাক খাচ্ছে। সে আমার সাথে কাউকে না কাউকে জুড়তে বদ্ধপরিকর। আমি মনে মনে ভাবলাম যে, তার এই আগ্রহের জন্য আমার খুশি হওয়া উচিত। যখন আমি এই স্টেটে শিক্ষকতা শুরু করি, তখন প্রথম বন্ধু হিসেবে একজন কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাকে পেয়ে আমি অবাকই হয়েছিলাম। তখন থেকে সেই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।

“তাহলে তুমি শুক্রবার রাতে আমার সাথে যাচ্ছো, তাই তো?”

“এই লোকটার শ্বাস-প্রশ্বাস কেমন?” আমি কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলাম।

“শুরু করিস না তো, বান্ধবী! ওর নাম জন, বিলের সাথে সেদিন ওর দেখা হয়েছিল এবং সে খুব চমৎকার মানুষ। এখন থেকে এক বছর পর তোরা দু’জন যখন সোনালি চুলের একগাদা বাচ্চা সামলাতে গিয়ে রাত জাগবি, তখন তুই আমাকে ধন্যবাদ দিবি।” সে হাসল।

“আমি যাব, কিন্তু ভুলেও তাকে এটা বলিস না যে সে কোনো সুযোগ পেতে চলেছে।”

“আমি কথা দিচ্ছি, তবে আমি জানি তুই এই লোকটার পৌরুষে মজে যাবি!” সে চোখ টিপে বলল। “তাকে দেখে আমার প্যান্টি ভিজে গিয়েছিল, আর তুই তো জানিস আমি কদাচিৎ সাদা পাউরুটি খাই (শ্বেতাঙ্গদের পছন্দ করি)।”

“তুই মিথ্যে বলিস, জেনি। বড় পেশি থাকলে তুই একটা সিজোফ্রেনিক অ্যালবিনোকেও ডেট করতিস।”

“আমি কোথায় একটা খুঁজে পাব?” সে মজা করে বলল, “ঠিক আছে। আমাকে যেতে হবে। শুক্রবার রাতে দেখা হবে এবং দয়া করে মিস গ্রুন্ডির মতো সেকেলে পোশাক পরে আসিস না।”

আমি তাকে ঘর থেকে বের হওয়ার পথে টেবিলে টেবিলে হাসির আদান-প্রদান করতে দেখলাম। সে স্বভাবতই সামাজিক প্রাণীদের একজন। আমি তার ডেট বাতিল করার কথা ভাবছিলাম, কিন্তু গত সন্ধ্যার ঘটনার পর আমার মন পাল্টে গেল। বাজারের ফল বিভাগে এক মিনিটের জন্য একজন অচেনা ব্যক্তির সাথে দেখা হওয়া যদি আমাকে হস্তমৈথুন করতে বাধ্য করে, তবে এটা স্পষ্ট যে আমার যৌন সঙ্গমের প্রয়োজন। হয়তো আমি সত্যিই একটি সম্পর্ক চাই।

বিকেলে আমার বক্তৃতায় ‘নিউ ডিল’ যুগ এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার ওপর এর গভীর প্রভাব নিয়ে আলোচনা ছিল। সোশ্যাল সিকিউরিটি এবং বেকারত্ব বীমার মতো বিপ্লবী ধারণার প্রতি ছিল উন্মত্ত বিরোধিতা। অনিয়ন্ত্রিত লোভ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক পতনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছিল এবং বিপ্লবের সম্ভাবনা ছিল বাস্তব। এই সম্ভাবনায় প্রতিষ্ঠিত মহলের আতঙ্কই একজন বিচক্ষণ এফ.ডি.আর.-কে এই সংস্কারগুলো বড় ব্যবসায়ীদের গলায় জোর করে নামিয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা জুগিয়েছিল। তারা এই ধারণাটিকে ঘৃণা করত যে, একজন পুরুষ বা মহিলা সারাজীবনের কঠোর পরিশ্রমের পরে পৃথিবীতে তাদের সময়ের সামান্য একটি অংশ বিশ্রাম নিতে এবং উপভোগ করতে পারবে। তারা বরং চাইত যে, তাদের অধীনস্থ প্রত্যেকে ধনীদের গাড়ির জোয়ালে বাঁধা অবস্থায় কাজ করতে করতেই মৃত্যুবরণ করুক। বেকারত্ব বীমা হয়তো একজন ব্যক্তিকে এমন কাজ খুঁজে নেওয়ার সময় দেবে যা সে উপভোগ করে—বরং তথাকথিত ‘ভালো লোকেদের’ আদেশ মতো কাজ করতে বাধ্য না হয়ে—এই ভাবনাও তাদের বিরক্ত করত। তারা শুধু মানুষের অবস্থার এই উন্নতিগুলোর সক্রিয়ভাবে বিরোধিতাই করেনি, বরং তারপর থেকে বছরের পর বছর ধরে তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরা এই এজেন্ডা হাতে নিয়েছে এবং এই অগ্রগতিকে উল্টে দেওয়ার জন্য পর্দার আড়ালে কাজ করে যাচ্ছে।

বক্তৃতাটি বেশ সমাদৃত হলো এবং আমি আশা করলাম আমি তাদের ভাবিয়ে তুলতে পেরেছি। তারপরে আমরা দেড় ঘণ্টার এক মিটিংয়ে বসলাম। টম জেনকিন্স যেমনটা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, মিটিংটি ছিল অভিভাবকদের কাছে আমাদের মূল্যায়নের বিষয়ে কৌশলপূর্ণ হওয়ার উপদেশমূলক। তারা চেক লেখেন এবং ডিন তাদের রাগাতে চান না।

দিনটি দীর্ঘ ছিল এবং যখন আমি ক্যাম্পাস ছেড়ে বের হলাম, তখন মনে হচ্ছিল কোথাও একটা কড়া পানীয়ের গ্লাস হাতে ধপ করে বসে পড়তে পারলে মন্দ হতো না। আমার যাত্রাপথে ‘দ্য পিগ অ্যান্ড হুইসেল’ নামে একটি ছোট পাব ছিল। আমি কখনো সেখানে থামিনি, কিন্তু আজ সিদ্ধান্ত নিলাম একবার ঘুরে দেখব।

ভেতরে প্রচুর লোক ছিল। সম্ভবত তাদের বেশিরভাগই ট্র্যাফিক কমার অপেক্ষায় একটি পানীয় নিয়ে সময় কাটাচ্ছিল। আমি ঘরের দিকে মুখ করে বারের শেষ প্রান্তে বসলাম যাতে মানুষ দেখতে পারি। বারের পেছনে ‘পিম’স নং ১’ (Pimm’s No. 1) দেখে আমি একটি পিম’স কাপ অর্ডার করলাম। এটি ভালো ছিল, তবে আমার ছাত্রজীবনে লন্ডনে আমার একবারের ভ্রমণের সময় যেমনটি মনে ছিল, ঠিক তেমন নয়। আমি ভেতরটা জরিপ করলাম এবং দেখলাম যে, আসলে এটি গত দশকে গড়ে ওঠা সেই মেকি ইংরেজ পাবগুলোর মধ্যে আরেকটি। নিশ্চয়ই কেউ এই লোকেদের কাছে সেই সমস্ত অচল লাল ফোন বুথ বিক্রি করে প্রচুর অর্থ কামিয়েছে। আমি ভাবলাম, নিশ্চয়ই কোথাও একটি কারখানা আছে যা ‘পিকাডিলি সার্কাস’ সাইনবোর্ড তৈরি করে চলেছে।

আমি আরও একটি পানীয় অর্ডার করব নাকি চলে যাব, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম, তখনই সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করল।

এটা ঘটার সম্ভাবনা কতটুকু ছিল? একই লোক পরের দিনই হাজির হলো? ঠিক আছে, সুপারমার্কেটটি এই পাব থেকে খুব দূরে ছিল না। হয়তো এটা তার পাড়া। আমি তাকে দেখতে দেখতে এই সমস্ত চিন্তা আমার মাথায় ভিড় করল।

সে চারপাশে একবার চোখ বুলাল; যেভাবে লোকেরা ঘরে প্রবেশ করার সময় করে। কেউ তাকে অভ্যর্থনা জানাল না। বারে, সে একটি ড্রাফট বিয়ার নিল, যা নিয়ে সে ডার্টবোর্ডের কাছে গেল। একা, আমার দিকে পিঠ করে, সে ডার্ট ছুঁড়তে শুরু করল।

আমি ফ্যাশন বিশেষজ্ঞ নই, যেমনটা আমার বন্ধু জেনি আমাকে প্রায়ই বলে থাকে, কিন্তু আমার সন্দেহ ছিল যে সে যা পরেছিল তা মলের র‍্যাক থেকে কেনা সাধারণ পোশাক। তাকে দেখতে—ঠিক, পরিপাটি; সম্ভবত এটাই আমার মনে আসল। তার কালো স্লিপ-অন জুতোগুলোতে সেই জৌলুসহীন অথচ দামী আভিজাত্যের দীপ্তি ছিল। আমি তার মুখ দেখতে পারছিলাম না, কিন্তু সে যখন ডার্টগুলি তুলতে গেল, তখন তার চলনে এক সাবলীল ছন্দ ছিল, যা সে প্রায় অলস গতিতে নির্ভুলভাবে ছুঁড়ছিল।

আমি হঠাৎ নিজেকে বোকা মনে করলাম। আমি সেখানে বসে তার পোশাক, তার ধরন, হে ঈশ্বর, এমনকি তার জুতোও বিশ্লেষণ করছিলাম।

আমার কী হয়েছে? সে সম্ভবত তার সেই চাতুর্যপূর্ণ ইঙ্গিত আমি উপেক্ষা করার পরে আমাকে দ্বিতীয়বার ভাবেনি। তার মতো দেখতে একজন পুরুষের জন্য সমুদ্রে ক্ষুধার্ত মাছের অভাব হবে না। আমি স্থির করলাম যে, হয় আমাকে তাকে মন থেকে সরিয়ে দিয়ে চলে যেতে হবে, নয়তো এগিয়ে গিয়ে নিজের পরিচয় দিতে হবে।

৪.

প্রত্যূষেই আমি তার রাস্তার এক কোণে গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষায় ছিলাম। যখন আমরা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পৌঁছালাম, তখন বিস্ময়ের খুব একটা অবকাশ ছিল না। ভেবেছিলাম সে হয়তো একজন গ্রন্থাগারিক, কিন্তু স্নাতক ছাত্রী হওয়ার বয়স তার অনেক আগেই অতিক্রান্ত। আমি তার পার্ক করা গাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে গেলাম। শিক্ষিকা! গাড়ির উইন্ডশিল্ডে সাঁটা অনুষদের স্টিকারটি আগে কীভাবে আমার নজর এড়িয়ে গেল?

আমি তার গাড়ির দৃষ্টিসীমার মধ্যে একটি জায়গা খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষায় রইলাম এবং অবশেষে তা মিলল। ভর্তি বিষয়ক দপ্তরটি খুঁজে বের করলাম। সেখানে কর্মরত এক হাস্যোজ্জ্বল তরুণী—যে কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছে—আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিবরণী বা ক্যাটালগ ধরিয়ে দিল।

বাইরে ছায়াসুনিবিড় একটি বেঞ্চ খুঁজে নিয়ে আমি সেই রমণীর পরিচয় উদ্ঘাটনে মন দিলাম, যাকে আমি প্রলুব্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হ্যাঁ, অনুষদ বিভাগে তার নাম পাওয়া গেল। ছবিটির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এটি তার রূপের প্রতি সুবিচার করতে ব্যর্থ হয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার, সামনাসামনি তাকে দেখে যদি আকৃষ্ট না হতাম এবং পত্রিকার পাতায় এই ছবি দেখতাম, তবে নিবন্ধটি পড়ার বিন্দুমাত্র আগ্রহ বোধ করতাম না। যা হোক, তার সম্পর্কে জানা গেল:

মার্টিন, মিয়ারা। জন্মস্থান: হ্যাভারহিল, ম্যাসাচুসেটস। ফ্রিটাউন হাই স্কুল থেকে স্নাতক। বি.এ., ইতিহাস, বার্টন কলেজ। এম.এ., রাষ্ট্রবিজ্ঞান, নর্থইস্ট ইউনিভার্সিটি। বিভাগ: ইতিহাস। কোর্স: আধুনিক ইতিহাস।

বাকিটা ছিল কোর্সের বিবরণ এবং সময়সূচি। তার নাম, জন্মস্থান এবং শেষ বুধবারের ক্লাস সাড়ে তিনটায় শেষ হয়—এই তথ্য ছাড়া আর কোনো কাজের কথা সেখানে ছিল না। অবশ্য এর চেয়ে বেশি কিছু আমি প্রত্যাশাও করিনি। আজকাল মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় বেশ সতর্ক। পৃথিবীতে নানা ধরনের উন্মাদ ঘুরে বেড়ায়। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, তার স্কুলের ইতিহাস আমাকে দু-একটি সূত্র দিতে পারে। আমি বিবরণীটি আবর্জনার ঝুড়িতে ফেলে দিয়ে গাড়ির দিকে পা বাড়ালাম।

রাস্তায় জ্যাম কম থাকায় দুপুরের আগেই শহরের কেন্দ্রস্থলে আমার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এলাম। বেসমেন্টের গ্যারেজে গাড়ি রেখে লিফটে চড়লাম। উপরের তলার বোতামটি চাপতে আমি সবসময়ই এক ধরনের তৃপ্তি বোধ করি। সেখানে মাত্র ছয়টি অ্যাপার্টমেন্ট, প্রতিটির নিজস্ব ছাদের বাগান এবং টেরেস রয়েছে। রাতে সেখান থেকে নিচের শহরটিকে বড়দিনের আলোকসজ্জার গালিচার মতো মনে হয়। এর জন্য এক বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে, কিন্তু তাতে কী? আমার অর্থের অভাব নেই এবং পৃথিবী ছাড়ার সময় এক পাত্র ছাই ছাড়া আর কিছুই সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আমার নেই।

কম্পিউটারে বসে কাজে লেগে পড়লাম। আমার অনুমান, তার বয়স আটাশ বছরের কাছাকাছি। সেই হিসেবে চুরানব্বই সালে তার হাইস্কুলের গণ্ডি পেরোনোর কথা। আমি ছয়টি ভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনে সেই সাল এবং তার হাইস্কুলের নাম ‘কি-ওয়ার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করলাম এবং অবশেষে ডেভিড মার্টিনকে খুঁজে পেলাম, যে চুরানব্বই সালে সেখান থেকে স্নাতক হয়েছিল। আমি ধরে নিলাম, সেই স্কুলে সেই একমাত্র মার্টিন ছিল না।

আমি স্কুলের গ্রন্থাগারের নম্বর জোগাড় করলাম এবং গ্রন্থাগারিকের কাছে নিজেকে ডেভিড মার্টিন হিসেবে পরিচয় দিলাম। করুণ কণ্ঠে সাজানো এক মিথ্যা গল্প ফেঁদে বসলাম—কীভাবে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আমার বাড়ি ভস্মীভূত হয়েছে এবং আমার মহামূল্যবান হাইস্কুলের ইয়ারবুকগুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমি তাকে অনুরোধ করলাম, তিনি যদি আমার সিনিয়র ইয়ারের পাতাগুলো স্ক্যান করে আমাকে জিপ ফাইল করে পাঠাতে পারেন। আমার দুর্ভাগ্য নিয়ে তিনি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করলেন এবং সাহায্য করতে পেরে খুশি হবেন জানালেন। ফোন রেখে আমি যন্ত্রটির দিকে তাকিয়ে হাসলাম। ভাবলাম, এটি অনেকটা রেসের মাঠে বাজির ঘোড়ার ওপর বাজি ধরার মতো—তিনে এক জেতার সম্ভাবনা। বয়সের হিসেবে এক-আধ বছর এদিক-ওদিক হতেই পারে, কিন্তু জুয়াড়ির কাছে এটাই রোমাঞ্চ।

স্মোকড স্যামন আর গার্লিক ব্রেড সহযোগে সামান্য মধ্যাহ্নভোজ সারলাম এবং ইমেইলের সেই কাঙ্ক্ষিত সংকেত ধ্বনির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

ঘণ্টাখানেক পর নিজেকে বেশ পরিতৃপ্ত মনে হলো। হ্যাঁ, সে সেখানেই ছিল। ডেভিড মার্টিনের ব্রণ-কণ্টকিত মুখের পাশেই শোভা পাচ্ছিল এক তরুণী এবং অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ মিয়ারা মার্টিন। মোটা ফ্রেমের চশমার আড়াল থেকে সে ভবিষ্যতের পানে তাকিয়ে আছে। সে নিশ্চয়ই এখন কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করছে বা ল্যাসিক করিয়েছে। বাকি তথ্যগুলো ছিল গতানুগতিক—ন্যাশনাল অনার সোসাইটি, ডিবেটিং ক্লাব, ড্রামা ক্লাব, সাহিত্য পত্রিকা, ফিউচার টিচার্স অফ আমেরিকা। একমাত্র অস্বাভাবিক বিষয় হলো, খেলাধুলার ঘরটি ছিল সম্পূর্ণ শূন্য। এই নারী পুরোদস্তুর মস্তিষ্কনির্ভর।

সালটি সঠিক হওয়ায় তার কলেজের তথ্য পাওয়াটা সহজ হয়ে গেল। সেই ছবিতে চশমা ছিল না এবং ঠোঁটের কোণে ছিল এক চিলতে হাসির আভাস। “তুমি নিশ্চয়ই অবশেষে নিজের নারীসত্তাকে আবিষ্কার করেছ,” তার ছবির দিকে তাকিয়ে আমি স্বগতোক্তি করলাম।

অন্যথায়, বাকি সবই ছিল কেতাবী—ডিন’স লিস্ট, সর্বোচ্চ সম্মানে (Summa Cum Laude) স্নাতক এবং একটি পিবিকে (ফাই বিটা কাপা) চাবি। তখনও খেলাধুলার কোনো উল্লেখ নেই। আমার সন্দেহ হলো, তার সামাজিক জীবন ছিল নিতান্তই সীমিত। না, আমার মিষ্টি মিয়ারা কখনোই তথাকথিত জনপ্রিয় ভিড়ের অংশ ছিল না।

সাড়ে তিনটা বাজার অপেক্ষায় ছিলাম। প্রায় আরও দু’ঘণ্টা অতিক্রান্ত হয়ে গেল। নিশ্চয়ই কোনো প্রেমিকের সঙ্গ ধরে সে চলে গেছে! এই সহজ সম্ভাবনাটি কেন আমার মাথায় আগে আসেনি? এমন এক রমণীর প্রেমিক থাকাটাই তো স্বাভাবিক।

অবশেষে তাকে একাকী হেঁটে আসতে দেখা গেল এবং সে ভলভোতে উঠে বসল। আমি ইতিমধ্যেই গাড়ির ইঞ্জিন চালু করে দিয়েছিলাম। আমরা সোজা তার বাড়ির পথ ধরলাম। আমি ভাবতে শুরু করলাম, এই রুটিনই কি তার সমগ্র জীবন? কিন্তু আমার সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো যখন সে ‘দ্য পিগ অ্যান্ড হুইসেল’ নামক রাস্তার ধারের এক ছোট পানশালায় থামল।

আমি তাকে ভেতরে থিতু হওয়ার জন্য কিছুটা সময় দিলাম। জায়গাটা লোকে লোকারণ্য, কিন্তু ভিড় ঠেলে বারের এক প্রান্তে তাকে দেখতে পেলাম। আমি একটি বিয়ার হাতে নিয়ে ডার্টবোর্ডের সামনে কিছুটা ফাঁকা জায়গা খুঁজে দাঁড়ালাম। যদিও বেশিক্ষণ তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিনি, তবুও মনে হলো সে আমাকে চিনতে পেরেছে; তবে আমি নিশ্চিত হতে পারলাম না।

তার দিকে পিঠ ঘুরিয়ে আমি ডার্ট খেলায় মগ্ন হওয়ার ভান করলাম। এখন যোগাযোগের মোক্ষম সময়, তবে আমি চেয়েছিলাম এটিকে যেন একটি আকস্মিক সাক্ষাৎ মনে হয়। আমি ভাবছিলাম কীভাবে এগোব, ঠিক তখনই কাঁধে একটি মৃদু স্পর্শ অনুভব করলাম। ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখলাম, সে নিজেই এগিয়ে এসে আমার সেই কষ্টটুকু লাঘব করে দিয়েছে।

আমি তাকে আমার সবচেয়ে মোহনীয় হাসিটি উপহার দিলাম। “ক্ষমা করবেন,” সে বলল, “হয়তো আপনার মনে নেই… কিন্তু গতকাল আমাদের প্রায় দেখা হয়েই গিয়েছিল।” “আমার বিলক্ষণ মনে আছে,” আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম, “আপনিই তো সেই রমণী, যিনি নিখুঁত কমলা খুঁজছিলেন।”

৫.

“হ্যাঁ, আমিই সেই রমণী,” আমি উত্তর দিলাম, যদিও তা বলা ছিল নিষ্প্রয়োজন। “কমলালেবুগুলো আমাকে সর্বদা বিভ্রান্ত করে। প্রাতঃরাশে ফলের রসের পরিবর্তে একটি আস্ত কমলা আস্বাদন করাই আমার পছন্দ। কিন্তু যদি সেটি রসবিহীন শুষ্ক হয়, তবে মনটা বড়ই বিষন্ন হয়ে পড়ে। আর কেবল বাইরের রূপ দেখে এদের বিচার করা দুষ্কর—ঠিক যেন বইয়ের মলাট দেখে তার বিষয়বস্তু অনুধাবন করার ব্যর্থ চেষ্টা।”

সহসা অনুভব করলাম আমি অনর্গল বকে যাচ্ছি, তাই তৎক্ষণাৎ নীরব হলাম। তার সেই সুদৃশ্য হাসিটিতে এবার যেন কিছুটা শ্লেষের আভাস ফুটে উঠল।

“হ্যাঁ, আপনার অনুভূতি আমি বিলক্ষণ বুঝতে পারছি,” সে বলল, “সামান্য একটি ফলের ছলনায় প্রতারিত হলে যে কারও দিনটাই মাটি হয়ে যেতে পারে।”

সে পুনরায় ডার্ট বোর্ডের দিকে মনোযোগ দিল এবং মুহূর্তের নিস্তব্ধতার পর একটি ডার্ট ছুঁড়ল, যা সোজা লক্ষ্যের কেন্দ্রবিন্দু ভেদ করল। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিতান্তই বোকা মনে করতে লাগলাম। ধারণা করলাম, আমার এই খুঁতখুঁতে স্বভাবের পরিচয় পেয়ে সে নিশ্চয়ই বিরক্ত বোধ করছে।

“আসলে, আপনাকে চিনতে পারার পর আমি চলেই যাচ্ছিলাম। কেবল সৌজন্যবশত সম্ভাষণ জানাতে এসেছিলাম,” আমি আড়ষ্টভাবে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার ভান করে বললাম। “হয়তো আবার সাক্ষাৎ হবে।”

কথাটি দুর্বলভাবে শেষ করে আমি পিছিয়ে এলাম। নিজেকে অপদস্থ মনে করে প্রস্থান করার জন্য যেইনা ঘুরে দাঁড়িয়েছি…

“বসো।”

তার কণ্ঠস্বর ছিল কোমল, অথচ তাতে আদেশের সুর স্পষ্ট। তার পিঠ তখনও আমার দিকে ঘোরানো, সে পরবর্তী লক্ষ্যের দিকে মনোযোগী। আচরণটি আমার কাছে শিষ্টাচারবহির্ভূত মনে হলেও, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে পড়লাম। হয়তো মনের গভীরে আমি খুশিই হয়েছিলাম যে, সে আমাকে পুরোপুরি নির্বোধ ভেবে বাতিল করে দেয়নি। সে পুনরায় লক্ষ্যভেদ করল। সম্ভবত এই খেলাটি তার কাছে বিশেষ গুরুত্ববহ। এরপর ডার্টগুলো ওভাবেই রেখে সে ঘুরে এসে আমার ঠিক বিপরীতে বসল। সেই ভুবনভোলানো হাসিটি আবার তার মুখে ফিরে এল, যা এবার যেন আরও উজ্জ্বল ও দীপ্তিময়।

বোর্ডের দিকে ইঙ্গিত করে আমি বললাম, “আপনি এই খেলায় বেশ পারদর্শী।”

সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে আমার প্রশংসা তুচ্ছজ্ঞান করল এবং নীরবে আমার দিকে তাকিয়ে সেই রহস্যময় হাসি হাসতে লাগল—যেন সে আমাকে কথা চালিয়ে যেতে বাধ্য করছে। একের পর এক অর্থহীন পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে আমিও তার চোখের দিকে তাকালাম।

“অ্যালান ক্যামেরন,” অবশেষে সে নীরবতা ভাঙল।

“মিয়ারা মার্টিন,” আমিও হাত বাড়িয়ে দিয়ে উত্তর দিলাম।

করমর্দনের পরিবর্তে সে আমার হাতের কব্জিটি আলতো করে মুঠোয় পুরে নিল। সে আমার অন্য হাতটির জন্যও ইঙ্গিত করল এবং আমি তা বাড়িয়ে দিতেই সে সেটিও একইভাবে ধরল। সে আমাদের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। আমি ভাবলাম, সে কি এবার হস্তরেখাবিদের মতো আমার ভাগ্যগণনার ভান করবে, নাকি অন্য কিছু?

“বলো,” সে শান্ত স্বরে বলল, “তোমার নিজের সম্পর্কে কিছু বলো।”

“কী বলব? বলার মতো তেমন কিছু নেই। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপনা করি। আজকের বক্তৃতার সারসংক্ষেপ শুনতে চান?”

“না। একদম শুরু থেকে বলো, যখন তুমি ম্যাসাচুসেটসের সেই ছোট্ট মেয়েটি ছিলে।”

আমি চমকে উঠে হাত সরিয়ে নিতে চাইলাম, কিন্তু আমার কব্জি তখনও তার দখলে। বিষয়টি অদ্ভুত, কারণ সে কোনো জোর প্রয়োগ করছিল না, তবুও মনে হচ্ছিল যেন অদৃশ্য কোনো হাতকড়ায় আমি তার সাথে বাঁধা পড়েছি।

“আপনি এটা জানলেন কী করে?” আমি বিস্ময়ে প্রশ্ন করলাম।

“তোমার কথার টানে,” সে সহজভাবে উত্তর দিল।

অন্য কেউ কখনো আমার উচ্চারণে আঞ্চলিকতার কথা বলেনি। আমি নিশ্চিত যে আমি কথা বলার সময় কোনো কৃত্রিমতা বা অতিরঞ্জন করি না। আমি হালকাভাবে বললাম, “সেখানেও বলার মতো বিশেষ কিছু নেই। এক মফস্বল শহরে কাটানো নিতান্তই সাধারণ এক শৈশব।”

“ওহ, মিয়ারা, আমার তো মনে হয় না তুমি মোটেও সাধারণ।”

তার কণ্ঠে সেই মাদকতা আবার ফিরে এল এবং এই সামান্য প্রশংসায় আমি লজ্জায় আরক্ত হলাম। এতক্ষণ ধরে এভাবে কব্জি ধরে রাখাটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলছিল, কিন্তু অদ্ভুত কোনো কারণে আমি নিজেকে মুক্ত করার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করলাম না।

“আপনার কী খবর, অ্যালান? আপনি নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন।”

আমার প্রশ্নটি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সে জিজ্ঞেস করল, “তোমার প্রথম যখন চুম্বন হয়েছিল, তখন তোমার বয়স কত ছিল?”

আমি অধৈর্য হয়ে উত্তর দিলাম, “আমার মনে হয় ষোলো। স্কুলের নাচের অনুষ্ঠানের পর। সত্যি বলছি অ্যালান, এবার আমার পালা। আমি আপনার ব্যাপারে কৌতূহলী।”

“আমি মেষ রাশির জাতক। এবার আবার আমার পালা। তুমি যখন কুমারীত্ব বিসর্জন দাও, তখন তোমার বয়স কত ছিল?”

এটি আমার সহ্যের সীমা অতিক্রম করল। আমি ঝটকা দিয়ে আমার হাত সরিয়ে নিলাম। আমি এত জোরে টান দিলাম যে, মনে হলো আমি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলেছি, কারণ সে আসলে আমার হাত খুব আলতোভাবেই ধরে রেখেছিল।

“সদ্য পরিচিত নারীদের কি আপনি সবসময় এমন অশালীন ব্যক্তিগত প্রশ্ন করেন?”

“থাক, উত্তরটা আমি জানি। এটি তোমার কলেজের শেষ বর্ষে ঘটেছিল। সম্ভবত এমন কোনো ছেলের সাথে, যার ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত ছিলে যে সে তোমার মতোই সম্পর্কের বিষয়ে গভীর ভাবত।”

লোকটির কথা শুনে মনে হচ্ছিল আমি যেন এক উন্মুক্ত গ্রন্থ, যার পাতা উল্টে সে যা খুশি পড়ে নিচ্ছে। ধিক! সে একদম ঠিক বলেছে। আমি নিশ্চিত ছিলাম মাইকেল আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে। আমরা দু’বছর একসাথে ছিলাম। আমি ওখানেই চিন্তার লাগাম টানলাম… মাইকেলের কথা আমি আর ভাবি না, ভাবতে চাইও না।

“আমি বিরক্ত হচ্ছি, অ্যালান। আমি এই মনস্তাত্ত্বিক খেলায় আগ্রহী নই। আমার মনে হয় আমার এবার প্রস্থান করা উচিত। আপনার সাথে সাক্ষাৎ হয়ে ভালো লাগল।”

কী বোকা আমি! সৌজন্যবশত আমি আবার হাত বাড়িয়ে দিলাম এবং সে পুনরায় আমার কব্জি নিয়ে একই চাতুর্য করল।

“মিয়ারা, তুমি নিজের সম্পর্কে ভুল ভাবছ। তুমি পুরোপুরি এই মনস্তাত্ত্বিক খেলায় আসক্ত। আসলে, আমি বাজি ধরে বলতে পারি শারীরিক কসরত তোমাকে একঘেয়েমিতে ভোগায়। সম্ভবত বেড়ে ওঠার সময় তুমি কোনো খেলাধুলাও করোনি। তোমার মস্তিষ্কই তোমার সমস্ত শক্তি নিঃশেষ করে ফেলে, নইলে তুমি স্থূল হতে।”

“বড়ই পরিতাপের বিষয় যে আপনার মতো একজন সুপুরুষ এখনও এটা শেখেননি যে, ঔদ্ধত্য পুরুষের সৌন্দর্যের অংশ নয়।”

আমি ভেবেছিলাম এতে সে দমে যাবে। কিন্তু না, সে এমনভাবে কথা চালিয়ে গেল যেন আমি কিছুই বলিনি।

“যদিও তুমি যৌনতা পছন্দ করো,” সে বলল, “এবং তুমি এটা নিয়ে কথা বলতে চাও, কিন্তু তুমি জানো না কীভাবে বলতে হয়। মিয়ারা, শেষ কবে তোমার সঙ্গম হয়েছে?”

এবার আমি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আমার হাত ছাড়িয়ে নিলাম। ব্যাগটি তুলে নিয়ে বুঝিয়ে দিলাম যে আমি চলে যাচ্ছি। সে শান্তভাবে হাসল, কিন্তু আমাকে আটকানোর কোনো চেষ্টা করল না। আমি একই সাথে স্বস্তি পেলাম এবং হতাশ হলাম। আমার অনুভূতিগুলো ছিল বিভ্রান্তিকর। যে পুরুষ আমাকে অস্বস্তিতে ফেলতে আনন্দ পায়, তার প্রতি এমন তীব্র আকর্ষণ বোধ করাটা আমার যুক্তিতে কুলাচ্ছিল না। ধুর ছাই!

আমি যখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছিলাম, সে আবার বলল, “চলো শুক্রবার রাতে আমরা বাইরে যাই। আমি কথা দিচ্ছি, আমি অত্যন্ত কমনীয় এবং পুরোপুরি ভদ্র থাকব।”

“সেটি নিশ্চয়ই দেখার মতো অভিজ্ঞতা হবে, কিন্তু আমার অন্য জায়গায় কথা দেওয়া আছে।”

“বাতিল করে দাও। আমার সাথে তোমার সময়টা আরও উপভোগ্য হবে।”

“আমি পারব না। কিন্তু তবুও ধন্যবাদ। হয়তো আমাদের আবার দেখা হবে।”

“রাত আটটা। শুক্রবার রাত। আমি এখানেই তোমার জন্য অপেক্ষা করব,” সে প্রত্যয়ের সুরে বলল।

আমি তাকে বলতে যাচ্ছিলাম যে সে তার সময় নষ্ট করবে, কিন্তু কেবল মাথা ঝাঁকালাম। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার সেই দীপ্তিময় হাসিটি তখনও আমার দিকে নিবদ্ধ।

গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরার পথে আমি ভাবছিলাম শুক্রবার তার সাথে দেখা করার ঝুঁকি নেওয়া উচিত কিনা। চাইলেও আমি তা করতে পারতাম না। জেনি ভয়ংকর চটে যাবে।

৬.

শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। পাবটি তখনও খুব একটা জমজমাট হয়ে ওঠেনি, তাই আমার সেই নির্দিষ্ট টেবিলে বসতে কোনো সমস্যা হলো না। আমাকে স্বীকার করতেই হবে, মিয়ারা আদৌ আসবে কি না, তা নিয়ে আমার মনে পঞ্চাশ-পঞ্চাশ সংশয় ছিল। আমি অনুভব করেছিলাম যে সে আমার প্রতি আকৃষ্ট, কিন্তু হয়তো আমি তাকে একটু বেশিই অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিলাম। তাছাড়া, সে যে ডেটটির কথা বলেছিল, সেটাও তো ছিল। সত্যিই কি তার কোনো প্রেমিক ছিল, নাকি এটা ছিল আমাকে এড়ানোর একটি অজুহাত? আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল, সে একাই।

যাই হোক, আর ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। যদি সে আসে, তবে সে অবশ্যই সময়নিষ্ঠ হবে। শিক্ষাবিদদের জীবন তো ঘড়ির কাঁটার সাথেই বাঁধা।

আমাদের সেই সাক্ষাতের পর, আমি রাতের খাবারের আয়োজন করেছিলাম এবং কিছু কেনাকাটাও সেরেছিলাম। আমি চৌদ্দ ক্যারেট সোনার একটি অসাধারণ ফ্লোরেনটাইন চোকার খুঁজে পেয়েছিলাম। সেটি নিয়ে আমি একজন স্বর্ণকারের কাছে গিয়েছিলাম এবং তাকে দিয়ে এর সাধারণ আংটাটি একটি কম্বিনেশন টাম্বলার দিয়ে প্রতিস্থাপন করিয়েছিলাম এবং সাথে একটি ছোট ক্লিপ রিং যুক্ত করেছিলাম। আমি তাকে আমার জন্য একই ধাঁচের একটি সোনার লিশ বা শিকল তৈরি করার ফরমাশও দিয়েছিলাম। সে জানিয়েছিল যে, এক সপ্তাহের আগে কোনোভাবেই এটি সম্ভব হবে না। আমার কাছে সময়টা ঠিকই মনে হয়েছিল।

আমার দ্বিতীয় ম্যানহাটন পান করার সময় সে ঠিক ঘড়ি ধরে প্রবেশ করল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে তার চেয়ারটি এগিয়ে দিলাম।

“তোমাকে আজ অনবদ্য লাগছে,” আমি আন্তরিকভাবেই বললাম।

আমার প্রশংসায় কোনো খাদ ছিল না। তার দীর্ঘ, রেশমি চুলগুলো এখন খোলা, কাঁধের চারপাশে তা ঝিকমিক করছিল। সে অসাধারণ সরলতার একটি কালো পোশাক বেছে নিয়েছিল। শরীরে কোনো অলঙ্কার নেই, প্রসাধনও ছিল হালকা ও নিঁখুত। সে বসতেই তার পারফিউমের মৃদু সুবাস আমাকে ছুঁয়ে গেল।

“এত কিছুর পরেও আপনি কেন ভাবলেন যে আমি আসব?” সে জিজ্ঞেস করল।

“তুমি আমার ওপর দিয়ে হেঁটে চলে যাওয়ার পর আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলাম। আর ভাবলাম যদি ঈশ্বর ব্যস্ত থাকেন, সেই জন্য শয়তানের সাথেও একটা চুক্তি করে রেখেছিলাম।”

“আমি তো ভাবছিলাম আপনিই সেই শয়তান,” সে হেসে উঠল।

“আচ্ছা, তুমি কি ‘সিসিলি’ পারফিউম ব্যবহার করেছ?”

“এটা আপনি জানলেন কী করে? আমার মাসি এটা আমাকে পাঠিয়েছিলেন। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এটা খুব একটা সহজলভ্য নয়।”

“অবসর নেওয়ার আগে আমার একটি আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা ছিল। পারফিউম ছিল আমাদের পণ্যের মধ্যে অন্যতম।”

“অবসর নেওয়ার জন্য আপনার বয়স তো বেশ কম, আমি মুগ্ধ।”

“জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। উপভোগ করার জন্য থামাটা আমার কাছে সহজ সিদ্ধান্ত ছিল। তুমি কি কিছু পান করবে, নাকি আমরা উঠব? আমার দারুণ এক নৈশভোজের ব্যবস্থা করা আছে।”

“আমি পান করা এড়িয়ে যেতে পারি। চলুন, যাওয়া যাক।”

সেখানে তার গাড়ি ফেলে যাওয়া নিয়ে কোনো ঝামেলা হলো না। আমি ধরে নিলাম সপ্তাহান্তে সেটি নিরাপদই থাকবে। আমি তাকে তার গাড়ির কাছে নামিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলাম, কিন্তু কখন, তা নির্দিষ্ট করে বলিনি। আমার গাড়ির দিকে তাকিয়ে সে কোনো ‘ওহ’ বা ‘আহ’ করে আতিশয্য দেখাল না, এতে আমি তার প্রতি আরও বেশি মুগ্ধ হলাম। সে জিজ্ঞেস করল আমরা কোথায় যাচ্ছি।

“এটা একটা চমক থাক। আমার মনে হয় তোমার ভালো লাগবে।”

আমি ব্যক্তিগত আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যারেজে গাড়ি পার্ক করে তাকে লিফটের দিকে নিয়ে গেলাম। আমরা ওপরে ওঠার সময় তার কৌতূহল তাকে যেন অস্থির করে তুলছিল, কিন্তু সে মুখে কিছু বলল না। লিফটের দরজা যখন ফোয়ারার দিকে খুলল, তখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে আমি তাকে আমার অ্যাপার্টমেন্টেই নিয়ে এসেছি।

“আমার কোনো ধারণা ছিল না যে এখানে একটা রেস্তোরাঁ আছে,” সে সামান্য ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলল।

“এটা নতুন। আজ রাতে এর গ্র্যান্ড ওপেনিং।”

আমি তাকে বসার ঘরের মধ্য দিয়ে হাঁটিয়ে টেরেসের বাইরে নিয়ে গেলাম। ক্যাটারার এবার সব ঠিকঠাক করেছে। দুজন মানুষের জন্য লিনেনের ওপর টেবিল পাতা, সাথে গোলাকার কাঁচের মোমবাতি। ইউনিফর্ম পরা একজন ওয়েটার তার চেয়ারটি ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি যে ত্রয়ী বাদকদলকে ভাড়া করেছিলাম, আমরা বাইরে যেতেই তারা বাজাতে শুরু করল।

হঠাৎ এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে, সে দুজনার জন্য পাতা টেবিলটি পাশ কাটিয়ে রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল এবং নিচের শহরের আলোর ঝলকানি দেখতে লাগল। সে আমার দিকে পিঠ দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। আমি তার পেছনে এগিয়ে গেলাম এবং আমার হাত তার নরম, অনাবৃত কাঁধে রাখলাম। এবার আর দূরত্ব নয়।

“এই জায়গাটা বেশ নিস্তেজ লাগছে। তুমি চাইলে আমরা আরও প্রাণবন্ত কোনো জায়গা খুঁজে নিতে পারি,” আমি তার কানে ফিসফিস করে বললাম।

“অ্যালান, আমাকে শুধু নিজেকে একটু সামলে নিতে দাও। এটা অসাধারণ। তুমি নিশ্চয়ই পাগল! কেন তুমি এত কিছু করলে? আমি তো প্রায় নিজেই নিজেকে তোমার সাথে দেখা করা থেকে বিরত করে দিয়েছিলাম।”

“আমি তো বলেছি, আমি শয়তানের সাথে চুক্তি করেছিলাম। এসো, বসো। আমি শুনেছি তারা এখানে দারুণ লবস্টার থার্মিডর পরিবেশন করে।”

রাতের খাবার, বিশেষ করে পিচেস ফ্ল্যাম্ব পর্যন্ত সবকিছুই ছিল পুরোপুরি নিখুঁত। আমি রসিক ও মনোমুগ্ধকর ছিলাম এবং তাকে একবারও বিরক্ত করিনি। বিনিময়ে সে আমাকে তার শৈশব, তার প্রিয় গান এবং তার অপছন্দের বিষয়গুলো সম্পর্কে বলল। আমরা একবারও ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলিনি। আমরা যখন একজোড়া কমলার লিকিউর পান করছিলাম, ত্রয়ী বাদকদলটি তখন ‘মিস্টি’ বাজাচ্ছিল এবং আমি তাকে নাচের জন্য আহ্বান জানালাম।

প্রথমদিকে সে কিছুটা আড়ষ্টভাবে নড়ল, কিন্তু একবার যখন সে আমার হাতে নিজেকে সঁপে দিল, তখন তার সেই জড়তা কেটে গেল। আমি আরও এক বোতল ওয়াইন চাইলাম এবং সাহায্যকারীদের বিদায় করে দিলাম। সে যখন তার গ্লাস থেকে চুমুক দিচ্ছিল এবং রাতের দৃশ্য উপভোগ করছিল, তখন তারা নীরবে তাদের জিনিসপত্র গুছিয়ে বেরিয়ে গেল।

রাতের খাবারের সময় তার ইডিথ পিয়াফের কথা বলাটা মনে রেখেছিলাম, তাই আমি ‘লা ভি এন রোজ’ গানটি চালালাম এবং আমরা আবার নাচলাম। সে আমার বাহুডোরে যেন গলে যাচ্ছিল। একজন নারীর সাথে সবকিছুর জন্য সঠিক সময়জ্ঞানটাই আসল।

“তুমি আজ থাকবে,” আমি বললাম।

“হ্যাঁ।”

শয়নকক্ষে সে আমাকে তার পোশাক খোলার অনুমতি দিল। আমি ধীরে ধীরে তা করলাম, তাকে বুঝতে দিলাম যে আমি এই মুহূর্তটি কতটা উপভোগ করছি। সে তার পাম্প জুতো থেকে পা বের করল এবং আমার সুবিধার জন্য তার চুলগুলো তুলে ধরল। আমি তার পিঠের জিপারটি নিচে নামালাম এবং তাকে পোশাকটি থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করলাম।

আমি তাকে পূর্ণ আকারের আয়নার সামনে নিয়ে গেলাম এবং কাঁচের মধ্য দিয়ে তার দৃষ্টি ধরে রাখলাম। তারপর আমি তার কালো লেইসের ব্রাটির ক্ল্যাপ খুলে দিলাম এবং সেটিকে মেঝেতে পড়ে যেতে দিলাম। তার স্তন ঠিক তেমনই ছিল যেমনটা আমি কল্পনা করেছিলাম। আমি তাদের পূর্ণতা অনুভব করলাম, যখন আমি তার স্তনবৃন্তগুলিকে ম্যাসাজ করে শক্ত করে তুললাম। তখনও তার চোখের দিকে তাকিয়ে, আমি আমার ঠোঁট তার গলার কাছে নিয়ে গেলাম এবং তার পারফিউমের ঘ্রাণ নিলাম। এরপর তার চোখ বন্ধ হয়ে গেল এবং সে তার মাথা আমার দিকে হেলিয়ে দিল।

আমি আমার বুড়ো আঙুল তার প্যান্টির ভেতরে ঢুকিয়ে দিলাম এবং তার পিঠ বেয়ে নিচে চুম্বন করতে করতে হাঁটু গেড়ে বসলাম এবং সেগুলোকে খুলে নিলাম। আমি তার নিতম্বে একটি কোমল কামড় দিলাম এবং তাকে আমার দিকে ফেরালাম।

তার ভঙ্গি প্রসারিত হলো এবং সে তার যোনি সামনের দিকে ঠেলে দিল। আমি আমার মুখ তার গভীরে ডুবিয়ে দিলাম এবং তার আকাঙ্ক্ষার ঘ্রাণ নিঃশ্বাস নিলাম। আমি আমার জিহ্বা তার ভেতরে চালালাম এবং সে কামরস দিয়ে আমার জিহ্বা ভিজিয়ে দিল।

“বিছানায় চলো,” সে ফিসফিস করে বলল, “আমি তোমার পুরুষাঙ্গ আমার ভেতরে চাই।”

৭.

আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে আমি তার কাছে ওভাবে চেয়ে বসেছি। এমন তীব্র অনুভূতি আমার আগে কখনো হয়নি। যখন তার মুখ আমার যোনিপথ থেকে সরে গেল, তখন একধরনের শূন্যতার কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু একইসাথে আমি উত্তেজিতও ছিলাম, কারণ আমি চাইছিলাম এবার তার পুরুষাঙ্গ আমার ভেতরে আছড়ে পড়ুক। সে উঠে দাঁড়ালে আমিও বিছানার দিকে এগোলাম, কিন্তু সে আমাকে থামিয়ে দিল। আমি অধৈর্য হয়ে উঠলাম। সে কি জানে না সে আমার কী অবস্থা করেছে?

“অপেক্ষা করো,” সে বলল এবং আমাকে আয়নার দিকে ঘুরিয়ে দিল।

পকেট থেকে সে একটি সোনার হার বের করল। আমার দুপাশে হাত দিয়ে সে সেটি তুলে ধরল। বস্তুটি ছিল অপূর্ব।

“আমি চাই তুমি এটি পরো। তুমি কি এটি গ্রহণ করবে?”

“এটি তো অত্যন্ত মূল্যবান,” আমি মৃদু আপত্তি জানালাম।

“তুমি কি এটি পরবে?”

আমি সম্মত হলাম। তাকে বিছানায় পাওয়ার জন্য আমি তখন যেকোনো কিছুতেই রাজি ছিলাম। আমি আমার চুলগুলো তুলে ধরলাম এবং সে আমার গলায় সেটি পরিয়ে দিল। আয়নায় দেখলাম, হারের সাথে লকেটের মতো একটি ভারী রিং ঝুলছে।

“এটি চমৎকার, অ্যালান, তবে দেখতে খানিকটা কলারের (গলার পাট্টা) মতো লাগছে।”

“কারণ এটি একটি কলার-ই,” সে নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল।

“ওহ,” আমি বিস্মিত হয়ে বললাম।

“মিয়ারা, তুমি কি এখন সেক্স করতে চাও?”

“হ্যাঁ।”

আমার উত্তরের মধ্যে সেই তীব্র তাড়না আমি লুকাতে পারলাম না। অবশেষে, আমি ভাবলাম—

কিন্তু তখনই দেখলাম তার হাতে একটি কালো স্কার্ফ।

“আমি তোমার চোখ বেঁধে দিতে চাই, মিয়ারা। এতে তোমার অনুভূতিগুলো আরও তীব্র হবে।”

আমার উত্তেজনা এমনিতেই আমাকে পাগল করে তুলছিল। এই মুহূর্তে চোখ বাঁধার বিষয়টি নিয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম না, তবে আমি তার ওপর বিশ্বাস রাখলাম। আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। সে আমার চোখের ওপর স্কার্ফটি শক্ত করে বেঁধে দিল, আর মুহূর্তেই সবকিছু অন্ধকারে ডুবে গেল।

এরপর আমাকে সামনের দিকে টেনে নেওয়া হলো—হাত ধরে নয়, বরং সে আমাকে যে চোকারটি পরিয়েছিল, সেটি ধরে। বিষয়টি অদ্ভুত এবং কিছুটা ভীতিপ্রদ মনে হলো। অনুভব করলাম আমাকে ঘোরানো হচ্ছে এবং তারপর বিছানার কিনারা আমার হাঁটুর পেছনের দিকে চাপ দিল। সে আমাকে বিছানায় চিৎ করে শুইয়ে দিল। তাকে আমন্ত্রণ জানাতে আমি দু’পা ছড়িয়ে দিলাম। আমার যোনি তখন শূন্য এবং ব্যাকুল, তাকে দিয়ে পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায়।

হঠাৎ ডান কব্জিতে নরম কিছুর স্পর্শ পেলাম এবং হাতটি মাথার ওপর টেনে নেওয়া হলো। আমি চাইলেও আর হাত নামাতে পারলাম না। বুঝতে পারলাম, আমাকে বিছানার সাথে বাঁধা হচ্ছে।

“অ্যালান? আমি তোমাকে চাইছি। তুমি এমনটা কেন করছ?” আমি কম্পিত স্বরে জিজ্ঞেস করলাম।

“আমি জানি তুমি আমাকে চাও, মিয়ারা। শুধু ধৈর্য ধরো আর আমার ওপর বিশ্বাস রাখো।”

যখন আমার অন্য হাত এবং দু’পায়ের গোড়ালিও বেঁধে ফেলা হলো, আমি চুপ করে রইলাম। আমি তার জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলাম, কিন্তু এভাবে বন্দী হওয়ায় নিজেকে কেবল অনাবৃতই নয়—বরং সম্পূর্ণ অরক্ষিত এবং অসহায় মনে হচ্ছিল। অদ্ভুতভাবে, এই অসহায়ত্ব আমাকে আরও বেশি কাম্য এবং সুন্দর অনুভব করাচ্ছিল। আমি অনুভব করলাম উত্তেজনায় আমার যোনি কামরসে সিক্ত হয়ে উঠছে।

অ্যালানের পোশাক খোলার শব্দ আমার কানে এল এবং সেই অপেক্ষার প্রহর আমাকে উন্মাদ করে তুলছিল। আমি চিৎকার করে তাকে আমার কাছে আসার জন্য, আমার সাথে সেক্স করার জন্য মিনতি করতে প্রস্তুত ছিলাম।

অবশেষে বিছানায় তার শরীরের ভার অনুভব করলাম এবং তারপর তার ঠোঁট আমার ঠোঁটের ওপর চেপে বসল। আমি জিভ দিয়ে জোর করে তার ঠোঁট ফাঁক করে তার মুখের ভেতর গোঙানি দিলাম। সেও আমাকে গভীর চুম্বন করল, মনে হলো আমার ফুসফুস থেকে সব বাতাস শুষে নিচ্ছে। সে যখন মাথা তুলল, আমি হাঁপাচ্ছিলাম।

এরপর তার স্পর্শ পেলাম আমার স্তনবৃন্তের কাছে। সে একটি স্তনে দংশন করছিল, কিন্তু সেই চাপ এত ধীরলয়ে বাড়ছিল যে আমি তা উপভোগই করছিলাম। কিন্তু একটা সময় তা অসহ্য হয়ে উঠল। আমি মিনতি শুরু করলাম।

“দয়া করে! দয়া করে অ্যালান, প্লিজ আমাকে ভোগ করো। অ্যালান, দয়া করে আমার সাথে সেক্স করো।”

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, অবশেষে আমি তার পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ আমার ভেতরে অনুভব করলাম। তবে সেই শয়তানটা তখনও আমাকে জ্বালাতন করছিল। সে কেবল আমার যোনির প্রবেশমুখে অগভীর, ছোট এবং ধীরগতিতে আঘাত করছিল।

“জোরে। প্লিজ, অ্যালান, আরও জোরে,” আমি আর্তনাদ করে উঠলাম।

সে তার পুরোটা আমার ভেতরে ঠেলে দিল… কিন্তু খুব ধীরে… এবং তারপর আবার বের করে নিল। সে পর্যায়ক্রমে আমার যোনির দেয়ালে ঘর্ষণ করছিল এবং আমার ভগাঙ্কুরে আঘাত হানছিল। ইশ! যদি আমার হাত দুটো মুক্ত থাকত! আমি তার নিতম্ব আঁকড়ে ধরে তাকে আমার গভীরে টেনে নিতাম। আমার কোমর আপনাআপনিই তার দিকে উঠে যাচ্ছিল এবং যোনির পেশিগুলো দিয়ে আমি তার পুরুষাঙ্গকে নিংড়ে নিতে শুরু করলাম। আমি এই শয়তানটাকে জোরে সেক্স করতে বাধ্য করবই, সে চাক বা না চাক!

কোনো এক হাস্যকর কারণে আমার মনে হলো, ‘দেখো মা, হাত ছাড়াই কেমন পারছি’। এই মুহূর্তে মাথায় যা খুশি তাই আসতে পারে।

অবশেষে আমার প্রচেষ্টা সফল হলো। সে দ্রুতগতিতে সঙ্গম শুরু করল, তার প্রতিটি ধাক্কা আমার পিউবিক হাড়ের ওপর আছড়ে পড়ছিল। সে আমার স্তন মুঠো করে ধরল এবং তার কণ্ঠের গোঙানি শুনতে পেলাম। আমি অনুভব করলাম আমার ভেতরের সেই চরম বিন্দুটি শক্ত হয়ে উঠছে, ফেটে পড়ার অপেক্ষায়।

যখন অবশেষে সেই বাঁধ ভাঙল, আমি আশা করলাম সেও আমার সাথেই আছে, কারণ আমি তখন জগত-সংসার সব ভুলে গেছি। এক তীব্র উত্তাপ আমার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল এবং আমি এতটাই তীব্র সুখের শিখরে পৌঁছালাম যে মনে হলো আমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলব। আমার বন্দী আঙুলগুলো এমনভাবে কুঁকড়ে গেল যেন মনে হলো সেগুলো ভেঙে যাবে।

চোখ বাঁধা থাকায় সেই অন্ধকারে ভেসে যাওয়াটা সহজ ছিল। তবে আমার মনে হয় আমি এমনিতেও ভেসে যেতাম, কারণ আমি নিশ্চিত—সেই তীব্র অর্গাজম আমার চোখকে উল্টে মাথার ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।

(সমাপ্ত)

 

Leave a Reply